তারকাদের শেষ ভরসা কি ইউটিউব
jugantor
তারকাদের শেষ ভরসা কি ইউটিউব

  এফ আই দীপু  

২৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাপী চলছে করোনাভাইরাসের তাণ্ডব। অন্যসব কর্মক্ষেত্রের মতো বিনোদন মিডিয়ার কাজকর্মও বন্ধ দীর্ঘদিন। কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে- সেটিও অনিশ্চিত। আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন সবাই। কেউ কেউ ভুগছেন মানসিক অবসাদে।

আবার কোনো কোনো তারকাশিল্পী নিজের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে অনলাইনে ইউটিউবকেই আয়-রোজগারের বিকল্প একটি মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তবে কি এটিই তাদের শেষ ভরসার জায়গা? বিস্তারিত লিখেছেন -

করোনাভাইরাস নামে এক মহামারী বিশ্বব্যাপী মানুষকে ঘরে আটকে দিয়েছে। বাইরে বের হলেই বিপদ! বাধ্য হয়ে ঘরে বসে থাকা মানুষ সঞ্চিত অর্থ দিয়েই নিজেকে বাঁচাতে চাইছেন। কিন্তু সেটি কতদিন?

কথায় আছে, ‘বসে বসে খেলে রাজার ভাণ্ডারও একদিন ফুরিয়ে যায়’। সাধারণ মানুষের আয় তো আর রাজভাণ্ডারের মতো নয়। তাদের বসে থাকার দিন ফুরিয়ে গেছে অনেক আগেই। বাধ্য হয়ে বের হচ্ছেন। কেউ জানে না, কবে এ মহামারী থেকে মুক্তি পাবে মানবজাতি! জীবনের তাগিদে কিংবা জীবিকার তাগিদে- যাই হোক না কেন, বিনোদন জগতের বাসিন্দাদেরও বাইরে বের হতে হয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষের মতো তাদের সঞ্চিত ভাণ্ডারও ফুরিয়ে এসেছে গত তিন মাসে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই শুটিংয়ে ফিরছিলেন অনেক তারকা অভিনয়শিল্পী। কিন্তু পথ আগলে বসে রয়েছে অদৃশ্য দানব করোনাভাইরাস। ঠিকই হানা দিয়েছে ইউনিটে। বাধ্য হয়ে ঘরেই ফিরতে হচ্ছে তারকাদের। গেল সপ্তাহে দেশের প্রথমসারির টিভি অভিনয়শিল্পী জিয়াউল ফারুক অপূর্ব ও মেহজাবিন চৌধুরী ঠিক এমনই একটি ঘটনার মুখোমুখি হন। একটি নাটকের ইউনিটে দু’জন সদস্যের করোনা পজেটিভ ধরা পড়ে। বাধ্য হয়ে নাটকের প্রধান কুশলী অপূর্ব ও মেহজাবিনকে ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করতে হয়েছে পনেরো দিনের জন্য!

এ তো গেল একটি ঘটনার কথা। আরও ঘটছে এমন। অনেকেই হয়তো শুটিং করছেন কিন্তু তাদেরও একদিন ফিরতে হবে। কারণ সেই অদৃশ্য দানব ওঁৎ পেতে রয়েছে। যেন ঠিক সময় দেবে মরণ কামড়! তাহলে এসব অভিনয়শিল্পীদের বাঁচার উপায় কী? সাধারণ মানুষের চেয়ে তাদের জীবনের চাহিদা একটু বেশিই। হওয়াটাই স্বাভাবিক। নিজেকে অন্যের চেয়ে আলাদা রাখতে হলে সবকিছুতে একটু বেশি যত্ন নিতে হবে। সেটি জীবনযাপন, পোশাক-পরিচ্ছেদ- যাই হোক না কেন। এ আলাদা যত্ন নেয়ার জন্য একটু বেশিই অর্থ দরকার। কাজ নেই তাই অর্থও নেই। করোনা যেন সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। তাহলে এ অর্থের চাহিদা এখন কীভাবে মিটবে? বিকল্প কী উপায় রয়েছে? হ্যাঁ, তারকাশিল্পীদের অনেকেই এরই মধ্যে বিকল্প একটি মাধ্যম বেছে নিয়েছেন।

সেটি হচ্ছে অনলাইন। এ অনলাইনে নিজেদের আয়-রোজগারের পথ সুগম করার একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে ‘ইউটিউব’। এ মাধ্যমে কেউ কেউ অর্থ রোজগার শুরুও করে দিয়েছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ইউটিউব-ই কি তারকাদের অর্থ রোজগারের শেষ ভরসা? সাধারণের মতে, আপাতদৃষ্টিতে হ্যাঁ। করোনা মহামারীতে তো আর কিছু করার নেই। তাই নিজেদের স্টারডম কাজে লাগিয়ে যদি কিছুটা অর্থ উপার্জন করতে পারে মন্দ কী? আর সেটিই কাজে লাগাচ্ছেন অনেক তারকাশিল্পী।

কিন্তু যারা ইউটিউবে নিজেদের নামে বা ভিন্ন নামে চ্যানেল খুলে বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট আপলোড করছেন, তারা বলছেন ভিন্ন কথা। বিষয়টি শুধুই আয়-রোজগার- এটি মানতে নারাজ তারা। তাদের মতে, দর্শকদের সঙ্গে নিজেদের ভালোলাগা কিছু বিষয় শেয়ার করতেই এ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। অভিনয়, নাচ ও গানের পাশাপাশি এখন নিজেদের পছন্দমতো কনটেন্ট দিচ্ছেন তারা। যেটি নির্দিষ্ট গল্পের একটি নাটক বা সিনেমার মাধ্যমে কখনই দেয়া সম্ভব নয়। এটি নিজের কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের আর্কাইভ হিসেবেও কাজ করছে বলে তাদের মত। এবার নজর দেয়া যাক, কারা কারা ইউটিউব চ্যানেল খুলে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন?

শুরুতেই দেশসেরা নায়ক শাকিব খানের প্রসঙ্গে আসি। তিনি গত বছর নিজের জন্মদিনে বেশ ঘটা করে ‘শাকিব খান অফিসিয়াল’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। তখন বলেছেন, নিজের ছবির প্রচারণা চালাতে এ চ্যানেলটি খুলেছেন। শুটিং কিংবা ছবি নির্মাণের পেছনের গল্প ভিডিও আকারে নিজের চ্যানেলে আপলোড করবেন। যেটি অন্য মাধ্যমে সম্ভব নয়। পরবর্তী সময়ে এ চ্যানেল থেকে সেসব কথার বাস্তবায়নও দেখা গেছে।

নিজের ইউটিউব চ্যানেল প্রসঙ্গে শাকিব খান বলেন, ‘এটি আসলে সময়ের প্রয়োজনে করেছি। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে নিজের একটি আর্কাইভ দরকার। কী করেছি আমি- তার পেছনের গল্পও আমার ভক্ত-দর্শকদের জানা দরকার। সেই ভাবনা থেকেই কাজ করছে চ্যানেলটি।’ পাশাপাশি বাণিজ্যিক বিষয়টিও তিনি ভেবেছেন। বলেছেন, ‘এ চ্যানেল থেকে আর্থিকভাবে আয়েরও সুযোগ আছে। তবে কনটেন্ট অবশ্যই ভালো দিতে হবে।’ তবে ইউটিউব চ্যানেল আয়ের শেষ ভরসা- মানতে একেবারেই নারাজ এ নায়ক। তিনি বলেন, ‘ইউটিউব থেকে যে পরিমাণ অর্থ আসবে সেটি আমার জন্য একেবারেই নগণ্য। আর এটির আয় নিয়ে ভাবছি না। যেটি আসে বা আসবে সেটি অতিরিক্ত আয় হিসেবেই ধরে নেব।’

চিত্রনায়ক-প্রযোজক অনন্ত জলিলও নিজের নামে ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন বেশ আগে। তিনি অবশ্য বাণিজ্যিক চিন্তা থেকে এটি করেননি। কারণ তার বর্তমান যে ব্যবসা রয়েছে সেটির তুলনায় ইউটিউবের আয় আসলে বিশাল সমুদ্রে এক ফোঁটা জলের মতোই। ইউটিউব চ্যানেল খোলার পেছনের কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে আপডেট রাখা। তাছাড়া সিনেমার বাইরে আমি অনেক সেবামূলক কাজ করি। যেটি আমার ভক্ত-দর্শকরা জানেন না। তাদের উৎসাহ দিতে, তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেই আমি মিডিয়া কিংবা আমার অন্যান্য কাজের কিছু অংশ ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করি। এর জন্য আমার আলাদা একটি টিম আছে। তারাই সবকিছু সামলায়। ইউটিউব থেকে অর্থ আয় কিংবা আয়ের শেষ ভরসা- এসব নিয়ে আমি ভেবেও দেখিনি। যেটি আয় হয় বা হবে- সেটি অতিরিক্ত আয় হিসেবেই আমার কাছে বিবেচিত হবে।’ একই রকম চিত্রনায়িকা বর্ষারও একটি ইউটিউব চ্যানেল আছে। যেখান থেকে স্বামী অনন্ত জলিলের মতোই তার বিভিন্ন কাজকর্ম সেই চ্যানেলে আপলোড করা হয়। তিনিও আর্থিক দিক বিবেচনা করে ইউটিউব চ্যানেল খোলেননি বলে জানিয়েছেন।

অনন্ত জলিল কিংবা শাকিব খানের মতো বড় তারকাদের হয়তো অর্থ সংকট নেই। মিডিয়ার কাজ ছাড়াও তাদের আলাদা ব্যবসা রয়েছে, যেখান থেকে জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট সহায়তা তারা পাচ্ছেন। কিন্তু অন্য তারকাশিল্পী, যারা শুধুই অভিনয়ের ওপর নির্ভরশীল তাদের কাছে ইউউিটব থেকে আয়ের বিষয়টি অবশ্যই আলাদা কিছু। বিশেষ করে এ করোনা মহামারীতে ইউটিউবই তাদের বাঁচার পথ সুগম করে দিচ্ছে। সেটি তারা স্বীকার করুক আর না-ই করুক। এ তালিকায় রয়েছেন নাট্যাভিনেত্রী মেহজাবিন চৌধুরী। কয়েক বছর আগেই তিনি নিজের নামে ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। সেখানে বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট আপলোড করেছেন। বিশেষ করে করোনা দুর্যোগে ঘরবন্দি থাকাকালে সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছেন ইউটিউব চ্যানেলে। চ্যানেলটি থেকে বর্তমানে আয়-রোজগার বেশ ভালোই হচ্ছে। নিজের চ্যানেল প্রসঙ্গে মেহজাবিন গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘চ্যানেলটি করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দুটি। এক. দেশের বাইরে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাগুলো ভিডিও করে আপলোড করা। প্রতিদিনের নিজের অভিজ্ঞতা ভক্তদের সঙ্গে শেয়ার করা। পাশাপাশি এখান থেকে আয়ও হয়। দুই. সব কাজের অভিজ্ঞতাগুলো এখানে আর্কাইভ হিসেবে থাকছে। ভবিষ্যতে আমি যদি পরিকল্পিতভাবে কন্টেন্ট দিই তাহলে আর্থিকভাবে আরও লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে।’ আর্থিক বিষয়টি উল্লেখ করলেও ইউটিউবকে আয়ের শেষ ভরসা হিসেবে মানছেন না এ তারকাশিল্পী।

দেশের প্রথমসারির বিদ্যা সিনহা মিমও এ করোনাকালে নিজের ইউটিউব চ্যানেল খুলে নিজের প্রযোজিত একটি শর্টফিল্ম এবং একটি আড্ডার অনুষ্ঠান আপলোড করেছেন। চ্যানেলটি তিনি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে করার কথা না বললেও এর থেকে আয়ের বিষয়টি তার চলার পথকে মসৃণ রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মিম বলেন, ‘করোনার মধ্যে বাসায় অযথা বসে না থেকে কিছু ভিন্নধর্মী কাজ করার চিন্তা করলাম। সেই চিন্তা থেকেই ইউটিউব চ্যানেল খোলা ও কনটেন্ট আপলোড করা। যদিও আমি বেশ আগে থেকেই এ ধরনের কিছু করার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু সময়ের অভাবে করতে পারছিলাম না। অবশেষে করোনার অবসর আমাকে সে সুযোগ করে দিয়েছে। বাণিজ্যিক বিষয়টি অগ্রাধিকার না পেলেও এখান থেকে অর্থ আসবে- এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে আমি ইউটিউবকে আয়-রোজগারের শেষ মাধ্যম হিসেবে একেবারেই ভাবছি না। আমার বিশ্বাস, করোনার এ দুঃসময় একদিন কেটে যাবে। আবারও আমরা শুটিং কলরবে মেতে উঠব।’

জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীও একটি ইউটিউব চ্যানেলের মালিক। এ অভিনেতা পেশা হিসেবে একমাত্র অভিনয়কেই এখনও প্রাধান্য দিচ্ছেন। তাই নিজের অভিনীত কিছু ভিন্নধর্মী কাজ দর্শকদের সঙ্গে শেয়ার করতেই গত বছরের শেষ দিকে নিজের নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে ‘ফিরে পাওয়া ঠিকানা’ নামে একটি মুক্তিযুদ্ধের নাটক আপলোড করে ইউটিউব জগতে পা রাখেন। গণমাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, এ চ্যানেলটি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নয় বরং ভালো কিছু উপহার দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হবে। তিনি বলেন, ‘টিভিতে সময়ের অভাবে অনেক কিছুই মানুষ মিস করেন। ইউটিউবে দেখার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় লাগে না। তাই ভালো কিছু কনটেন্ট তৈরি করে দর্শকের উপহার দেয়ার জন্যই এ চ্যানেল নিয়ে যাত্রা শুরু করেছি। ভালো কিছু কাজ দিয়ে আমার চ্যানেলটিকে সমৃদ্ধ করতে চাই।’

ইউটিউব চ্যানেল নিয়ে কাজ করছেন এমন তালিকায় আরও রয়েছেন চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি, অভিনেত্রী অর্চিতা স্পর্শিয়া, সাফা কবির ও মুমতাহিনা টয়াসহ আরও অনেকে।

অভিনয়শিল্পীদের বাইরে গানের অনেক শিল্পীর ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন মনির খান, এসডি রুবেল, ডলি সায়ন্তনী, রবি চৌধুরী, আসিফ আকবর, তাহসান, হৃদয় খান ও হাবিব ওয়াহিদ। তারা নিজেদের গান নিজেদের চ্যানেলেই আপলোড করেন। সেখান থেকে কেউ কেউ বাণিজ্যিকভাবে বেশ লাভবানও হচ্ছেন। অভিনয় কিংবা গান, যাই হোক না কেন- এরই মধ্যে অনেক তারকাশিল্পী এ প্ল্যাটফর্ম নিয়ে বেশ গুরুত্ব দিয়েই কাজ শুরু করার চিন্তা করছেন। কারণ করোনাপরবর্তী বিশ্ব ব্যাপক বদলে যাবে। বদলে যাবে কাজের ধরন। সেই ধরনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সময়ও লাগবে। তার আগেই যদি আয়-রোজগারের কিছু ব্যবস্থা করে রাখা যায় তবে মন্দ কী? তাই শুধু করোনাকালের জন্য হলেও বলা যায়, ইউটিউবই আপাত ক্ষেত্রে তারকাদের আয়ের শেষ ভরসা। তবে এসব ভাবনা শুধুই তারকাশিল্পীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ ইউটিউব চ্যানেল থেকে আয় করতে হলে সেটিকে আগে পরিচিত করতে হয় বা সাবস্ক্রাইবার বাড়াতে হয়। নতুন কিংবা স্বল্প পরিচিত একজন শিল্পীর চ্যানেলকে দাঁড় করাতে হলে অনেক সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু একজন বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয় তারকার চ্যানেল খুব সহজেই সাবস্ক্রাইবার বেড়ে যায়। স্বভাবতই তাদের আয়-রোজগারের পথও সুগম হয় দ্রুত।

তারকাদের শেষ ভরসা কি ইউটিউব

 এফ আই দীপু 
২৩ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাপী চলছে করোনাভাইরাসের তাণ্ডব। অন্যসব কর্মক্ষেত্রের মতো বিনোদন মিডিয়ার কাজকর্মও বন্ধ দীর্ঘদিন। কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে- সেটিও অনিশ্চিত। আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন সবাই। কেউ কেউ ভুগছেন মানসিক অবসাদে।

আবার কোনো কোনো তারকাশিল্পী নিজের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে অনলাইনে ইউটিউবকেই আয়-রোজগারের বিকল্প একটি মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তবে কি এটিই তাদের শেষ ভরসার জায়গা? বিস্তারিত লিখেছেন -

করোনাভাইরাস নামে এক মহামারী বিশ্বব্যাপী মানুষকে ঘরে আটকে দিয়েছে। বাইরে বের হলেই বিপদ! বাধ্য হয়ে ঘরে বসে থাকা মানুষ সঞ্চিত অর্থ দিয়েই নিজেকে বাঁচাতে চাইছেন। কিন্তু সেটি কতদিন?

কথায় আছে, ‘বসে বসে খেলে রাজার ভাণ্ডারও একদিন ফুরিয়ে যায়’। সাধারণ মানুষের আয় তো আর রাজভাণ্ডারের মতো নয়। তাদের বসে থাকার দিন ফুরিয়ে গেছে অনেক আগেই। বাধ্য হয়ে বের হচ্ছেন। কেউ জানে না, কবে এ মহামারী থেকে মুক্তি পাবে মানবজাতি! জীবনের তাগিদে কিংবা জীবিকার তাগিদে- যাই হোক না কেন, বিনোদন জগতের বাসিন্দাদেরও বাইরে বের হতে হয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষের মতো তাদের সঞ্চিত ভাণ্ডারও ফুরিয়ে এসেছে গত তিন মাসে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই শুটিংয়ে ফিরছিলেন অনেক তারকা অভিনয়শিল্পী। কিন্তু পথ আগলে বসে রয়েছে অদৃশ্য দানব করোনাভাইরাস। ঠিকই হানা দিয়েছে ইউনিটে। বাধ্য হয়ে ঘরেই ফিরতে হচ্ছে তারকাদের। গেল সপ্তাহে দেশের প্রথমসারির টিভি অভিনয়শিল্পী জিয়াউল ফারুক অপূর্ব ও মেহজাবিন চৌধুরী ঠিক এমনই একটি ঘটনার মুখোমুখি হন। একটি নাটকের ইউনিটে দু’জন সদস্যের করোনা পজেটিভ ধরা পড়ে। বাধ্য হয়ে নাটকের প্রধান কুশলী অপূর্ব ও মেহজাবিনকে ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করতে হয়েছে পনেরো দিনের জন্য!

এ তো গেল একটি ঘটনার কথা। আরও ঘটছে এমন। অনেকেই হয়তো শুটিং করছেন কিন্তু তাদেরও একদিন ফিরতে হবে। কারণ সেই অদৃশ্য দানব ওঁৎ পেতে রয়েছে। যেন ঠিক সময় দেবে মরণ কামড়! তাহলে এসব অভিনয়শিল্পীদের বাঁচার উপায় কী? সাধারণ মানুষের চেয়ে তাদের জীবনের চাহিদা একটু বেশিই। হওয়াটাই স্বাভাবিক। নিজেকে অন্যের চেয়ে আলাদা রাখতে হলে সবকিছুতে একটু বেশি যত্ন নিতে হবে। সেটি জীবনযাপন, পোশাক-পরিচ্ছেদ- যাই হোক না কেন। এ আলাদা যত্ন নেয়ার জন্য একটু বেশিই অর্থ দরকার। কাজ নেই তাই অর্থও নেই। করোনা যেন সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। তাহলে এ অর্থের চাহিদা এখন কীভাবে মিটবে? বিকল্প কী উপায় রয়েছে? হ্যাঁ, তারকাশিল্পীদের অনেকেই এরই মধ্যে বিকল্প একটি মাধ্যম বেছে নিয়েছেন।

সেটি হচ্ছে অনলাইন। এ অনলাইনে নিজেদের আয়-রোজগারের পথ সুগম করার একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে ‘ইউটিউব’। এ মাধ্যমে কেউ কেউ অর্থ রোজগার শুরুও করে দিয়েছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ইউটিউব-ই কি তারকাদের অর্থ রোজগারের শেষ ভরসা? সাধারণের মতে, আপাতদৃষ্টিতে হ্যাঁ। করোনা মহামারীতে তো আর কিছু করার নেই। তাই নিজেদের স্টারডম কাজে লাগিয়ে যদি কিছুটা অর্থ উপার্জন করতে পারে মন্দ কী? আর সেটিই কাজে লাগাচ্ছেন অনেক তারকাশিল্পী।

কিন্তু যারা ইউটিউবে নিজেদের নামে বা ভিন্ন নামে চ্যানেল খুলে বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট আপলোড করছেন, তারা বলছেন ভিন্ন কথা। বিষয়টি শুধুই আয়-রোজগার- এটি মানতে নারাজ তারা। তাদের মতে, দর্শকদের সঙ্গে নিজেদের ভালোলাগা কিছু বিষয় শেয়ার করতেই এ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। অভিনয়, নাচ ও গানের পাশাপাশি এখন নিজেদের পছন্দমতো কনটেন্ট দিচ্ছেন তারা। যেটি নির্দিষ্ট গল্পের একটি নাটক বা সিনেমার মাধ্যমে কখনই দেয়া সম্ভব নয়। এটি নিজের কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের আর্কাইভ হিসেবেও কাজ করছে বলে তাদের মত। এবার নজর দেয়া যাক, কারা কারা ইউটিউব চ্যানেল খুলে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন?

শুরুতেই দেশসেরা নায়ক শাকিব খানের প্রসঙ্গে আসি। তিনি গত বছর নিজের জন্মদিনে বেশ ঘটা করে ‘শাকিব খান অফিসিয়াল’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। তখন বলেছেন, নিজের ছবির প্রচারণা চালাতে এ চ্যানেলটি খুলেছেন। শুটিং কিংবা ছবি নির্মাণের পেছনের গল্প ভিডিও আকারে নিজের চ্যানেলে আপলোড করবেন। যেটি অন্য মাধ্যমে সম্ভব নয়। পরবর্তী সময়ে এ চ্যানেল থেকে সেসব কথার বাস্তবায়নও দেখা গেছে।

নিজের ইউটিউব চ্যানেল প্রসঙ্গে শাকিব খান বলেন, ‘এটি আসলে সময়ের প্রয়োজনে করেছি। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে নিজের একটি আর্কাইভ দরকার। কী করেছি আমি- তার পেছনের গল্পও আমার ভক্ত-দর্শকদের জানা দরকার। সেই ভাবনা থেকেই কাজ করছে চ্যানেলটি।’ পাশাপাশি বাণিজ্যিক বিষয়টিও তিনি ভেবেছেন। বলেছেন, ‘এ চ্যানেল থেকে আর্থিকভাবে আয়েরও সুযোগ আছে। তবে কনটেন্ট অবশ্যই ভালো দিতে হবে।’ তবে ইউটিউব চ্যানেল আয়ের শেষ ভরসা- মানতে একেবারেই নারাজ এ নায়ক। তিনি বলেন, ‘ইউটিউব থেকে যে পরিমাণ অর্থ আসবে সেটি আমার জন্য একেবারেই নগণ্য। আর এটির আয় নিয়ে ভাবছি না। যেটি আসে বা আসবে সেটি অতিরিক্ত আয় হিসেবেই ধরে নেব।’

চিত্রনায়ক-প্রযোজক অনন্ত জলিলও নিজের নামে ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন বেশ আগে। তিনি অবশ্য বাণিজ্যিক চিন্তা থেকে এটি করেননি। কারণ তার বর্তমান যে ব্যবসা রয়েছে সেটির তুলনায় ইউটিউবের আয় আসলে বিশাল সমুদ্রে এক ফোঁটা জলের মতোই। ইউটিউব চ্যানেল খোলার পেছনের কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে আপডেট রাখা। তাছাড়া সিনেমার বাইরে আমি অনেক সেবামূলক কাজ করি। যেটি আমার ভক্ত-দর্শকরা জানেন না। তাদের উৎসাহ দিতে, তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেই আমি মিডিয়া কিংবা আমার অন্যান্য কাজের কিছু অংশ ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করি। এর জন্য আমার আলাদা একটি টিম আছে। তারাই সবকিছু সামলায়। ইউটিউব থেকে অর্থ আয় কিংবা আয়ের শেষ ভরসা- এসব নিয়ে আমি ভেবেও দেখিনি। যেটি আয় হয় বা হবে- সেটি অতিরিক্ত আয় হিসেবেই আমার কাছে বিবেচিত হবে।’ একই রকম চিত্রনায়িকা বর্ষারও একটি ইউটিউব চ্যানেল আছে। যেখান থেকে স্বামী অনন্ত জলিলের মতোই তার বিভিন্ন কাজকর্ম সেই চ্যানেলে আপলোড করা হয়। তিনিও আর্থিক দিক বিবেচনা করে ইউটিউব চ্যানেল খোলেননি বলে জানিয়েছেন।

অনন্ত জলিল কিংবা শাকিব খানের মতো বড় তারকাদের হয়তো অর্থ সংকট নেই। মিডিয়ার কাজ ছাড়াও তাদের আলাদা ব্যবসা রয়েছে, যেখান থেকে জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট সহায়তা তারা পাচ্ছেন। কিন্তু অন্য তারকাশিল্পী, যারা শুধুই অভিনয়ের ওপর নির্ভরশীল তাদের কাছে ইউউিটব থেকে আয়ের বিষয়টি অবশ্যই আলাদা কিছু। বিশেষ করে এ করোনা মহামারীতে ইউটিউবই তাদের বাঁচার পথ সুগম করে দিচ্ছে। সেটি তারা স্বীকার করুক আর না-ই করুক। এ তালিকায় রয়েছেন নাট্যাভিনেত্রী মেহজাবিন চৌধুরী। কয়েক বছর আগেই তিনি নিজের নামে ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। সেখানে বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট আপলোড করেছেন। বিশেষ করে করোনা দুর্যোগে ঘরবন্দি থাকাকালে সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছেন ইউটিউব চ্যানেলে। চ্যানেলটি থেকে বর্তমানে আয়-রোজগার বেশ ভালোই হচ্ছে। নিজের চ্যানেল প্রসঙ্গে মেহজাবিন গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘চ্যানেলটি করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দুটি। এক. দেশের বাইরে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাগুলো ভিডিও করে আপলোড করা। প্রতিদিনের নিজের অভিজ্ঞতা ভক্তদের সঙ্গে শেয়ার করা। পাশাপাশি এখান থেকে আয়ও হয়। দুই. সব কাজের অভিজ্ঞতাগুলো এখানে আর্কাইভ হিসেবে থাকছে। ভবিষ্যতে আমি যদি পরিকল্পিতভাবে কন্টেন্ট দিই তাহলে আর্থিকভাবে আরও লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে।’ আর্থিক বিষয়টি উল্লেখ করলেও ইউটিউবকে আয়ের শেষ ভরসা হিসেবে মানছেন না এ তারকাশিল্পী।

দেশের প্রথমসারির বিদ্যা সিনহা মিমও এ করোনাকালে নিজের ইউটিউব চ্যানেল খুলে নিজের প্রযোজিত একটি শর্টফিল্ম এবং একটি আড্ডার অনুষ্ঠান আপলোড করেছেন। চ্যানেলটি তিনি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে করার কথা না বললেও এর থেকে আয়ের বিষয়টি তার চলার পথকে মসৃণ রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মিম বলেন, ‘করোনার মধ্যে বাসায় অযথা বসে না থেকে কিছু ভিন্নধর্মী কাজ করার চিন্তা করলাম। সেই চিন্তা থেকেই ইউটিউব চ্যানেল খোলা ও কনটেন্ট আপলোড করা। যদিও আমি বেশ আগে থেকেই এ ধরনের কিছু করার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু সময়ের অভাবে করতে পারছিলাম না। অবশেষে করোনার অবসর আমাকে সে সুযোগ করে দিয়েছে। বাণিজ্যিক বিষয়টি অগ্রাধিকার না পেলেও এখান থেকে অর্থ আসবে- এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে আমি ইউটিউবকে আয়-রোজগারের শেষ মাধ্যম হিসেবে একেবারেই ভাবছি না। আমার বিশ্বাস, করোনার এ দুঃসময় একদিন কেটে যাবে। আবারও আমরা শুটিং কলরবে মেতে উঠব।’

জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীও একটি ইউটিউব চ্যানেলের মালিক। এ অভিনেতা পেশা হিসেবে একমাত্র অভিনয়কেই এখনও প্রাধান্য দিচ্ছেন। তাই নিজের অভিনীত কিছু ভিন্নধর্মী কাজ দর্শকদের সঙ্গে শেয়ার করতেই গত বছরের শেষ দিকে নিজের নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে ‘ফিরে পাওয়া ঠিকানা’ নামে একটি মুক্তিযুদ্ধের নাটক আপলোড করে ইউটিউব জগতে পা রাখেন। গণমাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, এ চ্যানেলটি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নয় বরং ভালো কিছু উপহার দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হবে। তিনি বলেন, ‘টিভিতে সময়ের অভাবে অনেক কিছুই মানুষ মিস করেন। ইউটিউবে দেখার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় লাগে না। তাই ভালো কিছু কনটেন্ট তৈরি করে দর্শকের উপহার দেয়ার জন্যই এ চ্যানেল নিয়ে যাত্রা শুরু করেছি। ভালো কিছু কাজ দিয়ে আমার চ্যানেলটিকে সমৃদ্ধ করতে চাই।’

ইউটিউব চ্যানেল নিয়ে কাজ করছেন এমন তালিকায় আরও রয়েছেন চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি, অভিনেত্রী অর্চিতা স্পর্শিয়া, সাফা কবির ও মুমতাহিনা টয়াসহ আরও অনেকে।

অভিনয়শিল্পীদের বাইরে গানের অনেক শিল্পীর ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন মনির খান, এসডি রুবেল, ডলি সায়ন্তনী, রবি চৌধুরী, আসিফ আকবর, তাহসান, হৃদয় খান ও হাবিব ওয়াহিদ। তারা নিজেদের গান নিজেদের চ্যানেলেই আপলোড করেন। সেখান থেকে কেউ কেউ বাণিজ্যিকভাবে বেশ লাভবানও হচ্ছেন। অভিনয় কিংবা গান, যাই হোক না কেন- এরই মধ্যে অনেক তারকাশিল্পী এ প্ল্যাটফর্ম নিয়ে বেশ গুরুত্ব দিয়েই কাজ শুরু করার চিন্তা করছেন। কারণ করোনাপরবর্তী বিশ্ব ব্যাপক বদলে যাবে। বদলে যাবে কাজের ধরন। সেই ধরনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সময়ও লাগবে। তার আগেই যদি আয়-রোজগারের কিছু ব্যবস্থা করে রাখা যায় তবে মন্দ কী? তাই শুধু করোনাকালের জন্য হলেও বলা যায়, ইউটিউবই আপাত ক্ষেত্রে তারকাদের আয়ের শেষ ভরসা। তবে এসব ভাবনা শুধুই তারকাশিল্পীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ ইউটিউব চ্যানেল থেকে আয় করতে হলে সেটিকে আগে পরিচিত করতে হয় বা সাবস্ক্রাইবার বাড়াতে হয়। নতুন কিংবা স্বল্প পরিচিত একজন শিল্পীর চ্যানেলকে দাঁড় করাতে হলে অনেক সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু একজন বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয় তারকার চ্যানেল খুব সহজেই সাবস্ক্রাইবার বেড়ে যায়। স্বভাবতই তাদের আয়-রোজগারের পথও সুগম হয় দ্রুত।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন