তরুণ মিউজিশিয়ানরা কোন পথে?

  আখন্দ জাহিদ ০৮ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গান
হাবিব ওয়াহিদ, ইমরান, কাজী শুভ ও আরিফিন রুমি (বাঁ থেকে)

গান আত্মার খোরাক জোগায়। মনের বিষণ্ণতা কাটিয়ে তুলতে কিংবা মনের আনন্দের সঙ্গে আরও এক পশলা আনন্দ যুক্ত করতে মানুষ বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে সঙ্গীতকেই বেছে নেন।

আনন্দ কিংবা বেদনা যে কোনো মাধ্যমেই মনের অজান্তে সব মানুষের সুরের হৃদয়ে গুনগুনিয়ে ওঠা অনুভূতির নাম সঙ্গীত। কিন্তু এখনকার গান কী আদৌ মনের খোরাক জোগাতে পারছে?

কিংবা এখন যারা তরুণ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন তারা কী পারছেন শ্রোতাদের চাহিদা মেটাতে? কোন পথে চলছেন তারা? এসব বিষয়ে তরুণ কয়েকজন মিউজিশিয়ানের ভাবনা নিয়ে এ প্রতিবেদন লিখেছেন-আখন্দ জাহিদ।

সঙ্গীত কিংবা গান যা-ই বলি না কেন এটাই বিনোদনের অন্যতম মাধ্যমের একটি। যার কথা কিংবা সুরের সঙ্গে মানুষ নিজের কল্পনাকে এক করতে পারেন। কিন্তু বর্তমানে সেই গানের সুর কোথাও যেন হারিয়ে গেছে।

মানুষের কল্পনাকে পরিপূর্ণভাবে স্পর্শ করতে পারে না। জাদুকরি গানের সুর আর সঙ্গীতের মনোরম আভা বর্তমান সঙ্গীতাঙ্গনে বসন্তের কোকিলের মতো। যার উপস্থিতি শুধু ক্ষণকালেই সীমাবদ্ধ।

‘কাট-পেস্ট’ উপদ্রবের কারণে পুরনো কোনো গানের সুর কপি করে কোনোরকম সুর করা হলেই যেন গান হয়ে গেল! সুরের মাঝে যেমন নকলের ছাপ, নতুন কোনো ভাবনায় উদয় নেই, তেমনি গানের কথার মাঝেও নেই কোনো নতুনত্ব। এমন কোনো গান এখন আর নেই বললেই চলে, যে গানের কথায় দুটি পারস্পরিক হৃদয়ের মাঝে ভাবের আদান-প্রদান হবে।

যে গান মানুষের মনে নতুন করে ভাবনার সৃষ্টি করবে। অতীতের সুর ও গানের কথা একসঙ্গেই যেন বিলিন হয়ে গেছে। এমন দায়সারাভাবে গানের কথা, সুর ও সঙ্গীতায়োজনের বিষয়ে জানতে চাইলে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হাবীব ওয়াহিদ বলেন, ‘পুরনো কোনো সুর ভালোলাগা থেকে অনুপ্রেরণা হতে পারে। কেউ কেউ হয়তো সুর কপি করছে।

কপি করে গানের সুর করার পক্ষে আমি নই। গান কিংবা সুর কোনো কারখানা থেকে উৎপাদন হয়ে আসে না। এটা চর্চা ও সাধনার বিষয়। আমি গান করি ভেতর থেকে সুর এলে। সে জন্য পরিশ্রম করতে হয়। সবার তা-ই করা উচিত।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘গান যে এখনই কপি, পেস্ট, অটো টিউন করা হয় তা কিন্তু নয়, আগেও তা হতো। হয়তো সহজে ধরা পড়েনি। এখন শ্রোতা-দর্শকরা ধরতে পারেন। সঙ্গীতে অন্য বিষয়ের মতোই ভালো-মন্দ রয়েছে। অন্য গানের সঙ্গে নিজের কাজ মিলে যেতেই পারে এটা খুব বেশি দোষের নয়। তবে তরুণ যারা গান করেন তাদের একটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে, এ মিলটা যেন কপি না হয়ে মৌলিক হয়।’

নকল সুর কিংবা সঙ্গীতায়োজনের গান প্রসঙ্গে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক আরফিন রুমি বলেন, ‘আসলে আমাদের দেশে সুরের সঙ্গে মিলে গেলেই নকল বলা হয়। একটি গানের সঙ্গে আরেকটি গানের মিল খারাপ কিছু নয়।

তবে সুর ছাড়াও একটি গানে আরও অনেক কিছুই কপি হয়। বিশেষ করে অডিওতে। যারা অডিও নিয়ে কাজ করেন তারাই এ বিষয়টি ধরতে পারবেন। এটি যে এ যুগেই হচ্ছে তা নয়, আগেও এসব ছিল। হয়তো ধরার উপায় ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, ‘গানের কথাগুলোই শ্রোতাদের হৃদয় নাড়া দেয়। এ যুগে যারা কাজ করছেন তাদের কথা, সঙ্গীত এবং সুরের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’ প্

রযুক্তিনির্ভর সঙ্গীতাঙ্গন বিষয়ে রুমি বলেন, ‘ভিউ ইদানীং একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমি এটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। কারণ চর্চা করে কাজ করে ভালো গান করা সম্ভব আর ভালো গান অবশ্যই শ্রোতারা শুনবেন।’

কথা ও সুরের সৌন্দর্যকে হার মানিয়ে বর্তমান সঙ্গীত শ্রবণ প্রথার নিয়ম ভেঙে দর্শন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। একটা সময় মানুষ মন প্রাণ উজাড় করে রেডিও, ফিতা কিংবা সিডিতে গান শুনতেন।

বর্তমানে প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে গানে অডিওর সঙ্গে ভিডিও যোগ হয়েছে। এ সুযোগে একটি গানের কথা এবং সুরের প্রতি নজর দিলে কীভাবে শ্রোতার অন্তরে গানটি পৌঁছানো যাবে সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে কীভাবে গানকে সস্তা প্রেমকাহিনী আর মসলাদার আপত্তিকর ভিডিও দিয়ে কত বেশি দর্শক জোগাড় করা যাবে, তাই নিয়ে চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

বর্তমান সঙ্গীতাঙ্গনের এ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ইমরান বলেন, ‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের চলতে হয়। একটা সময় ফিতা, সিডি, ভিসিডি ছিল। সে সময় চর্চার জায়গাটি যেমন ছিল বর্তমানে তেমন নেই।

তবু গান চর্চার মাধ্যমেই তৈরি করতে হয়। সেভাবেই এগিয়ে যাচ্ছি। কিছুটা অস্থিরতার মধ্যে থাকলেও বর্তমানে অনেক ভালো ভালো গান হচ্ছে। এটা ঠিক যে, আগের মতো গান মুখে মুখে মুখরিত না হলেও ভিউ গণনার মাধ্যমে শিল্পীরা তারকা হচ্ছেন। ইউটিউবে গান প্রকাশের পর ভিউ গণনার চেয়ে মুখ্য বিষয় হল, লাইক-আন লাইক। তারপর দর্শকের প্রতিক্রিয়া।

কমেন্টে দর্শক বলতে পারেন গানটি কেমন হয়েছে, যা আগে শ্রোতাদের পক্ষে বলা বা লেখা সম্ভব ছিল না। সে ক্ষেত্রে ইউটিউবে গান প্রকাশ ও ভিউ প্রসঙ্গটি ভালোই। তবে যিনিই গান করুক, গানের ক্ষেত্রে অবশ্যই কথা, সুর ও সঙ্গীতের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। ভালো কথার গান খালি গলায় গেয়েও সাড়া জাগানো যায়, কিন্তু শুধু মিউজিক দিয়ে তা সম্ভব নয়।’

বিষয়টি নিয়ে ইমরানের মতোই একই সুরে কথা বললেন আরেক কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হৃদয় খান। তিনি বলেন, ‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সবাই এগিয়ে যাচ্ছে। ভালো-মন্দ মিলিয়েই গান হচ্ছে।

ভিউর পেছনে না গিয়ে আরও চর্চা করতে হবে। ভালো গান শ্রোতারা অবশ্যই শুনবেন। শ্রোতারাই গানের প্রাণ। তারা গান শোনেন বলেই আমরা গান তৈরি করতে আগ্রহী হই। ভিডিও বিশেষ কোনো বিষয় নয়, তবুও শ্রোতারা শোনার পাশাপাশি এখন গানের ভিডিও দেখতে চান। তবে আমি ভিডিওর চেয়ে অডিওকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। বিষয়টি তরুণ কিংবা নতুন যা-ই বলি না কেন, সবাইকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।’

গানের কথা না লিখলেও নিয়মিত সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করছেন কাজী শুভ। বর্তমান সঙ্গীতাঙ্গন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ফিতা, সিডি ভিসিডির যুগ শেষ।

গান এখন ইন্টারনেট মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। একটা সময় আমরা গান তৈরি করে প্রযোজনা কোম্পানির কাছে যেতাম। তাদের ভালো লাগলেই গান প্রকাশ করতেন। কিন্তু এখন আর সে ভালো লাগা, খারাপ লাগার বিচার হয় না। কেননা সবাই নিজের ইচ্ছামতো নিজের ইউটিউব চ্যানেলে গান প্রকাশ করছেন। বর্তমান সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে তারকা হওয়ার প্রবণতাই বেশি।

আমি এ ধরনের তারকা হওয়ায় বিশ্বাসী নই। আমি মনে করি ভালো গান করলে শ্রোতারা মনে রাখবেনই।’ নকল গান ও ভিউয়ার্স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কপি বিষয়ে অনেক দ্বিমত রয়েছে।

একজন সিনিয়র শিল্পীর গান কারও ভালো লাগতেই পারে। সে গানটি গাওয়ার ইচ্ছা হলে সেই শিল্পীর অনুমতি নিয়ে করা উচিত যেটি আমি করি। এ যুগে ভিউ ক্যান্সারে ভুগছেন অনেকেই। ভিউ বিষয়ে অনেক বিতর্কও রয়েছে। একটিমাত্র মিউজিক ভিডিও দেখার পর দর্শক সংখ্যা গণনা করা হয়। কিন্তু আমাদের শুরুর সময় একটি অ্যালবামে দশটি গান রাখতাম।

সবগুলো গান ভালো না লাগলেও কোনো না কোনো গান জনপ্রিয় হয়ে যেত। এখন আর সেই রীতিটি নেই। নিজের মনমতো একটি গান ইউটিউবে দেয়া হয় ভালো-মন্দ বিচার হয় ভিউ দিয়ে।

আজ সঙ্গীতের জন্য সুফল নয়। এ জন্য হয়তো একটু অস্থিরতায় ছিল আমাদের সঙ্গীতাঙ্গন। এখন অনেকটা শিথিল। সামনে সঙ্গীতাঙ্গন আরও ভালোর দিকে যাবে আমার বিশ্বাস।’

এ যাবৎকালে যত কালজয়ী গান শ্রোতা হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে সব শোনার মাধ্যমে। বর্তমানে অনেকেই গানের কথাকে মিউজিক দিয়ে ঢেকে গান করে যে কেউ শিল্পী বনে যাচ্ছেন। পাশাপাশি স্বল্প বাজেটে নিুমানের গল্পে তৈরি করছেন সেসব গানের ভিডিও।

আবার কেউ কেউ কারও কোনো সহযোগিতা ছাড়াই নিজেকে প্রাজ্ঞজন হিসেবে জাহির করতে গিয়ে তৈরি করে ফেলছেন গানের কথা এবং সুর। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কিংবা সিনিয়র শিল্পী কিংবা অন্য কলাকুশলীদের শরণাপন্ন হতে দেখা যায় না তরুণ প্রজন্মের মিউজিশিয়ানদের।

তাই গানের অবস্থা হচ্ছে জগাখিচুড়ি। এ বিষয়ে তরুণ কণ্ঠশিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক বেলাল খান বলেন, ‘প্রকৃত মেধাকে সবার কাজে লাগানো উচিত। প্রযুক্তিনির্ভর হলে নিজের মেধার প্রকাশ হয় না। আমাদের সঙ্গীতাঙ্গন এখন অনেকটাই ভিউ ক্যান্সারে আক্রান্ত। যার ফলে অনেক জনপ্রিয় শিল্পীর গানও ভিউ ব্যবধানে আড়াল হয়ে যায়।

এ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এটি অশনিসংকেত। উপযুক্ত চর্চার অভাবে সবাই এখন কম্পিউটারের ওপর নির্ভর হয়ে গেছে। ভিউ বিষয়ের ফলে অনেকেই গান করছেন না।

একটি উদাহরণ দিতে চাই, সৈয়দ আবদুল হাদী স্যারের একটি গান আর নতুন একটি গান এখন ভিউ দিয়ে পরিমাপ করা হয়। হাদী স্যারের গানে ভিউ কম বলে কী তার গান ভালো না? এটিই অনেকেই হয়তো বুঝান। এটি উপযুক্ত সঙ্গীত এবং মানসিক চর্চার অভাব। এ থেকে আমাদের সবার বেরিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সিনিয়রদের কাছ থেকেও পরামর্শ নেয়া উচিত।’

বর্তমান তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে নিজেদের জাহির করার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এ প্রজন্মের কোনো শিল্পীর গান শুধু অডিও শোনার মধ্য দিয়ে শ্রোতাদের ভালোবাসা পেয়েছে, তার সংখ্যা খুবই যৎসামান্য।

গান গাওয়ার আগেই গানের ভিডিও নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন শিল্পীরা। গানের কথা, সুর কিংবা মিউজিকের পেছনে অর্থ ও সময় ব্যয় করার চেয়ে বেশি ব্যস্ততা দেখা যায় ভিডিও ধারণ করে কতটা দর্শক দর্শনে প্রশংসা কুড়িয়ে পাওয়া যাবে সেই দিকে।

যার পরিণতিতে নিজেরাই হাজির হয়ে যান দর্শিত গানের সেই ভিডিওর সামনে। যে কোনো শিল্পীর সত্ত্বার সঙ্গে স্বভাবতই বিনয়ী ভাবটা জড়িত। কিন্তু এ প্রজন্মের শিল্পীরা নিজেকে নিজেদের দেয়া তারকাখ্যাতি উপাধিতে ভূষিত করে রাতারাতি তারকা ভাবতে শুরু করেন।

তাই স্বভাবতই শ্রোতামনে প্রশ্ন জাগে, তরুণ মিউজিশিয়ানরা কোনো পথে যাচ্ছেন?

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×