একাত্তরের জননী রমা চৌধুরী

রমা চৌধুরী। একজন মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। স্বাধীন দেশেও তিনি অবহেলিত হয়েছিলেন স্বামী-স্বজনদের দ্বারা। ৩ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাকে নিয়ে লিখেছেন- রঞ্জন মল্লিক

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

সুখের সঙ্গে রমা চৌধুরীর আড়ি ছিল সারাজীবন। তবে দুঃখকে সঙ্গী করলেও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সমাজ ও মানুষ নিয়ে ভাবতেন। নিজেই শুধু বাঁচব না অন্যকে বাঁচানোর চেষ্টা করব- এটা ছিল তার জীবনের আদর্শ।

একবার নানাবিধ আলাপচারিতায় একটি অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তাকে করার সুযোগ হয়েছিল আমার। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনি এত বিড়াল লালন-পালন করেন কেন? নিমিষে তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছিল। একটু উত্তেজিতভাবেই বলেছিলেন, মানুষের লোভ-লালসা দেখে আমি আর ভক্তি রাখতে পারছি না। সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এখনও পুরোপুরি আসেনি। লোভী মানুষের ভিড়ে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। তাই বিড়াল নিয়ে থাকি। ওদের সৌন্দর্য দেখি। লোভী মানুষের চেয়ে বিড়াল অনেক ভালো।

এত অভাব অনটনের মধ্যেও তিনি তার গ্রামে দীপংকর স্মৃতি অনাথালয় নামের একটি আশ্রম চালাতেন। নীতি ও আদর্শের সঙ্গে তিনি কখনও আপোষ করেননি। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাতে একটি করে অনাথ আশ্রম করার শেষ ইচ্ছা ছিল তার। যেখানে সব ধর্মের অনাথরা থাকবে।

মহীয়সী এ নারী জীবন ও কর্মে রেখে গেছেন তার প্রতিভার স্বাক্ষর। হার না মানা সংগ্রামী এ নারী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

রমা চৌধুরী ১৪ অক্টোবর ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে, চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারান। মা মোতিময়ী চৌধুরীর স্নেহ-আদরে তার বেড়ে ওঠা। জীবিকার অন্বেষণে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময়েই তিনি স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা করেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালে তিনি কক্সবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার পদে যোগদান করেন। ১৯৬৯-৭০ সালে স্বাধিকার আন্দোলনে অংশ নেন।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয়মাস রমা চৌধুরীর জীবনে নেমে আসে কঠিন দুঃসময়। ২০১৩ সালে রমা চৌধুরীর ১৯৭১ এবং পরবর্তী জীবন নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করি। প্রথমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের কঠিন দিনগুলো সম্পর্কে কোনো কথা বলতে চাননি। সাহিত্য, জীবনবোধ এবং সমাজের নানা রকম মানুষের কথা দিয়েই আলোচনার শুরুটা হয়েছিল। সেখানে তিনি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের জীবন-যাত্রার মান উন্নয়ন ছাড়া স্বাধীনতা তাৎপর্যহীন। বাংলার মানুষ অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সুদূরকাল থেকে জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাঙালিরা একত্রিত হয়েছিল শুধু সেই আশায়। দীর্ঘদিনের শোষণ-বঞ্চনার অবসান হবে, মনে ছিল সেই ভরসা। কথা প্রসঙ্গে একাত্তর সম্পর্কেও বলেছিলেন। আলাউদ্দিন খোকন ছিলেন তার সহচর। ২৪ বছর দিদিকে দেখভাল করেছেন। দিদি আলাউদ্দিন খোকনকে পুত্রবত স্নেহ করতেন। কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, মানুষের যদি চৈতন্য না হয়, নৈতিকতা না থাকে তবে দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে না। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি কি লোভের জন্ম দিতে। লোভী মানুষের সঙ্গে খানসেনাদের কোনো পার্থক্য নেই। একাত্তরের ১৩ মে সকালে খানসেনারা তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। আতঙ্কিত পুরুষ, নারী ও বৃদ্ধরা এদিক-সেদিক পালান। খানসেনারা তাদের বাড়িতে ঢুকে কয়েকটি ঘর তল্লাশি করে। একটি ঘরে অনেক মালামাল ছিল। খানসেনারা ঘরটি ভালোভাবে তল্লাশি করে চলে যায়। বাড়ির লোকজন ভেবেছিলেন বিপদ কেটে গেছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আশ্রয় নেয়া মানুষজন তাদের বাড়িতে এসে জড়ো হয়। প্রায় আধ ঘণ্টা পর খানসেনারা আবার ফিরে আসে এবং অতর্কিতে হামলা চালায়। তিনি ও তার মা বাচ্চাদের নিয়ে ঘর থেকে বেরুনোর সময় খানসেনাদের হাতে ধরা পড়েন। দুই শিশু ও তার মাকে খানসেনারা রাইফেল তাক করে আটকে রাখে। দীর্ঘদেহী একজন খানসেনা তার গতিরোধ করে। খানসেনার শক্ত হাতের মুঠো থেকে নিজেকে মুক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেও বিফল হন তিনি। তাকে টেনে হেঁচড়ে পাশে তার কাকার ঘরে নিয়ে যায়। এরপর আর কথা বলতে পারেননি তিনি।

এই ঘটনার মাত্র ছয়-সাত মাসের ব্যবধানে তার দুটি শিশু পুত্র সাগর ও টগর মারা যায়। স্বাধীনতার পর স্বামীও তাকে পরিত্যাগ করে। মুক্তিযুদ্ধ তাকে অপমান ও আঘাতে জর্জরিত করে। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। দুঃখ-দুর্দশাকে ঝেড়ে ফেলে আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। ১৯৭৮ সালে আলসারে আক্রান্ত হলে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন।

এরপর জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি কলম ধরেন। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলা সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে লিখেন। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে রমা চৌধুরীর গ্রন্থ সংখ্যা ১৮। নিজের বই নিজেই ফেরি করে বিক্রি করতেন। ‘একাত্তরের জননী’ মুক্তিযুদ্ধের ওপর তার একটি অনবদ্য লেখা। তার উল্লেখযোগ্য কাব্য ও প্রবন্ধের মধ্যে ‘স্বর্গে আমি যাব না’, ‘শহীদের জিজ্ঞাসা’, ‘রবীন্দ্র সাহিত্যে ভৃত্য’, ‘অপ্রিয় বচন’ এবং ‘সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ ইত্যাদি।