পূজার জন্য ভালোবাসা

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  তুষার সরকার

পূজা সিকদার। আমার গাঁয়ের মেয়ে। অনগ্রসর জাতি। ঘিঞ্জি পরিবেশে ওদের বসতি। নদীতে মাছ ধরে। নদীময় জীবন। নদী ভালো থাকলে ওরা ভালো থাকে। নদীর চোখে কান্না এলে ওরা কাঁদে। আমিও একই গোষ্ঠীর সন্তান। খুব কাছ থেকে দেখেছি যাপিত জীবনের চালচিত্র। ওদের জীবন দুঃখের শ্লোকে গাঁথা, আন্ধার পিন্দা রাতের মতো।

পূজাকে জন্ম থেকে আমি চিনি। জানিও। ওর দুরন্তপনায় মেতে থাকে গ্রাম, গ্রামের মানুষ। মধুমতি নদীর পাড় ওর চেনা, কূলের ঢেউগুলো ওকে পেয়ে ছন্দ ফিরে পায়। মাঝিরা ওকে নৌকায় তুলে পাল উড়িয়ে গান গায়- ‘আমি রঙিলা নায়ের মাঝি...’। বিলের শাপলা-শালুক ওকে দেখে খিল খিল করে হাসে, মনের কথা কয়। গাঁয়ের পায়ে চলা সাদা পথের ধুলো ওকে চেনে, কাছে ডাকে পরম আদরে। পাখিরা ওর সুরে সুর মিলিয়ে গান গায়, চারদিক সুরের বৃষ্টিতে ভেজায়। সবুজে নিকানো মাঠের ফসল ওর আসার শব্দে মাথা দোলায়, যেন জনম জনমের সখ্য। ফুলেরা ওর স্পর্শে সৌন্দর্য ছড়ায়, সৌরভে ভরিয়ে তোলে গাঁয়ের আনাচ-কানাচ। গাছেরা ডাকে ওদের শীতল ছায়ায়, মায়ার বাঁধনে বাঁধতে। গাঁয়ের ছেলে-বুড়ো, বৌ-ঝি সবাই ওকে ভালোবাসে, স্নেহ-মায়া-মমতায় আগলে রাখে। ও যে অভাগী। বাবা মারা গেছেন ছয় বছর আগে। স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মৃত্যু। সেই থেকে মা পরের বাড়ি কাজ করেন। পূজার পড়াশোনার খরচ চালান। মা স্বপ্ন দেখেন, পূজা একদিন অনেক অনেক বড় হবে। বড় হওয়ার শুরুটাও সুখকর। চলতি বছর পূজা নড়াইল জেলার লোহাগড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। যাকে বলে গোবরে পদ্মফুল। কিন্তু ফুল আজ কীটে আক্রান্ত। কুরে কুরে খাচ্ছে ফুলের সব সৌন্দর্য। সরব পূজা আজ নীরব। চোখে বিবর্ণ দৃষ্টি। অবয়বে বিষাদের কালো ছায়া। হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুকনো মুখে ভবিতব্যের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর ব্লাড ক্যান্সার। ক্যান্সার চিকিৎসকবিশেষজ্ঞরা ওর চিকিৎসা করছেন । আরও পাশে আছেন লোহাগড়াবাসী। পাশে আছেন নড়াইলবাসী। পাশে আছে আমার দরদি দেশ। বিদেশে কর্মরত আমাদের সোনার ছেলেরা।

দশের লাঠি একের বোঝা। আমরা ষোলো কোটি মানুষ। একটা করে টাকা দিলেও ষোলো কোটি টাকা হয়। না, ষোলো কোটি টাকা পূজার জন্য লাগবে না। পূজাকে বাঁচাতে প্রয়োজন বারো থেকে পনেরো লাখ টাকা। খুব কি বেশি টাকা? না! আমরা অনেকের জন্যই মানবতার হাত বাড়িয়ে দিই। আমরা পারি। আমরা অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারি। আমরা পূজার চলে যাওয়াও রোধ করতে পারি। যমের দুয়ারে পুঁতে দিতে পারি কাঁটা। আমরা আমাদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে যে যার অবস্থান থেকে যা পারি তাই দিতে পারি পূজার চিকিৎসার জন্য। আমি অবশ্যই তা পারব। আমি না পারলে পরিচিতদের কাছে হাত পাতব। এ হাত পাতায় কোনো লজ্জা নেই। সঙ্কোচ নেই। এ হাত পাতায় আছে মানবতার জয়গান। আমি দেশের টিভি চ্যানেল, বিভিন্ন দৈনিকগুলোকে অনুরোধ করব, আপনারা পূজার পাশে দাঁড়ান। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সবার কাছে মিনতি জানাব, আপনারা পূজার মৃত্যু রুখে দিন। দেশের বাইরে যারা আছেন- তাদের কাছে বিনীত প্রার্থনা, পূজার দেখা সুন্দর পৃথিবীটা যেন নিষ্ঠুর না হয়ে ওঠে।

আমরা পারি। আমরা পারব। পূজা আবার ফিরে যাবে নদীর কাছে, বিলের কাছে, পাখির কাছে, গাছের কাছে, ফুলের কাছে, মাঠ ভরা ফসলের কাছে।

পূজার জন্য সাহায্য পাঠাতে হলে

হায়াতুজ্জামান, প্রধান শিক্ষক, লোহাগড়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। বিকাশ নং-০১৭১১৩৯৬৫৮৩। ডা. এসএম নাহিদ মোর্শেদ চয়ন, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিকাশ নং-০১৯২৪৩৩০৬৪৫। ব্যাংক একাউন্ট নং- সুবর্ণা রাণী সিকদার, এ/সি-৩১৪৫০১০০০৮১৫৬, রূপালী ব্যাংক লিঃ, লোহাগড়া বাজার শাখা, লোহাগড়া, নড়াইল।