শোবিজের চলমান সংকট নিরসনে সংগঠনগুলোর দায় কতটুকু?

‘এখন অনেককেই দেখছি সংগঠনের জন্য নিবেদিত প্রাণ। কিন্তু সবাই কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত। যার ফলে চলচ্চিত্রের এ অবস্থা। এত সংগঠন থেকে বা কী লাভ? নিজেরা নিজের কাজটুকু সঠিকভাবে করলেই তো হয়’ - বাপ্পারাজ

  হাসান সাইদুল ১৬ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ সঙ্গবদ্ধ জীব। সৃষ্টির আদিকাল থেকে এ নিয়ম ধারাবাহিকভাবে মানুষের মধ্যে প্রভাবিত। উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও সেই ধারাবাহিকতার রকমফের কখনও হতে দেখা যায়নি। আজও মানুষ এবং মনুষ্য সৃষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সঙ্গবদ্ধভাবেই চলছে। অন্যান্য পেশার পাশাপাশি অভিনয় এবং সঙ্গীতেও রয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। একমাত্র ব্যান্ড দলগুলোর সংগঠন ‘বামবা’ ছাড়া সঙ্গীতে উল্লেখ করার মতো আর কোনো সংগঠন না থাকলেও নাটক এবং চলচ্চিত্রে সংগঠনের আধিক্য লক্ষ্যণীয়। এর মধ্যে ঢাকাই চলচ্চিত্রে রয়েছে ১৮টি সংগঠন। টিভি মাধ্যমে রয়েছে ৬টিরও অধিক সংগঠন। সংগঠন থাকলে সবাই এক হয়ে কাজ করেন। সংগঠনের পক্ষ থেকে শিল্পীদের সমস্যা, জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকী এমনকি সংগঠনের কেউ অসুস্থ হলে তার খবর নেয়াসহ নানা বিষয় পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হয়। কিন্তু বর্তমানে আমাদের অভিনয় জগতের প্রতিষ্ঠিত সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিশেষ করে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বারবার বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। কারও মধ্যে যেন কোনো সম্মানবোধ নেই। মূলত তাদের কাজ কী, কিংবা কোন লক্ষ্য ধরে তারা এগোচ্ছেন সেটা গঠনতন্ত্রে উল্লেখ থাকলেও তা নিয়ে যেন নির্বাচিতদের মাথাব্যথা নেই। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই সেটা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

চলচ্চিত্রে গান গেয়ে এ শিল্পকে সমৃদ্ধ করলেও গত বছর প্রয়াত হওয়া ব্যান্ড লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহে শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে দেখা মেলেনি চলচ্চিত্রাঙ্গনের কোনো সংগঠনের। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে বরেণ্য সুরকার, গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের বেলায়। কয়েকমাস আগে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান এ সুরস্রষ্টা। মৃত্যুর পর তার মরদেহ সর্বস্তরের জনসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হলেও সেখানেও দেখা মেলেনি চলচ্চিত্রের বড় কোনো তারকার। চলচ্চিত্রের এত সংগঠনের কাজ কি তাহলে, এমন প্রশ্ন স্বভাবতই তৈরি হয় মনে। সুখে-দুঃখে শিল্পীদের পাশে থাকাই সংগঠনগুলোর গুরু দায়িত্ব। নির্বাচনের আগে অনেক বুলি আওড়ান কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর কাউকে আর দেখা যায় না।

এ প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে সব সময় শিল্পীদের এবং একটি সংগঠনে জড়িত সবাইকে বিবেক দিয়ে কাজ করা উচিত। সবাই তো তারকা। এখন আমি জুনিয়র হয়ে সিনিয়রকে বলব, বুঝাব। তিনি যদি না শোনেন তাহলে আমি কী করতে পারি? আর চলচ্চিত্রের বর্তমান যে অবস্থা সে থেকে উত্তরণের জন্য সবারই কাজ করতে হবে। একটি সংগঠন কিংবা একজন ব্যক্তি দিয়ে তো পুরো প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।’

এদিকে চলচ্চিত্রের অবস্থাও একেবারে নাজুক। ঘটন-অঘটনের মধ্য দিয়েই চলছে দেশি বিনোদনের সবচেয়ে বড় এ মাধ্যমটি। সিনেমা নেই। দর্শক হলবিমুখ। অভ্যন্তরীণ কোন্দল। সব মিলিয়ে এ শিল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। করণীয় কী? এ প্রসঙ্গে এখন সংগঠনগুলোই বা কী ভাবছে? বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘পেছনের বিষয় নিয়ে কিছু বলতে চাই না। অনেক সময় অনেক কথা মুখে বললেও একার পক্ষে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। চলচ্চিত্রের উন্নয়নের নিরিখে অনেক বিষয় নিয়ে আমরা ভাবছি। এখন আমরা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করব। আর ছবি নির্মাণের বিষয় একজন পরিচালকের সব কিছু করা সম্ভব নয়। লগ্নিকারীরও দরকার হয়। ভালো গল্পও দরকার। যা-তা গল্প দিয়ে ছবি বানালে তো হবে না। সব মিলিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে আমাদের সবার কাজ করা উচিত। সব সময় সংকট ছিল, সামনেও থাকবে। এসব নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

শুধু সংগঠন থাকলেই যে সব সমস্যার সমাধান হবে তা কিন্তু নয়। সংগঠনের কার্যকরী কমিটিতে থাকা সদস্যদের বাইরে সাধারণ সদস্য এবং অভিনয় জগতের সব শিল্পী যদি একটু যত্নবান হন তবে যে কোনো বিষয়ে বা সমস্যায় সবাই একত্রিত হওয়া সম্ভব। এমনই মনে করেন ডিরেক্টরস গিল্ডের সভাপতি নির্মাতা ও অভিনেতা সালাউদ্দিন লাভলু। তিনি বলেন, ‘বিগত বছরগুলোয় দেখেছি শিল্পীদের কোনো সমস্যা প্রধানমন্ত্রীর কান পর্যন্ত পৌঁছতে পারলে কাজ হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও আমরা সবাই যদি যত্নবান হই, একাত্ববোধ হয়ে কাজ করি সব কিছুতেই আমরা সহভাগী হতে পারব। তবে সব কিছুতেই সংগঠনের দোষ দিলেই হবে না। আমাদের সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সঠিক কাজটি করতে হবে। তবে সব সময় হয়তো তা সম্ভব নয়। এর জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। আমি কিছুদিন আগে দায়িত্বে এসেছি। কিছু কার্যক্রম চালুও করেছি। সামনে আরও আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলবে।’

এদিকে একাধিক সংগঠন থাকলেও কিছু কিছু বিষয়ে সবাই কোনো না কোনো জায়গায় অসহায়। এমনটাই মনে করেন টেলিভিশন শিল্পী সংঘের সভাপতি শহীদুল আলম সাচ্চু। তিনি বলেন, ‘পরিবর্তনশীল এ পৃথিবীতে আমরা চক্রাকারে পরিবর্তন হচ্ছি। আমাদের শোবিজাঙ্গনে অনেক পরিবর্তন হচ্ছে, যে পরিবর্তনের জন্য আমরা প্রস্তুত নই। আমাদের যাবতীয় সমস্যার মূল কারণ হল নিজেকে প্রস্তুত করা। সমস্যা যেহেতু আছে সমাধানও হবে। কিন্তু শিল্পী সংঘ তো কাজ বাড়াতে পারবে না। গল্পকার গল্প না লিখলে, প্রযোজক টাকা না খরচ করলে, পরিচালক নির্মাণ না করলে যে বেকারত্ব বাড়বে সেটির দায় কেন সংগঠন নেবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘সবাইকে একাত্ব হয়ে কাজ করতে হবে। সামনে সুদিন দেখছি। আশা করছি সব সংগঠন সক্রিয় থেকে কাজ করবে।’

ঢাকাই চলচ্চিত্র বর্তমানে ক্রান্তিকাল পার করছে বলে অনেকেই মনে করেন। এ ক্রান্তিকালের জন্য জনে জনে রেষারেষিকে দায়ী করছেন অনেকে। কে কাকে টেনে ধরবে, কে কাকে ডুবাবে এ কাজেই ব্যস্ত সবাই। এমনটাই মনে করেন নায়করাজের বড় ছেলে জনপ্রিয় চিত্রনায়ক বাপ্পারাজ। তিনি বলেন, ‘এখন অনেককেই দেখছি সংগঠন নিবেদিত প্রাণ। কিন্তু সবাই কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত। যে কারণে চলচ্চিত্রের এমন নাজুক অবস্থা। এত সংগঠন থেকে বা কী লাভ? নিজেরা নিজের কাজটুকু সঠিকভাবে করলেই তো হয়।’

এত রকম সংগঠন দেখে বিরক্ত লাগে বলে যুগান্তরকে জানান জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ও প্রযোজক ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, ‘এখন অনেক সংগঠন দেখছি কিন্তু তারা আসলে কী করেন বুঝতে পারছি না। চলচ্চিত্র পরিবার বলেন আর চলচ্চিত্র ফোরামই বলেন, সবার লক্ষ্য একটাই হওয়া উচিত, সিনেমা বানানো। শিল্পী, পরিচালক ও প্রযোজকরা প্রতিনিয়ত নতুন সিনেমা নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হবেন, সেটাই সবার জন্য আনন্দের খবর। কিন্তু এত মিছিল, মিটিং আর সংগঠন বাড়িয়ে কী লাভ! যদি কাজ না হয়? কীভাবে নতুন সিনেমার শুটিং বাড়ানো যায়, সেদিকে মনোযোগী হওয়া উচিত বলে মনে করেন এ নায়ক।’

তবে সংগঠনগুলো যদি নিজেদের কাজটা দেখাতে পারে তাহলে সব সমস্যার সমাধান হবে বলে মন্তব্য করেছেন চিত্রনায়ক আলমগীর। তিনি বলেন, ‘এখন নিজেকে জাহির করতেই ব্যস্ত সবাই। এক হয়ে কাজ করার মানসিকতা খুব কম দেখি। সংগঠনগুলো যদি নিজেদের কাজটা যথাযথভাবে করতে পারে, তাহলে হয়তো সব ধরনের সংকট থেকে উত্তোরণ সম্ভব। শুধু বহিষ্কার বা শোকজ করা সংগঠনগুলোর কাজ নয়। তাদের কাজ একসঙ্গে বসে পরামর্শ করে সমস্যার সমাধান করা। নিজেদের মধ্যে কোন্দল মিটিয়ে কাজ করতে পারলেই সুদিন ফিরবে বলে আমি মনে করি।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×