কেঁচো চাষী কামরুন নাহারের গল্প

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আব্বাস আলী

ছবি: লেখক

ডাবরে কেঁচো চাষ করছিলেন কামরুন নাহার। টেলিভিশনে একদিন কেঁচো চাষের অনুষ্ঠান দেখে এর প্রতি আগ্রহ জন্মে তার। মনে মনে বলেন, কেঁচো চাষের পদ্ধতি যদি হাতেকলমে শিখতে পারতেন। সেই আগ্রহ থেকেই কেঁচো চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নেন।

এ প্রসঙ্গে নওগাঁর মান্দা উপজেলার বিজয়পুর গ্রামের মৃধাপাড়ার গৃহবধূ কামরুন নাহার বলেন, মাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনা করতে পারলাম না। কিন্তু কিছু একটা করার ইচ্ছা সবসময় আমাকে তাড়িয়ে বেড়াত। তা থেকে বাড়িতেই কেঁচো খামার গড়ে তুলি। এখন কেঁচো চাষ করছি। এলাকায় কৃষাণী হিসেবে পরিচিতিও পেয়েছি।

২০১৪ সালে একটি বেসরকারি সংস্থা সিসিডিবি থেকে বিজয়পুর গ্রামে কেঁচো চাষের ওপর একদিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এই প্রশিক্ষণে ৩৫ জন নারী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে কামরুন নাহারও ছিলেন। ওই সংস্থা থেকে একটি করে ডাবর (মাটির বড় পাত্র) ও কিছু কেঁচো ও উপকরণ দেয়া হয়। এইটুকু সহযোগিতা কামরুন নাহারকে স্বপ্ন পূরণে পৌঁছে দেয়।

এরপর কেঁচো সার তৈরি করতে কামরুন নাহারকে আর বেগ পেতে হয়নি। কারণ কেঁচো সার তৈরির প্রধান উপকরণ গোবর। তার দুটি গরু রয়েছে। আছে দুটি বাছুরও। খামারে গরুগুলো সবসময় বাঁধা থাকে। সেখানে গরুগুলোকে পরিচর্যা করা হয়। কেঁচো সার তৈরিতে প্রথমে গোবরকে বালু ও আবর্জনা মুক্ত করেন। এরপর একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে মুখ বেঁধে ১০-১২ দিন ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে দেন।

কারণ এসময়ের মধ্যে গোবর থেকে গ্যাস বেরিয়ে যায় এবং কালচে রং ধারণ করে। এরপর সেগুলো পলিথিনের বস্তার ওপর ঢেলে রিফাইন করে বা পানি দিয়ে হালকা নরম করে ডাবরে রাখা হয়। সেখানে কেঁচো ছেড়ে দিয়ে ছায়াযুক্ত স্থানে রাখা হয়। এভাবেই শুরু হয় সার তৈরির প্রক্রিয়া। কেঁচোর পরিমাণ বেশি হলে ১২-১৫ দিন।

আর যদি কেঁচোর পরিমাণ কম হয় তাহলে ১৮-২০ দিনের মতো সময় লাগে। বর্তমানে দুটি বড় এবং তিনটি মাঝারি আকারের ডাবরে কেঁচো সার তৈরি করেন তিনি। আলাদা করে তাকে আর কেঁচো কিনতে হয় না।

গোবরের মধ্যে কেঁচো ডিম দেয় এবং সেখান থেকেই কেঁচো জন্মে। আর এ সারগুলো তিনি নিজের কাজেই ব্যবহার করেন। যেমন বেগুন, লাউ, আদা, হলুদ, সিম, মরিচ চাষে এবং নারিকেল গাছের গোড়ায় ব্যবহার করেন। বাড়তিটুকু বিক্রি করেন।

এ পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার টাকার কেঁচো বিক্রি করেছেন। আরও প্রায় চার হাজার টাকার মতো বিক্রি করবেন। প্রতি কেজি কেঁচো সারের দাম নেন ১০ টাকা। প্রতিবেশীরাই তার ক্রেতা। তার এ পদ্ধতি দেখে এখন অনেকেই কেঁচো সার তৈরিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

এ প্রসঙ্গে তারই প্রতিবেশী গৃহবধূ জান্নাতুন নেছা বলেন, কেঁচো সার শিম গাছের গোড়ায় দিয়েছিলাম। কিছুদিন পর গাছের চেহারা সুন্দর হয়ে ওঠে। এখন গাছে শিম ধরতে শুরু করেছে। আগামীতে নিজেরাই কেঁচো সার তৈরি করব। জমিতে ফসলের ভালো ফলনের জন্য এটি খুবই উপকারী।

এ কাজে কোনো বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কিনা এ প্রসঙ্গে কামরুন নাহার বলেন, যখন কেঁচো চাষ শুরু করি তখন বাড়ির অনেকেই বাধা দিয়েছেন। কিন্তু আমি দমে যাইনি। নিজের চেষ্টায় কেঁচো চাষে এগিয়ে চলেছি। সবজির ফলন ভালো হওয়ায় এখন আর কেহ বাধা দেয় না। আমার বাবা আনিছার রহমান মৃধাও এখন কেঁচো চাষে আগ্রহী হয়েছেন।

কেঁচো চাষ নিয়ে ভবিষৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে কামরুন নাহার জানান, আরও বড় পরিসরে কেঁচো চাষ করার ইচ্ছা আছে তার। সেক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতাও দরকার। এলাকার কৃষকরা সবজি ও ধানের আবাদে রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন।

তারা যেন ফসলে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে কেঁচো সার বা জৈব সার ব্যবহারে আগ্রহী হয় সে ক্ষেত্রে কাজ করবেন তিনি। সবাই যখন কেঁচো সার নিজেরাই তৈরি করে জমিতে ব্যবহার করবে, তখন রাসায়নিক সারের চাহিদা কমে যাবে। এছাড়া আবাদের খরচও কম হবে।

মান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উপজেলায় বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অনেকেই কেঁচো চাষ করছেন। বাণিজ্যিকভাবে এখনও চাষ শুরু হয়নি। তবে আগামীতে কেঁচো চাষীর সংখ্যা বাড়াতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হবে।

সরকারিভাবে এ পর্যন্ত ২০ সেট (৩টি রিং স্লাব, কেঁচো, খাদ্য) কেঁচো চাষের উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। কৃষকরা নিজেরাই কেঁচো খাদ্য সংগ্রহ করেন।