ডিজিটাল বিশ্ব শিশুর জীবন বিপদের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে

অনলাইন ব্যবহার

  রীতা ভৌমিক ২২ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার
শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার

চার বছরের দিশার কোনো খেলার সাথী নেই। বাবা-মা তাকে অনেক খেলনা কিনে দিয়েছেন। একই খেলনা দিয়ে প্রতিদিন খেলতে ভালো লাগে না ওর। সকাল আটটা বাজতেই বাবা-মা অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হন। যাওয়ার আগে মা ওকে ঘুম থেকে উঠিয়ে নাস্তা করিয়ে দেন। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত আয়ার সঙ্গেই থাকে ও। আয়া টেলিভিশন দেখে। টেলিভিশন দেখতে ওর ভালো লাগে না। প্রথম প্রথম ঘরজুড়ে দৌড়াদৌড়ি করত। ওর মনে নানা প্রশ্ন উঁকি দিত। বাসায় কেউ না থাকায় আয়ার কাছে জানতে চাইত ওর সব প্রশ্নের উত্তর। বিরক্ত হয়ে আয়া ওকে ধমক দিত। খারাপ ব্যবহার করত। একদিন আয়া ওকে ল্যাপটপ দিয়ে বসিয়ে দেয়। বাবা-মাকে ল্যাপটপ ব্যবহার করতে দেখে। তাই ওর ল্যাপটপ চালাতে কোনো সমস্যা হয় না। ল্যাপটপ হয়ে ওঠে ওর প্রধান সঙ্গী। এটা-ওটা চাপ দিতেই একদিন ইন্টারনেটে ঢুকে যায় ও। এভাবেই নতুন নতুন সাইডে ও ঢুকে যায়। ছুটির দিনটা ওর কাছে বিষাদ মনে হয়। বাবা-মা বাসায় থাকেন। ওকে ল্যাপটপ চালাতে দেয় না।

এ প্রসঙ্গে দিশার অভিভাবক বলেন, অফিসে থাকলেও সময় পেলে ফোন করে মেয়ের খোঁজখবর নিই। কী করছে জিজ্ঞেস করি। দুপুরে খেয়ে ঘুমুতে বলি। বিকালে খেলতে বলি। বেশ কয়েকমাস বুঝতে পারিনি মেয়ে ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে গেছে। প্রথমে ভেবেছি সারা দিন আমরা ওকে সময় দিতে পারি না। একা একা থাকায় হয়তো ও এমন চুপচাপ হয়ে গেছে। তাই শিশু মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। চিকিৎসক ওর সঙ্গে বন্ধুর মতো গল্প করে। গল্পের ছলেই বলে ল্যাপটপে ও গেম খেলে। সেখানে ওর অনেক বন্ধু হয়েছে। ওরা অনেক ছবি পাঠায়। এরপরই বুঝতে পারি ছুটির দিনে আমরা বাড়িতে থাকলে কেন ও মনমরা হয়ে থাকে। বেড়াতে যাওয়ার প্রতিও কেন ওর আগ্রহ নেই।

দ্য স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস চিলড্রেন ২০১৭ : চিলড্রেন ইন ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড (বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি ২০১৭, ডিজিটাল বিশ্বে শিশুরা)-শীর্ষক ইউনিসেফের বাৎসরিক এই প্রতিবেদনে জানা যায়, ডিজিটাল বিশ্বের বিপদ থেকে শিশুদের রক্ষা করতে এবং তাদের জন্য নিরাপদ অনলাইন কনটেন্ট ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে খুব সামান্য পদক্ষেপই নেয়া হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি শিশুদের জীবন এবং সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করছে। এর পাশাপাশি বিপদ ও সুযোগগুলোকে চিহ্নিত করছে। এ ক্ষেত্রে এটি ইউনিসেফের প্রথম বিশদ পর্যবেক্ষণ। এই প্রতিবেদনে যুক্তি দেখানো হয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি খাত পরিবর্তনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে যা শিশুদের নতুন ঝুঁকি ও ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, ক্ষতিকর কনটেন্টের ব্যবহার এবং সাইবার হুমকির শিকার হওয়াসহ ইন্টারনেট কীভাবে শিশুদের ঝুঁকি ও ক্ষতির দিকে অরক্ষিত করে তুলতে পারে সেটিও প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে এও তুলে ধরা হয়েছে মোবাইল ডিভাইসের সর্বব্যাপী উপস্থিতি অনেক শিশুকে নজরদারিহীন অবস্থায় অনলাইনে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। যা তাদের সম্ভাব্য বিপদের মাত্রাকে আরও বাড়িয়েছে। এ ছাড়া পাচার এবং অনলাইনে ‘ফরমায়েশি’ (মেড টু অর্ডার) শিশু যৌন নির্যাতনসহ ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ডিজিটাল নেটওয়ার্কগুলো সবেচেয়ে খারাপ উপায়ে শোষণ ও অপব্যবহারের পথ তৈরি করছে। প্রতিবেদনটিতে ডিজিটাল ‘আসক্তি’ সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান বিতর্ক এবং মস্তিষ্কের বিকাশের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় ধরে কম্পিউটার বা মোবাইলের স্কিনে মনোনিবেশ করার সম্ভাব্য প্রভাব অনুসন্ধানের মাধ্যমে শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে বর্তমান তথ্য এবং বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি লেক বলেন, ভালো এবং খারাপ উভয় বিবেচনাতেই ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন আমাদের জীবনের একটি অপরিবর্তনীয় সত্য। ডিজিটাল বিশ্বে প্রতিটি শিশুর জন্য ইন্টারনেটের উপকারী দিকগুলো সর্বোচ্চ মাত্রায় উন্নীত করার পাশাপাশি ক্ষতিকর বিষয়গুলো কমিয়ে আনাটাই হচ্ছে আমাদের দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। যদিও ইন্টারনেট তৈরি করা হয়েছিল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, তবে ক্রমবর্ধমান হারে শিশু ও তরুণরা এটি ব্যবহার করছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করছে। তাই ডিজিটাল নীতিমালা, কার্যকলাপ ও পণ্যগুলোতে শিশুদের চাহিদা, শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিশুদের কথা প্রতিফলিত হওয়াটা বাঞ্ছনীয়।

বিশ্বের সব ওয়েবসাইটের প্রায় ৫৬ শতাংশ ইংরেজি ভাষায়। অনেক শিশুই এমন কনটেন্ট খুঁজে পায় না, যা তারা বুঝতে পারে অথবা যা তাদের জন্য সাংস্কৃতিকভাবে প্রাসঙ্গিক। শিশুদের যৌন হয়রানি করে বৈশ্বিকভাবে শনাক্ত করা এমন প্রতি ১০টি ইউআরএলের মধ্যে ৯টিরও বেশি পরিচালিত হয় পাঁচটি দেশ থেকে। দেশগুলো হল- কানাডা, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, রাশিয়ান ফেডারেশন ও যুক্তরাষ্ট্র। এ সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার, বেসরকারি খাত, শিশু সংস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও শিশুদের নিজেদের সম্মিলিত উদ্যোগই কেবল ডিজিটাল ক্ষেত্রে সমতা বিধান করতে পারে। শিশুদের জন্য ইন্টারনেটকে আরও নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে পারে। শিশুদের উপকারে আরও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে সহায়তা করতে বাস্তবসম্মত সুপারিশমালা এবং আরও দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক কার্যকলাপগুলোর মধ্যে রয়েছে- উচ্চ মানসম্পন্ন অনলাইন উপকরণগুলোতে সব শিশুকে সুলভে প্রবেশাধিকার প্রদান। অপব্যবহার, শোষণ, পাচার, সাইবার হুমকি ও অপ্রযোজ্য উপকরণের মুখোমুখি হওয়াসহ অনলাইনে শিশুদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে সুরক্ষিত রাখা। অনলাইনে শিশুদের গোপনীয়তা ও পরিচয় সুরক্ষিত রাখা। শিশুদের অবহিত, সম্পৃক্ত ও অনলাইনে নিরাপদ রাখার জন্য তাদের ডিজিটাল বিষয়গুলো শেখানো। নৈতিক মান ও কার্যকলাপগুলো এগিয়ে নিতে বেসরকারি খাতের শক্তিকে কাজে লাগানো। যা অনলাইনে শিশুদের সুরক্ষা এবং সুবিধা প্রদান করে। ডিজিটাল নীতিমালার কেন্দ্রে শিশুদের রাখা।

জাতীয় মানসিক ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মোহিত কামালের মতে, ইন্টারনেট আসক্তের কারণে শিশুরা বিভিন্ন গেমে আসক্ত হচ্ছে। না বুঝে ডার্ক ওয়েব বা পর্নো সাইটে ঢুকে পেশাদার নারী-পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক দেখছে। এর ফলে তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বিঘিœত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই সঙ্গে তার নৈতিক ক্ষতিও হয়। ফলে বাবা-মা কর্মক্ষেত্র থেকে ঘরে ফিরলে সে তাদের সঙ্গে মেজাজ দেখায়। স্বাভাবিক আচরণ করে না। ঘরে দরজা বন্ধ করে একা থাকতে চায়। স্কুলগামী শিশুরা স্কুলে যেতে চায় না। এভাবেই তার আচরণগত পরিবর্তনের প্রকাশ ঘটে। অভিভাবক গৃহপরিচারিকার কাছে দীর্ঘসময় তার সন্তানকে রেখে গেলেও সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাড়িতে তার সন্তান কী করছে, কেমন আছে তা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। যে গৃহপরিচারিকার কাছে তার সন্তানকে রেখে গেছেন, তিনি শিশুটিকে ভয় দেখাচ্ছেন নাকি মমতার সঙ্গে দেখভাল করছেন এই বিষয়টিও নিশ্চিত হওয়া দরকার। এ জন্য খেয়াল রাখতে হবে কর্মক্ষেত্র থেকে তারা বাসায় ফিরলে তার সন্তানটি দূরে দূরে থাকে, নাকি তাদের জন্য অপেক্ষায় থাকে। দরজা খোলার শব্দ শুনে তাদের কাছে দৌড়ে আসে, নাকি বিরক্ত হয়। এর অন্যথা হলেই বুঝতে হবে তার সন্তান কোনো একটা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×