ঈদের নাটকের পোস্টমর্টেম

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সোহেল আহসান

লেডি কিলার ২ নাটকের দৃশ্যে

সপ্তাহব্যাপী ঈদের অনুষ্ঠান প্রচার হল টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে। প্রতিযোগিতার দৌড়ে কে এগিয়ে আর কে পিছিয়ে এ নিয়ে হিসাবের খাতা খুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। কারও পৌষ মাস আবারও কারও সর্বনাশ।

শেষ হয়ে গেল আনন্দের পসরা নিয়ে আসা ঈদ উৎসব। নাটকপাড়া এই ঈদকে কেন্দ্র করে জমজমাট ছিল ঈদের অনেক আগে থেকেই। বিরামহীন পরিশ্রমের মাধ্যমে নির্মিত নাটকগুলো প্রচার হয়েছে সপ্তাহব্যাপী।

অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীরা তাই এই বিশাল যজ্ঞ অতিক্রম করে অনেকটা অবসর সময় পার করছেন। তবে সংখ্যা ও জনপ্রিয়তার দৌড়ে কারা এগিয়ে তা নিয়ে চলছে অলোচনা।

রোজার ঈদের মতো এই ঈদেও অপূর্ব, আফরান নিশো, তাহসান, জাকিয়া বারী মম, মেহজাবিন, তানজিন তিশা, নুসরাত ইমরোজ তিশার নাটক বেশি প্রচার হয়েছে।

এছাড়া জাহিদ হাসান, মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরীদেরও একাধিক নাটক প্রচার হয়েছে। এক খণ্ডের পাশাপাশি ঈদ ধারাবাহিক নাটকগুলোও এবার দর্শকদের বিনোদিত করেছে। তবে বরাবরের মতোই বিজ্ঞাপন বিড়ম্বনা দর্শকের ভূগিয়েছে। এই বিড়ম্বনার কারণে বেশিরভাগ দর্শক কোনো চ্যানেলেই স্থির থাকেননি।

তারপরও কিছু নাটক ও টেলিফিল্ম দর্শকের নজরে ছিল। আর অধিকাংশ চ্যানেলই গল্পকে গুরুত্ব না দিয়ে তারকা শিল্পীর সমাবেশ ঘটানো নাটক প্রচারের দিকে জোর দিতে দেখা গেছে।

বাংলাদেশ টেলিভিশন : রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ চ্যানেলে জাতীয় শোক দিবসের বিশেষ আয়োজনের কারণে এবারের ঈদের অনুষ্ঠান প্রচার হয়েছে মাত্র তিন দিন। ঈদের আগের দিন থেকে তাদের ঈদের অনুষ্ঠান প্রচার হয়েছে। তিন দিনে তিনটি নিজস্ব প্রযোজনার নাটক ছিল এ চ্যানেলে।

তিনটি নাটকের মধ্যে ‘নো ডাক্তার’ নাটকটি কিছুটা আলোচনায় ছিল। তবে বেসরকারি চ্যানেলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে খুব বেশি দর্শক টানতে সক্ষম হয়নি এ চ্যানেলের নাটকগুলো।

চ্যানেল আই : এ টিভি চ্যানেল ৮ দিনের ঈদ অনুষ্ঠান প্রচার হয়েছে। এর মধ্যে আফজাল হোসেনের পরিচালনায় ঈদ ধারাবাহিক ছোট কাকু সিরিজের ‘খালি খালি নোয়াখালী’ নাটকটি ছোটদের পাশাপাশি বড়দের আগ্রহও লক্ষ্য করা গেছে।

একই চ্যানেলে আবুল হায়াতের পরিচালনায় ‘সেতু’, সালাউদ্দিন লাভলুর পরিচালনায় ‘পরীর নাম ময়না পক্ষী’, তৌকীর আহমেদের ‘রক্ত ঋণ’, আরিফ খানের ‘থেকে যায় প্রশ্ন’, অঞ্জন আইচের ‘বার্ষিক পরীক্ষা’, সাজ্জাদ সুমনের ‘হ্যাশ ট্যাগ মি টু’ নাটকগুলো দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে।

এটিএন বাংলা : এ চ্যানেলের নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল হানিফ সংকেতের খণ্ডনাটক ‘অজ্ঞ বিজ্ঞ সমাচার’। নাটকটি দর্শক দারুণ উপভোগ করেছেন।

এ ছাড়া মোস্তফা কামাল রাজের পরিচালনায় খণ্ড নাটক ‘আনফিট’, কাজল আরেফিন অমির ‘বিউটি ফুল’, মাবরুর রশীদ বান্নাহর ‘ফিরে আসি বারবার’, মিজানুর রহমান লাবুর ‘বিবাহ বিড়ম্বনা’ এবং শামস করিমের ‘ফকির’ নাটকগুলোর প্রতিও দর্শকদের আগ্রহ ছিল।

বেশ কয়েকটি ঈদ ধারাবাহিক নাটকও প্রচার হয়েছে এই চ্যানেলে। এগুলোর মধ্যে শামীম জামানের পরিচালনায় ‘চুটকী ভাণ্ডার-৮’ এবং সকাল আহমেদের ‘লেকুর অ্যাভারেস্ট জয়’ অলোচনায় ছিল।

এনটিভি : ৭ দিনের ঈদ আয়োজনে এই চ্যানেলে শিহাব শাহীনের পরিচালনায় ‘কুহক’ এবং রেদওয়ান রনির পরিচালনায় ‘বিহাইন্ড দ্য পাপ্পি’ ঈদ ধারাবাহিক দুটি দর্শকপ্রিয় ছিল। অন্যদিকে একক নাটক প্রচারের ক্ষেত্রে এই চ্যানেল বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। মানসম্মত গল্পের নাটকের আধিক্য ছিল চ্যানেলটিতে। একক নাটকের মধ্যে তৌকীর আহমেদের পরিচালনায় ‘পাদুকা সমাচার’, সাগর জাহানের ‘তোমার চোখে চেয়ে’, সাজ্জাদ সুমনের ‘ভালোবাসার রঙ থাকে না’, গৌতম কৈরির ‘ছোট পাখি’, মিজানুর রহমান আরিয়ানের ‘রঞ্জনা আমি আবার আসব’, ইমরাউল রাফাতের ‘বেটার হাফ’ ছিল দর্শকের আগ্রহের মধ্যে।

বাংলাভিশন : আট দিন ঈদের অনুষ্ঠান প্রচার করেছে বাংলাভিশন। এই চ্যানেলের প্রায় সব ঈদ ধারাবাহিকই দর্শকপ্রিয় ছিল। এগুলো হল- সালাউদ্দিন লাভলুর পরিচালনায় ‘অতঃপর শিক্ষিত বউ’, মাসুদ সেজানের ‘চরিত্র : ভাড়াটিয়া’, সাগর জাহানের ‘কবুল বলিল কে’, আবু হায়াত মাহমুদের ‘আলাল দুলাল’ উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে একাধিক খণ্ডনাটক দর্শকের পছন্দের তালিকায় ছিল। এগুলো হল জাহিদ হাসানের পরিচালনায় ‘অভিমানী কাজল’, মোস্তফা কামাল রাজের ‘শিশির বিন্দু’, সাগর জাহানের ‘মায়া সবার মতো না’, মিজানুর রহমান আরিয়ানের ‘লাইফ ইন্স্যুরেন্স’, মাবরুর রশীদ বান্নাহর ‘লেডি কিলার-২’ ও ‘শেষ কথা’, ইমরাউল রাফাতের ‘লাকী ভাই’, আশফাক নিপুণের ‘আগন্তুক’, তপু খানের ‘শেষ বিকালে’ এবং সকাল আহমেদের ‘বিশ্ব টাউট’। এ ছাড়া অন্য নাটকগুলোর দর্শক ছিল গড়পড়তা।

আরটিভি : এই চ্যানেলে তিনটি ঈদ ধারাবাহিক নাটক প্রচার হয়েছে। প্রতিটি ধারাবাহিক নাটকই দর্শকের নজরে পড়েছে। এগুলোর গল্পের নাটকীয়তার কারণে দর্শক বিনোদিত হয়েছেন। নাটকগুলো হল সাজ্জাদ সুমনের পরিচালনায় ‘ম্যানেজ মকবুল’, সাগর জাহানের পরিচালনায় ‘হেভিওয়েট মিজান’, শামীম জামানের পরিচালনায় ‘আনমাইন্ডফুল’। অন্যদিকে এক খণ্ডের নাটকগুলোর গল্প ও তারকা অভিনয়শিল্পীর কারণে কয়েকটি নাটক আলোচনায় ছিল। এগুলো হল তৌকীর আহমেদের পরিচালনায় ‘স্বর্ণলতা’, শেখ সেলিমের ‘অহংকার’, আবু হায়াত মাহমুদের ‘রূপা ভাবি’, অঞ্জন আইচের ‘আয়নার গল্প’, মাবরুর রশীদ বান্নাহর ‘মিস্টার পরিষ্কার’, সাজিন আহমেদ বাবুর ‘উবার’, তপু খানের ‘ফ্রাইডে লাভ’ এবং তানিম রহমান অংশুর ‘দরজার অপাশে’।

মাছরাঙা : সাত দিনের ঈদের অনুষ্ঠানমালা ছিল এই চ্যানেলে। তবে এবারের ঈদের অনুষ্ঠানে চ্যানেলটি সবচেয়ে বেশি শিশুতোষ অনুষ্ঠান প্রচার করেছে। এর মধ্যে কার্টুন সিরিজের আধিক্য ছিল বেশি। তারপরও নাটক প্রচারের ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে চ্যানেলটি।

এই চ্যানেলের একমাত্র ঈদ ধারাবাহিক ছিল ‘২৫/২ কাঠমান্ডু ভ্যালি’। বৃন্দাবন দাসের রচনায় নাটকটি পরিচালনা করেছেন সকাল আহমেদ। গল্পের বৈচিত্র্যের কারণে দর্শকের চোখে পড়েছে নাটকটি। অন্যদিকে একক নাটকগুলোর গল্পও ছিল পরিশীলিত।

বেশ কিছু নাটক ছিল আলোচনায়। এগুলো হল সীমান্ত সজলের পরিচালনায় ‘ওয়াটার’, শাহনেওয়াজ রিপনের ‘কিডন্যাপড’, সকাল আহমেদের ‘অশরীরি’, নিয়াজ মাহবুবের ‘রুস্তম কুস্তিগীর’, সাদাত রাসেলের ‘দুষ্টু কুটুম’। অন্যদিকে বেশ কিছু টেলিফিল্মও দর্শকের কাছে আলোচিত ছিল। এগুলো হল- ইমরাউল রাফাতের পরিচালনায় ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে’, সাখাওয়াত শিবলীর ‘মনের গহিন করিডোরে’।

বৈশাখী টেলিভিশন : এ চ্যানেলে আট দিনব্যাপী ঈদ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়েছে। একক নাটকের পাশাপাশি টেলিফিল্ম ও ঈদ ধারাবাহিক নাটক প্রচার করতে দেখা গেছে। তবে চ্যানেলটিতে তুলনামূলক কমেডি নাটক বেশি প্রচার করা হয়েছে। একক নাটকগুলোর আলোচনায় ছিল- অকাশ রঞ্জনের পরিচালনায় ‘ভাবির দোকান-২’, সৌর্য দীপ্ত সূর্যের ‘ডিজিটাল প্রতারণা’, এফ জামান তাপসের ‘ওয়ান মিলিয়ন ভিউ’।

অন্যদিকে কয়েকটি টেলিফিল্মও দর্শক দেখেছেন। এগুলো হল অনিমেষ আইচের পরিচালনায় ‘দাদার দেশের ডাক্তার’, আল হাজেনের ‘ঘর জামাই’, সাজিন আহমেদ বাবুর ‘কিড সোলায়মান’ ও হিমেল আশরাফের ‘প্রেমের নাম বেদনা’। এছাড়া ঈদ ধারাবাহিক নাটক আদিবাসী মিজানের ‘লো প্রেসার’, এসএম শাহীনের ‘মফিজের লাইফ স্টাইল’ উল্লেখযোগ্য ছিল।

একুশে টেলিভিশন : এ চ্যানেলটি ঈদে ৭ দিনের অনুষ্ঠান প্রচার করেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ নাটকই ছিল কমেডি ধাঁচের। মিজানুর রহমান লাবুর পরিচালনায় ‘বংশ মর্যাদা’ এবং ফরিদুল হাসানের ‘জামাই হাজির’ ধারাবাহিক নাটক দুটি আলোচনায় ছিল।

এ ছাড়া একক নাটকগুলোর মধ্যে সুমন অনোয়ারের পরিচালনায় ‘বাও বাতাস’, দীপু হাজরার ‘আমি আবার তোমার আঙুল ধরতে চাই’, অঞ্জন আইচের ‘পাঁচ কোটি টাকা’ দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়।

এশিয়ান টিভি : সাত দিনের ঈদ অনুষ্ঠান প্রচার করেছে এই চ্যানেলটি। অন্যান্য অনুষ্ঠানের সঙ্গে নাটকও প্রচার হয়েছে এখানে। খণ্ডনাটকের পাশাপাশি ঈদ ধারাবাহিক নাটকও দেখানো হয়েছে এখানে। এ চ্যানেলে প্রচারিত একক নাটকগুলোর মধ্যে জহিরুল ইসলামের পরিচালনায় ‘লাভ উইল টার্ন’, মুরসালিন শুভর ‘চরিত্র’ ছিল উল্লেখ করার মতো।

ধারাবাহিক নাটকের মধ্যে ফজলুল সেলিমের পরিচালনায় ‘বোকা বাবুল এখন সুপার মডেল’, রুলীন রহমানের ‘ভালোবাসার সর্দি কাশি’, পারভেজের পরিচালনায় ‘আলাল-দুলাল’ এবং সাজ্জাদ সুমনের ‘হাইত্তাম নো কিল্লাই’ দর্শকের নজর কেড়েছে।

দীপ্ত টিভি : সাত দিনের আয়োজনে এই চ্যানেলে ঈদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাটক প্রচার করা হয়েছে। অভিনেতা জাহিদ হাসানের পরিচালনায় চ্যানেলটির একমাত্র ঈদ ধারাবাহিক নাটক ‘ভাইজান’ ছিল আলোচনার শীর্ষে। এতে জাহিদ হাসানের পরিচালনাও প্রশংসিত হয়েছে।

এ ছাড়া একক নাটকগুলোর মধ্যে সুমন আনোয়ারের পরিচালনায় ‘মায়া’, ইফতেখার আহমেদ ফাহমির ‘নো ওয়ে আউট’, সৈয়দ শাকিলের ‘প্রজাপতি মেয়েটা’, মিলন ভট্টের ‘বেঙ্গল দ্য সেলফি হিরো’, পারভেজ আমিনের ‘জোয়ার’, তপু খানের ‘বিয়ে করা বারণ’ ও ইমরাউল রাফাতের ‘চলো পালাই’ ছিল দর্শকের পছন্দের তালিকায়। এ ছাড়া অন্য নাটকগুলো খুব বেশি অলোচনায় ছিল না।

দেশ টিভি : সাত দিনের ঈদ আয়োজনে এই চ্যানেলটিতে হাতেগোনা কয়েকটি নাটক প্রচার হয়েছে। তবে নাটকের চেয়ে সঙ্গীতানুষ্ঠান প্রচারের দিকেই বেশি ঝোঁক ছিল এই চ্যানেলের। তারপরও কয়েকটি একক নাটক দর্শকের চোখে পড়েছে। এর মধ্যে সকাল আহমেদের পরিচালনায় ‘যে রাতে সে এসেছিল’, হাবিব শাকিলের ‘অপছন্দের সাত দিন’, রাইসুল তমালের ‘অপেক্ষা’ উল্লেখযোগ্য।

নাগরিক টেলিভিশন : সাত দিনের ঈদ অনুষ্ঠানমালায় একাধিক খণ্ড ও ধারাবাহিক নাটক প্রচার করেছে এ চ্যানেলটি। এ চ্যানেলের ঈদ ধারাবাহিক নাটকের মধ্যে শামীম জামানের ‘এক্স ফেল ফয়েজ’, তারিক মোহাম্মদ হাসানের ‘তিন রাস্তার ভূত’ ও সোহাগ কাজীর ‘বাকির নাম ফাঁকি’ অলোচনায় ছিল।

এ ছাড়া খণ্ডনাটকের মধ্যে রাহাত মাহমুদের ‘সুইট সিক্সটিন’, মাসুদ আল জাবেরের ‘স্বপ্নের স্কুল’ ও হুমায়ুন রশীদ সম্রাটের ‘গ্যাংস্টার পাপা’ ছিল উল্লেখযোগ্য।