চার দশকে ইত্যাদি

শেকড় ধরে শিখরে

  তারা ঝিলমিল প্রতিবেদক ১০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শেকড় আঁকড়ে ধরে শিখরে পৌঁছে যাওয়া একটি নাম ইত্যাদি। গত চার দশক ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি, পর্যটন ও প্রত্নতাত্ত্বিক জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে জায়গাগুলো উপস্থাপিত হয়ে আসছে এর প্রতিটি পর্ব। এর ধারাবাহিকতায় ইত্যাদির গত পর্বটি ধারণ করা হয় কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার হাওরবিধৌত হামিদ পল্লীতে।

সাধারণত কোনো চ্যানেল বা নির্মাতা যে স্থানে যাওয়ার কথা কখনও কল্পনাতেও আনবেন না, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সহযোগিতায় হানিফ সংকেত সেই দুর্গম স্থানকেই অনুষ্ঠান উপযোগী করে লক্ষাধিক দর্শক সমাগম ঘটিয়ে অন্যদের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করলেন। জানা গেছে, এ অনুষ্ঠানের জন্য টানা ২০ দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে ধারণ স্থানের ছনের বন কেটে, অসমতল ভূমিকে সমতল করা হয়েছে। হামিদ পল্লীর নিঃস্ব অসহায় মানুষগুলোও ইত্যাদি এবং হানিফ সংকেতের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার টানে এ কাজে সবার সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিয়েছেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে ক্ষণিকের কিছু চিত্র দেখে হয়তো সেই মহাকর্মযজ্ঞের সামান্যই উপলব্ধি করতে পেরেছেন দর্শক। একটি অনুষ্ঠান কীভাবে উৎসব হয়ে উঠতে পারে তার প্রমাণ পাওয়া যায় ইত্যাদির প্রতিটি পর্বে হাজার হাজার দর্শকের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, অংশগ্রহণ আর স্থানীয় প্রশাসনের আগ্রহ, সহযোগিতা এবং আন্তরিকতা দেখে। যার প্রমাণ আবারও মিলল গত পর্বে। যেখানে সর্বসাধারণের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় হাওরের মাঝখানে জনবিচ্ছিন্ন একটি অসমতল ছনের বন মুহূর্তেই হয়ে উঠল ইত্যাদির সুবিশাল মঞ্চ। সে কারণেই হয়তো স্থানীয় সংসদ সদস্য অনেকটা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘হাওরের সঙ্গে যুদ্ধ করে এখানকার মানুষ বেঁচে আছে। আজ হাওরে উৎসবের রব পড়েছে, এখানে ইত্যাদি হবে’।

প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ নদীভাঙনের হাত থেকে মিঠামইনসহ আরও কিছু এলাকা রক্ষার জন্য নদীর গতিপথ সোজা করতে নদী খননের পরামর্শ দেন এবং সেই খননকৃত মাটি দিয়ে গড়ে ওঠে এ পল্লী। যেখানে আশ্রয় পান নদীভাঙনের কারণে নিঃস্ব হওয়া দরিদ্র মানুষ। সেই থেকেই এ পল্লীর নামকরণ করা হয় হামিদ পল্লী।

ইত্যাদির এ পর্বে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল এই প্রথমবারের মতো টেলিভিশন অনুষ্ঠানে কোনো রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার প্রদান। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের স্বল্প সময়ের এ ব্যতিক্রমধর্মী ও রাজনৈতিক নেতাদের জন্য শিক্ষণীয় সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে দর্শকরা জানতে পেরেছেন তার জীবনের নানা অজানা দিক। আরও জানা গেছে, ক্ষমতার শীর্ষে গিয়েও যার ব্যক্তিত্বের এবং এলাকার মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। পক্ষ-বিপক্ষ সবাই যাকে এক দৃষ্টিতে দেখেন। সবার কাছেই রয়েছে তার সমান গ্রহণযোগ্যতা। কলেজ জীবন থেকেই যিনি এলাকার শিক্ষা এবং হাওর অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য কাজ করে গেছেন। হাওর অঞ্চলে নিয়েছেন বিদ্যুৎ, তৈরি করেছেন ডুবো রাস্তা- যাকে বলা হয় টু ওয়েদার রোড। গড়ে তুলেছেন শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

বাড়ি মিঠামইনে হলেও ইটনা, অষ্টগ্রামসহ পুরো হাওর অঞ্চলই যেন তার বাড়ি, তার ঠিকানা। এ তিন উপজেলার এমন কোনো গ্রাম বা বাড়ি নেই, যেখানে মহামান্য রাষ্ট্রপতির পদচিহ্ন পড়েনি, তার উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। ইত্যাদির মাধ্যমে জানা গেছে, ডেপুটি স্পিকার থাকতেই তিনি হাওরাঞ্চলে ‘ডুবো সড়ক’-এর এক ব্যতিক্রমধর্মী ধারণা তৈরির মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সৃষ্টি করেছেন। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তিনি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অনুষ্ঠান ইত্যাদি এবং হানিফ সংকেতের উপস্থাপনার বেশ প্রশংসা করে বলেন, ‘আপনার অনুষ্ঠান ইত্যাদি সারা বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয়। বিশেষ করে আপনার মোহনীয় উপস্থাপনা, সুন্দর কথাবার্তা শুনে সারা বাংলাদেশের মানুষ আনন্দে আপ্লুত হয়। আমি নিজেও তা হই।’

রাষ্ট্রপতি হানিফ সংকেতের প্রতিটি প্রশ্নেরই সহজ-সরল জবাব দিয়েছেন যা ছিল অত্যন্ত শিক্ষণীয় এবং অনুকরণীয়।

সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরে সমাজকে পরিশুদ্ধ করতে ইত্যাদি যেমন নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে, তেমনি আমাদের নাগরিক সচেতনতা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখতেও ভূমিকা রাখছে আন্তরিকতার সঙ্গে। ইত্যাদির প্রতিটি পর্বের মতো এ পর্বেও ছিল সেই পরিশ্রমের ছাপ। এবারের পর্বে কিশোরগঞ্জ জেলার প্রতিবেদনের পাশাপাশি চন্দ্রাবতীর মন্দির ও বাড়ি, সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটা, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের প্রতিবেদন। বর্তমান রাষ্ট্রপতির বাড়ি, শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান, দিল্লির আখড়া, এগারসিন্দুর দুর্গ, জঙ্গলবাড়ি দুর্গ, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ পয়েন্ট, কেপ অব গুড হোপ বা উত্তমাশা অন্তরীপ, বাতিঘর ও পেঙ্গুইন নিয়ে করা প্রতিবেদন- সবগুলোতেই ছিল মেধা, নিষ্ঠা এবং সুনিপুণ নির্মাণশৈলী। এ পর্বেও ছিল টনক নড়ার কিছু সমসাময়িক বিষয়। যেমন টনক নড়ানোর টনিক, মানহীন রিয়েলিটি শো, অনলাইন গেম নামক ভয়ংকর আসক্তি ইত্যাদি। দর্শক পর্বে বেশ মজার একটি ঘটনা ঘটে। এ পর্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চে ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। উপস্থাপক তাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ব্যবসাসফল ছবির অভিনেতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ছবির নাম বেদের মেয়ে জোছনা। ইলিয়াস কাঞ্চন তাতে যুবরাজ চরিত্রে অভিনয় করেন। সেই চরিত্রের নাম কী ছিল- এমন প্রশ্নের জবাবে বাছাই করা সেই চারজন দর্শক উত্তর দিতে পারেননি। পরক্ষণেই স্বয়ং ইলিয়াস কাঞ্চনকেই সেই প্রশ্নটি করা হলে দেখা গেল, তিনিও সেটি জানেন না। আসলে চরিত্রটির নাম ছিল আনোয়ার। হানিফ সংকেত তখনই চমৎকার একটি বার্তা স্মরণ করিয়ে দেন, ‘নাম নয়, কাজই বড়’। দর্শকরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে এসব দেখেছেন এবং উপভোগ করেছেন।

ইত্যাদির এ পর্বে কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর থানার অন্তর্গত বাহেরবালি গ্রামের হাওরের বুকে অবিশ্বাস্য অবস্থানে ভেসে থাকা অত্র এলাকার একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ওপর একটি হৃদয়গ্রাহী প্রতিবেদন প্রচার করা হয়। প্রতিবেদনে উঠে আসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্কুল পারাপারের করুণ চিত্র। হাওর এলাকার ছয় সাতটি গ্রাম থেকে একটিমাত্র নৌকায় করে ভাগে ভাগে প্রায় তিনশ’ শিক্ষার্থীকে স্কুলে আনা-নেয়া করা হয় বছরের ৯ মাস। ফলে কয়েক শতাধিক শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন গ্রাম থেকে স্কুলে আনতে সকাল সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত লেগে যায়। আবার স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের বাড়ি পৌঁছে দিতেও বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যায়। স্কুলের শিক্ষক, কর্মচারীদের যাতায়াতের বাহনও ওই একটিমাত্র নৌকা। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় প্রতিবার প্রায় ৩০-৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাতায়াত করতে হয় নৌকাটিকে। ঘটেছে নৌকাডুবির ঘটনাও। তাছাড়া এত লম্বা সময় শিক্ষার্থীদের স্কুলে অবস্থান করতে হলেও নেই কোনো খাবারের ব্যবস্থা, গরমে নেই ফ্যানের ব্যবস্থাও। এমন একটি দুর্গম ও অবহেলিত স্কুলটির ওপর ইত্যাদি শুধু একটি প্রতিবেদন প্রচার করেই দায়িত্ব শেষ করেনি বরং বরাবরের মতোই পাশে দাঁড়িয়েছে, বাড়িয়েছে সহায়তার হাত। ইত্যাদির মঞ্চে হাজার হাজার দর্শকের সামনে পাশাপাশি বসিয়েছেন অবহেলিত সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আর জেলা প্রশাসককে। দুই মিনিটের সেই বৈঠকেই মিলেছে সমাধান যা তথাকথিত সব টকশো আর সংলাপকে নিমিষেই হার মানায়। পাশাপাশি ইত্যাদি থেকে প্রদান করা হয়েছে নগদ দশ লাখ টাকার চেক আর জেলা প্রশাসক দফতর থেকে মঞ্চেই মিলেছে আরও দুই লাখ টাকা। ইত্যাদির এ প্রতিবেদনটিও তাই আবারও সমাজ সংস্কারের আরও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।

বিগত তিন যুগ ধরে ইত্যাদির ক্যামেরায় তুলে ধরা ইত্যাদির এমন অসংখ্য প্রতিবেদন আলোকবর্তিকা হয়ে সমাজ সংস্কারে ও জাতি গঠনে অসামান্য ভূমিকা রেখে চলেছে, ইত্যাদির প্রচার কল্যাণেই অসংখ্য উদ্যোগ অর্জন করেছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি, দামামা উড়িয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, ইত্যাদি নামটি পৌঁছে গিয়েছে শেকড় থেকে শিখরে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×