মঞ্চ সংবাদ

কালরাত্রির নৃশংসতা নিয়ে নাটক অপ্রতুল

  ফারুক হোসেন শিহাব ২১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের যে শাখাটি সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়েছে তা হচ্ছে নাটক। বিশেষ করে আমাদের মঞ্চ বা থিয়েটারের পরিচ্ছন্ন নাট্যচর্চা দেশের সংস্কৃতিকে দিয়েছে বিশেষ অলঙ্করণ। ১৯৭১ সালের আগে রচিত আমাদের নাটক ছিল পূর্ব-বাংলাকেন্দ্রিক। সেই ঐতিহ্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে রচিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ও পরবর্তী নাট্যচর্চার রূপরেখা। সেই ধারাবাহিকতায় একাত্তর-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে মঞ্চাঙ্গনে রচিত হয়েছে বহু নাটক, গল্প, কবিতা এবং উপন্যাস। এসবে স্থান পেয়েছে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ, পাকদের হাতে নারী ধর্ষণ, ধর্ষিতা ও নির্যাতিতদের আর্তনাদ, বাঙালির অকুতোভয় বীরত্বগাথা এমনকি রাজাকার, আলবদর, আল-শামস তথা পাক নরপশুদের অমানবিক নিষ্ঠুরতার লোমহর্ষক চিত্র। তবে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের নাটক খুঁজে পায় গতিময় এক নতুন পথের ঠিকানা। ভাষা আন্দোলনের পর স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধ হয়ে ওঠে চেতনার অনন্য অবলম্বন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ যাবত যত নাটক রচিত হয়েছে তার অধিকাংশেই নানাভাবে উঠে এসেছে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভয়াল রাতের লোমহর্ষক ঘটনা। তবে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর নাটক রচিত হলেও শুধু ২৫ মার্চ রাতের ভয়াবহ নৃশংসতা নিয়ে সেভাবে নাটক রচিত হয়নি।

ভয়াল এই রাতের ঘটনাপ্রবাহে প্রথম নাট্যকার মান্নান হীরার রচনা ও নির্দেশনায় নির্মিত হয় নাটক ‘রাজারবাগ ৭১’। ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী বাংলার নিরস্ত্র জনতার ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে নারী, শিশু, পথচারীসহ হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয় বাড়িঘর, দোকানপাট। তাদের ওই পৈশাচিকতার প্রথম টার্গেট ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্যাংক আর বিপুল গোলাবারুদ নিয়ে তারা প্রথমে এগিয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। একপর্যায়ে হামলা চালায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী পাক সামরিক বাহিনীর সামনে পিছু না হটে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পুলিশ সদস্যরা সম্মুখ যুদ্ধে শামিল হন। পুলিশের রাইফেল থেকেই গর্জে ওঠে প্রতিরোধের প্রথম বুলেট! সূচনা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধের ইতিহাস। পুলিশ বাহিনীর সেই বীরত্বগাথা আর মুক্তিযুদ্ধে তাদের আত্মত্যাগের সেই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই রচিত নাটক ‘রাজারবাগ ৭১’। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিএমপি নাট্যদলের প্রথম প্রযোজনা হিসেবে ভয়াল সে রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ঘটে যাওয়া সেই নৃশংসতাকে সুনিপুণ অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন পুলিশ সদস্যরা। অনবদ্য এ নাট্যাখ্যান হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধ তথা ২৫ মার্চ রাতের ভয়াবহতার অনন্য দলিল।

অপরদিকে ইতিহাসের নির্মমতম এ হত্যাযজ্ঞের ঘটনা নিয়ে দেশের প্রথম সারির থিয়েটার দল পদাতিক নাট্য সংসদ, টিএসসি মঞ্চে আনে নাটক ‘কালরাত্রি’। লামিসা শিরীন হোসাইনের ‘লোন সার্ভাইভার’ গল্প অবলম্বনে ‘কালরাত্রি’র নাট্যরূপ দিয়েছেন ড. তানভীর আহমেদ সিডনী এবং নির্দেশনা দিয়েছেন ওয়াহিদুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ও এর আশপাশের এলাকাকে পাওয়া যায় নাটকের গল্পে। এতে মার্চের কালরাতে বেঁচে যাওয়া জগন্নাথ হলের এক শিক্ষার্থীর ভাষ্যে উঠে আসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই কালরাতের ভয়াল চিত্র।

২৫ মার্চ রাতের নৃশংসতা নিয়ে সেভাবে নাটক রচনা না হওয়া প্রসঙ্গে নাট্যজন ড. ইনামুল হক বলেন, ‘এই হত্যাযজ্ঞের বিবরণ আরও ব্যাপকভাবে জনসমক্ষে নিয়ে আসা উচিত। যেন মুক্তিযুদ্ধে ভয়াবহতা, নৃশংসতা, ধ্বংসযজ্ঞতা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করা যায়। যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের বোধকে তাড়িত করবে। আলাদাভাবে ২৫ মার্চ রাতের ভয়াবহতা নিয়ে আমার কোনো নাটক না থাকলেও অধিকাংশ নাটকেই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদের নাটকের ক্ষেত্রেও তাই।’

নাট্যজন মান্নান হীরা বলেন, ‘৩০ লাখ শহীদের দেশে সারা দেশটাই তো একটা বধ্যভূমি। বিশেষ করে গণহত্যার বিভীষিকার চেয়ে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বের করে আনার ক্ষেত্রে আরও কাজ করার রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নতুন প্রজন্মের চোখ দিয়ে দেখতে হবে এবং দেখাতে হবে। আমাদের সে উদ্যোগের অভাব রয়েছে।’ প্রকৃতপক্ষে আমরা গতানুগতিক ধারার নাটকই ঘুরেফিরে দেখতে পাই কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় সর্বস্তরের মানুষের আবেগকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা খুব একটা দেখি না। অথচ সারা দেশে এরকম অসংখ্য বীরত্বপূর্ণ ঘটনা ও দুঃখগাথা গল্প ছড়িয়ে আছে। এমনি বিষয়-বৈচিত্র্যের নাটকই নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×