সংশ্লিষ্টরা কী ভাবছেন?

টিভি নাটকে ঘুরেফিরে একই মুখ

  সোহেল আহসান ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

টিভি নাটকে ঘুরেফিরে একই মুখ

চ্যানেলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি টিভি নাটক নির্মাণের হারও বেড়েছে। দর্শক বিনোদনের অন্যতম এ মাধ্যমটিতে সরব অসংখ্য অভিনয়শিল্পী।

তবে নির্দিষ্ট কয়েকজন অভিনয়শিল্পীকে দিয়েই নাটক নির্মাণের প্রবণতা গেল কয়েক বছর ধরে বিদ্যমান। এতে করে নতুন অভিনয়শিল্পীরা যেমন কম সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনই কর্মহীন অভিনয়শিল্পীর সংখ্যাও বাড়ছে।

এর জন্য একে অন্যকে দোষারোপ করলেও বিষয়টি নিয়ে নির্মাতা ও চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বলছেন ভিন্ন কথা। বিস্তারিত লিখেছেন-

বাংলাদেশে টেলিভিশন নাটকের সূচনালগ্ন থেকেই একক ও ধারাবাহিক নাটক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সেই সঙ্গে নাট্যামোদী দর্শকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তৈরি হতে থাকে নতুন নতুন দর্শক।

এতে করে পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকে নাটক নির্মাণের সংখ্যা। ৮০ এবং ৯০-এর দশকে শিল্পমান বজায় রেখে প্রচুর নাটক নির্মিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হন অনেকে।

এতে করে নাটক একটি নতুন শিল্প মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। অনেকেই মঞ্চ নাটকের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকেও নিয়মিত অভিনয় করতে থাকেন।

এভাবেই দর্শকের মনের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেন অভিনয়শিল্পীরা। তারকাখ্যাতি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হন হুমায়ূন ফরীদি, আফজাল হোসেন, আসাদুজ্জামান নূর, মামুনুর রশীদ, তারিক আনাম খান, সুর্বণা মুস্তাফা, গাজী রাকায়েত, আফসানা মিমি, শহীদুজ্জামান সেলিম, শমী কায়সার, বিপাশা হায়াত, জাহিদ হাসান, মাহফুজ আহমেদ, তৌকীর আহমেদসহ অনেকেই। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় আবহাওয়া।

বেসরকারি টেলিভিশনের যাত্রা শুরুর পর দ্রুতই বিকশিত হতে শুরু করে টেলিভিশন নাটক। নির্মাণের সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। সেই সঙ্গে অভিনয়শিল্পীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। নাটক নির্মাণে যোগ হয় নতুন মাত্রা।

প্রথিতযশা অভিনয় শিল্পীদের সঙ্গে সন্নিবেশ ঘটে একঝাঁক তরুণ অভিনয়শিল্পীর। এ পর্যায়ে দর্শকের পছন্দের তারকায় পরিণত হন চঞ্চল চৌধুরী, আনিসুর রহমান মিলন, মোশাররফ করিম, অপি করিম, শ্রাবন্তী, তনিমা হামিদ, রিচি সোলায়মান প্রমুখ। চ্যানেলের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর অভিনয়শিল্পী এ অঙ্গনে অন্তর্ভুক্ত হন। অ

ভিনয়শিল্পীদের সংগঠন শিল্পী সংঘের তথ্য মতে প্রায় ৯০০ অভিনয়শিল্পী কাজ করছেন নাটকে। এতে করে যেমন ভালো নাটক নির্মাণ হচ্ছে হরহামেশাই, তেমনি বাড়ছে বিনিয়োগ। লাভবান হচ্ছেন এ মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত আছেন যারা।

নাট্যসংশ্লিষ্ট অনেকেরই অভিযোগ, নাটকের সংখ্যা বাড়লেও বর্তমানে বিনিয়োগ হচ্ছে কম। গত কয়েক বছরে অনেক পেশাদার অভিনয়শিল্পীরই উপার্জন কমে গেছে।

বিশেষ করে নতুন যারা কাজ করছেন তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বাকিরা প্রায় কর্মসংস্থানের সংকটে ভুগছেন। নাটক নির্মিত হচ্ছে কয়েকজন অভিনয়শিল্পীকে দিয়ে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাহিদ হাসান, মাহফুজ, মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, আনিসুর রহমান মিলন, সজল, অপূর্ব, আফরান নিশো, তিশা, মম, তানজিন তিশা, তৌসিফ, জোভান, নাঈম, সাবিলা নূর, মেহজাবিন চৌধুরী প্রমুখ। এতে করে প্রযোজক ও নির্মাতারা পড়ছেন বিপাকে।

এই গুটিকয়েক অভিনয়শিল্পীকে দিয়ে নাটক নির্মাণ করতে গিয়ে সমস্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। অভিনয়শিল্পীরা অবসর পাচ্ছেন না, আবার স্বল্প সময়ে নাটক নির্মাণের প্রবণতাও বেড়ে গেছে।

তাতে করে কয়েকজন অভিনয়শিল্পীর হাতে জিম্মি হয়ে আছে টিভি নাটক। আবার সেই অভিনয়শিল্পীরাও বিশ্রামহীন কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন কিংবা অবসাদে ভুগছেন। এর উত্তরণের জন্য এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দুষছেন। নাট্য নির্মাতারা বলছেন, তাদের টেলিভিশন চ্যানেল থেকেই সব ঠিক করে দেয়া হয় কে অভিনয় করবে।

আবার চ্যানেল বলছে বাণিজ্যিক কারণে তারা বিজ্ঞাপনদাতাদের পরামর্শমতে এই পথে হাঁটছেন। এসব নিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা পার করছে টিভি নাটক।

অবশ্য টিভি চ্যানেলগুলো বিভিন্ন রকম বক্তব্য দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাভিশনের অনুষ্ঠান বিভাগের ইনচার্জ তারেক আখন্দ বলেন, ‘বিষয়টির কিছুটা সত্যতা আছে।

বিশেষ করে একক নাটকে প্রায় কয়েকজন অভিনয়শিল্পীকেই বেশি দেখা যায়। তবে ধারাবাহিক নাটকে কিন্তু পরিচিত শিল্পীর পাশাপাশি নতুনদের সুযোগ দেয়া হয়।

আমাদের চ্যানেলে একক নাটক প্রচার হয় না। আমাদের ধারাবাহিক নাটকগুলোতে প্রচুর নতুন চরিত্র থাকে। তবে সার্বিক বিবেচনায় বললে এ কথা স্বীকার করতে হবে, ঘুরেফিরে কিছু নির্দিষ্ট অভিনয়শিল্পীকে নিয়েই বেশি কাজ হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে আরটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান দেওয়ান শামসুর রকিব বলেন, ‘আমাদের চ্যানেলে একটি প্রিভিউ বোর্ড আছে। সেই বোর্ড নাটক দেখে চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আমাদের চ্যানেল আগে থেকে বলে দেয় না নির্মাতাদের। তবে ভালো অভিনয়শৈলী দেখেছি নতুনদের মাঝে। আমরা প্রচুর একক নাটক প্রচার করি সব সময়।’

দেশ টিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান রবিউল করিম বলেন, ‘দেশ টিভি গল্প অনুযায়ী অভিনয়শিল্পী নির্বাচনের চেষ্টা করে। আমাদের নাটকে নতুন-পুরনো দুই ধরনের শিল্পীই থাকে। অনেক নতুন অভিনয়শিল্পী নিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হয়। শিল্পী নির্বাচনের দায়িত্ব আমরা পুরোপুরি পরিচালকের ওপরই ছেড়ে দিই।’

নির্মাতা এবং টিভি চ্যানেলের নানা মারপ্যাঁচের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে টিভি নাটক। একই মুখ বারবার ঘুরেফিরে আসছে।

এ প্রসঙ্গে অভিনেতা মোশাররফ করিম বলেন, ‘আমার কাছে এটি অর্থহীন ভাবনা মনে হয়। নতুন-পুরনো এ জাতীয় বিশ্বাসও আমার মধ্যে কাজ করে না। মূল বিষয় হচ্ছে কে কতটা সমৃদ্ধ। একজন অভিনয়শিল্পী যদি তৈরি থাকে, ঠিকঠাক অভিনয়টা করতে পারে তাহলে তাকে নিয়ে তো আসলে কাড়াকাড়ি পড়ে যাবে। আমিও নতুন ছিলাম এক সময়। অল্প সময়েই নির্মাতাদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছি। নতুনরা সুযোগ পাচ্ছেন না। এটা কোনো কথাই হতে পারে না। প্রত্যেকেরই নিজের সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করতে হবে।’

নাটকে ঘুরেফিরে একই মুখ প্রসঙ্গে অভিনেতা অপূর্ব বলেন, ‘আমি তো পেশাদার অভিনেতা। নির্মাতারা তাদের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আমাকে নিচ্ছেন। নাটকের অভিনয়শিল্পী নির্বাচন কে করছেন এটা আমার দেখার বিষয় নয়। এক সময় নতুন ছিলাম। তখন হয়তো এত কাজ করা হতো না। প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়েই নিজেকে প্রমাণ করতে হয়েছে।’

আরেক ব্যস্ত শিল্পী নুসরাত ইমরোজ তিশা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নতুনরা সুযোগ পাচ্ছেন না তা কিন্তু নয়। ইদানীং অনেক নাটক করছেন নতুনরা। তবে যাদের ওপর নির্মাতাদের আস্থা আছে তারাই বেশি কাজ করছেন এবং করবেন- এটাই স্বাভাবিক।’

এ সময়ের ব্যস্ত অভিনেত্রীদের একজন জাকিয়া বারী মম। বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করেই আজকের অবস্থানে আসিনি। নির্মাতাদের আস্থার প্রতিদান দিতে পারছি বলেই হয়তো তারা আমাকে নিয়ে সারা বছর নাটক নির্মাণ করছেন। আর দর্শকও আমাকে পছন্দ করেন।’

এ ছাড়া মেহজাবিন, সজল, আফরান নিশো, সাবিলা নূর, জোভান, নাঈম, তৌসিফরাও প্রায় একই কথা বলেছেন। নির্মাতারা চাইছেন বলেই তারা কাজ করছেন।

নির্মাতাদের অভিযোগ, চ্যানেল কর্তৃপক্ষ যাই বলুক না কেন, তাদের আগ্রহ অনাগ্রহের ওপর নির্ভর করেই নাটকের কাস্টিং ঠিক করা হচ্ছে। এতে করে কিছু নির্দিষ্ট অভিনয়শিল্পী নিয়েই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

তাতে করে নির্মাণে প্রতিবন্ধকতা যেমন বেড়েছে, তেমনি নাটকের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

অনেকেই আবার আশার আলোও দেখছেন যে, নাটকের এ অবস্থা থেকে দ্রুতই উত্তরণ সম্ভব হবে। এর জন্য সমন্বিত কর্মপন্থা ঠিক করতে টেলিভিশন মাধ্যমের তিনটি সংগঠনকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×