স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ আয়োজন

স্বাধীনতার চলচ্চিত্র এবং চলচ্চিত্রে স্বাধীনতা

১৯৭১ সালের আগে কিংবা পরে স্বাধীনতার বিষয়টিকে উপজীব্য করে বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। অনেকে স্বাধীনতা কিংবা মুক্তিযুদ্ধকে সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি করতে চাইলেও মানের বিচারে উতরে গেছেন মাত্র কয়েকজন। তবে অন্যদের চেষ্টাকেও খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। স্বাধীনতার পর ‘স্বাধীনতা’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও স্বাধীন দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে স্বাধীনতাও খুব বেশি প্রয়োজন, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিস্তারিত লিখেছেন -

  এফ আই দীপু ২৬ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চলচ্চিত্র একটি বহুমাত্রিক মাধ্যম। এর মধ্যে শিল্প, বাণিজ্য ও বিনোদন- তিনটিই হাত ধরে চলে। এরপর বলা যায় চলচ্চিত্র একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় সমাজ, দেশ কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন ঘটনাবলী অবলম্বনে। এর কোনোটি বাস্তব, আবার কোনোটি কাল্পনিক। তবে পৃথিবীর বড় সব যুদ্ধ, বিপ্লব আর মুক্তিসংগ্রামকে অবলম্বন করেই নির্মিত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যবসাসফল কিংবা আলোচিত চলচ্চিত্রগুলো। যার মধ্যে ছিল শিল্পের ছোঁয়া, বাণিজ্যের উপকরণ ও বিনোদনের খোরাক।

২৬ মার্চ বাংলাদেশে মহান স্বাধীনতা দিবস। এ দিনকে কেন্দ্র করে পরবর্তী নয় মাসের যুদ্ধের ঘটনাবলী ফিতায় বন্দি করার চেষ্টা করেছেন আমাদের অনেক প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার। ১৯৭১ সালের আগের সংগ্রামী দিনগুলোকেও কেউ কেউ সেলুলয়েডে বন্দি করেছেন। কিন্তু শিল্পের দিক থেকে সেগুলো কতটা উতরে গেছেন, কিংবা বাণিজ্যিক বিবেচনায় কতটা সফল অথবা বিনোদনের জন্য কী ছিল তাতে সেটাই আলোচ্য। যদিও স্বাধীনতা পূর্ববর্তী যে সময় ছবিগুলো নির্মিত হয়েছে সেখানে বাণিজ্যিক বিষয়টি ভাবার মতো অবস্থা ছিল না। যেখানে চলচ্চিত্রে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী দেখানোর স্বাধীনতাই ছিল না, সেখানে বাণিজ্যিক দিক বিবেচনা করাটাও যুক্তিসঙ্গত নয়। তবে কিছুটা বিনোদনের আবহ সেসব চলচ্চিত্রে ছিল, এটা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। যেমন, জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’। ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ চলচ্চিত্রে জীবন ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও আমাদের প্রকৃত মুক্তির আকাক্সক্ষা আর সংগ্রামকে প্রথমবার সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি করেন এ সাহসী চলচ্চিত্রকার। আমজাদ হোসেনের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত এ চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলীতে কিছু দুর্বলতা সত্ত্বেও জীবনঘনিষ্ঠতায়, মহাকাব্যিক গভীরতায় সর্বোপরি বিষয়ের মহত্তে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে। কী নেই এ চলচ্চিত্রে? রাষ্ট্রীয় রাজনীতি, দমন-পীড়ন, পারিবারিক শাসন, বিনোদন- সবকিছুর সমন্বয়ে জহির রায়হান এ মহকাব্যিক চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন আমাদের। বলা যায় মুক্তি সংগ্রামের খণ্ডচিত্র সেই আমলে দুঃসাহসিকতার সঙ্গে সামাল দিয়েছেন এ চলচ্চিত্রকার। তাই তো ‘জীবন থেকে নেয়া’ হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের এক প্রামাণ্য দলিল।

মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের পরের গল্পটাও রচনা করেন এই জহির রায়হান। তার ‘আর কতদিন’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি শুরু করেন যুদ্ধবিরোধী মানবতাবাদী এক চলচ্চিত্র ‘লেট দেয়ার বি লাইট’। কিন্তু ততদিন বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। নানা কারণে সেই চলচ্চিত্র আর শেষ করতে পারেননি তিনি। অনেক চলচ্চিত্র বোদ্ধার মতে এটিই জহিরের শ্রেষ্ঠকীর্তি। এরপরও তিনি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার জন্য প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি শুরু করেন ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে। যুদ্ধের ভয়াবহতা, প্রাণ বাঁচানোর আশায় অসহায় মানুষের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণের চিত্র বাস্তব ও মর্মস্পর্শী হয়ে ফুটে উঠেছে এ প্রামাণ্যচিত্রে। মুক্তিযুদ্ধের আরও একটি প্রামাণ্য দলিল এটি। এ ছাড়া যুদ্ধ চলাকালীন জহির রায়হানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আলমগীর কবির তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘লিবারেশন ফাইটার্স’। বাবুল চৌধুরীর প্রামাণ্যচিত্র ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’-এর বিষয়বস্তু ছিল শিশুদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা। পাশাপাশি জহির রায়হান ‘এ স্টেট ইজ বর্ণ’ তৈরি করেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধেকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে।

মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি তৈরি হয় মাত্র ৪টি। ১৯৭৩ সালে ৪টি এবং ১৯৭৪ সালে ২টি। এর মধ্যে মানের বিচারে উল্লেখ করার মতো হচ্ছে আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩), হারুন অর রশীদের ‘মেঘের অনেক রং’ (১৯৭৬) এবং হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪)। এ ছাড়া ফখরুল আলমের ‘জয় বাংলা’, সুভাষ দত্তের ‘অরুনোদয়ের অগ্নি সাক্ষী’, খান আতার ‘আবার তোরা মানুষ হ’, কবীর আনোয়ারের ‘সুপ্রভাত’, ‘স্লোগান’, চাষী নজরুলের ‘ওরা ১১ জন’, ‘সংগ্রাম’, মমতাজ আলীর ‘রক্তাক্ত বাংলা’, মিতার ‘আলোর মিছিল’, আলমগীর কুমকুমের ‘আমার জন্মভূমি’, আনন্দের ‘বাঘা বাঙ্গালী’ চলচ্চিত্রগুলোও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহন করে। তারপর দু-একটি বিচ্ছিন্ন প্রয়াস ছাড়া আমাদের চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে বিকল্পধারার নামে কেউ কেউ চেষ্টা করেছেন মুক্তিযুদ্ধকে সেলুলয়েডে বন্দি করতে। এদের মধ্যে মোরশেদুল ইসলাম ‘আগামী’ ও ‘সূচনা’, মোস্তফা কামাল ‘প্রত্যাবর্তন’, আবু সায়ীদ ‘ধূসর যাত্রা’, খান আখতার হোসেন ‘দুরন্ত’, তানভীর মোকাম্মেল ‘স্মৃতি-৭১’, নাসির উদ্দীন ইউসুফ ‘একাত্তরের যীশু’, ‘গেরিলা’, তারেক মাসুদ ‘মুক্তির গান’ নির্মাণ করে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্রে আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে যথেষ্ট স্বাধীনতা থাকলেও সেভাবে নির্মিত হতে দেখা যায়নি। এর কারণ হিসেবে অনেকে বলেছেন ‘চলচ্চিত্রে স্বাধীনতা’র কথা। চলচ্চিত্রে স্বাধীনতার কথা বললে অনেক কিছুই সামনে চলে আসে। বিষয়টি স্পষ্ট ধারণা দেয়া দরকার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সিনিয়র নির্মাতা বলেছেন, ‘আমি চাইলেই এখন আর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারব না। কারণ এর সঙ্গে রাজনীতি জড়িত। মানবিক বিষয়গুলো নিয়েই হয়তো আমাকে কাজ করতে হবে। কিন্তু যুদ্ধ তো শুধু মানবিক বিষয়ই নয়, সেখানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অনেক ঘটনাবলী থাকে, যেগুলোর সঙ্গে অনেকে জড়িত থাকেন, যার মধ্যে কেউ কেউ বিতর্কিত। এই বিতর্কিত কাউকে নিয়ে তো আর চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায় না। কারণ সেই বিতর্কিত ব্যক্তিটিও হয়তো মুক্তিযুদ্ধের নায়কদের মধ্যে একজন ছিলেন। বিষয়টি আমি উদাহরণস্বরূপ বলছি। তা ছাড়া একজন ব্যক্তিকে টার্গেট করেও কিন্তু যুদ্ধের একটি চিত্র একটি চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলা যায়। ধরুন, আমি সেটিই করলাম। কিন্তু সেন্সর বোর্ড থেকে সেটির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এলো। ফলাফল কী দাঁড়াল? তাই কথা বলার এবং চিত্র ধারণ করার যথেষ্ট স্বাধীনতা না থাকলে আমি কেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করব?’

বিষয়টি যৌক্তিক। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলার স্বাধীনতা না থাকলে এ ধরনের গল্প কিংবা ঘটনাবলী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করাটা রিস্কি। কেউ কেউ বলছেন, যদি স্বাধীনতা দেয়া হয়, তাহলে সমাজ কিংবা দেশে এর জন্য অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। সে বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেও হয়তো কিছুটা সেন্সরশিপ রেখে দেয়া হয়।

অনেক নির্মাতার মতে, স্বাধীনতার চলচ্চিত্র নির্মাণ করার জন্য এখন শুধু সরকার কিংবা সেন্সর বোর্ডের তরফ থেকেই স্বাধীনতা নয়, সেই আগেকার পরিবেশটাও নেই। কারণ সময় অনেক বদলে গেছে। স্বাধীনতার চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সেই সময়ের আবহ তৈরি করতে হবে। তার জন্য বিশাল অর্থের প্রয়োজন। সেই অর্থ কেউ লগ্নি করতে চাইবেন না। কারণ চলচ্চিত্রের বাজার এখন আর আগের মতো নেই। তাই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে যারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তারা কখনই এই বিশাল ক্ষতির মুখে পড়তে চাইবেন না। তবে সরকার যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে আগামী প্রজন্মের জন্য তুলে ধরতে চায় তাহলে হয়তো বড় বাজেটে এখনও এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব। এটা ঠিক যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য বড় বড় ট্যাংক, সামরিক হেলিকপ্টার এগুলোর প্রয়োজন নেই। নদীমাতৃক বাংলাদেশে মূলত যুদ্ধ হয়েছে গেরিলা পদ্ধতিতে। তাই দেশপ্রেমের মানসিকতা থাকলেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বড় বাজেটের ছবি নির্মাণ করলে সেটা দিয়ে বাণিজ্যিকভাবেও লাভবান হওয়া সম্ভব বলে মনে করেন অনেকে। এ জন্য শুধু সরকারের সহযোগিতা ও নির্মাতার সদিচ্ছার প্রয়োজন।

সর্বোপরি স্বাধীনতার চলচ্চিত্রের যেমন সংকট রয়েছে, পাশাপাশি এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণে স্বাধীনতার ঘাটতিও রয়েছে বলা যায়। সেটি হতে পারে রাজনৈতিক, হতে পারে অর্থনৈতিক, হতে পারে সামাজিক। আমাদের বিশ্বাস, এ ধরনের ঘাটতি কাটিয়ে আমাদের চলচ্চিত্রও একটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। হোক সেটা স্বাধীনতার চলচ্চিত্র, কিংবা এ সময়ের কোনো স্বাধীন গল্পের চলচ্চিত্র। মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ থাকতেই পারে। প্রত্যেকেই নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেদের চিন্তা-ভাবনার প্রসার ঘটালেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের চলচ্চিত্রের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হতে পারে।

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত