প্রযোজক না পেয়ে আমি হতাশ হয়েছিলাম

১৫ ফেব্রুয়ারি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে তৌকীর আহমেদ পরিচালিত ছবি ‘ফাগুন হাওয়ায়’। ভাষা অন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত এ ছবিটি নিয়ে এরই মধ্যে দর্শকের আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। ছবিটি নির্মাণের দীর্ঘসূত্রতাসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ের অভিজ্ঞতা হিসাবের খাতায় যুক্ত করেছেন এই খ্যাতিমান অভিনেতা, নির্মাতা। সেসব নিয়ে যুগান্তরের এই আয়োজনে নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন -

  তৌকীর আহমেদ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমার প্রথম ছবি ছিল ‘জয়যাত্রা’। যেটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। আমার সব সময়ই মনে হয়, আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, ঐতিহ্য এগুলোকে তুলে ধরা দরকার নতুন প্রজন্মের সামনে। যে জাতি তার ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারে না তাদের পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে রকম একটি চিন্তা থেকে আমি ‘বায়ান্ন’ নিয়ে একটি কাজ করার চিন্তা করেছিলাম অনেক আগে। ২০০৪ সালে আমি ‘ফাগুন হাওয়ায়’ ছবির গল্পটি প্রথম পড়ি। এটি ‘বউ কথা কউ’ গল্পের আদলেই তৈরি হয়েছে। এ গল্পটি পড়ার পর থেকেই আমার মাথায় আসে, এটি নিয়ে একটি ছবি করা যায়। এরপর আমি এ গল্পের লেখকের কাছে এটি নিয়ে ছবি তৈরি করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি তাতে সম্মতি দেন। তারপর সেই গল্পের আলোকে চিত্রনাট্য তৈরি করার কাজে হাত দিই। কখনও পরিবর্ধন, কখনও সংযোজন। এ সবের মধ্য দিয়েই সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য তৈরি করে ফেলি। ২০০৭ সালের পর থেকেই এ গল্পটি নিয়ে সিনেমা নির্মাণের চেষ্টা করতে শুরু করি। তবে হতাশার বিষয়, এ ছবি নির্মাণের জন্য প্রযোজক পাইনি অনেক দিন। বায়ান্নর গল্পের জন্যই অনেকে এতে লগ্নি করার বিষয়ে উৎসাহও দেয়নি কিংবা অর্থায়নে এগিয়ে আসেননি। তারা মনে করতেন, এ ছবি হয়তো চলবে না। আর তারা ভেবেছেন, এ ছবির গল্পটা ভারি কিছু বিষয় হবে। পরে কিছুদিন অপেক্ষা করে প্রযোজক না পেয়ে আমি হতাশ হয়েছিলাম। সে সময় ছবি নির্মাণে অনিয়মিত হয়ে যাই।

২০১৫ সালে এ ছবিটি নির্মাণের জন্য সরকারি অনুদান চেয়ে আবেদন করি। কিন্তু অনুদানও দেয়া হয় না আমাকে। আমি কিছুটা অবাকও হয়েছিলাম যে ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে একটি ছবি অনুদান পেল না! তার কিছু সময় পর আমি ‘অজ্ঞাতনামা’ ও ‘হালদা’ শিরোনামে দুটি ছবি নির্মাণ করি। এ দুটি ছবি দেশে-বিদেশে প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়। এরপর আমি ‘ফাগুন হাওয়ায়’ ছবিটি নির্মাণের জন্য আবার নতুন করে চেষ্টা শুরু করি। আমি ফরিদুর রেজা সাগর ভাইয়ের কাছে ছবিটি নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি অর্থ লগ্নি করতে রাজি হন। এরপর ছবিটি নির্মাণের জন্য আগের ছবিগুলোর চেয়ে বেশি বাজেটের বিষয়ে অবগত করলাম। কারণ এখানে বায়ান্নর সেই বিষয়টাকে ফুটিয়ে তুলতে হবে। সেট, কস্টিউম, বাড়ি, ঘর, গাড়ি, মোটরসাইকেল সবই যথাযথ হতে হবে। সময়ের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে হবে। তিনি আমাকে সেই সুযোগ দিলেন এবং আমি ২০১৮ সালেই ছবিটির নির্মাণ কাজ শেষ করি। কিন্তু বছরের শেষ দিকে এটি মুক্তি না দিয়ে আমি চিন্তা করলাম, এটি এ ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি দিলে ভালো হবে। অবশেষে তাই করলাম।

ছবিটি তৈরির সময় আমি ভেবেছি, এটি যেন খুব ভারি না হয়। খেলার ছলে, হাসির ছলে আমাদের নতুন প্রজন্মকে বায়ান্নর বিষয়টা যেন মনে করিয়ে দিতে পারি। সেভাবেই ছবিটি উপস্থাপন করেছি। মুক্তির প্রথম দিন থেকেই দেখছি, দর্শক ছবিটি উৎসাহ নিয়ে উপভোগ করছেন। মানুষ হাসছেন, কাঁদছেন, গর্জে উঠছেন, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তখন আমার মনে হল, আমার এ পরিশ্রম কিছুটা হলেও সফল।

১৯৫২ সালের আন্দোলনের পর থেকেই আমরা কিন্তু আমাদের এ মাতৃভাষাটা নিজের করে পেয়েছি। সে সময় থেকেই আমাদের স্বাধীনতার বীজ বোনা হয়ে গিয়েছিল। বাংলা ভাষা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি ছবি এই প্রথম নির্মিত হয়েছে। আমার মনে হয়েছে, নির্দিষ্ট একটি পিরিয়ড নিয়ে ছবি নির্মাণ করা খুব কষ্টসাধ্য ও কঠিন। সব দিক দিয়েই কঠিন। অর্থের জোগানের বিষয়টা খুব সহজ হয় না এসব ছবির ক্ষেত্রে। ভাষা অন্দোলনের বিষয়টা আমাদের সবারই জানা। তাই হয়তো অনেকেই এটাকে সিনেমার গল্প হিসেবে বিবেচনা করতে চাননি। আমি মনে করি, ফিল্ম মেকিং পুরোটাই একটা প্রতিবন্ধকতা। এখানে আমাদের কাজ করতে হয় খুব কম বাজেট নিয়ে। ‘ফাগুন হাওয়ায়’-এর মতো ছবির ক্ষেত্রে প্রচুর কম্পিউটার গ্রাফিক্সের বিষয় চলে আসে। অনেক কিছু মুছতে হয়, অনেক কিছু তৈরি করতে হয়। বাস্তবে নেই কিন্তু সেটাকে নিয়ে আমাদের অ্যানিমেশনের ওপর ভর করতে হয়। এ জায়গাটায় প্রচণ্ড লিমিটেশন ছিল। এ ধরনের ছবিতে অভিনয়ের জন্য অনেক অভিনয়শিল্পীই আছেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এ সুন্দর বিষয়টাকে সুচারুভাবে ফুটিয়ে তোলা সহজসাধ্য ছিল না। এ ছবিতে একজন বিদেশি শিল্পীও রয়েছেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করার বিষয়টা সহজ ছিল না। তিনি বলিউডের মতো বড় ইন্ডাস্ট্রির নামি অভিনেতা। সেটাও আমাকে খেয়াল করতে হয়েছে। তাকে যেন সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, এটিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাকে তো নামেমাত্র কিংবা মার্কেটিংয়ের জন্য আনা হয়নি। তাকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়েছে। সেটিও দর্শক পছন্দ করেছেন।

অন্যদিকে, ছবিটি মুক্তির পর আমার একটি অপূর্ণতা রয়ে গেল। তা হল- একমাত্র সিনেপ্লেক্সগুলো ছাড়া অন্যান্য প্রেক্ষাগৃহের নিুমানের সাউন্ডের জন্য খুব হতাশ হয়েছি। এ জন্য আমি বলব, অচিরেই যেন আমাদের দেশে সিনেপ্লেক্স বাড়ানো হয়। এ ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি এবং সহযোগিতা করা দরকার। তাহলে সিনেমায় দর্শক সংখ্যা বাড়বে এবং সিনেমার মধ্য দিয়ে জাতির সুন্দর মানস গঠন করা যাবে।

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×