প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ভালো করা আর প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়া এক নয়

এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা আজিজুল হাকিম এখনও নাটক ও সিনেমায় নিয়মিত অভিনয় করছেন। বর্তমানে অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক নির্মাণেও বেশি সময় দিচ্ছেন। অভিনয় ক্যারিয়ারের শুরু থেকে অনেক উত্থানের পাশাপাশি পতনও দেখেছেন। যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপে এ অভিনেতা জানিয়েছেন বর্তমান ব্যস্ততা ও ক্যারিয়ারের নানা বাঁকের গল্প। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন -

  এইচ সাইদুল ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আপনি যখন অভিনয়ে এসেছেন সে সময় অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেয়া কতটা সহজ বা কঠিন ছিল?

আমি মূলত ভালো লাগা থেকেই অভিনয়ে এসেছি। ছোটবেলা থেকে অভিনয়ের প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। তবে সে সময় অভিনয়ে আসা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। ছাত্রজীবন থেকে চর্চার পাশাপাশি আমি মঞ্চে অভিনয় শুরু করি। সেখানে আমার এবং আমার সমসাময়িক অনেককেই নিজেদের দক্ষতা দেখাতে হয়েছে। মঞ্চে আমাদের আগে যারা অভিনয় করতেন তাদের সঙ্গে আমরা পরামর্শ করতাম। কীভাবে আরও ভালো করা যায় সে বিষয়গুলো জানতাম। বিভিন্ন ওয়ার্কশপ করতাম। তারপর টেলিভিশনে আসা। এখন যত সহজে স্ক্রিনে আসা যায় আমাদের সময় তা ছিল স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখে তা পূরণ করতে হয়েছে অনেক কষ্ট করে।

আপনাদের সময় যে কয়েকজন অভিনয় শুরু করেছিলেন তাদের বেশিরভাগই অভিনয়ে অনিয়মিত। এর কারণ কী বলে মনে করেন?

সবারটা বলতে পারব না। দু-একজনের কথা জানি। অভিনয়ের পাশাপাশি সবাই এখন কোনো না কোনো কাজ নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন হয়তো। কেউ কেউ শুধু অভিনয় নিয়ে আছেন। আমিও এখন আগের মতো অভিনয় করি না। বিশেষ দিনেই অভিনয় করি।

আপনাদের সময় আর বর্তমান নাটকের মধ্যে কেমন পার্থক্য দেখতে পান?

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে যে নাটকের চর্চা, সাহিত্যের চর্চা, সংস্কৃতির চর্চা ছিল, সেখানে শুধু নাটকই কিন্তু এগিয়ে ছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী একদল মানুষ যারা সংস্কৃতি নিয়ে ভাবেন তারা বিভিন্ন নাট্যদল গঠন করে নাট্যচর্চা শুরু করেন। ক্রমান্বয়ে ভালোই চলছিল সব। কিন্তু এরপর ছন্দপতন ঘটে। বর্তমানে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা বাড়ছে। অস্থিরতাও রয়েছে। এর মধ্যে ভালো ভালো নাটকও হচ্ছে। তবে এখন সবার একটু যত্নবান হয়ে কাজ করা উচিত বলে মনে করি।

ঈদ, পূজা বা বৈশাখের নাটকের সেকাল ও একাল নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। এ পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে হবে। আমাদের সময় গল্প এবং দর্শকদের গল্পের চাহিদা ছিল এক রকম। বর্তমানে যে গল্প দেখছি তাতেও দর্শকদের চাহিদা রয়েছে। আমরা মূলত কাজ করি দর্শকদের চাহিদা মাথায় রেখে। এখন দর্শকদের রুচির পরিবর্তন হয়েছে। সে অনুযায়ী নির্মাতারা নাটক বানাচ্ছেন এবং কেউ কেউ প্রশংসাও পাচ্ছেন। আমি একজন আশাবাদী মানুষ। তাই বলছি, আগামীতে আরও পরিবর্তন আসবে এবং সেটিকে সবার গ্রহণ করতে হবে।

এখন অনেকেই প্রযুক্তির সহজলভ্যতাকে প্রতিবন্ধকতা মনে করেন। আপনিও কি তাই মনে করেন?

আমি তা মনে করি না। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভালো ভালো কাজ উপহার দেয়া সম্ভব। আমাদের সময় এত সহজলভ্য ছিল না। তবে এটা সত্যি, প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ভালো করা আর প্রযুক্তির ওপর নির্ভর হওয়া এক নয়। সবার মনে রাখতে হবে, আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করব, ফেসবুক, ইউটিউব ব্যবহার করব কিন্তু তার ওপর নির্ভরশীল হব না।

আশাবাদী তো তারাই যারা বর্তমান নিয়ে সন্তুষ্ট নয়...

আসলে এখন নাটক যতই ভালো হোক না কেন আমরা চাইব এর চেয়ে আরও ভালো হোক। সে অর্থে হয়তো আমার মতো অনেকেই আশাবাদী।

বর্তমানে যে নাটক হচ্ছে তাতে কিসে ঘাটতি দেখতে পান?

ঘাটতির কথা বলেই বা কী লাভ? সবই তো জানাশোনা। আমরা যদি নব্বই দশকের কথাই ভাবি তাহলে বর্তমান সময়ের নাটকের মধ্যে বিরাট পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়। এ পার্থক্য কেন তা যদি বিশ্লেষণ করি তবে সমাধানও সহজ হবে।

আপনার দৃষ্টিতে সেই সমাধানটা কী?

আমরা তরকারি খাই। সে জন্য কত রকম ঝামেলা পেরিয়ে তা তৈরি করে খাই। এ বিষয়টি একবার যদি চিন্তা করি তবে সব কিছুই সহজ হবে। নাটক নির্মাণের সময় ভালো গল্প, সংলাপ, উপযুক্ত অভিনয়শিল্পী, দক্ষ নির্মাতা এসব বিষয় এক করেই একটি ভালো নাটক দর্শকদের উপহার দেয়া যায়। যা কেউ কেউ দিচ্ছেনও। এখন অন্যরা কেন পারবেন না এটি তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে না শিখে কোনো কিছু করা উচিত নয় আমি মনে করি।

এখন অনেক নাটক হচ্ছে। অভিনয়শিল্পীও অনেক। কিন্তু স্থায়ী কোনো চরিত্র বা সংলাপ হচ্ছে না। এর কারণ কী?

এর অনেক কারণ আছে। একটা বিষয় খেয়াল করলে তা বোঝা যাবে। একটা সময় দর্শক অপেক্ষায় থাকত আজ ওমুক তারকার ওমুক নাটকের এত পর্ব প্রচার হবে। যে কারণে দর্শক নিজের ব্যক্তিগত কাজ সেরে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকতেন। অর্থাৎ দর্শক তার মনটা শুধু নিজের পছন্দের নাটক দেখার জন্য ঠিক রাখতেন। আর এখনকার কথা চিন্তা করলে প্রথমত দর্শক খুব ব্যস্ত নানা কারণে। তারপর অনেক টেলিভিশন চ্যানেল। কোথায় কোন নাটক যাবে সেটি তারা জানেন না। একটি নাটকের এক পর্বের কিছু অংশ প্রচার হওয়ার পর শুরু হয় বিজ্ঞাপন। যতটুকু নাটক দেখেন তাও মনোযোগ দিয়ে দেখতে পারেন না। যার কারণে এখন চরিত্র বা সংলাপ স্থায়ী হচ্ছে না।

এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?

কোনো উপায় নেই। বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে হবে। তবে নির্মাতাদের আরও মনোযোগী হয়ে সময় নিয়ে কাজ করা উচিত। অভিনয়শিল্পীদেরও একই কাজ করতে হবে। এখন একজন শিল্পী যে কাজ করবেন এটি কিন্তু সারা জীবন অনলাইনে থেকে যাবে। বিশ বছর পর নতুন দর্শক দেখবেন। এটি ভেবে অভিনয়শিল্পীর কাজ করা উচিত, যাতে করে দু-তিন দশক পরও যেন মনে হয় ভালো অভিনয়, ভালো সংলাপ।

নতুনদের মধ্যে তারকা হওয়ার যে প্রবণতা, বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

নতুনদের মধ্যে যে তারকা হওয়ার প্রবণতা সেটি দোষের কিছু নয়। কাজ করতে করতে অবশ্যই তারকা হবে। কিন্তু কাজ না করে ফেসবুক ফলোয়ার কিংবা ভিউয়ার্স দিয়ে তো তারকা হওয়া যায় না। আমি তেমন ফেসবুক চালাই না। আমার সমসাময়িক যারা ছিলেন- তৌকীর আহমেদ, মাহফুজ আহমেদ, শহিদুজ্জামান সেলিম, জাহিদ হাসান, তানিয়া আহমেদ, শমী কায়সার, তারিন কি তারকা নয়? তারকা তো তারাই যাদের মানুষ মনে রেখেছে গল্প চরিত্র ও সংলাপের মাধ্যমে, চেহারা কিংবা ফলোয়ার বিচার করে নয়।

বর্তমান সময় আপনি অভিনয়ের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেন?

গল্প ও আমার চরিত্রের কথা ভাবি। যে নাটকে অভিনয় করব তাতে সামাজিক কোনো মেসেজ আছে কিনা তাও দেখি। তারপর অভিনয় করি।

নাটকে এখনও আপনাকে দেখা যায়। কিন্তু আপনার ক্যারিয়ারে চলচ্চিত্রের সংখ্যা কম। কারণ কী?

কোনো কারণ নেই। এমনিতেই চলচ্চিত্রে অভিনয় কম করেছি। মুস্তাফিজুর রহমান পরিচালিত ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নামে একটি চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় করি। এরপর তৌকির আহমেদের ‘জয়যাত্রা’য় অভিনয় করি। তারপর ১৪ বছর পর ‘পুত্র’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। একটা সময় বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে অভিনয়ের আগ্রহ ছিল। কিন্তু তখন চলচ্চিত্রের ভালো অবস্থা ছিল না। এখন যে ধরনের ছবি হচ্ছে তাতে অভিনয় করতে আগ্রহ পাই না।

বর্তমান ব্যস্ততা কী নিয়ে?

প্রচারচলতি ‘বকুলপুর’ নামে একটি নাটকের শুটিং শুরু করেছি ঈদের পরপরই। আমেরিকা যাওয়ার কথা রয়েছে। ওখানে থাকব দু’সপ্তাহ। ফিরে এসে নতুন কয়েকটি নাটকের শুটিং শুরু করব। নিজেও কয়েকটি নাটক নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেছি।

তরুণদের মধ্যে যারা অভিনয়ে আসতে চান বা শুরু করেছেন তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?

আমি একটি বিষয়ই বলতে চাই, লক্ষ্যে যেতে হলে প্রথমে দরকার লক্ষ্য স্থির করা। তারপর সেখানে যেতে নিয়মিত অনুশীলন ও চর্চা করা। যদি নিষ্ঠা ও সততা থাকে তবে অবশ্যই লক্ষ্যে যেতে পারবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×