সিনেমাবিহীন আরও একটি ঈদ
jugantor
সিনেমাহল খোলার পক্ষে-বিপক্ষে তারকারা
সিনেমাবিহীন আরও একটি ঈদ

  অরণ্য শোয়েব  

০২ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মিম, আমিন খান ও মিশা সওদাগর

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক নির্মম অধ্যায় পার হচ্ছে চলতি ২০২০ সালটি। যদিও সিনেমার অবস্থা নড়বড়ে বহুদিন আগে থেকেই। বারবার সিনেমাপাড়া থেকে সুখবর এলেও বাস্তবচিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বদলায়নি হলের অবস্থা, বদলায়নি সিনেমার আঁতুড়ঘরখ্যাত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএফডিসির কিছু সিস্টেমও।

সিনেমাহলের সংখ্যা হাজার থেকে শতকের ঘরে নেমে এসেছে। যেসব হল আছে তার মধ্যে অধিকাংশই সিনেমা দেখার উপযোগী নয়। সমীক্ষা বলছে, ২০১০ সালের পর থেকে বদলে যেতে শুরু করে সিনেমার চিত্রগ্রহণ করার ক্যামেরা পদ্ধতি, শব্দগ্রহণ, এডিটিং, ভিএফএক্স এবং বিশেষ দৃশ্যধারণ ব্যবস্থাও। এর মধ্যে উদ্যোগী হয়ে কিছু শপিংমলের মালিকপক্ষ তাদের নিজস্ব ভবনে আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ চালু করেন।

কিন্তু হলের সংখ্যা বাড়েনি বরং দিন দিন কমতে শুরু করছে। বিগত দশ বছরে অনেক সিনেমা মুক্তি পেলেও বছর শেষে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান সিনেমার সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি। এর জন্য অনেকেই দায়ী। বিশেষ করে সিনেমাহলের দিকেই সবাই আঙুল তোলেন।

বাংলাদেশে সিনেমা প্রদর্শন ব্যবস্থা আধুনিক নয় (সিনেপ্লেক্স ও ব্লকবাস্টারসহ কয়েকটি সিনেমাহল ছাড়া)। দেশের বেশিরভাগ হলে মুক্তি দিলেও লভ্যাংশ তো বটে, আসল টাকাও ভূতে খেয়ে ফেলে! এফডিসি থেকে একাধিক গণমাধ্যমকে জানানো হয়, সরকারের সঙ্গে সব সমস্যা নিয়ে কথা হচ্ছে ও আলাপ চলছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবেশক সমিতি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকারের ওপর মহলের সঙ্গে সিনেমাহলের সমস্যার বিষয়টি তুলে ধরার জন্য। আলোচনা কিছুটা এগিয়েও ছিল।

কিন্তু সেই এগোনো পথে জল ঢেলে দিল করোনাভাইরাস। এ ভাইরাস যেন সিনেমা শিল্পে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। টানা চার মাস ধরেই নতুন কোনো সিনেমার শুটিং হচ্ছে না। সিনেমাহলও বন্ধ। এ কারণে গত রোজার ঈদে মুক্তি পায়নি কোনো সিনেমা। অথচ চলতি বছরেই সব আলোচিত এবং বিগ বাজেটের সিনেমাগুলো মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। ছবিগুলো মুক্তি পেলে হয়তো চিত্রপাড়ার সাময়িক স্থিরচিত্র একটু হলেও বদলাত। এর মধ্যেই আবার দরজায় কড়া নাড়ছে কোরবানির ঈদ। কিন্তু সিনেমাহল খোলার কোনো খবর নেই। কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, সিনেমাহল খুব শিগগিরই খুলে দেয়া হবে এবং কোরবানির ঈদে সিনেমা মুক্তিও দেয়া হতে পারে।

যদিও এ সবই চায়ের টেবিলেই সীমাবদ্ধ। সিনোমহল খোলার জন্য প্রযোজক সমিতি চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। যদি সিনেমাহল খোলেও তবে কি নতুন সিনেমা মুক্তি দেয়া হবে ঈদে? কিংবা নতুন সিনেমা মুক্তি দিলেও সেসব দেখতে আগের মতো কি দর্শক হলে আসবেন? এসব প্রশ্নই করা হয়েছিল সিনেমা সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের কাছে।

প্রসঙ্গক্রমে এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি এবং মধুমিতা সিনেমা হলের কর্ণধার ইফতেখার উদ্দিন নওশাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছর ধরে আমাদের সিনেমার অবস্থা কিন্তু খুবই খারাপ। ভালো কন্টেন্ট কমে গেছে। এ কারণেই কিন্তু হলের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এমনিতেই সিনেমার অবস্থা ভালো নয়, সিনেমা কম চলে- তার মধ্যে এখন আবার এ করোনাভাইরাসের প্রকোপ চারদিকে। এখন সিনেমা হল খুললেও ভালো কন্টেন্ট দিতে হবে। সেটি দিলেও দর্শক নিয়ে কিন্তু আমি সন্দিহান। তবে সব সিনেমাহল খোলা হবে কিনা- এটি আমি এখনই বিস্তারিত বলতে পারছি না।’

এদিকে ভিন্ন কথা বলেছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবেশক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছি ৭ জুন। তিনি কোনো উত্তর দেননি। কিন্তু মৌখিকভাবে তিনি বলেছেন, সিনেমাহল খুলতে আগ্রহী নন। তিনি নাকি সরকারের তরফ থেকে কোনো নির্দেশনা পাননি। তবে আমরাও একটি রিমাইন্ডার দিয়েছি, সিনেমাহল খোলার বিষয়ে মিটিং করার জন্য।’ সিনেমা হল খুললেও দর্শক আগের মতো আসবে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চাইলেই তো দর্শকদের আনা যাবে না।

একটু সময় লাগবে এবং স্বাস্থ্যবিধির একটি ব্যাপার আছে। মিটিং হলে আমরা বলব, স্বাস্থ্যবিধি মেনে হলে দর্শক ঢুকানো যাবে। একটি হলে কত সংখ্যক সিট আছে, সেখানে কতজন আসন গ্রহণ করবেন- সব বিষয় নিয়ে আলাপ থাকবে। একজন প্রযোজক সিনেমাহলে দর্শক না পেলে কেন সিনেমা মুক্তি দেবেন? একজন হল মালিক যদি দর্শক না পান তিনিও হল খুলে দিয়ে স্টাফ এবং সব লোকজনের বেতন কী করে দেবেন? তাই সব কিছু আলোচনা করা দরকার। এমন অবস্থা চলতে থাকলে প্রযোজকরা সবাই মরে যাবে। কারণ অনেকের অনেক টাকা এখানে লগ্নি করা রয়েছে।’

সিনেমাহল খোলা প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে- বাস যেমন একটি সিটের পাশে আরেকটি সিট বাকি রেখে টিকিটের দাম বাড়িয়ে চালু করা হয়েছে তেমনিভাবে সিনেমাহলও চালু হতে পারে। আমি এটার পক্ষে। যদি সিনেমাহল খোলার বিষয়টি গুজবও হয়ে থাকে তাহলে আমি বলব এটি সত্যি হোক।’ সিনেমাহল খুললে দর্শক আসবে কিনা এ মুহূর্তে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন একটু কঠিন হবে তবে ফিরবে- এটিই জানি। সাধারণ মানুষের বিনোদনের জন্য সে ধরনের তো কিছু নেই। সেই জায়গা থেকে আমার মনে হয়, এসব সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে, সব সেট হয়ে যাবে।’

স্বাস্থ্যবিধি মেনে সিনেমাহল খোলা প্রসঙ্গে চিত্রনায়ক রিয়াজ বলেন, ‘একটি বিষয় হচ্ছে এ মুহূর্তে দর্শক আসবে কিনা- এটি দর্শকদের ওপর নির্ভর করবে। আমি সেটি প্রেডিক্ট করতে পারি না। আর সিনেমাহল খোলা হচ্ছে কি হচ্ছে না তাও সঠিক বলতে পারছি না। বিষয়টি হচ্ছে করোনা একটি ছোঁয়াচে রোগ। পরীক্ষামূলকভাবে সিনেমাহল খুলে দেখা যেতে পারে দর্শক আসবে কিনা। ভালো ছবি হলে দর্শক আসতে পারে কিন্তু আমি এটি নিশ্চিত বলতে পারছি না। এসব বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’

সিনেমাহল খুলে দিলে এ মুহূর্তে দর্শক আসবে কিনা- এ প্রসঙ্গে চিত্রনায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম বলেন, ‘আসলে এ মুহূর্তে যদি হল খোলে তাহলে দর্শক খুব কম আসবে। আর যদি এসেও থাকে তাহলে খুব ক্ষতি হবে। ক্ষতি হবে এ জন্য, করোনা রোগটি ছোঁয়াচে। হলে অনেক মানুষ থাকার কারণে এটি ছড়ানো খুব সহজ হয়ে যাবে। একটি বিষয় হচ্ছে, আগের চেয়ে কিন্তু করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। তাই এখন তো অবস্থা ভালো নয়। দরকার একটু সময় নেয়া। আর অনেক দেশেই কিন্তু হল খুলেছে কিন্তু সেটি সীমিত, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও একটি সিট থেকে আরেকটি সিটের দূরত্ব বজায় রেখে। এমন করে কি আমাদের দেশে হলের সিস্টেম হবে? ঠিক এ মুহূর্তে হলে যাওয়াটা সেইফ হবে না। আমাদের উচিত দু-তিন মাস অপেক্ষা করা।

চিত্রনায়ক আমিন খান বলেন, ‘আসলে এখন মানুষের ওপর সব কিছু ছেড়ে দেয়া উচিত। কেউ কি জেনে-বুঝে আগুনে ঝাঁপ দেবে? এখন সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। আর এর মধ্যে যদি কেউ জেনে মিশে যান এ সবের মধ্যে তাহলে তো কিছু বলার নেই। মোটকথা, এখন আমাদের সচেতন থাকতে হবে এ বছরটি পুরো সাবধানে থাকতে হবে এবং যতদিন না পর্যন্ত টিকা আবিষ্কার হচ্ছে। এত অস্থির হওয়ার কিছু নেই। একটু সময় নিতে হবে। প্রযোজকেরও সময় নিতে হবে কারণ তাদেরও অনেক টাকা লগ্নি। তাই পুরো টাকাটা যেন ওঠাতে পারে সেই সঠিক সময়টা আসতে হবে।

এদিকে ভিন্ন সুর দিলেন চিত্রনায়ক ইমন। তিনি বলেন, ‘আমার আপত্তি নেই সিনেমা হল খুললে। সিনেমা হল বন্ধ করেছিল কিন্তু করোনার প্রবল আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। কিন্তু সেটি কি কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে? এখন তো আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি, মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি। আর এখনই কিন্তু মানুষ বের হচ্ছেন বেশি। আসলে তো কিছু করার নেই। কারণ জীবন ধারণ করতে হবে, বাঁচতে হবে। আমি নিজেও হয়তো বের হব সাবধানতা অবলম্বন করে। আমি ফিল্মের লোক, সিনেমা হল খুললে আমিও বেশি খুশি হব। কিন্তু পরিস্থিতি তো ভিন্ন এখন। তবে এ মুহূর্তে হল খুললেও যে দর্শক খুব আসবে সেটি মনে হচ্ছে না আপাত দৃষ্টিতে।

চিত্রনায়ক নিরব বলেন, ‘এ মুহূর্তে এটি আসলে সুখবর নয়। সুখবর হচ্ছে করোনা যদি না থাকে। এখন সিনেমা হল খুললে সিনেমা দেখবে কারা, দর্শক কই? যারা সচেতন নয় তারাই তো এখন হলে যাবে। সিনেমাহলে যাওয়া মানে করোনাকে স্বাগত জানান। যেটি সুখবর হবে না। আর যদি সুরক্ষা মেনে সিনেমাহল খোলে তাহলে আর কী বলব? আমরা তো এ মেইনটেইন্টটি করি না। আমরা রাস্তাঘাটে চলার সময়ই করি না সেখানে সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে কতটুকু কী করব। তারপরও যদি এমনটি হয়, সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে হল খোলে তাহলে তো খুবই ভালো।

সিনেমাহল খোলা প্রসঙ্গে চিত্রনায়িকা পপি বলেন, ‘বিনোদন ছাড়া মানুষ তো থাকতে পারে না- সেটি ঠিক আছে। কিন্তু বেঁচে থাকলে তো বিনোদন! আগে বেঁচে থাকাটা হচ্ছে খুব জরুরি। অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও খারাপভাবে করোনার প্রকোপ শুরু হয়েছে। মানুষ এখন রিস্কের মধ্যে আছে। টাকা-পয়সার ঝামেলা চলছে। সিনেমা হলে তো পরে যাবে, আগে তো দু’মুঠো খেতে হবে। এখন খাবারের সংকট আছে অনেকেরই। সিনেমা হল চালানো বা কতটুকু সিনেমা চলবে আমি জানি না। আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ বিনোদন নেবে এখন? স্বাস্থ্যবিধি মেনে কি দর্শক আসবে? আমার তো মনে হয় না।

একই কথা বললেন চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদ। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে সিনেমাহলে বসে সিনেমা দেখা এ মুহূর্তে তো অসম্ভব। আমার মনে হয় না, এ মুহূর্তে দর্শক হলে আসবে। কারণ মানুষ বিনোদনের জন্য সিনেমা দেখে আর বিনোদিত হওয়ার সেই আনন্দটি কারোর মনের মধ্যেই নেই। সবার মধ্যেই একটি শঙ্কা কাজ করছে। মনে হচ্ছে না এ মুহূর্তে সিনেমা হলে খুব বেশি দর্শক হবে। যদি এমন হতো তাহলে তো সারা বিশ্বের হলে সিনেমা শুরু হয়ে যেত। উচিত একটু সময় নিয়ে পরিস্থিত কোন দিকে যায়- সেটির ওপর নজর দেয়া।

সিনেমাহল খোলার পক্ষে-বিপক্ষে তারকারা

সিনেমাবিহীন আরও একটি ঈদ

 অরণ্য শোয়েব 
০২ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
মিম, আমিন খান ও মিশা সওদাগর
মিম, আমিন খান ও মিশা সওদাগর

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক নির্মম অধ্যায় পার হচ্ছে চলতি ২০২০ সালটি। যদিও সিনেমার অবস্থা নড়বড়ে বহুদিন আগে থেকেই। বারবার সিনেমাপাড়া থেকে সুখবর এলেও বাস্তবচিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বদলায়নি হলের অবস্থা, বদলায়নি সিনেমার আঁতুড়ঘরখ্যাত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএফডিসির কিছু সিস্টেমও।

সিনেমাহলের সংখ্যা হাজার থেকে শতকের ঘরে নেমে এসেছে। যেসব হল আছে তার মধ্যে অধিকাংশই সিনেমা দেখার উপযোগী নয়। সমীক্ষা বলছে, ২০১০ সালের পর থেকে বদলে যেতে শুরু করে সিনেমার চিত্রগ্রহণ করার ক্যামেরা পদ্ধতি, শব্দগ্রহণ, এডিটিং, ভিএফএক্স এবং বিশেষ দৃশ্যধারণ ব্যবস্থাও। এর মধ্যে উদ্যোগী হয়ে কিছু শপিংমলের মালিকপক্ষ তাদের নিজস্ব ভবনে আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ চালু করেন।

কিন্তু হলের সংখ্যা বাড়েনি বরং দিন দিন কমতে শুরু করছে। বিগত দশ বছরে অনেক সিনেমা মুক্তি পেলেও বছর শেষে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান সিনেমার সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি। এর জন্য অনেকেই দায়ী। বিশেষ করে সিনেমাহলের দিকেই সবাই আঙুল তোলেন।

বাংলাদেশে সিনেমা প্রদর্শন ব্যবস্থা আধুনিক নয় (সিনেপ্লেক্স ও ব্লকবাস্টারসহ কয়েকটি সিনেমাহল ছাড়া)। দেশের বেশিরভাগ হলে মুক্তি দিলেও লভ্যাংশ তো বটে, আসল টাকাও ভূতে খেয়ে ফেলে! এফডিসি থেকে একাধিক গণমাধ্যমকে জানানো হয়, সরকারের সঙ্গে সব সমস্যা নিয়ে কথা হচ্ছে ও আলাপ চলছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবেশক সমিতি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকারের ওপর মহলের সঙ্গে সিনেমাহলের সমস্যার বিষয়টি তুলে ধরার জন্য। আলোচনা কিছুটা এগিয়েও ছিল।

কিন্তু সেই এগোনো পথে জল ঢেলে দিল করোনাভাইরাস। এ ভাইরাস যেন সিনেমা শিল্পে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। টানা চার মাস ধরেই নতুন কোনো সিনেমার শুটিং হচ্ছে না। সিনেমাহলও বন্ধ। এ কারণে গত রোজার ঈদে মুক্তি পায়নি কোনো সিনেমা। অথচ চলতি বছরেই সব আলোচিত এবং বিগ বাজেটের সিনেমাগুলো মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। ছবিগুলো মুক্তি পেলে হয়তো চিত্রপাড়ার সাময়িক স্থিরচিত্র একটু হলেও বদলাত। এর মধ্যেই আবার দরজায় কড়া নাড়ছে কোরবানির ঈদ। কিন্তু সিনেমাহল খোলার কোনো খবর নেই। কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, সিনেমাহল খুব শিগগিরই খুলে দেয়া হবে এবং কোরবানির ঈদে সিনেমা মুক্তিও দেয়া হতে পারে।

যদিও এ সবই চায়ের টেবিলেই সীমাবদ্ধ। সিনোমহল খোলার জন্য প্রযোজক সমিতি চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। যদি সিনেমাহল খোলেও তবে কি নতুন সিনেমা মুক্তি দেয়া হবে ঈদে? কিংবা নতুন সিনেমা মুক্তি দিলেও সেসব দেখতে আগের মতো কি দর্শক হলে আসবেন? এসব প্রশ্নই করা হয়েছিল সিনেমা সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের কাছে।

প্রসঙ্গক্রমে এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি এবং মধুমিতা সিনেমা হলের কর্ণধার ইফতেখার উদ্দিন নওশাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছর ধরে আমাদের সিনেমার অবস্থা কিন্তু খুবই খারাপ। ভালো কন্টেন্ট কমে গেছে। এ কারণেই কিন্তু হলের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এমনিতেই সিনেমার অবস্থা ভালো নয়, সিনেমা কম চলে- তার মধ্যে এখন আবার এ করোনাভাইরাসের প্রকোপ চারদিকে। এখন সিনেমা হল খুললেও ভালো কন্টেন্ট দিতে হবে। সেটি দিলেও দর্শক নিয়ে কিন্তু আমি সন্দিহান। তবে সব সিনেমাহল খোলা হবে কিনা- এটি আমি এখনই বিস্তারিত বলতে পারছি না।’

এদিকে ভিন্ন কথা বলেছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিবেশক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রশাসককে চিঠি দিয়েছি ৭ জুন। তিনি কোনো উত্তর দেননি। কিন্তু মৌখিকভাবে তিনি বলেছেন, সিনেমাহল খুলতে আগ্রহী নন। তিনি নাকি সরকারের তরফ থেকে কোনো নির্দেশনা পাননি। তবে আমরাও একটি রিমাইন্ডার দিয়েছি, সিনেমাহল খোলার বিষয়ে মিটিং করার জন্য।’ সিনেমা হল খুললেও দর্শক আগের মতো আসবে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চাইলেই তো দর্শকদের আনা যাবে না।

একটু সময় লাগবে এবং স্বাস্থ্যবিধির একটি ব্যাপার আছে। মিটিং হলে আমরা বলব, স্বাস্থ্যবিধি মেনে হলে দর্শক ঢুকানো যাবে। একটি হলে কত সংখ্যক সিট আছে, সেখানে কতজন আসন গ্রহণ করবেন- সব বিষয় নিয়ে আলাপ থাকবে। একজন প্রযোজক সিনেমাহলে দর্শক না পেলে কেন সিনেমা মুক্তি দেবেন? একজন হল মালিক যদি দর্শক না পান তিনিও হল খুলে দিয়ে স্টাফ এবং সব লোকজনের বেতন কী করে দেবেন? তাই সব কিছু আলোচনা করা দরকার। এমন অবস্থা চলতে থাকলে প্রযোজকরা সবাই মরে যাবে। কারণ অনেকের অনেক টাকা এখানে লগ্নি করা রয়েছে।’

সিনেমাহল খোলা প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে- বাস যেমন একটি সিটের পাশে আরেকটি সিট বাকি রেখে টিকিটের দাম বাড়িয়ে চালু করা হয়েছে তেমনিভাবে সিনেমাহলও চালু হতে পারে। আমি এটার পক্ষে। যদি সিনেমাহল খোলার বিষয়টি গুজবও হয়ে থাকে তাহলে আমি বলব এটি সত্যি হোক।’ সিনেমাহল খুললে দর্শক আসবে কিনা এ মুহূর্তে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন একটু কঠিন হবে তবে ফিরবে- এটিই জানি। সাধারণ মানুষের বিনোদনের জন্য সে ধরনের তো কিছু নেই। সেই জায়গা থেকে আমার মনে হয়, এসব সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে, সব সেট হয়ে যাবে।’

স্বাস্থ্যবিধি মেনে সিনেমাহল খোলা প্রসঙ্গে চিত্রনায়ক রিয়াজ বলেন, ‘একটি বিষয় হচ্ছে এ মুহূর্তে দর্শক আসবে কিনা- এটি দর্শকদের ওপর নির্ভর করবে। আমি সেটি প্রেডিক্ট করতে পারি না। আর সিনেমাহল খোলা হচ্ছে কি হচ্ছে না তাও সঠিক বলতে পারছি না। বিষয়টি হচ্ছে করোনা একটি ছোঁয়াচে রোগ। পরীক্ষামূলকভাবে সিনেমাহল খুলে দেখা যেতে পারে দর্শক আসবে কিনা। ভালো ছবি হলে দর্শক আসতে পারে কিন্তু আমি এটি নিশ্চিত বলতে পারছি না। এসব বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’

সিনেমাহল খুলে দিলে এ মুহূর্তে দর্শক আসবে কিনা- এ প্রসঙ্গে চিত্রনায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম বলেন, ‘আসলে এ মুহূর্তে যদি হল খোলে তাহলে দর্শক খুব কম আসবে। আর যদি এসেও থাকে তাহলে খুব ক্ষতি হবে। ক্ষতি হবে এ জন্য, করোনা রোগটি ছোঁয়াচে। হলে অনেক মানুষ থাকার কারণে এটি ছড়ানো খুব সহজ হয়ে যাবে। একটি বিষয় হচ্ছে, আগের চেয়ে কিন্তু করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। তাই এখন তো অবস্থা ভালো নয়। দরকার একটু সময় নেয়া। আর অনেক দেশেই কিন্তু হল খুলেছে কিন্তু সেটি সীমিত, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও একটি সিট থেকে আরেকটি সিটের দূরত্ব বজায় রেখে। এমন করে কি আমাদের দেশে হলের সিস্টেম হবে? ঠিক এ মুহূর্তে হলে যাওয়াটা সেইফ হবে না। আমাদের উচিত দু-তিন মাস অপেক্ষা করা।

চিত্রনায়ক আমিন খান বলেন, ‘আসলে এখন মানুষের ওপর সব কিছু ছেড়ে দেয়া উচিত। কেউ কি জেনে-বুঝে আগুনে ঝাঁপ দেবে? এখন সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। আর এর মধ্যে যদি কেউ জেনে মিশে যান এ সবের মধ্যে তাহলে তো কিছু বলার নেই। মোটকথা, এখন আমাদের সচেতন থাকতে হবে এ বছরটি পুরো সাবধানে থাকতে হবে এবং যতদিন না পর্যন্ত টিকা আবিষ্কার হচ্ছে। এত অস্থির হওয়ার কিছু নেই। একটু সময় নিতে হবে। প্রযোজকেরও সময় নিতে হবে কারণ তাদেরও অনেক টাকা লগ্নি। তাই পুরো টাকাটা যেন ওঠাতে পারে সেই সঠিক সময়টা আসতে হবে।

এদিকে ভিন্ন সুর দিলেন চিত্রনায়ক ইমন। তিনি বলেন, ‘আমার আপত্তি নেই সিনেমা হল খুললে। সিনেমা হল বন্ধ করেছিল কিন্তু করোনার প্রবল আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। কিন্তু সেটি কি কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে? এখন তো আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি, মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি। আর এখনই কিন্তু মানুষ বের হচ্ছেন বেশি। আসলে তো কিছু করার নেই। কারণ জীবন ধারণ করতে হবে, বাঁচতে হবে। আমি নিজেও হয়তো বের হব সাবধানতা অবলম্বন করে। আমি ফিল্মের লোক, সিনেমা হল খুললে আমিও বেশি খুশি হব। কিন্তু পরিস্থিতি তো ভিন্ন এখন। তবে এ মুহূর্তে হল খুললেও যে দর্শক খুব আসবে সেটি মনে হচ্ছে না আপাত দৃষ্টিতে।

চিত্রনায়ক নিরব বলেন, ‘এ মুহূর্তে এটি আসলে সুখবর নয়। সুখবর হচ্ছে করোনা যদি না থাকে। এখন সিনেমা হল খুললে সিনেমা দেখবে কারা, দর্শক কই? যারা সচেতন নয় তারাই তো এখন হলে যাবে। সিনেমাহলে যাওয়া মানে করোনাকে স্বাগত জানান। যেটি সুখবর হবে না। আর যদি সুরক্ষা মেনে সিনেমাহল খোলে তাহলে আর কী বলব? আমরা তো এ মেইনটেইন্টটি করি না। আমরা রাস্তাঘাটে চলার সময়ই করি না সেখানে সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে কতটুকু কী করব। তারপরও যদি এমনটি হয়, সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে হল খোলে তাহলে তো খুবই ভালো।

সিনেমাহল খোলা প্রসঙ্গে চিত্রনায়িকা পপি বলেন, ‘বিনোদন ছাড়া মানুষ তো থাকতে পারে না- সেটি ঠিক আছে। কিন্তু বেঁচে থাকলে তো বিনোদন! আগে বেঁচে থাকাটা হচ্ছে খুব জরুরি। অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও খারাপভাবে করোনার প্রকোপ শুরু হয়েছে। মানুষ এখন রিস্কের মধ্যে আছে। টাকা-পয়সার ঝামেলা চলছে। সিনেমা হলে তো পরে যাবে, আগে তো দু’মুঠো খেতে হবে। এখন খাবারের সংকট আছে অনেকেরই। সিনেমা হল চালানো বা কতটুকু সিনেমা চলবে আমি জানি না। আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ বিনোদন নেবে এখন? স্বাস্থ্যবিধি মেনে কি দর্শক আসবে? আমার তো মনে হয় না।

একই কথা বললেন চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদ। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে সিনেমাহলে বসে সিনেমা দেখা এ মুহূর্তে তো অসম্ভব। আমার মনে হয় না, এ মুহূর্তে দর্শক হলে আসবে। কারণ মানুষ বিনোদনের জন্য সিনেমা দেখে আর বিনোদিত হওয়ার সেই আনন্দটি কারোর মনের মধ্যেই নেই। সবার মধ্যেই একটি শঙ্কা কাজ করছে। মনে হচ্ছে না এ মুহূর্তে সিনেমা হলে খুব বেশি দর্শক হবে। যদি এমন হতো তাহলে তো সারা বিশ্বের হলে সিনেমা শুরু হয়ে যেত। উচিত একটু সময় নিয়ে পরিস্থিত কোন দিকে যায়- সেটির ওপর নজর দেয়া।