মন্তব্য প্রতিবেদন

কমেডি চরিত্রে অভিনয় আর কমেডিয়ান এক নয়

  এফ আই দীপু ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কমেডি চরিত্রে অভিনয় আর কমেডিয়ান এক নয়

সাম্প্রতিক সময়ে মিডিয়ায় আলোচিত বিষয় হচ্ছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ২০১৭-১৮ সালের জন্য বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গেজেট প্রকাশ হয়েছে।

বিজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত সম্মানিত জুরি বোর্ড তাদের সুবিবেচনার মাধ্যমে সেরাদের নির্বাচিত করেছেন। এরপর মন্ত্রণালয় বিজয়ীদের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে।

বিজয়ীরাও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন- এ পর্যন্ত সবকিছুই ঠিক আছে। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সেটি হচ্ছে কৌতুক অভিনেতা হিসেবে সেরা শিল্পী নির্বাচন।

এবারের গেজেটে ২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত নুর ইমরান মিঠু পরিচালিত ‘কমলা রকেট’ চলচ্চিত্রের জন্য অভিনেতা মোশাররফ করিমকে ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, কৌতুক চরিত্রে’ পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনাও হচ্ছে বেশ। এমনিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান নিয়ে কম-বেশি বিতর্ক প্রতি বছরই শোনা যায়। এবার মোশাররফ করিম তার পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার কারণে বিতর্কটা একটু জোরালো হচ্ছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক।

কারণ রাষ্ট্রীয় এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে এ ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করার কারণ কী? মোশাররফ করিম দাবি করেছেন, ‘কমলা রকেট’ ছবিতে তার অভিনয় করা ‘মফিজুর’ চরিত্রটি কোনো কৌতুক চরিত্র নয়। এটি প্রধান চরিত্রগুলোর একটি। এদিকে ছবিটির গল্প লেখক শাহাদুজ্জামানও বলেছেন, মফিজুর চরিত্রটি কোনোভাবেই কৌতুক চরিত্র নয়।

তাহলে কৌতুক চরিত্র হিসেবে এটিকে নির্বাচন করার দায়ভার কার? ছবি জমা দেয়ার জন্য নির্ধারিত ফরমে কি এ চরিত্রটি কৌতুকধর্মী সেটা লেখা ছিল? যদি থাকে তাহলে দায়ভার অবশ্যই পরিচালক কিংবা প্রযোজকের। যদি না থাকে তাহলে বিচারকার্য যারা সম্পাদন করেছেন তাদেরও কিছুটা দায়ভার থেকে যায়।

অন্যদিকে ‘মফিজুর’ চরিত্রটি যদি রম্য ঘরানার চরিত্র হয় তাহলে সেটা থেকে অর্জিত পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করাটাও সমীচীন নয়। কারণ কৌতুক চরিত্রে অভিনয় আর কৌতুকাভিনেতা দুটো কখনই এক নয়। কমেডিয়ান বা কৌতুকাভিনেতা সব সময়ই একরকম থাকেন। ছবি বা নাটকে তাদের চরিত্রের ব্যাপ্তিও তত বেশি থাকে না।

মূলত, কোনো ছবির আঙ্গিক সৌন্দর্যের জন্যই কৌতুকাভিনেতা রাখা হয়। যিনি হাস্যরসাত্মক সংলাপ ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে দর্শকদের আলাদা বিনোদন দেবেন।

উদাহরণ হিসেবে আমরা বাংলাদেশি অভিনেতা প্রয়াত দিলদার, টেলিসামাদ, আনিসের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করতে পারি। কালেভদ্রে সিরিয়াস চরিত্রে দেখা গেলেও তারা ছিলেন পুরোদস্তুর কৌতুকাভিনেতা। তাদের জন্য আলাদাভাবে চরিত্র তৈরি করা হতো।

অন্যদিকে অনেকটা রম্য চরিত্রে অভিনয় করেও অনেক সিরিয়াস অভিনেতা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। সহজভাবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ‘পিকে’ নামে একটি ছবির উদাহরণ আমরা দিতে পারি।

এ ছবিতে আমির খানের চরিত্রটি ছিল অনেকটা রম্য চরিত্র। তার অভিনয়, অঙ্গভঙ্গি কিংবা সংলাপ- অনেকাংশে কৌতুকধর্মী ছিল। এখন তাকে কী কৌতুকাভিনেতা বলা যাবে? উত্তর হচ্ছে, না। অথবা এ ছবির জন্য আমির খানকে যদি ‘সেরা অভিনেতা, কৌতুক চরিত্রে’ পুরস্কার দেয়া হয় তাহলেও কী আমির খান কমেডিয়ান হয়ে যাবেন? এখানেও উত্তর, না। মূলত আমির খানের চরিত্রটিকে কৌতুক চরিত্র বলা হচ্ছে, আমির খানকে কমেডিয়ান বলা হচ্ছে না। দুটি উদাহরণে নিশ্চয়ই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবেন সবাই।

এবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে একই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বিজ্ঞ অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবুর পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়েও। পুরস্কার গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেও তিনিও নাখোশ তার ক্যাটাগরি নির্বাচন নিয়ে। তাকেও ‘সেরা অভিনেতা, কৌতুক চরিত্রে’ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। তারও দাবি যে চরিত্রের জন্য তাকে এ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে সেটাও কৌতুকধর্মী নয়।

যদি সত্যিই না হয়, তাহলে তো প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার যদি এ দুই বিজ্ঞ অভিনেতার বোঝার ভুল হয়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে তাদের আরও একবার ভেবে মন্তব্য করা উচিত। আর যদি এটা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই নেন, তাহলেও সেখানে কিছু বলার নেই।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া কিংবা প্রণালি আরও সতর্ক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক হওয়া উচিত। যাতে ভবিষ্যতে কেউ রাষ্ট্রীয় এ স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে। আশা করি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়টি অনুধাবন করবেন।

ফজলুর রহমান বাবু যা বলেছেন

‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই অনেকের ফোন পেয়েছি। আমার ভক্ত শুভাকাঙ্ক্ষীরা ব্যাপারটি ভালোভাবে নেয়নি বলেই মনে হয়েছে। অনেকেই বলেছেন আপনার মতো একজন সিরিয়াস অভিনেতাকে কৌতুক অভিনেতা বানিয়ে দিল!

আমার মনে হয়েছে এখন ছবিতে এ ক্যাটাগরি রাখাই ঠিক নয়। এখনকার সময়ে ছবি আর কোনো নির্দিষ্ট ফর্মেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আমাকে যে চরিত্রের জন্য পুরস্কার দেয়া হয়েছে সেটি কোনো কমেডি চরিত্র ছিল না। এটা একটা সিরিয়াস চরিত্র ছিল। তবে এ চরিত্রটি মানুষ উপভোগ করেছেন। এটা এক রকম খল চরিত্রই ছিল।

যেখানে দেখানো হয়েছে একজন লোভী মানুষ, অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার। লোভে পড়ে একের পর এক অপরাধ করে চলে সে। চরিত্রটি হয়তো মজার ছিল, কিন্তু কৌতুক চরিত্র ছিল না। ভবিষ্যতে চরিত্র নির্বাচন করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞ নির্বাচকরা নিশ্চয়ই বিষয়টি ভেবে দেখবেন। তাহলে কোনো রকম বিতর্কের সৃষ্টি হবে না বলে আমি বিশ্বাস করি।’

মোশাররফ করিম যা বলেছেন

৭ নভেম্বর দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৮ সালের পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকায় আমি নিজের নামও দেখতে পেয়েছি। নুর ইমরান মিঠু পরিচালিত ‘কমলা রকেট’ চলচ্চিত্রের জন্য আমাকে ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেতা কৌতুক চরিত্রে’ পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ।

কিন্তু এ পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে আমার কিছু কথা রয়েছে। তার আগে সবাইকে অবগত করতে চাই, কৌতুকপূর্ণ বা কমেডি চরিত্র আমার কাছে অন্যসব চরিত্রের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ‘কমলা রকেট’ চলচ্চিত্রে আমি যে চরিত্রটিতে অভিনয় করেছি সেটি কোনোভাবেই কমেডি বা কৌতুক চরিত্র নয়। ছবিটির চিত্রনাট্যকার, পরিচালকসহ সহশিল্পীরা নিশ্চয়ই অবগত আছেন।

একই সঙ্গে যারা ছবিটি দেখেছেন তারাও নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছেন ‘কমলা রকেট’-এ আমার অভিনয় করা ‘মফিজুর’ চরিত্রটি কোনো কৌতুক চরিত্র নয়। এটি প্রধান চরিত্রগুলোর একটি। তাই সম্মানিত জুরি বোর্ডের কাছে আমার অনুরোধ, ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেতা কৌতুক চরিত্রে’ আমার জন্য বরাদ্দ করা পুরস্কারটা প্রত্যাহার করে নিলে ভালো হয়। না হলে আমার পক্ষে এ পুরস্কার গ্রহণ করা সম্ভব নয়। আমি কাজটাকে ভালোবেসে আমৃত্যু করে যেতে চাই।

ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষীসহ সবার কাছে আমার ও আমার পরিবারের জন্য দোয়া চাই। একই সঙ্গে যারা পুরস্কার পেয়েছেন সবাইকে অভিনন্দন জানাই। এ মুহূর্তে আমি ব্যক্তিগত কাজে দেশের বাইরে অবস্থান করছি। তাই লিখিতভাবে সবাইকে জানানো হল। আশা করছি পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’

প্রসঙ্গত, এ বক্তব্য দেয়ার সময় মোশাররফ করিম মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। দেশে এসে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন বলে জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×