দর্শকমহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া

নাটকে বিভিন্ন মহলের সিন্ডিকেট

  সোহেল আহসান ১১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নাটকে বিভিন্ন মহলের সিন্ডিকেট

উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির কারণে বিনোদন মাধ্যমের প্রতি দর্শকের আগ্রহ বেড়েছে অনেক। অবসর সময়ে বিনোদিত হওয়ার জন্য টেলিভিশন কিংবা অনলাইনে নাটক দেখছেন প্রচুর সংখ্যক দর্শক।

কিন্তু দর্শকের এই আগ্রহকে পুঁজি করে কিছু সংখ্যক টিভি চ্যানেল, নির্মাতা ও অভিনেতা নাটকে সিন্ডিকেট করে কাজ করছেন বলে অভিযোগ অনেকের। বিষয়টি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া এবং শোবিজে প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বিস্তারিত লিখেছেন-

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই টেলিভিশন নাটক বিকশিত হয়ে আসছে। সে সময় থেকে চলচ্চিত্রের পরিপূরক হিসেবে পারিবারিক বিনোদনের চাহিদার জোগান দিয়ে আসছে নাটক।

শৌখিন গৃহিণী থেকে শুরু করে যারা প্রেক্ষাগৃহে যেতে পারেন না, তাদের কাছে টেলিভিশন নাটকই একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম ছিল। এসব দর্শকের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে নিয়মিতভাবে নাটক নির্মিত হচ্ছে।

তখন অল্প সংখ্যক নাটক নির্মিত হলেও বাংলাদেশ টেলিভিশনের কল্যাণে সারা দেশের দর্শক সেগুলো দেখতেন। গল্প অনুযায়ী চরিত্র নির্বাচন করা হতো এবং প্রায় প্রতিটি নাটকই ছিল দর্শকপ্রিয়।

একটা নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে নির্মাতারা গল্প নির্বাচন কিংবা নাটক নির্মাণ করতেন। গল্পের প্রয়োজনেই সেসব নাটকে অভিনয়শিল্পী নির্বাচন করা হতো। তখন আফজাল হোসেন, সুবর্ণা মুস্তাফা, তৌকীর আহমেদ, বিপাশা হায়াতদের মতো অভিনয় জুটি দর্শক সাদরে গ্রহণ করেছেন।

স্বাভাবিকভাবেই তাদের জন্য গল্প তৈরি করে অভিনয় করান হতো। কিন্তু একুশ শতকের শুরুর দিকে এসে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের আবির্ভাব ঘটলে বিনোদন মাধ্যম সম্প্রসারিত হয়। কাজের সংখ্যা বেড়ে যায়। এতে অভিনয়শিল্পী, নাট্যকার ও কলাকুশলীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়।

উচ্চশিক্ষিত আধুনিক মনস্ক তরুণ শোবিজ কর্মী মিডিয়ায় যুক্ত হতে থাকে। দর্শক সংখ্যাও ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে।

গত দুই দশকে বেসরকারি চ্যানেলও বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। এতে করে কাজের পরিমাণও বেড়ে গেছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় উচ্চশিক্ষা সমাপন করে অনেকেই এখন মিডিয়ায় ক্যারিয়ার গড়ছেন। অন্যদিকে বর্তমান সময়ে টেলিভিশনের পাশাপাশি অনলাইন মাধ্যমের জন্যও নাটক তৈরি হচ্ছে।

এসব কর্মযজ্ঞে প্রচুর সংখ্যক অভিনয়শিল্পী কাজ করছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নাটকে সিন্ডিকেট করে কাজ করার অভিযোগ উঠছে। কেউ কেউ অভিনয়শিল্পী থেকে শুরু করে নির্মাতা এবং টেলিভিশন চ্যানেলের দিকেও আঙুল তুলছেন।

এ সিন্ডিকেট করে কাজ করার কারণে অনেক অভিনয়শিল্পী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গত এক বছরে টেলিভিশন কিংবা অনলাইনের জন্য যেসব নাটক নির্মাণ করা হয়েছে, তার বেশিরভাগ কাজেই গুটিকয়েক অভিনয়শিল্পীকে দেখা গেছে। আগামী ঈদের জন্যও যে নাটকগুলো তৈরি হচ্ছে এগুলোর দিকে তাকালে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন শোবিজ সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, একখণ্ডের নাটকগুলোয়ই সিন্ডিকেট করে কাজ করার প্রবণতা বেশি। আর এ ক্ষেত্রে অপূর্ব, আফরান নিশো, মেহজাবিন এবং তানজিন তিশা- এই চার অভিনয়শিল্পীকেই একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে নাটকে। এ মুহূর্তে যতগুলো নাটক সাম্প্রতিক সময়ে নির্মিত হচ্ছে তার সিংহভাগেই কাজ করছেন এই অভিনয়শিল্পীরা।

এতে করে তাদের সমসাময়িক অনেক তারকারই কাজ কমে গেছে। আর এক জুটিকে বারবার টিভি পর্দায় দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন অনেক দর্শক। পাশাপাশি তাদের পরের

প্রজন্মের অনেকেই এ ধারা অনুকরণ করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ অনেকের।

নিয়মিত নাটক দেখেন রাজধানীতে বসবাস করা এমন এক দর্শক মো. নুর নবী নিরব বলেন, ‘অবসর সময় খুব পাই না। তারপরও সারা দিনের ক্লান্তি শেষে যখন টিভি সেটের সামনে বসি, তখন বেশিরভাগ সময়ই একই মুখ বারবার ঘুরে ফিরে আসছে।

এতে করে বিনোদিত না হয়ে উল্টোটা হচ্ছে। আমাদের কথা বিবেচনা করে যদি বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজ করা হয়, তাহলে আমরা উপকৃত হব।’ অন্যদিকে জামালপুরের ইসলামপুর থেকে দর্শক মিহির রঞ্জন সাহা বলেন, ‘সুবর্ণা মুস্তাফারা যখন নিয়মিত নাটক করতেন তখন থেকেই আমি টিভি নাটক দেখি।

তখন সপ্তাহে একদিন নাটক প্রচার হতো। সেই অপেক্ষা পেরিয়ে আমরা নাটকে নিটোল বিনোদন পেয়েছি। এখন প্রতিদিন অসংখ্য নাটক প্রচার হচ্ছে, কিন্তু তেমন আগ্রহ নিয়ে আর নাটক দেখা হচ্ছে না। একই মুখ ঘুরে ফিরে আসছে। গল্পে কোনো বৈচিত্র্য নেই। কেমন যেন একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ থেকে পরিত্রাণ চাই।’

তবে যেসব অভিনয়শিল্পীকে নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে তারা বলছেন ভিন্ন কথা। সিন্ডিকেট করে কাজ করা প্রসঙ্গে অপূর্ব বলেন, ‘বেশ কিছুদিন থেকে আমিও শুনছি সিন্ডিকেটের কথা। কারও মাথায় বন্দুক ধরে তো কাজ নেয়া হয় না। আর কোনো ক্ষমতা দেখিয়ে কিন্তু আমরা কাজ করি না।

পরিচালক কাকে নিয়ে কাজ করবেন এটা একান্তই পরিচালকের ইচ্ছা। এ ক্ষেত্রে অভিনয়শিল্পীর কোনো ভূমিকা নেই। আমরা অনেক কষ্ট করে কাজ করি দর্শকের জন্য।

আজকের এই জায়গায় আসতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। দর্শক যতদিন আমার অভিনয় গ্রহণ করবেন ততদিনই কাজ করব। আমি সিন্ডিকেট বিষয়টিকে পছন্দ করি না।’

সিন্ডিকেটের অভিযোগ প্রসঙ্গে মেহজাবিন বলেন, ‘একজন পরিচালক যখন গল্পটি হাতে পায় তখন তার পরিকল্পনায় কোনো না কোনো অর্টিস্ট থাকেন। গত ঈদে অপূর্ব ভাই ও নিশো ভাইয়ের সঙ্গেই বেশি কাজ করা হয়েছে। এটা হয়েছে নির্মাতাদের ইচ্ছায়। আমি যতটুকু জানি, চ্যানেল থেকেও নাকি নির্মাতাদের বলে দেয়া হয় যে কাকে নিয়ে কাজ করবে তারা। আমার কাজ অভিনয় করা। এর বাইরে আর কোনো দায়িত্ব নিতে চাই না আমি’।

তবে বিষয়টি নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বলছে ভিন্ন কথা। সিন্ডিকেট করে কাজ করার কথা তারা অস্বীকার করছেন।

এ বিষয়ে বাংলাভিশনের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান তারেক আখন্দ বলেন, ‘আমি ভালো নাটকে বিশ্বাসী। আমাদের চ্যানেলে সিন্ডিকেটের কোনো প্রভাব নেই।

আর সিন্ডিকেট করে কোনো ভালো কাজ হয় না। দর্শকদের বিনোদিত করার চেষ্টা করি সব সময়। দর্শক যে ধরনের নাটক দেখতে চান, সেসবই আমরা প্রচার করি। আমি যে কোনো ধরনের সিন্ডিকেটের বিপক্ষে।’

এ বিষয়ে এনটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান মোস্তফা কামাল সৈয়দ বলেন, ‘সিন্ডিকেটের কথাটা আমিও শুনেছি। কিন্তু আমরা সবার সঙ্গে কথা বলে কাজ করি। কোনো কিছু কারও ওপর চাপিয়ে দেই না। দর্শকের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে অভিনয়শিল্পী নেয়া হয়। দর্শকের আগ্রহের কারণে কিছু জুটি তৈরি হচ্ছে। এটাকে আমি সিন্ডিকেট বলব না। তবে সিন্ডিকেটের কাজ আমাদের চ্যানেলে হয় না।’

অন্যদিকে টেলিভিশন মিডিয়ার সংগঠন অভিনয়শিল্পী সংঘ ও ডিরেক্টর গিল্ডের নেতারাও এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখজনক একটি বিষয়।

শিল্পী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিচালকের যদি স্বাধীনতা না থাকে তাহলে বাংলাদেশের নাটকের মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। যে চরিত্রের জন্য যিনি যোগ্য, তাকে যে কোনোভাবেই হোক নিতে হবে। এখন প্রচুর ফরমায়েশি কাজ হচ্ছে। এ ধারা বজায় থাকলে বাংলাদেশের নাটক একঘেয়েমি ও বিরক্তিকর পর্যায়ে চলে যাবে। এখান থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বিভাগগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে। যাতে করে তৃতীয় কোনো পক্ষ কাস্টিং কিংবা কন্টেন্টের দিকে হাত না বাড়াতে পারে।’

একই প্রসঙ্গে ডিরেক্টরস গিল্ডের সভাপতি সালাউদ্দিন লাভলু বলেন, ‘সিন্ডিকেট বিষয়টি নিয়ে আমি প্রায়ই আলোচনা শুনি। যদি সত্যিই সিন্ডিকেট করে কাজ করা হয় তাহলে এটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমাদের সংগঠনে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব এবং নাটকের জন্য যে কোনো নেতিবাচক

বিষয়কে নিরুৎসাহিত করব।’

অভিযোগের বিষয়ে আফরান নিশো ও তানজিন তিশাকে কয়েকবার ফোন করা হলে তারা ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি পরিচয় দিয়ে খুদে বার্তা পাঠালেও সেটারও উত্তর দেননি।

তবে অলোচনা যাই হোক না কেন বাংলাদেশের নাটকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি কার্যকরী নীতিমালা তৈরি করে সেই অনুযায়ী কর্ম পরিচালনা করলে অশুভ কোনো বিষয়ের অবতারণা হবে না বলে মতামত জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখন প্রচুর ফরমায়েশি কাজ হচ্ছে। এ ধারা বজায় থাকলে বাংলাদেশের নাটক একঘেয়েমি ও বিরক্তিকর পর্যায়ে চলে যাবে। এখান থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বিভাগগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

শহীদুজ্জামান সেলিম, অভিনেতা

সিন্ডিকেট করা দুঃখজনক। যদি সত্যিই কেউ করে থাকেন তাহলে এটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমাদের সংগঠনে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব এবং নাটকের জন্য যে কোনো নেতিবাচক বিষয়কে নিরুৎসাহিত করব।

সালাউদ্দিন লাভলু, নির্মাতা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×