প্রবাসে ঈদ আনন্দ

সামনেই কোরবানি ঈদ। বিদেশ-বিভুঁইয়ে বাড়িতে বাড়িতে কোরবানি দেয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু ফার্মে গিয়ে অনেকেই ঈদের দিন কোরবানি দেন। ঈদের দিন আত্মীয়স্বজনদের ছেড়ে কিভাবে ঈদ উদযাপন করবেন প্রবাসী নারীরা। তাদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন সাব্বিন হাসান

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

কোরবানির তাৎপর্য ছোটদের জানানো উচিত : সাজেদা খানম

কোরবানি ঈদের আয়োজন ক’দিন আগেই শুরু হয়। আর ঈদের দিনের উত্তেজনা খুব সকাল থেকেই শুরু হয়। গরু-খাসি জবাই তারপর মাংসের ভাগ থেকে শুরু করে তা শেষ হয় মাংস বিলি করার মধ্যে দিয়ে। এমনই ছিল দেশের কোরবানির ঈদ। দেশের বাইরে আসার পর প্রথম ক’বছর কোরবানির জন্য দেশেই টাকা পাঠানো নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। ফলে কোরবানির মাংস ছাড়াই ঈদের খাওয়া-দাওয়া করতে হতো। কারণ এখানে ঈদের দিনে কোরবানি দিলেও ওই দিন সেই মাংস পাওয়া যায় না। দুই থেকে চারদিন পর সরবরাহ করা হয় কোনো দোকান থেকে। আমার হুশ ফিরল তখন, যখন মেয়েকে ঈদের তাৎপর্য বোঝাতে গেলাম। এক বছর বয়সে মেয়েকে নিয়ে দেশ ছেড়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে আসার কারণে দেশের কোরবানির ঈদ ও পায়নি। তাকে কোরবানি ঈদের আমেজ দেয়ার জন্য খুঁজে বের করি একটা ফার্ম। যেখানে ঈদের দিনই কোরবানির মাংস নিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। ফার্মেই ছাগল বা ভেড়া পছন্দ করে কোরবানি দিয়ে মাংস নিয়ে আসা যায়। এলাকার সমমনা ৫ থেকে ৬ জনের একদল ভাই নামাজ পড়েই চলে যাবেন কোরবানি দিতে। বাসা থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে মাংস নিয়ে বাসায় আসতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হবে তাদের।

এরপর মহা উৎসাহে মাংস ভাগাভাগি করার পাশাপাশি চলবে রান্নাবান্না। বিদেশে পাঁচ থেকে ছয় পরিবারের সবাই এক বাসায় হলে যা হয় আর কি! গল্প, আড্ডা, বাচ্চাদের ছোটাছুটি অবশেষে মাংস বিতরণের পুঁটলি যখন তৈরি, বেরিয়ে পড়া বিলি করতে। আর সে সময় মেয়ের অবাক করা প্রশ্ন, আমাদের কী মাংস বেশি হয়ে গেছে, ফ্রিজে কী জায়গা নাই, তাই সবাইকে দিয়ে দিচ্ছি? মনে হল, এই তো সময় নতুন প্রজন্মকে কিছু হাতে কলমে শেখানোর। মনে হল আমাদের শ্রম কিছুটা হলেও ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত কোরবানি ঈদের তাৎপর্য তাদের জানানো উচিত।

বিদেশে কোরবানির অনুভূতিটা কষ্টের : তানজিদা ইয়াসমিন

দেশের কোরবানির ঈদগুলো ছিল ভীষণ আনন্দের। আব্বা যেদিন হাটে যেতেন গরু কিনতে, সেদিন দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম অধীর আগ্রহে। কখন আসবেন গরু নিয়ে। আর অপেক্ষার সময়টুকুতে বাসার সামনে দিয়ে যে কোনো মানুষকে গরু কিনে বাসায় ফিরতে দেখলেই জিজ্ঞেস করতাম গরুর দাম কত? অন্যরকম একটা উত্তেজনা কাজ করত। আব্বা গরু নিয়ে বাসায় ফিরলে প্রথমেই খেয়াল করতাম আমাদের গরুটা পাশের বাড়ির গরুর চেয়ে সুন্দর কি-না। এটা ছিল ওই বয়সের একটা নিষ্পাপ প্রতিযোগিতা। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে আসার পর আমার সারা জীবনের কোরবানি ঈদের চিত্রটা যেন একদম বদলে গেল। গরুর হাট, হাট থেকে পছন্দমতো গরু কেনা কোনোটাই এখানে নেই। বাসার কাছাকাছি একটা দোকানে গিয়ে যে নামে কোরবানি হবে সেই নাম দিয়ে আসতে হয়। ঈদের পরের দিন মাংস সংগ্রহ করতে হয়। মনের কষ্টটা আড়াল করে এই ভিনদেশি কোরবানির প্রক্রিয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে ফার্মে যাই। কিন্তু বিপত্তি সেখানেও পিছু ছাড়ল না। যখন দোকানি বলল, শুধু ভেড়া কোরবানি হয় সেখানে। আর তারা শুধু মাংস দিবে কিন্তু মগজ, পা, ভুঁড়ি- এসব কিছুই দেবে না। সবকিছু মেনে নিয়ে মাংস নেয়ার সময় মনে হল যেন দোকান থেকে মাংস কিনছি। কোরবানি মনে হল না এতটুকুও। এরপর ঠিক করলাম ফার্মে গিয়ে দেখে পছন্দ করে নিজের দেশের মতো কোরবানি করব। মহা আনন্দে ফার্মে গিয়ে গরু পছন্দ করলাম। মনে মনে কল্পনার জাল বুনছি এবারে নিশ্চয়ই দেশের কোরবানির স্বাদটা অপূর্ণ থাকবে না। কিন্তু আমার সব আনন্দে কষ্টের ছোঁয়া দিতে একটুও কার্পণ্য করলেন না ফার্মের মালিক। তিনি আমাকে বলেছিলেন তিন ঘণ্টা পর যেতে। তারা মাংস রেডি করে রাখবে। এ যেন দোকানে মাংস কেনারই আরেক রূপ। মাংস কাটা বা কোরবানির সঙ্গে সশরীরে যুক্ত থাকা কোনোটাই হয় না প্রবাসে। এটাই কষ্টের।

ঈদের দিনে ছুটি নিতে হবে : ফিরোজা বেগম সায়মা

গত তিন বছর ধরে পর্তুগালে’র কোইমব্রা শহরে বসবাস করছি। এখানে ঈদের দিন ছুটি নিতে হয়। এবারও ছুটি নিব। এই শহরে বাংলাদেশি মাত্র পাঁচ জন। আমি, আমার স্বামী আর মেয়ে সারাহ। শহরের অন্য প্রান্তে আছেন এক বাংলাদেশি ভাই আর তার বাবা। তারপরও চেষ্টা করি প্রবাসেও বাংলাদেশি ঈদের ঐতিহ্য ধরে রাখার। ঈদের আগের রাতে ইউটিউবে ঈদের গান ছেড়ে রান্না করি। সকালে পাশের শহরে গিয়ে ঈদের নামাজ পড়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিন। মায়ের হাতের ঈদের খাবার খাওয়ার সুযোগ আর হয়ে ওঠে না এখানে। দুপুরে এই ক’জন বাঙালি এবং কয়েকজন পর্তুগিজ প্রতিবেশী বন্ধু একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাব। কোরবানির সুযোগ না থাকায় আমাদের কোরবানি দেশেই দেয়া হয়। এবারও তাই হবে। তবে এখন ঈদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমার সাড়ে তিন বছরের মেয়েকে ঈদুল আজহার তাৎপর্য বোঝানো। তার প্রিয় কোনো খেলনা কিনে ঈদের সকালে তাকে সারপ্রাইজ গিফট দেই। তার বাবা ঈদের সকালে নামাজে যাওয়ার আগে ওকে ঈদের সালামি দেবেন। নতুন পোশাক পরে দেশে ভিডিও কলে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে কাটবে ঈদের দিন। বিকেলে শাড়ি পরব। আমার স্বামী পাঞ্জাবি পরবেন। এই সাজে কোনো পার্কে গিয়ে সবাই একসঙ্গে ছবি তুলব। দেশের ঈদ একদিন পরে হওয়ায় পরদিনও দেশের পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে সারাদিন ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করব। আর অনলাইনে ঈদের অনুষ্ঠান দেখে কেটে যাবে ঈদ।

নিজেদের মতো করে আনন্দ করব : মাসরুরা ফেরদৌস

বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-পরিচালকের পদে কর্মরত রয়েছি। শিক্ষা ছুটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ‘অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ডস’ বৃত্তিতে ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নে পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়ছি। দেশের ঈদের সঙ্গে এখানের ঈদের কোনোভাবেই তুলনা হয় না। ঈদের দিন ভাই-বোন-কাজিনদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি আড্ডা হতো। এবার মায়ের হাতের সব স্পেশাল রান্নাগুলো মিস করব। আর এখানে ঈদের দিনে ছুটি থাকে না বলে প্রায়ই ইচ্ছামতো বেড়ানো সম্ভব হয় না। তাছাড়া বিভিন্ন দেশের মুসলিম কমিউনিটি চাঁদের হিসাব অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন দিনে ঈদ পালন করেন। কয়েকজন মিলে কোরবানি দেয়ার ইচ্ছা আছে। বিদেশে অবশ্য দেশের মতো কোরবানির উৎসব হয় না। এখানে বেশিরভাগ বাঙালি মুসলিম দোকান থেকে মাংস কিনে ঈদুল আজহা উদযাপন করেন। তবে অনেকে শহর থেকে দূরে ফার্মে গিয়ে নিজেরা ছাগল কিনে কোরবানি দেবেন। দেশে থাকতে এক্সপেরিমেন্টাল রান্না করতাম ঈদের সময়ে। প্রথমে ভেবেছিলাম বিদেশে ঈদের দিনটায় হয়তো মন খারাপ করে কাটাতে হবে। কিন্তু এখন তা মনে হয় না। এবারে ঈদের দিন বাংলাদেশি ভাইয়া-আপু, বন্ধুদের দাওয়াত করেছি বাসায়। সবাই মিলে বেড়াতেও যাব। সত্যি বলতে এবারও বিদেশে নিজেদের মতো করে আনন্দ করব। গত ঈদেও আমরা আনন্দ করেছি। এবারও ভালোই কাটবে এমনটা আশা করছি।