করোনায় সঙ্গীতাঙ্গনের অবস্থা বেসামাল
jugantor
করোনায় সঙ্গীতাঙ্গনের অবস্থা বেসামাল

  এসএম শাফায়েত  

০২ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কুমার বিশ্বজিৎ, রবি চৌধুরী, আসিফ আকবর
কুমার বিশ্বজিৎ, রবি চৌধুরী, আসিফ আকবর

করোনাভাইরাসের কারণে বিনোদন দুনিয়ার মানুষের ঘরবন্দি দশা কাটেনি এখনও। দেখতে দেখতে পার হতে যাচ্ছে চার মাস। ক্রমেই ভয়াল রূপ ধারণ করছে এ বৈশ্বিক মহামারী। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত রয়েছে প্রায় সব কর্মকাণ্ড।

এরই মধ্যে দেশ-বিদেশের নানা ক্ষেত্র ক্রমেই সচল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সামনের দীর্ঘপথ অন্ধকারে ঢাকা দেখছেন সঙ্গীতাঙ্গনের মানুষ। আর সেই অন্ধকার থেকে খানিকটা আলোর রেখা খুঁজে পেতে জোটবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশের শতাধিক সঙ্গীতশিল্পী। এটাকে নিজেদের প্রাপ্য অধিকার আদায় কিংবা বাঁচার লড়াই হিসেবে দেখছেন এ শিল্পীরা। তারা বলছেন, চলমান ঘরবন্দি সময়ে ফেসবুক-ইউটিউব হয়ে ওয়েবের বিভিন্ন মাধ্যমে যেভাবে ‘ফ্রি কালচার’ চলছে, সেভাবে আর চলা সম্ভব নয়। সম্প্রতি এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছেন সিনিয়র শিল্পীরা।

তারা মনে করেন শিল্পীদের সম্মানটা আগে, সম্মানী বিবেচনা পরে। তবে সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন অনেকে; কিন্তু কেউ কেউ মনে করছেন সংগঠিত হওয়ার জন্য বেছে নেয়া পথ সুগম নয়। কারণ দাবি তোলা শিল্পীদের অধিকাংশই নতুন প্রজন্মের। আবার শতাধিক শিল্পীর তালিকায় নিজেদের নাম দেখেও কেউ কেউ অবাক হচ্ছেন। এমনকি এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। অনুমতি ছাড়াই তাদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে।

ফলে বিষয়টি নিয়ে সঙ্গীতাঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে হ য ব র ল অবস্থা। তাই তাদের দাবি কতটা যৌক্তিক এ নিয়ে কথা বলা হয় নবীন-প্রবীণ শিল্পীদের সঙ্গে। তবে অধিকাংশ প্রবীণ শিল্পীরা কথা বলতে রাজি হননি এ প্রসঙ্গে।

এ বিষয়ে কণ্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ তার প্রতিক্রিয়াসহ বিশ্লেষণধর্মী এক মন্তব্যের শেষাংশে লিখেছেন, ‘সম্মানী ইস্যুতে যে জোট হয়েছে, সেটি নিয়ে কারোর প্রতি আমার ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ নেই। বরং এ প্রজন্মের প্রায় প্রতিটি ছেলেমেয়ের প্রতি আমি টান অনুভব করি। সবার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত আলাপ আছে; কিন্তু এ ছেলেমেয়েদের আমি এভাবে দেখতে চাইনি। অধিক ভরসা করলে যা হয়, সেটাই হয়েছে হয়তো। একটাই অনুরোধ ‘বি ইউনাইটেড, বি স্মার্ট’। নিজের শিল্পী সত্তাকে বিকিয়ে দিও না। এ বাংলার গান আর ঐতিহ্য তোমাদেরই টেনে নিতে হবে বাকিটা পথ।’

সঙ্গীতশিল্পী আসিফ আকবর সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে লিখেছেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সঙ্গীতের এমন অবস্থা নিয়ে টেলিভিশনে দ্রুত টকশো হওয়া উচিত। এখনই সময় সবকিছু পরিষ্কার করে জনসম্মুখে উপস্থাপন করা। সময় চলে গেলে ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করবে না। প্লিজ কেউ শত্রু শত্রু খেলা খেলবেন না। আমি ইন্ডাস্ট্রির একজন সফল সৈনিক- প্রশিক্ষণের প্রথমেই জেনেছি যে কোনো শত্রুকে বধ করা সম্ভব।’

নবীন সঙ্গীতশিল্পীদের একজোট হওয়ার বিষয়টি নিয়ে এসআই টুটুল বলেন, ‘সংগঠিত হওয়ার একটা কারণ লাগে। তারা একটা কারণ নিয়ে এগিয়ে এসেছে, আমিও তাদের সঙ্গে একমত হয়েছি। তবে যে দাবি নিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্ম আওয়াজ তুলেছে এটি প্রধান কারণ নয়। এটি একটি সূত্র মাত্র। এ সূত্র থেকে পুরো সঙ্গীতাজ্ঞনের মানুষ এক কাতারে আসুক। এর পর বড়-ছোট সবাই মিলে একসঙ্গে শুরু হোক জীবনটাকে নতুন করে গোছানো। প্রবীণদের মতামত নেব, অগ্রজদের এগিয়ে দেব, এভাবেই বদলে যাবে সবার জীবন। এটাই হয়তো একত্রিত হওয়ার একটা সুযোগ। অথচ আমি ও আমার প্রবীণ যারা আছেন তারা আজ পর্যন্ত সঙ্গীতশিল্পীদের নিয়ে একটা সংগঠন দাঁড় করাতে পারিনি। এটি আমাদের জন্য চরম ব্যর্থতা।’

সংগঠিত হওয়া ভালো; কিন্তু যে ইস্যু নিয়ে সংগঠিত হতে চেয়েছেন অনেকে সেটাকে খুব বেশি সম্মানের কাজ বলে মনে করছেন না সঙ্গীতশিল্পী কাজী শুভ। তিনি বলেন, ‘শিল্পীদের সবার আগে চিন্তা করতে হবে নিজেদের সম্মানের কথা। টাকা দিয়ে কিন্তু শিল্পীকে কেনা যায় না, পরিমাপও করা যায় না। কিছু কিছু জায়গা আছে যেখানে টাকা দিলেও আমি যাব না। যেখানে আমার সম্মান নেই, সেখানে আমি কখনও যাবই না।

আর যেখানে সম্মান ও আত্মিক সম্পর্কের ব্যাপার রয়েছে সেখানে আমি এমনিতেও যেতে পারি। ফেসবুক বা অনলাইন লাইভে যেতে হলে সম্মানী দিতে হবে এমন দাবি নিয়ে আন্দোলন করার বিষয়টি আমার কাছে ঠুনকো মনে হয়েছে।’

সম্মানী ইস্যুতে সংগঠিত হওয়ার মধ্যে অন্যতম সঙ্গীতশিল্পী মুহিন খান। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে অনেকদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। কারণ এর আগে কখনও কোনো টেলিভিশনে পারিশ্রমিক ছাড়া গান করতে যাইনি। এ করোনাকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা মাথায় রেখে কোথাও যাওয়া হচ্ছে না। তাই ঘরে বসে ফেসবুক লাইভ করার একটা রেওয়াজ চলছে। অনেকে আবার স্পন্সর নিয়ে ফেসবুক লাইভ প্রোগ্রাম করছেন। বিভিন্ন সময় টিভি চ্যানেলের বড় বড় প্রোগ্রাম করেছেন আমাদের নিয়ে।

সেই পরিমাণ টাকা তো ফেসবুক লাইভের জন্য দেয়া হচ্ছে না। যৎসামান্য একটা টকশোর সম্মানীর মতো কিছু থাকতে পারে। সেখান থেকেও যদি বঞ্চিত করে তবে সেটা অন্যায় করা হবে। এ কারণে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে একটা দাবি তোলা হয়েছে। যেখানে একটা কোম্পানির স্পন্সর নিয়ে কাজ করা হচ্ছে, শিল্পীরা তাদের পেজ থেকে লাইভে এসে সচেতনতামূলক কথা বলছেন, গান করছেন, তাহলে কেন শিল্পীদের যথাযথ সম্মানী দেয়া হবে না। তবে কারও পারিশ্রমিক নির্ধারিত নয়। যে যার জায়গা থেকে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করবেন; কিন্তু কেউ যেন পারিশ্রমিক ছাড়া কাজ না করেন।’

কণ্ঠশিল্পী বিউটিও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘একেবারে অযৌক্তিক বলব না। হয়তো আরেক দিক থেকে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। কারণ আপনার একটা পেজ থেকে লাইভ করে ওই পেজকে প্রোমোট করব তার কোনো দায়-দায়িত্ব আমার নেই। অথচ পেজটির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেগাবাইট (এমবি) খরচ করে কেন গান শোনাব? এটাও তো একটা যুক্তি। দেশের পেশাজীবী-কর্মঠ মানুষ প্রায় সবাই নিজ নিজ কাজে ফিরেছেন। কিন্তু শিল্পী সমাজ একেবারেই স্থবির হয়ে আছে। এর ভবিষ্যৎ যে কী সেটা আদৌ আমরা জানি না। যারা সঙ্গীতনির্ভর তাদের মধ্যে এর নেতিবাচক একটা প্রভাব পড়েছে।

এর বাইরে তো তারা অন্য কোনো পেশাকে প্রাধান্য দেইনি। বিশেষ করে মিউজিশিয়ানদের নিয়ে ভাবা উচিত। তারা আমাদের সঙ্গে এক মঞ্চে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। নিশ্চয়ই সুদিন আসবে একদিন। ততদিন তো একে অপরের জন্য কিছু না কিছু করতেই হবে।’

সিনিয়র সঙ্গীতশিল্পী রবি চৌধুরী বিষয়টির সমালোচনা করে বলেন, ‘আমি কোথায় গান করব না করব সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। শিল্পীরা স্বাধীন। আর এ ফেসবুক লাইভে কত টাকা দেবে। রেডিও-টেলিভিশনগুলোই আমাদের ঠিকমতো সম্মানী দেয় না। সেখানে ফেসবুক লাইভ করলে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা দেবে। তারপরও বলব, যার যেখানে ইচ্ছা হয় সে সেখান থেকে লাইভ করবে, এটি একান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। শতাধিক শিল্পীদের নিয়ে যে সংগঠন করা হচ্ছে, এর সঙ্গে সিনিয়র কেউ আছে বলে আমার মনে হয়নি। এটি বাচ্চারা করছে, যাদের অনেকে চেনেও না।’

সোশ্যাল মাধ্যমে সম্মানী ছাড়া গান করবেন না, কিছু শিল্পীর এমন দাবির সঙ্গে গীতিকার-সুরকাররাও তাদের কাছে নিজেদের সম্মান এবং সম্মানী দাবি করেছেন। তারা বলছেন, শিল্পীরা সম্মানী নেবে ভালো কথা; কিন্তু যার লেখা, যার সুর করা গানটি গাইছেন সেটার সম্মান এবং পারিশ্রমিকও তাদের পাওয়ার কথা।

শিল্পীরা কি সেটা করেন বা করছেন? শিল্পীদের দাবির সঙ্গে গীতিকার ও সুরকাররা কি সম্মানীর দাবিদার নয়? এমন প্রশ্নের জবাবে গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলী বলেন, ‘শিল্পীরা যদি গান করার জন্য সম্মানী দাবি করেন তবে গীতিকাররাও সমান দাবিদার। কারণ গানের প্রথম মা হচ্ছেন গীতিকার। মাকে অস্বীকার করলে তো জারজ সন্তানও বলা যায় না তাকে। তাই অবশ্যই গীতিকাররা সেই সম্মানীর ভাগীদার। পাশাপাশি সুরকারদের বিষয়টিও ভাবতে হবে।’

করোনায় সঙ্গীতাঙ্গনের অবস্থা বেসামাল

 এসএম শাফায়েত 
০২ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
কুমার বিশ্বজিৎ, রবি চৌধুরী, আসিফ আকবর
কুমার বিশ্বজিৎ, রবি চৌধুরী, আসিফ আকবর

করোনাভাইরাসের কারণে বিনোদন দুনিয়ার মানুষের ঘরবন্দি দশা কাটেনি এখনও। দেখতে দেখতে পার হতে যাচ্ছে চার মাস। ক্রমেই ভয়াল রূপ ধারণ করছে এ বৈশ্বিক মহামারী। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত রয়েছে প্রায় সব কর্মকাণ্ড।

এরই মধ্যে দেশ-বিদেশের নানা ক্ষেত্র ক্রমেই সচল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সামনের দীর্ঘপথ অন্ধকারে ঢাকা দেখছেন সঙ্গীতাঙ্গনের মানুষ। আর সেই অন্ধকার থেকে খানিকটা আলোর রেখা খুঁজে পেতে জোটবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশের শতাধিক সঙ্গীতশিল্পী। এটাকে নিজেদের প্রাপ্য অধিকার আদায় কিংবা বাঁচার লড়াই হিসেবে দেখছেন এ শিল্পীরা। তারা বলছেন, চলমান ঘরবন্দি সময়ে ফেসবুক-ইউটিউব হয়ে ওয়েবের বিভিন্ন মাধ্যমে যেভাবে ‘ফ্রি কালচার’ চলছে, সেভাবে আর চলা সম্ভব নয়। সম্প্রতি এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছেন সিনিয়র শিল্পীরা।

তারা মনে করেন শিল্পীদের সম্মানটা আগে, সম্মানী বিবেচনা পরে। তবে সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন অনেকে; কিন্তু কেউ কেউ মনে করছেন সংগঠিত হওয়ার জন্য বেছে নেয়া পথ সুগম নয়। কারণ দাবি তোলা শিল্পীদের অধিকাংশই নতুন প্রজন্মের। আবার শতাধিক শিল্পীর তালিকায় নিজেদের নাম দেখেও কেউ কেউ অবাক হচ্ছেন। এমনকি এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। অনুমতি ছাড়াই তাদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে।

ফলে বিষয়টি নিয়ে সঙ্গীতাঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে হ য ব র ল অবস্থা। তাই তাদের দাবি কতটা যৌক্তিক এ নিয়ে কথা বলা হয় নবীন-প্রবীণ শিল্পীদের সঙ্গে। তবে অধিকাংশ প্রবীণ শিল্পীরা কথা বলতে রাজি হননি এ প্রসঙ্গে।

এ বিষয়ে কণ্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ তার প্রতিক্রিয়াসহ বিশ্লেষণধর্মী এক মন্তব্যের শেষাংশে লিখেছেন, ‘সম্মানী ইস্যুতে যে জোট হয়েছে, সেটি নিয়ে কারোর প্রতি আমার ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ নেই। বরং এ প্রজন্মের প্রায় প্রতিটি ছেলেমেয়ের প্রতি আমি টান অনুভব করি। সবার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত আলাপ আছে; কিন্তু এ ছেলেমেয়েদের আমি এভাবে দেখতে চাইনি। অধিক ভরসা করলে যা হয়, সেটাই হয়েছে হয়তো। একটাই অনুরোধ ‘বি ইউনাইটেড, বি স্মার্ট’। নিজের শিল্পী সত্তাকে বিকিয়ে দিও না। এ বাংলার গান আর ঐতিহ্য তোমাদেরই টেনে নিতে হবে বাকিটা পথ।’

সঙ্গীতশিল্পী আসিফ আকবর সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে লিখেছেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সঙ্গীতের এমন অবস্থা নিয়ে টেলিভিশনে দ্রুত টকশো হওয়া উচিত। এখনই সময় সবকিছু পরিষ্কার করে জনসম্মুখে উপস্থাপন করা। সময় চলে গেলে ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করবে না। প্লিজ কেউ শত্রু শত্রু খেলা খেলবেন না। আমি ইন্ডাস্ট্রির একজন সফল সৈনিক- প্রশিক্ষণের প্রথমেই জেনেছি যে কোনো শত্রুকে বধ করা সম্ভব।’

নবীন সঙ্গীতশিল্পীদের একজোট হওয়ার বিষয়টি নিয়ে এসআই টুটুল বলেন, ‘সংগঠিত হওয়ার একটা কারণ লাগে। তারা একটা কারণ নিয়ে এগিয়ে এসেছে, আমিও তাদের সঙ্গে একমত হয়েছি। তবে যে দাবি নিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্ম আওয়াজ তুলেছে এটি প্রধান কারণ নয়। এটি একটি সূত্র মাত্র। এ সূত্র থেকে পুরো সঙ্গীতাজ্ঞনের মানুষ এক কাতারে আসুক। এর পর বড়-ছোট সবাই মিলে একসঙ্গে শুরু হোক জীবনটাকে নতুন করে গোছানো। প্রবীণদের মতামত নেব, অগ্রজদের এগিয়ে দেব, এভাবেই বদলে যাবে সবার জীবন। এটাই হয়তো একত্রিত হওয়ার একটা সুযোগ। অথচ আমি ও আমার প্রবীণ যারা আছেন তারা আজ পর্যন্ত সঙ্গীতশিল্পীদের নিয়ে একটা সংগঠন দাঁড় করাতে পারিনি। এটি আমাদের জন্য চরম ব্যর্থতা।’

সংগঠিত হওয়া ভালো; কিন্তু যে ইস্যু নিয়ে সংগঠিত হতে চেয়েছেন অনেকে সেটাকে খুব বেশি সম্মানের কাজ বলে মনে করছেন না সঙ্গীতশিল্পী কাজী শুভ। তিনি বলেন, ‘শিল্পীদের সবার আগে চিন্তা করতে হবে নিজেদের সম্মানের কথা। টাকা দিয়ে কিন্তু শিল্পীকে কেনা যায় না, পরিমাপও করা যায় না। কিছু কিছু জায়গা আছে যেখানে টাকা দিলেও আমি যাব না। যেখানে আমার সম্মান নেই, সেখানে আমি কখনও যাবই না।

আর যেখানে সম্মান ও আত্মিক সম্পর্কের ব্যাপার রয়েছে সেখানে আমি এমনিতেও যেতে পারি। ফেসবুক বা অনলাইন লাইভে যেতে হলে সম্মানী দিতে হবে এমন দাবি নিয়ে আন্দোলন করার বিষয়টি আমার কাছে ঠুনকো মনে হয়েছে।’

সম্মানী ইস্যুতে সংগঠিত হওয়ার মধ্যে অন্যতম সঙ্গীতশিল্পী মুহিন খান। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে অনেকদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। কারণ এর আগে কখনও কোনো টেলিভিশনে পারিশ্রমিক ছাড়া গান করতে যাইনি। এ করোনাকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা মাথায় রেখে কোথাও যাওয়া হচ্ছে না। তাই ঘরে বসে ফেসবুক লাইভ করার একটা রেওয়াজ চলছে। অনেকে আবার স্পন্সর নিয়ে ফেসবুক লাইভ প্রোগ্রাম করছেন। বিভিন্ন সময় টিভি চ্যানেলের বড় বড় প্রোগ্রাম করেছেন আমাদের নিয়ে।

সেই পরিমাণ টাকা তো ফেসবুক লাইভের জন্য দেয়া হচ্ছে না। যৎসামান্য একটা টকশোর সম্মানীর মতো কিছু থাকতে পারে। সেখান থেকেও যদি বঞ্চিত করে তবে সেটা অন্যায় করা হবে। এ কারণে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে একটা দাবি তোলা হয়েছে। যেখানে একটা কোম্পানির স্পন্সর নিয়ে কাজ করা হচ্ছে, শিল্পীরা তাদের পেজ থেকে লাইভে এসে সচেতনতামূলক কথা বলছেন, গান করছেন, তাহলে কেন শিল্পীদের যথাযথ সম্মানী দেয়া হবে না। তবে কারও পারিশ্রমিক নির্ধারিত নয়। যে যার জায়গা থেকে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করবেন; কিন্তু কেউ যেন পারিশ্রমিক ছাড়া কাজ না করেন।’

কণ্ঠশিল্পী বিউটিও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘একেবারে অযৌক্তিক বলব না। হয়তো আরেক দিক থেকে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। কারণ আপনার একটা পেজ থেকে লাইভ করে ওই পেজকে প্রোমোট করব তার কোনো দায়-দায়িত্ব আমার নেই। অথচ পেজটির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেগাবাইট (এমবি) খরচ করে কেন গান শোনাব? এটাও তো একটা যুক্তি। দেশের পেশাজীবী-কর্মঠ মানুষ প্রায় সবাই নিজ নিজ কাজে ফিরেছেন। কিন্তু শিল্পী সমাজ একেবারেই স্থবির হয়ে আছে। এর ভবিষ্যৎ যে কী সেটা আদৌ আমরা জানি না। যারা সঙ্গীতনির্ভর তাদের মধ্যে এর নেতিবাচক একটা প্রভাব পড়েছে।

এর বাইরে তো তারা অন্য কোনো পেশাকে প্রাধান্য দেইনি। বিশেষ করে মিউজিশিয়ানদের নিয়ে ভাবা উচিত। তারা আমাদের সঙ্গে এক মঞ্চে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। নিশ্চয়ই সুদিন আসবে একদিন। ততদিন তো একে অপরের জন্য কিছু না কিছু করতেই হবে।’

সিনিয়র সঙ্গীতশিল্পী রবি চৌধুরী বিষয়টির সমালোচনা করে বলেন, ‘আমি কোথায় গান করব না করব সেটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। শিল্পীরা স্বাধীন। আর এ ফেসবুক লাইভে কত টাকা দেবে। রেডিও-টেলিভিশনগুলোই আমাদের ঠিকমতো সম্মানী দেয় না। সেখানে ফেসবুক লাইভ করলে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা দেবে। তারপরও বলব, যার যেখানে ইচ্ছা হয় সে সেখান থেকে লাইভ করবে, এটি একান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। শতাধিক শিল্পীদের নিয়ে যে সংগঠন করা হচ্ছে, এর সঙ্গে সিনিয়র কেউ আছে বলে আমার মনে হয়নি। এটি বাচ্চারা করছে, যাদের অনেকে চেনেও না।’

সোশ্যাল মাধ্যমে সম্মানী ছাড়া গান করবেন না, কিছু শিল্পীর এমন দাবির সঙ্গে গীতিকার-সুরকাররাও তাদের কাছে নিজেদের সম্মান এবং সম্মানী দাবি করেছেন। তারা বলছেন, শিল্পীরা সম্মানী নেবে ভালো কথা; কিন্তু যার লেখা, যার সুর করা গানটি গাইছেন সেটার সম্মান এবং পারিশ্রমিকও তাদের পাওয়ার কথা।

শিল্পীরা কি সেটা করেন বা করছেন? শিল্পীদের দাবির সঙ্গে গীতিকার ও সুরকাররা কি সম্মানীর দাবিদার নয়? এমন প্রশ্নের জবাবে গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলী বলেন, ‘শিল্পীরা যদি গান করার জন্য সম্মানী দাবি করেন তবে গীতিকাররাও সমান দাবিদার। কারণ গানের প্রথম মা হচ্ছেন গীতিকার। মাকে অস্বীকার করলে তো জারজ সন্তানও বলা যায় না তাকে। তাই অবশ্যই গীতিকাররা সেই সম্মানীর ভাগীদার। পাশাপাশি সুরকারদের বিষয়টিও ভাবতে হবে।’