হতাশা ক্ষোভ আর কষ্টের উপাখ্যান
jugantor
ঢাকাই চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ
হতাশা ক্ষোভ আর কষ্টের উপাখ্যান
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের কথা বলতে গেলে হতাশা, ক্ষোভ আর কষ্টের উপাখ্যান ভেসে ওঠে মনে। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি হয়নি তেমন কোনো আন্তর্জাতিক মানের ছবি। কাঁচা-পাকা রাস্তা ধরে এগিয়ে আসা পাকিস্তানি সৈন্যভর্তি আর্মি ট্রাকের বহরে অপেক্ষায় থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবর্ষণ, অসহায় মা-বোনদের ইজ্জতহানি, অবশেষে মুক্তিবাহিনীর বিজয় দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র। তবে অনেক পরিচালক চেষ্টা করেছেন তাদের বাজেট অনুযায়ী কিছু একটা করতে। অনেকে সফল হয়েছেন, অনেকেই ব্যর্থ। বিস্তারিত রয়েছে এই প্রতিবেদনে

   

২২ মার্চ ২০১৮, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে বলতে গেলে যুদ্ধ চলাকালীন দৃশ্যপট ভেসে ওঠে ইতিহাসের খেরোখাতায়। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার জন্য জহির রায়হান প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি শুরু করেন ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে। যুদ্ধের ভয়াবহতা, প্রাণ বাঁচানোর আশায় অসহায় মানুষের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণের চিত্র বাস্তব ও মর্মস্পর্শী হয়ে ফুটে উঠেছে এ ছবিতে। নির্মাণশৈলীতে নির্মাতা এতে প্রায় স্পর্শ করে ফেলেছিলেন প্রামাণ্যচিত্রের প্রবাদপুরুষ রবার্ট ফ্লাহার্টিকে। বিষয়ের মহত্ত্বে এবং মানবিকতার জয়গানে তাকেও যেন ছাড়িয়ে গেলেন। চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের মতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখন পর্যন্ত এটিই আমাদের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকীর্তি। এ ছাড়া জহির রায়হানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আলমগীর কবির তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘লিবারেশন ফাইটার্স।’ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সাউন্ডট্র্যাকে ওভারল্যাপ করে এ ছবিতেই প্রথম ব্যবহার করা হয়েছে। বাবুল চৌধুরীর প্রামাণ্যচিত্র ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’র বিষয়বস্তু শিশুদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা। জহির রায়হান ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ তৈরি করেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে।

মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের অবস্থান কোথায়- এমন প্রশ্নের উত্তর কিন্তু অনেকের অজানা। যেখানে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ৫৫ বছর পর ডি ডাব্লিউ গ্রিফিথ তৈরি করেন মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র ‘বার্থ অব এ নেশন’ (১৯১৫)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৫০ বছর পরও স্পিলবার্গ তৈরি করেন অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘সিন্ডার্স লিস্ট’। সেখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি তৈরি হয় মাত্র ৪টি। ১৯৭৩ সালে আরও ৪টি এবং ১৯৭৪ সালে ২টি। তারপর দু-একটি বিচ্ছিন্ন প্রয়াস ছাড়া আমাদের চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধকে খুঁজেই পাওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলোর শিল্পমানও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খুব আশাব্যঞ্জক নয়। আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩), হারুন অর রশীদের ‘মেঘের অনেক রং’ (১৯৭৬) এবং হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪)- এ তিনটি ছবিই কিছুটা মানসম্পন্ন। এর বাইরে ফখরুল আলমের ‘জয় বাংলা’, সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নি সাক্ষী’, খান আতার ‘আবার তোরা মানুষ হ’, কবীর আনোয়ারের ‘সুপ্রভাত’, ‘শ্লোগান’, চাষী নজরুল ইসলামের ‘ওরা ১১ জন’, ‘সংগ্রাম, মমতাজ আলীর ‘রক্তাক্ত বাংলা’, নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’, আলমগীর কুমকুমের ‘আমার জন্মভূমি’, আনন্দের ‘বাঘা বাঙ্গালী’ উল্লেখযোগ্য। চলচ্চিত্রের গুণগত মানের বিচারে এগুলোর অবস্থা বিবেচনা করাটা মুখ্য নয়। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে জাতি। কারণ তারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে চলচ্চিত্রের রুপালি ফিতার বন্দি করার চেষ্টা করেছেন। প্রতিভার ঊনতার জন্য হয়তো শিল্পমানে মার খেয়েছেন। প্রতিভার ঊনতা ব্যক্তির ত্র“টি, দোষের কিছু নয়।

মুক্তিযুদ্ধের মতো এত বড় একটি ঘটনার প্রতি চলচ্চিত্রকাররা কেন এত উদাসীন? পর্যবেক্ষণ থেকে কিছু কারণ অনুমান করা যায়। প্রথম থেকেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রও বেনিয়াদের বাণিজ্যিক লক্ষ্যে পরিণত হয়। কিছু বিষয় সরলরৈখিকভাবে সব ছবিতে চলে আসে। ধর্ষণ দৃশ্যকে ত্রুটিপূর্ণভাবে উপস্থাপন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকার-আল বদরদের অপকর্মকে বস্তুনিষ্ঠ ও সামগ্রিকভাবে তুলে ধরা হয়নি। শুধু ধর্ষণকেই পুঁজি করা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের অবহেলিত, হতাশ এমনকি বিপথগামী রূপেও উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমনটি দেখা গেছে রুবাইয়াত হোসেনের পরিচালনায় নির্মিত ছবি ‘মেহেরজান’র মধ্যে। সঙ্গত কারণেই এটি পছন্দ করেননি মুক্তিযুদ্ধের দগদগে অভিজ্ঞতা বহনকারী জনসাধারণ। ফলে ছবিটি মার খেয়েছে। এসব কারণেই মুক্তিযুদ্ধের ছবি তৈরির প্রতি পুঁজি লগ্নির আগ্রহ হারিয়েছে বেনিয়ারা। এ ছাড়া স্বাধীনতার কয়েক বছর পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।

সত্যিকারের প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতার অবিশ্বাস্য রকমের দুর্ভিক্ষও আরেকটা কারণ। চলচ্চিত্র শিল্প এমন কাউকে পেল না, যার হাতে আইজেনস্টাইনের মতো ‘ব্যাটলশিপ পটেমকিন’ (যেটি এ যাবৎ নির্মিত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বলে বেশিরভাগ বোদ্ধাই মনে করেন) বা চ্যাপলিনের ‘দ্য গ্রেট ডিকটেটর’ মানের না হোক, অন্তত ভিত্তোরিও ডি সিকার ‘সান ফ্লাওয়ার’ কিংবা ডেভিড লিনের ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই’-এর মতো একটা ছবি হলেও হতে পারত। হয়তো আছেন কেউ কিন্তু নেই তার অর্থবল।

মূল ধারার চলচ্চিত্রের সর্বব্যাপী হতাশার পাশে আশার আলো দেখাচ্ছে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র। অনভিজ্ঞ, অসচ্ছল একদল মেধাবী উদ্যমী তরুণ প্রায় পরিত্যক্ত ১৬ মিমি. ক্যামেরা আর প্রজেক্টর সম্বল করে এর গোড়াপত্তন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই এদের প্রধান সম্বল। এর মধ্যেই ওদের অনেকে ছিনিয়ে এনেছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। মোরশেদুল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি ‘আগামী’ (১৯৮৪) ১৯৮৫ সালের দিল্লি চলচ্চিত্র উৎসবে ‘রৌপ্য ময়ূর’ লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মোরশেদের পর তৈরি করেন ‘সূচনা’। সর্বশেষ তার পরিচালনায় ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ যে পরিমাণ সাড়া জাগিয়েছে তাতে করে মুক্তিযুদ্ধের ছবির প্রতি দর্শকদের আকর্ষণ বাণিজ্যিক ধারার নির্মাতাদের কিছুটা হলেও ভাবিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি অন্যান্য ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- মোস্তফা কামালের ‘প্রত্যাবর্তন’, আবু সায়ীদের ‘ধূসর যাত্রা’, খান আখতার হোসেনের ‘দুরন্ত’, তানভীর মোকাম্মেলের ‘স্মৃতি-৭১’, নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘একাত্তরের যীশু’। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাস অবলম্বনে নাসির উদ্দিন ইউসুফ সর্বশেষ নির্মাণ করেছেন ‘গেরিলা’। দেশ-বিদেশে এ ছবিটির পুরস্কার অর্জন এবং দর্শক আগ্রহের কথা প্রায় প্রত্যেকেরই জানা। অকালে ঝরে যাওয়া আরেক প্রতিভাময় নির্মাতা তারেক মাসুদ ভাবতেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। ১৯৭১ সালে আমেরিকান সাংবাদিক লিয়ার লেভিন ‘বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’র সঙ্গে ঘুরে ঘুরে তাদের কার্যক্রমের ওপর ২০ ঘণ্টার দৃশ্য ধারণ করেছিলেন। কিন্তু তা ২৩ বছর লোকচক্ষুর আড়ালে বাক্সবন্দি হয়ে পড়েছিল অর্থসংকট এবং লেভিন বাংলা বুঝতে পারেননি বলে। স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদকে সঙ্গে নিয়ে তারেক মাসুদ সেগুলো উদ্ধার করে সম্পাদনার পর ৮০ মিনিট দৈর্ঘ্যরে ‘মুক্তির গান’ ছবিটি তৈরি করেন। এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দারুণ এক প্রামাণ্য দলিল এবং প্রথম রঙিন চিত্র।

আমাদের বাণিজ্যিক ধারার নির্মাতাদের অনেকের অজুহাত, বাংলাদেশে যুদ্ধ দেখানোর মতো প্রয়োজনীয় কারিগরি সামর্থ্য নেই। তাদের এই দাবিটিকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলে মনে হয়। যুদ্ধ দেখানো মানেই মারকাট কিছু দেখাতে হবে, এমন তো কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে গেরিলা পদ্ধতিতে। নদীমাতৃক দেশে অনেক ট্যাংক মিসাইল কিংবা অত্যাধুনিক রকেট নিয়ে যুদ্ধ হয়েছে, এমনটি ভুলেও কেউ বলবে না। দর্শকও মনে হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে এমনটি দেখতে চাইবেন না। তাই বলে বারবার একই ট্রাকে আগুন লাগানোর দৃশ্য থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারভাবে যে যুদ্ধ হয়েছে, তা ফুটিয়ে তুলতে সমস্যা কোথায়? শুরুর দিকের খানিকটা অংশ ছাড়া যুদ্ধের দামামাবিহীন ‘এনিম অ্যাট দ্য গেটস’ ছবিতে সোভিয়েত স্নাইপার শুটার ভ্যাসিলির শ্যেনদৃষ্টি আর জার্মান অফিসারের সঙ্গে তার ডুয়েল কী সিনেমাটিকে অসাধারণত্বের মর্যাদা এনে দেয়নি? কেন প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে নিজের অক্ষমতাকে প্রকাশ করতে হবে আমাদের নির্মাতাদের?

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের নির্মাতাদের ভাবনা নিয়মের বেড়াজালে বাক্সবন্দি থাকলেও বিদেশিরা কিন্তু থেমে থাকেননি। তাদের সেলুলয়েডের ফিতায়ও বন্দি হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা শুকদেব বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘নাইন মান্থস অব ফ্রিডম’। ব্রিটিশ টিভি চ্যানেল প্রাগডার উদ্যোগে নির্মিত হয় ‘মেজর খালেদ’স ওয়ার’। জাপানি চলচ্চিত্রকার নার্গিস ওলিমা নির্মাণ করেন ‘বাংলাদেশ স্টোরি’। ভারতের গীতা মেহতা ‘ডেটলাইন বাংলাদেশ’ এবং দুর্গাপ্রসাদ ‘দুরন্ত পদ্মায়’ চিত্রিত করেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে। ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝিতে ব্রিটিশ টিভি নেটওয়ার্ক চ্যানেল-৪-এর উদ্যোগে গীতা সায়গল ও ডেভিড বার্গম্যান তৈরি করেছেন ‘ওয়ারক্রাইমস ফাইল’।

চলচ্চিত্রের শতবর্ষ পালিত হয়েছে বছর কয়েক আগে। ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে ধরলে আমাদের চলচ্চিত্রের বয়স ৬২ বছর। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৭ বছর আগে। এই ৪৭ বছরেও আমাদের চলচ্চিত্র বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে এখনও শৈশবে পড়ে আছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি আর অগ্রসর বিজ্ঞান ভাবনায় বিশ্বচলচ্চিত্র চলে গেছে ‘অ্যাভাটার’ পর্যায়ে। আমাদের সামনেও আছে অমিত সম্ভাবনা। আছে হাজার বছরের সংগ্রামী ঐতিহ্য আর সাংস্কৃতিক ভিত্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। আমরা আশাবাদী আমাদের তরুণদের নিয়ে। যারা একদিন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি করবে বিশ্বমানের মহৎ চলচ্চিত্র।

তারা ঝিলমিল প্রতিবেদক

ঢাকাই চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ

হতাশা ক্ষোভ আর কষ্টের উপাখ্যান

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের কথা বলতে গেলে হতাশা, ক্ষোভ আর কষ্টের উপাখ্যান ভেসে ওঠে মনে। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি হয়নি তেমন কোনো আন্তর্জাতিক মানের ছবি। কাঁচা-পাকা রাস্তা ধরে এগিয়ে আসা পাকিস্তানি সৈন্যভর্তি আর্মি ট্রাকের বহরে অপেক্ষায় থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের গোলাবর্ষণ, অসহায় মা-বোনদের ইজ্জতহানি, অবশেষে মুক্তিবাহিনীর বিজয় দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র। তবে অনেক পরিচালক চেষ্টা করেছেন তাদের বাজেট অনুযায়ী কিছু একটা করতে। অনেকে সফল হয়েছেন, অনেকেই ব্যর্থ। বিস্তারিত রয়েছে এই প্রতিবেদনে
  
২২ মার্চ ২০১৮, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে বলতে গেলে যুদ্ধ চলাকালীন দৃশ্যপট ভেসে ওঠে ইতিহাসের খেরোখাতায়। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার জন্য জহির রায়হান প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ তৈরি শুরু করেন ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে। যুদ্ধের ভয়াবহতা, প্রাণ বাঁচানোর আশায় অসহায় মানুষের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণের চিত্র বাস্তব ও মর্মস্পর্শী হয়ে ফুটে উঠেছে এ ছবিতে। নির্মাণশৈলীতে নির্মাতা এতে প্রায় স্পর্শ করে ফেলেছিলেন প্রামাণ্যচিত্রের প্রবাদপুরুষ রবার্ট ফ্লাহার্টিকে। বিষয়ের মহত্ত্বে এবং মানবিকতার জয়গানে তাকেও যেন ছাড়িয়ে গেলেন। চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের মতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখন পর্যন্ত এটিই আমাদের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকীর্তি। এ ছাড়া জহির রায়হানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আলমগীর কবির তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘লিবারেশন ফাইটার্স।’ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সাউন্ডট্র্যাকে ওভারল্যাপ করে এ ছবিতেই প্রথম ব্যবহার করা হয়েছে। বাবুল চৌধুরীর প্রামাণ্যচিত্র ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’র বিষয়বস্তু শিশুদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা। জহির রায়হান ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ তৈরি করেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে।

মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের অবস্থান কোথায়- এমন প্রশ্নের উত্তর কিন্তু অনেকের অজানা। যেখানে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ৫৫ বছর পর ডি ডাব্লিউ গ্রিফিথ তৈরি করেন মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র ‘বার্থ অব এ নেশন’ (১৯১৫)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৫০ বছর পরও স্পিলবার্গ তৈরি করেন অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘সিন্ডার্স লিস্ট’। সেখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি তৈরি হয় মাত্র ৪টি। ১৯৭৩ সালে আরও ৪টি এবং ১৯৭৪ সালে ২টি। তারপর দু-একটি বিচ্ছিন্ন প্রয়াস ছাড়া আমাদের চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধকে খুঁজেই পাওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলোর শিল্পমানও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খুব আশাব্যঞ্জক নয়। আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩), হারুন অর রশীদের ‘মেঘের অনেক রং’ (১৯৭৬) এবং হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪)- এ তিনটি ছবিই কিছুটা মানসম্পন্ন। এর বাইরে ফখরুল আলমের ‘জয় বাংলা’, সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নি সাক্ষী’, খান আতার ‘আবার তোরা মানুষ হ’, কবীর আনোয়ারের ‘সুপ্রভাত’, ‘শ্লোগান’, চাষী নজরুল ইসলামের ‘ওরা ১১ জন’, ‘সংগ্রাম, মমতাজ আলীর ‘রক্তাক্ত বাংলা’, নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’, আলমগীর কুমকুমের ‘আমার জন্মভূমি’, আনন্দের ‘বাঘা বাঙ্গালী’ উল্লেখযোগ্য। চলচ্চিত্রের গুণগত মানের বিচারে এগুলোর অবস্থা বিবেচনা করাটা মুখ্য নয়। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে জাতি। কারণ তারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে চলচ্চিত্রের রুপালি ফিতার বন্দি করার চেষ্টা করেছেন। প্রতিভার ঊনতার জন্য হয়তো শিল্পমানে মার খেয়েছেন। প্রতিভার ঊনতা ব্যক্তির ত্র“টি, দোষের কিছু নয়।

মুক্তিযুদ্ধের মতো এত বড় একটি ঘটনার প্রতি চলচ্চিত্রকাররা কেন এত উদাসীন? পর্যবেক্ষণ থেকে কিছু কারণ অনুমান করা যায়। প্রথম থেকেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রও বেনিয়াদের বাণিজ্যিক লক্ষ্যে পরিণত হয়। কিছু বিষয় সরলরৈখিকভাবে সব ছবিতে চলে আসে। ধর্ষণ দৃশ্যকে ত্রুটিপূর্ণভাবে উপস্থাপন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকার-আল বদরদের অপকর্মকে বস্তুনিষ্ঠ ও সামগ্রিকভাবে তুলে ধরা হয়নি। শুধু ধর্ষণকেই পুঁজি করা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের অবহেলিত, হতাশ এমনকি বিপথগামী রূপেও উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমনটি দেখা গেছে রুবাইয়াত হোসেনের পরিচালনায় নির্মিত ছবি ‘মেহেরজান’র মধ্যে। সঙ্গত কারণেই এটি পছন্দ করেননি মুক্তিযুদ্ধের দগদগে অভিজ্ঞতা বহনকারী জনসাধারণ। ফলে ছবিটি মার খেয়েছে। এসব কারণেই মুক্তিযুদ্ধের ছবি তৈরির প্রতি পুঁজি লগ্নির আগ্রহ হারিয়েছে বেনিয়ারা। এ ছাড়া স্বাধীনতার কয়েক বছর পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।

সত্যিকারের প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতার অবিশ্বাস্য রকমের দুর্ভিক্ষও আরেকটা কারণ। চলচ্চিত্র শিল্প এমন কাউকে পেল না, যার হাতে আইজেনস্টাইনের মতো ‘ব্যাটলশিপ পটেমকিন’ (যেটি এ যাবৎ নির্মিত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বলে বেশিরভাগ বোদ্ধাই মনে করেন) বা চ্যাপলিনের ‘দ্য গ্রেট ডিকটেটর’ মানের না হোক, অন্তত ভিত্তোরিও ডি সিকার ‘সান ফ্লাওয়ার’ কিংবা ডেভিড লিনের ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই’-এর মতো একটা ছবি হলেও হতে পারত। হয়তো আছেন কেউ কিন্তু নেই তার অর্থবল।

মূল ধারার চলচ্চিত্রের সর্বব্যাপী হতাশার পাশে আশার আলো দেখাচ্ছে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র। অনভিজ্ঞ, অসচ্ছল একদল মেধাবী উদ্যমী তরুণ প্রায় পরিত্যক্ত ১৬ মিমি. ক্যামেরা আর প্রজেক্টর সম্বল করে এর গোড়াপত্তন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই এদের প্রধান সম্বল। এর মধ্যেই ওদের অনেকে ছিনিয়ে এনেছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। মোরশেদুল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি ‘আগামী’ (১৯৮৪) ১৯৮৫ সালের দিল্লি চলচ্চিত্র উৎসবে ‘রৌপ্য ময়ূর’ লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মোরশেদের পর তৈরি করেন ‘সূচনা’। সর্বশেষ তার পরিচালনায় ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ যে পরিমাণ সাড়া জাগিয়েছে তাতে করে মুক্তিযুদ্ধের ছবির প্রতি দর্শকদের আকর্ষণ বাণিজ্যিক ধারার নির্মাতাদের কিছুটা হলেও ভাবিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি অন্যান্য ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- মোস্তফা কামালের ‘প্রত্যাবর্তন’, আবু সায়ীদের ‘ধূসর যাত্রা’, খান আখতার হোসেনের ‘দুরন্ত’, তানভীর মোকাম্মেলের ‘স্মৃতি-৭১’, নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘একাত্তরের যীশু’। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাস অবলম্বনে নাসির উদ্দিন ইউসুফ সর্বশেষ নির্মাণ করেছেন ‘গেরিলা’। দেশ-বিদেশে এ ছবিটির পুরস্কার অর্জন এবং দর্শক আগ্রহের কথা প্রায় প্রত্যেকেরই জানা। অকালে ঝরে যাওয়া আরেক প্রতিভাময় নির্মাতা তারেক মাসুদ ভাবতেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। ১৯৭১ সালে আমেরিকান সাংবাদিক লিয়ার লেভিন ‘বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’র সঙ্গে ঘুরে ঘুরে তাদের কার্যক্রমের ওপর ২০ ঘণ্টার দৃশ্য ধারণ করেছিলেন। কিন্তু তা ২৩ বছর লোকচক্ষুর আড়ালে বাক্সবন্দি হয়ে পড়েছিল অর্থসংকট এবং লেভিন বাংলা বুঝতে পারেননি বলে। স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদকে সঙ্গে নিয়ে তারেক মাসুদ সেগুলো উদ্ধার করে সম্পাদনার পর ৮০ মিনিট দৈর্ঘ্যরে ‘মুক্তির গান’ ছবিটি তৈরি করেন। এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দারুণ এক প্রামাণ্য দলিল এবং প্রথম রঙিন চিত্র।

আমাদের বাণিজ্যিক ধারার নির্মাতাদের অনেকের অজুহাত, বাংলাদেশে যুদ্ধ দেখানোর মতো প্রয়োজনীয় কারিগরি সামর্থ্য নেই। তাদের এই দাবিটিকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলে মনে হয়। যুদ্ধ দেখানো মানেই মারকাট কিছু দেখাতে হবে, এমন তো কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে গেরিলা পদ্ধতিতে। নদীমাতৃক দেশে অনেক ট্যাংক মিসাইল কিংবা অত্যাধুনিক রকেট নিয়ে যুদ্ধ হয়েছে, এমনটি ভুলেও কেউ বলবে না। দর্শকও মনে হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে এমনটি দেখতে চাইবেন না। তাই বলে বারবার একই ট্রাকে আগুন লাগানোর দৃশ্য থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারভাবে যে যুদ্ধ হয়েছে, তা ফুটিয়ে তুলতে সমস্যা কোথায়? শুরুর দিকের খানিকটা অংশ ছাড়া যুদ্ধের দামামাবিহীন ‘এনিম অ্যাট দ্য গেটস’ ছবিতে সোভিয়েত স্নাইপার শুটার ভ্যাসিলির শ্যেনদৃষ্টি আর জার্মান অফিসারের সঙ্গে তার ডুয়েল কী সিনেমাটিকে অসাধারণত্বের মর্যাদা এনে দেয়নি? কেন প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে নিজের অক্ষমতাকে প্রকাশ করতে হবে আমাদের নির্মাতাদের?

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের নির্মাতাদের ভাবনা নিয়মের বেড়াজালে বাক্সবন্দি থাকলেও বিদেশিরা কিন্তু থেমে থাকেননি। তাদের সেলুলয়েডের ফিতায়ও বন্দি হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা শুকদেব বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘নাইন মান্থস অব ফ্রিডম’। ব্রিটিশ টিভি চ্যানেল প্রাগডার উদ্যোগে নির্মিত হয় ‘মেজর খালেদ’স ওয়ার’। জাপানি চলচ্চিত্রকার নার্গিস ওলিমা নির্মাণ করেন ‘বাংলাদেশ স্টোরি’। ভারতের গীতা মেহতা ‘ডেটলাইন বাংলাদেশ’ এবং দুর্গাপ্রসাদ ‘দুরন্ত পদ্মায়’ চিত্রিত করেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে। ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝিতে ব্রিটিশ টিভি নেটওয়ার্ক চ্যানেল-৪-এর উদ্যোগে গীতা সায়গল ও ডেভিড বার্গম্যান তৈরি করেছেন ‘ওয়ারক্রাইমস ফাইল’।

চলচ্চিত্রের শতবর্ষ পালিত হয়েছে বছর কয়েক আগে। ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে ধরলে আমাদের চলচ্চিত্রের বয়স ৬২ বছর। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৭ বছর আগে। এই ৪৭ বছরেও আমাদের চলচ্চিত্র বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে এখনও শৈশবে পড়ে আছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি আর অগ্রসর বিজ্ঞান ভাবনায় বিশ্বচলচ্চিত্র চলে গেছে ‘অ্যাভাটার’ পর্যায়ে। আমাদের সামনেও আছে অমিত সম্ভাবনা। আছে হাজার বছরের সংগ্রামী ঐতিহ্য আর সাংস্কৃতিক ভিত্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। আমরা আশাবাদী আমাদের তরুণদের নিয়ে। যারা একদিন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি করবে বিশ্বমানের মহৎ চলচ্চিত্র।

তারা ঝিলমিল প্রতিবেদক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন