ট্র্যাকের রানী শিরিন আক্তার

দেশের দ্রুততম মানবী শিরিন আক্তার। ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর জাতীয় অ্যাথলেটিক্সের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে দ্রুততম মানবী হওয়ার দৌড়ে তিনি সময় নিয়েছেন ১২.৩০ সেকেন্ড। তাকে নিয়ে লিখেছেন- ওমর ফারুক রুবেল

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

শেলি অ্যানফ্রেজার প্রাইসের নাম শুনেছেন তো? জ্যামাইকার স্প্রিন্টার। বেইজিং আর লন্ডন অলিম্পিকে ট্র্যাকে ঝড় তুলে দুটি সোনা জিতেছিলেন তিনি। সাতবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের সোনার পদকও জেতেন এই কৃষ্ণকলি স্প্রিন্টার। আমাদেরও আছেন তেমন একজন শেলি অ্যানফ্রেজার প্রাইস। নাম শিরিন আক্তার। অলিম্পিকে পদকের স্বপ্ন আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের মানায় না। তবে দেশের সেরা ক্রীড়াবিদের মর্যাদায় তো আসীন থাকতে পারেন। বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্সে টানা ছয়বারের দ্রুততম মানবী বাংলাদেশ নৌবাহিনীর স্প্রিন্টার শিরিন সেটাই দেখিয়ে চলেছেন।

পরিবারের কথা

সাতক্ষীরার এলারচরের দোহাকোলা গ্রাম। এ গ্রামে বাস করেন শেখ আবদুল মজিদ। মাছের ঘের আছে। আছে প্রচুর ধানী জমির মাঠ। প্রচণ্ড ধর্মপরায়ণ। স্ত্রী আঙ্গুরা বেগম। তাদের চার মেয়ে। তিন মেয়ে বাবার নির্দেশে পর্দা করে চলে। তবে দ্বিতীয় মেয়ে শিরিন আক্তার একটু ব্যতিক্রম। বই হাতে রোজ গ্রামের মেঠোপথ ধরে স্কুলে যেত। চঞ্চল প্রকৃতির শিরিন দুরন্ত শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা দেন। ঠিক তখনই তার চলন বলনে রেগে যেতেন বাবা আবদুল মজিদ। অন্য মেয়েরা যখন বোরকা পরে বাড়ির বাইরে যেত, শিরিন তখন এপাড়া ওপাড়া দৌড়ে বেড়াত। স্কুলের দৌড়ে অংশ নিত। নানাজনে নানা কথা বলত। বিষয়টি আসত আবদুল মজিদের কানেও। এ নিয়ে রাগও করেছেন তিনি। কিন্তু মন যে মানতে চায় না শিরিনের। খেলার অমোঘ টানে প্রায়ই বাড়ি থেকে না বলে বেড়িয়ে যেতেন। এক সময় এ মেয়েটিই রক্ষণশীল ও গোঁড়া মনোভাবের বাবাকে রাজি করিয়ে অ্যাথলেটিক ক্যারিয়ার শুরু করলেন। জাতীয় পর্যায়ে সফলও হলেন। ততদিন বাবা তার ভুল বুঝতে পেরেছেন। এখন তিনি মেয়ের সাফল্যে গর্বিত। মেয়েকে আশীর্বাদ করেন, যেন আরও বড় হয়। দেশের সম্মান বয়ে আনে। এ প্রসঙ্গে শিরিন বলেন, প্রথম প্রথম বাবা অনেক রাগারাগি করতেন। কিন্তু পরে আমাকে অনুপ্রেরণা দেয়।

সেই শিরিন এখন

বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট দুই বোন এখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। আট-দশটা ক্রীড়াবিদের মতো অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান নিয়ে অন্তত ভাবতে হয় না শিরিনকে। ক্রীড়াবিদ হিসেবে খেলেন নৌবাহিনীর হয়ে। আয়ের পুরোটা নিজের পেছনেই ব্যয় করছেন এ স্প্রিন্টার। তা অবশ্য স্প্রিন্টের কঠিন লড়াইয়ের জন্য নিজেকে উপযোগী করার জন্য যথেষ্ট নয়। তাতেও হাল ছাড়তে নারাজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান তৃতীয় বর্ষের এ ছাত্রী। শিরিন আক্তারের মতে, আমার লক্ষ্য এসএ গেমসের দ্রুততম মানবী হওয়া। এজন্য নিজের উদ্যোগেই বিশেষ প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। সে লক্ষ্য অর্জনের সামর্থ্য আমার আছে।

ট্র্যাকে শিরিনের পথচলা

দৌড়ে ভালো করায় ২০০৭ সালেই শিরিনকে নিজেদের ক্রীড়াবিদ হিসেবে ভর্তি করে নেয় বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)। ২০০৯ সালে যুব এশিয়ান গেমস দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিষেক ঘটে শিরিনের। পরবর্তীতে ২০১৪ কমনওয়েলথ গেমস, ২০১৫ সালে এশিয়ান বিচ গেমস, ২০১৬ সালে গৌহাটি এসএ গেমস এবং একই বছর রিও অলিম্পিক গেমসে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন শিরিন। এখন তো দেশের নারী অ্যাথলেটিক্সের অন্যতম ভরসা এই শিরিন আক্তারই।

শিরিনের আফসোস

ক্যারিয়ারে অনেক অর্জন হলেও জীবনে একবার পদক না পাওয়া এবং প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্যে যেতে না পাওয়ার বেদনায় এখনও কাঁদেন শিরিন। এটি ঘটেছিল ২০১৬ সালে। গৌহাটি এসএ গেমসে ক্যারিয়ার সেরা ১১.৯৯ সেকেন্ড সময় নিয়েও ১০০ মিটারেও পদক জিততে পরেননি শিরিন। যেখানে গেমসের দ্রুততম মানবী শ্রীলঙ্কার রুমেসিকা রত্নায়েকের ১১.৬০ সেকেন্ডেই স্বর্ণ পদক জিতেছেন। মাত্র ৩৯ মাইক্রো সেকেন্ড পেছনে থেকে তিনি পাননি কিছুই। দ্বিতীয়টি ঘটেছিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে নিয়মিত দূত হলেও ২০১৭ সালে গণভবনের সংবর্ধনার জন্য মনোনীত হননি। এ প্রসঙ্গে শিরিন আক্তার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্য পাওয়া অনেক বড় প্রেরণা। নিজেকে বুঝিয়েছি, আমি হয়তো এর যোগ্য ছিলাম না। আগামী দিনে গভীর মনোযোগে নিজেকে প্রস্তুত করার তাড়না দিবে বিষয়টি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিততে চাই

২০২০ সালে জাপানে অনুষ্ঠিতব্য অলিম্পিক গেমসে খেলতে চান শিরিন আক্তার। তবে কোয়ালিফাই করতে পারলে। তার আগে ২০১৯ সালে নেপালে অনুষ্ঠিতব্য সাউথ এশিয়ান গেমসে দেশকে একটি সোনার পদক উপহার দিতে চান। তাহলেই নিজের সব পাওয়া হয়েছে বলেই মনে করবেন শিরিন। শিরিনের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমার প্রিয় ১০০ মিটার স্প্রিন্ট থেকে দেশকে এখনও কিছু দিতে পারিনি। তাই এবার সেটাই জিতে আনতে চাই। আমাকে পারতেই হবে- এমন আত্মবিশ্বাস আমার আছে। বিকেএসপির ডিজি স্যারের কাছ থেকে আমি অনুমতি নিয়েছি এসএ গেমসের আগ পর্যন্ত বিকেএসপিতে আবদুল্লাহেল কাফি স্যারের কাছে অনুশীলন করার। এখন মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই আমার স্বর্ণজয়ের স্বপ্ন পূরণ হবে। এজন্য প্রচেষ্টা আর নিজের ভেতরে প্রতিজ্ঞা থাকতে হয়। অসম্ভবের কিছুই নেই। চেষ্টা-মনোবল থাকলে অবশ্যই সব সম্ভব। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েই ট্র্যাকে নেমেছি। এ নিয়ে টানা ছয়বার দেশের দ্রুততম মানবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছি। ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়। আমার মতো অনেক ক্রীড়াবিদ রয়েছেন, যারা কেবল নিজেদের প্রচেষ্টা আর প্রতিজ্ঞার বলেই আজ উজ্জ্বল হয়েছেন। বিদেশের মাটিতে দেশকে তুলে ধরছেন।

এক নজরে

চার বছরে ছয়বার

২০১৪ সালে জাতীয় অ্যাথলেটিক্সে দ্রুততম মানবী

২০১৪ সালে সামার অ্যাথলেটিক্সে দ্রুততম মানবী

২০১৫ সালে জাতীয় অ্যাথলেটিক্সে দ্রুততম মানবী

২০১৬ সালে জাতীয় অ্যাথলেটিক্সে দ্রুততম মানবী

২০১৭ সালে সামার অ্যাথলেটিক্সে দ্রুততম মানবী

২০১৭ সালে জাতীয় অ্যাথলেটিক্সে দ্রুততম মানবী