করোনাকালে অডিও গানে ফিরে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল
jugantor
করোনাকালে অডিও গানে ফিরে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল

  এসএম শাফায়েত  

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাকালে অডিও গানে ফিরে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল

করোনার প্রকোপে থমকে আছে বিশ্ব। সীমিত আকারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবকিছু চললেও আসলে পৃথিবী কিন্তু আগের মতো গতিশীল নয়। করোনা যতটা না বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ক্ষতি করেছে তার চেয়ে বেশি করেছে মানসিক। মানুষের জীবনে ছন্দপতন ঘটেছে।

তবে একটি কথা অনস্বীকার্য, সবদিক থেকে ক্ষতি হলেও মানুষের জীবনে একটি বিষয়ে দারুণ ইতিবাচক ধারা তৈরি করেছে এ করোনাভাইরাস। তা হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। ব্যস্ততার কারণে পরিবারকে সময় দিতে না পারা মানুষগুলো এ সময়টাতে আপনজনকে কাছে পেয়েছে অনেক বেশি। পাশাপাশি সৃজনশীল কাজগুলোতেও ভিন্ন ধারার পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছে এ ভাইরাস। যেমন, গানের জগৎ।

বর্তমানে মিউজিক ভিডিওর আড়ালে প্রায় অনেকটাই হারিয়ে গেছে অডিও গান। এ করোনাকাল হতে পারত গানের সেই অডিওতে ফিরে যাওয়ার সুবর্ণ সময়। সেটা কীভাবে?

প্রায় সব ভাষাভাষী, দেশ ও জাতির সঙ্গে সঙ্গীতের এক গভীর সম্পর্ক থাকে। থাকে সোনালি অতীত কিংবা স্বর্ণযুগ। বাংলাভাষায় রচিত ও বিভিন্ন শৈলীর সুরে সমৃদ্ধ বাংলা সঙ্গীত ধারাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তার অধিকারী। বাংলা আধুনিক গানের ধারাটিও যথেষ্ট সমৃদ্ধ।

যেমন ইংরেজি পপ রক ও ব্যান্ডের গানের ক্ষেত্রে বলা হয়, ষাট ও সত্তরের দশক ছিল তাদের সোনালি অতীত। তেমনি বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বলা হয় আশি ও নব্বইয়ের দশক ছিল স্বর্ণযুগ। অসাধারণ সব গান সৃষ্টি হয়েছে সে সময়। যেমন সুর, কথা ও কম্পোজিশন।

ব্যান্ড সঙ্গীত একটি উদাহরণ মাত্র। বাংলা আধুনিক কিংবা সমসাময়িক গানেরও স্বর্ণযুগ ছিল আজ থেকে দশ বছর আগেও। বিশেষ করে অডিও গান। গ্রামোফোনের যুগ পেরিয়ে ফিতার ক্যাসেট, পরবর্তীতে সিডি- সব মাধ্যমেই বাংলা গানের বাহারি আয়োজন ছিল চোখে পড়ার মতো। সেসব গানের সুর শ্রোতাদের কানে আজও লেগে আছে। ইচ্ছা করলেই ভোলা যায় না। এখনও নস্টালজিয়ায় ভোগেন এমন মানুষের সংখ্যা অগণিত। কিন্তু কালের বিবর্তনে অডিও গান শোনার বিষয়টি হয়ে গেল ‘দেখার বিষয়’!

প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে গান এখন ভিডিওচিত্রে পরিণত হয়েছে। দেখা ছাড়া এখন গান শোনাটা যেন অকল্পনীয়! বাণিজ্যিক দিক থেকে বিষয়টি মেনে নেয়া গেলেও, অডিও গান যে হারিয়ে যেতে বসেছে সেটা ভাবার মতো সময় নেই যেন কারও! গানের অডিওর চেয়ে ভিডিওতে গুরুত্ব বেশি দেয়ায় গানের কথা মন থেকে হারিয়ে গেছে মুহূর্তে।

বলা চলে, এক ধরনের হতাশায় ডুবছে বাংলা গান। শোনার মাধ্যম দ্রুত বদলে যাওয়ায় শ্রোতাও বিভ্রান্ত। গানের বোঝা বইতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। শিল্পী থেকে শুরু করে গীতিকার, সুরকার, যন্ত্রী ও অডিও কোম্পানি- সবাই অনিশ্চয়তায়। স্থিতিশীলতা নেই গানের বাজারে। এটি নিয়ন্ত্রণের কোনো পদ্ধতিও জানা নেই কারও। একটা সময় ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনার বিষয়টি ব্যাপক প্রচলিত ছিল। মূলত নব্বই দশক থেকে এ শতকের শুরু পর্যন্ত ক্যাসেটে গানের অ্যালবাম প্রকাশ করা হতো। এরপর সিডি প্লেয়ারে গান শোনা শুরু হলে দ্রুত হারিয়ে যায় ক্যাসেট। কিন্তু বর্তমানে সবকিছুকে ছাড়িয়ে জায়গা করে নিয়েছে অনলাইনে গানের প্রকাশনা। ভিউয়ার্স রোগে ভুগছেন সবাই। সঙ্গে হতাশাও যোগ হচ্ছে। সেটা প্রকাশ করুক আর না করুক!

এ হতাশাটা কাটিয়ে উঠার একটি উপযুক্ত মাধ্যম ছিল করোনাকাল। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। করোনাকালে গান আবারও ফিরে যেতে পারত অডিওর জগতে। সেটা স্বর্ণযুগ না হোক, রৌপ্য, তাম্র- কিছু একটা তো হতো! কীভাবে?

করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে দীর্ঘ পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল গান ও গানচিত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম। মূলত, স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকায় কাজ বন্ধ হয়ে অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছিল বলা চলে এ ভার্চুয়াল গানের বাজার। তবে এ সুযোগে আবারও চাইলে ফিরে যাওয়া যেত ক্যাসেট ঘরানা বা অডিও গানের যুগে। যেহেতু গানচিত্র নির্মাণে অর্থাৎ শুটিংয়ে বাধা ছিল, তাই ঘরে বসে স্টুডিও ভার্সন হিসেবে তা প্রকাশ করলে মন্দ হতো না।

জোর দিয়ে বলা যায়, চিত্রহীন গান শুনলে আবারও হৃদ্যতা গড়ে উঠত গানের সঙ্গে শ্রোতাদের মনের। অনলাইনে প্রকাশের জন্য যেহেতু ভিডিও লাগবেই, তাই ঘরে বসে কিংবা স্টুডিওতেই কণ্ঠ দেয়ার পাশাপাশি শিল্পীর ভিডিওচিত্রটুকুও ধারণ করা কোনো কঠিন কাজ ছিল না। এতে খরচ কমত। শ্রোতা-দর্শকরা মডেল কিংবা লোকেশনের চাকচিক্যের চেয়ে শিল্পীর কণ্ঠের দিকে বেশি নজর দিতেন। গানের কথার সঙ্গে একাত্ম হতে পারতেন। সর্বোপরি গান হয়ে উঠত আবারও অডিওময়। কিন্তু সে সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেননি আমাদের সঙ্গীত জগতের বাসিন্দারা।

করোনার মতো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি আমাদের কখনও : কুমার বিশ্বজিৎ

করোনাকালে গানের অডিওতে ফিরে যাওয়ার অবস্থা ছিল বলেই মনে করেন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ। তিনি বলেন, ‘একটি সময় ছিল যখন ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনার স্বর্ণযুগ ছিল। তখন নন-ফিল্মের গানগুলোর ওতটা ভিডিও হতো না। গানগুলো শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে, তারা গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে স্বপ্নে বিভোর হয়েছে। নিজের মতো করে গানের কথার সঙ্গে একটা দৃশ্যকল্প তৈরি করে নিয়েছে। সেখানে প্রিয়জনকে নিয়ে হেঁটেছে, খুনসুটি করেছে, কেঁদেছে- আরও কত কী! কিন্তু এখন তো আর স্বপ্ন দেখা কিংবা ভাবতে হয় না।

মিউজিক ভিডিওতেই পুরো গানের গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়। উল্টো শ্রোতাদের পরিশ্রম কমে গেছে বলে মনে করা হয়! অথচ আমি মনে করি, গান প্রকৃতপক্ষে শোনার ও উপলব্ধির বিষয়। আপনি যখন মিউজিক ভিডিও বানিয়ে দেবেন তখন আর ভাবনার জায়গাটি থাকছে না। তবে করোনাভাইরাসের কারণে যেহেতু ভিডিও চিত্রধারণ করা সম্ভব হয়নি এতদিন, তাই সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগ নিলে স্টুডিও ভার্সনে অডিও গানের প্রতি শ্রোতাদের আগ্রহের জায়গা তৈরি করে নেয়া যেতে পারত। কিন্তু করোনার মতো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি আমাদের কখনও। তাই তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই আমাদের। আর এ বিষয় নিয়ে ভাবনার সুযোগটিও আমাদের হয়নি।

এখন তো বহির্বিশ্বে গান নিয়ে বহু পরিকল্পনা করা হচ্ছে। গাড়িতে বসে কনসার্ট দেখার আয়োজনের কথাও শোনা যাচ্ছে। কয়েকটি জায়গায় করছেও। তবে স্টুডিও ভার্সনে অডিও গানে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি একটু ভিন্ন। যার স্টুডিও নেই, সে হয়তো একটি গিটার নিয়ে গান করত। কিন্তু এক্ষেত্রে গানের সেই অলঙ্করণ পাওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে অ্যাপসের মাধ্যমে অডিও গানের প্রসার ঘটানো গেলে অনেকটা সম্ভাবনার জায়গা তৈরি হবে।

যাতে মিউজিক ভিডিও নির্মাণের ব্যয় আর শুটিংয়ের ভেজাল কমবে, শিল্পীরা যথাযথ সম্মানী পাবে। এ পরিস্থিতিতে মানুষকে গান শোনানোর মধ্য দিয়ে মানসিক শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি অবলম্বন হতে পারত। কারণ সঙ্গীত অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রাণশক্তি। স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন সঙ্গীত মানুষকে আন্দোলিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। তেমনিভাবে চাইলে আবারও ওইভাবে ব্যবহার করা যেতে পারত বলেই আমি মনে করি।’

সবাই আসলে বেঁচে থাকার বিষয়টিই ভাবছেন এ সময় : ধ্রুব গুহ

করোনাকালে অডিও গানের প্রতি অধিক গুরুত্ব দেয়া যেত বলে মনে করেন সঙ্গীতশিল্পী ও দেশের শীর্ষস্থানীয় অডিও-ভিডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের কর্ণধার ধ্রুব গুহ। তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক যে এখন ভিডিওর আধিক্যের জন্য অডিও গানের প্রতি শ্রোতাদের মনোযোগ নষ্ট হয়ে গেছে। ভিডিও দেখতে গিয়ে অডিওতে কী আছে কিংবা সেটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারছেন না। এটা সঙ্গীতের জন্য খুব ভালো কথা নয়। কিন্তু সময়কে অস্বীকার করারও তো কোনো উপায় নেই। আপনাকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে হবে। নতুবা পিছিয়ে পড়বেন।

তবে আমি সবসময় অডিওটাকে সামনে রাখতে চাই। ভিডিও তো গানের অনুষঙ্গ মাত্র। অডিওটাই আসল। সেটি যত মানসম্পন্ন ও শ্রুতিমধুর ততটাই শ্রোতার কানে এবং কণ্ঠে দুটোতেই থাকবে। পাশাপাশি এটাও সত্যি, করোনার এ দীর্ঘ সময়ে আমাদের গান আবারও অডিওতে ফিরে যেতে পারত। যেহেতু করোনার মধ্যে দীর্ঘদিন ভিডিওর শুটিং করতে পারেননি কেউ। সময়ের চাহিদা মেটাতে শুধু শিল্পীর উপস্থিতিতে অডিও গানের স্টুডিও ভার্সন প্রকাশ করতে পারতেন। কিন্তু সেটি বুঝতে ওতো সময় লেগেছে। কারণ করোনাভাইরাস কতদিন থাকবে, কবে যাবে, সতর্কতা অবলম্বন করে সচেতন থাকতে গিয়ে বাইরে বের না হওয়া- সবকিছু মিলিয়েই সবাই ছিলেন চিন্তাক্লিষ্ট। এসব কারণে গান নিয়ে আলাদা কিছু ভাবার মতো হয়তো মানসিক অবস্থা ছিলও না কারও। সুবর্ণ সুযোগ বা অন্য যাই কিছু বলুন, মানুষ বেঁচে থাকা নিয়েই বেশি ভেবেছেন। তাই ভাবনার জগতে অন্য কিছু কারোই ছিল না বলে আমার মনে হয়। তবে সময়টা যে সুবর্ণ ছিল সেটি স্বীকার করতেই হবে।’

মানুষ এখন আর স্টুডিও ভার্সনে গান শুনতে চান না : সোহেল

করোনাকালের মধ্যে অডিও গানের স্বর্ণযুগে ফিরে যাওয়ার কতটা সম্ভব ছিল এমন প্রশ্নে দেশের আরেক শীর্ষস্থানীয় অডিও-ভিডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিডি চয়েসের কর্ণধার জ‌হিরুল ইসলাম সোহেলবলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি আমাদের কাছে একটি দুর্যোগের মতো। হঠাৎ করে আমরা চিন্তাও করিনি, এটি এমন দীর্ঘমেয়াদি হবে। এখন টেকনোলজির পরিবর্তনের কারণে আমরা ইন্টারনেটের কাছে এতটাই অসহায়, গান হয়ে গেছে মূলত দেখার মাধ্যম। সময়টা এমন হয়ে গেছে যে, এখন আর কেউ অডিও শুনতে অভ্যস্ত নন, তারা ভিডিও গানে আগ্রহী।

বছরখানেক আগেও ইউটিউবে কোনো লিরিক্যাল ভিডিও প্রকাশ করা হলে লাখের ওপরে ভিউ হতো। আর এখন তা ১০-১৫ হাজারে নেমে এসেছে, যা শিল্পীর জন্য অসম্মানজনক। কারণ মানুষ এখন আর স্টুডিও ভার্সনে গান শুনতে চান না। তবে পুরনো দিনের গানগুলো স্টুডিও ভার্সনে শুনতে অভ্যস্ত তারা। কিন্তু বর্তমানে যে গানগুলো প্রকাশ হচ্ছে, তার সঙ্গে ভিডিও চান শ্রোতারা।

আগে যেমন গান শুধু শোনা হতো, আর এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে তা বদলে দেখার মাধ্যমে রূপ নিয়েছে। এখন মানুষ গান শোনেন বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে। সেখানে তারা শুধু অডিওটি শোনেন। আমি মোটামুটি আশাবাদী, অ্যাপসে গান শোনার এ মাধ্যমটি আরও উন্নত হবে। আগে যেটি ক্যাসেট প্লেয়ার, ভিসিডি ও সিডিতে শোনা হতো, সেটি এখন মোবাইলে শোনা যাবে।’

করোনাকালে অডিও গানে ফিরে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল

 এসএম শাফায়েত 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
করোনাকালে অডিও গানে ফিরে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল
কুমার বিশ্বজিৎ, ধ্রুব গুহ ও জ‌হিরুল ইসলাম সোহেল (বাঁ থেকে)

করোনার প্রকোপে থমকে আছে বিশ্ব। সীমিত আকারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবকিছু চললেও আসলে পৃথিবী কিন্তু আগের মতো গতিশীল নয়। করোনা যতটা না বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ক্ষতি করেছে তার চেয়ে বেশি করেছে মানসিক। মানুষের জীবনে ছন্দপতন ঘটেছে।

তবে একটি কথা অনস্বীকার্য, সবদিক থেকে ক্ষতি হলেও মানুষের জীবনে একটি বিষয়ে দারুণ ইতিবাচক ধারা তৈরি করেছে এ করোনাভাইরাস। তা হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। ব্যস্ততার কারণে পরিবারকে সময় দিতে না পারা মানুষগুলো এ সময়টাতে আপনজনকে কাছে পেয়েছে অনেক বেশি। পাশাপাশি সৃজনশীল কাজগুলোতেও ভিন্ন ধারার পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছে এ ভাইরাস। যেমন, গানের জগৎ।

বর্তমানে মিউজিক ভিডিওর আড়ালে প্রায় অনেকটাই হারিয়ে গেছে অডিও গান। এ করোনাকাল হতে পারত গানের সেই অডিওতে ফিরে যাওয়ার সুবর্ণ সময়। সেটা কীভাবে? 

প্রায় সব ভাষাভাষী, দেশ ও জাতির সঙ্গে সঙ্গীতের এক গভীর সম্পর্ক থাকে। থাকে সোনালি অতীত কিংবা স্বর্ণযুগ। বাংলাভাষায় রচিত ও বিভিন্ন শৈলীর সুরে সমৃদ্ধ বাংলা সঙ্গীত ধারাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তার অধিকারী। বাংলা আধুনিক গানের ধারাটিও যথেষ্ট সমৃদ্ধ।

যেমন ইংরেজি পপ রক ও ব্যান্ডের গানের ক্ষেত্রে বলা হয়, ষাট ও সত্তরের দশক ছিল তাদের সোনালি অতীত। তেমনি বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বলা হয় আশি ও নব্বইয়ের দশক ছিল স্বর্ণযুগ। অসাধারণ সব গান সৃষ্টি হয়েছে সে সময়। যেমন সুর, কথা ও কম্পোজিশন।

ব্যান্ড সঙ্গীত একটি উদাহরণ মাত্র। বাংলা আধুনিক কিংবা সমসাময়িক গানেরও স্বর্ণযুগ ছিল আজ থেকে দশ বছর আগেও। বিশেষ করে অডিও গান। গ্রামোফোনের যুগ পেরিয়ে ফিতার ক্যাসেট, পরবর্তীতে সিডি- সব মাধ্যমেই বাংলা গানের বাহারি আয়োজন ছিল চোখে পড়ার মতো। সেসব গানের সুর শ্রোতাদের কানে আজও লেগে আছে। ইচ্ছা করলেই ভোলা যায় না। এখনও নস্টালজিয়ায় ভোগেন এমন মানুষের সংখ্যা অগণিত। কিন্তু কালের বিবর্তনে অডিও গান শোনার বিষয়টি হয়ে গেল ‘দেখার বিষয়’!

প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে গান এখন ভিডিওচিত্রে পরিণত হয়েছে। দেখা ছাড়া এখন গান শোনাটা যেন অকল্পনীয়! বাণিজ্যিক দিক থেকে বিষয়টি মেনে নেয়া গেলেও, অডিও গান যে হারিয়ে যেতে বসেছে সেটা ভাবার মতো সময় নেই যেন কারও! গানের অডিওর চেয়ে ভিডিওতে গুরুত্ব বেশি দেয়ায় গানের কথা মন থেকে হারিয়ে গেছে মুহূর্তে।

বলা চলে, এক ধরনের হতাশায় ডুবছে বাংলা গান। শোনার মাধ্যম দ্রুত বদলে যাওয়ায় শ্রোতাও বিভ্রান্ত। গানের বোঝা বইতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। শিল্পী থেকে শুরু করে গীতিকার, সুরকার, যন্ত্রী ও অডিও কোম্পানি- সবাই অনিশ্চয়তায়। স্থিতিশীলতা নেই গানের বাজারে। এটি নিয়ন্ত্রণের কোনো পদ্ধতিও জানা নেই কারও। একটা সময় ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনার বিষয়টি ব্যাপক প্রচলিত ছিল। মূলত নব্বই দশক থেকে এ শতকের শুরু পর্যন্ত ক্যাসেটে গানের অ্যালবাম প্রকাশ করা হতো। এরপর সিডি প্লেয়ারে গান শোনা শুরু হলে দ্রুত হারিয়ে যায় ক্যাসেট। কিন্তু বর্তমানে সবকিছুকে ছাড়িয়ে জায়গা করে নিয়েছে অনলাইনে গানের প্রকাশনা। ভিউয়ার্স রোগে ভুগছেন সবাই। সঙ্গে হতাশাও যোগ হচ্ছে। সেটা প্রকাশ করুক আর না করুক!

এ হতাশাটা কাটিয়ে উঠার একটি উপযুক্ত মাধ্যম ছিল করোনাকাল। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। করোনাকালে গান আবারও ফিরে যেতে পারত অডিওর জগতে। সেটা স্বর্ণযুগ না হোক, রৌপ্য, তাম্র- কিছু একটা তো হতো! কীভাবে?

করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে দীর্ঘ পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল গান ও গানচিত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম। মূলত, স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকায় কাজ বন্ধ হয়ে অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছিল বলা চলে এ ভার্চুয়াল গানের বাজার। তবে এ সুযোগে আবারও চাইলে ফিরে যাওয়া যেত ক্যাসেট ঘরানা বা অডিও গানের যুগে। যেহেতু গানচিত্র নির্মাণে অর্থাৎ শুটিংয়ে বাধা ছিল, তাই ঘরে বসে স্টুডিও ভার্সন হিসেবে তা প্রকাশ করলে মন্দ হতো না।

জোর দিয়ে বলা যায়, চিত্রহীন গান শুনলে আবারও হৃদ্যতা গড়ে উঠত গানের সঙ্গে শ্রোতাদের মনের। অনলাইনে প্রকাশের জন্য যেহেতু ভিডিও লাগবেই, তাই ঘরে বসে কিংবা স্টুডিওতেই কণ্ঠ দেয়ার পাশাপাশি শিল্পীর ভিডিওচিত্রটুকুও ধারণ করা কোনো কঠিন কাজ ছিল না। এতে খরচ কমত। শ্রোতা-দর্শকরা মডেল কিংবা লোকেশনের চাকচিক্যের চেয়ে শিল্পীর কণ্ঠের দিকে বেশি নজর দিতেন। গানের কথার সঙ্গে একাত্ম হতে পারতেন। সর্বোপরি গান হয়ে উঠত আবারও অডিওময়। কিন্তু সে সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেননি আমাদের সঙ্গীত জগতের বাসিন্দারা।

করোনার মতো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি আমাদের কখনও : কুমার বিশ্বজিৎ

করোনাকালে গানের অডিওতে ফিরে যাওয়ার অবস্থা ছিল বলেই মনে করেন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ। তিনি বলেন, ‘একটি সময় ছিল যখন ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শোনার স্বর্ণযুগ ছিল। তখন নন-ফিল্মের গানগুলোর ওতটা ভিডিও হতো না। গানগুলো শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে, তারা গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে স্বপ্নে বিভোর হয়েছে। নিজের মতো করে গানের কথার সঙ্গে একটা দৃশ্যকল্প তৈরি করে নিয়েছে। সেখানে প্রিয়জনকে নিয়ে হেঁটেছে, খুনসুটি করেছে, কেঁদেছে- আরও কত কী! কিন্তু এখন তো আর স্বপ্ন দেখা কিংবা ভাবতে হয় না।

মিউজিক ভিডিওতেই পুরো গানের গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়। উল্টো শ্রোতাদের পরিশ্রম কমে গেছে বলে মনে করা হয়! অথচ আমি মনে করি, গান প্রকৃতপক্ষে শোনার ও উপলব্ধির বিষয়। আপনি যখন মিউজিক ভিডিও বানিয়ে দেবেন তখন আর ভাবনার জায়গাটি থাকছে না। তবে করোনাভাইরাসের কারণে যেহেতু ভিডিও চিত্রধারণ করা সম্ভব হয়নি এতদিন, তাই সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগ নিলে স্টুডিও ভার্সনে অডিও গানের প্রতি শ্রোতাদের আগ্রহের জায়গা তৈরি করে নেয়া যেতে পারত। কিন্তু করোনার মতো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি আমাদের কখনও। তাই তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই আমাদের। আর এ বিষয় নিয়ে ভাবনার সুযোগটিও আমাদের হয়নি।

এখন তো বহির্বিশ্বে গান নিয়ে বহু পরিকল্পনা করা হচ্ছে। গাড়িতে বসে কনসার্ট দেখার আয়োজনের কথাও শোনা যাচ্ছে। কয়েকটি জায়গায় করছেও। তবে স্টুডিও ভার্সনে অডিও গানে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি একটু ভিন্ন। যার স্টুডিও নেই, সে হয়তো একটি গিটার নিয়ে গান করত। কিন্তু এক্ষেত্রে গানের সেই অলঙ্করণ পাওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে অ্যাপসের মাধ্যমে অডিও গানের প্রসার ঘটানো গেলে অনেকটা সম্ভাবনার জায়গা তৈরি হবে।

যাতে মিউজিক ভিডিও নির্মাণের ব্যয় আর শুটিংয়ের ভেজাল কমবে, শিল্পীরা যথাযথ সম্মানী পাবে। এ পরিস্থিতিতে মানুষকে গান শোনানোর মধ্য দিয়ে মানসিক শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি অবলম্বন হতে পারত। কারণ সঙ্গীত অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রাণশক্তি। স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন সঙ্গীত মানুষকে আন্দোলিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। তেমনিভাবে চাইলে আবারও ওইভাবে ব্যবহার করা যেতে পারত বলেই আমি মনে করি।’

সবাই আসলে বেঁচে থাকার বিষয়টিই ভাবছেন এ সময় : ধ্রুব গুহ

করোনাকালে অডিও গানের প্রতি অধিক গুরুত্ব দেয়া যেত বলে মনে করেন সঙ্গীতশিল্পী ও দেশের শীর্ষস্থানীয় অডিও-ভিডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের কর্ণধার ধ্রুব গুহ। তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক যে এখন ভিডিওর আধিক্যের জন্য অডিও গানের প্রতি শ্রোতাদের মনোযোগ নষ্ট হয়ে গেছে। ভিডিও দেখতে গিয়ে অডিওতে কী আছে কিংবা সেটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারছেন না। এটা সঙ্গীতের জন্য খুব ভালো কথা নয়। কিন্তু সময়কে অস্বীকার করারও তো কোনো উপায় নেই। আপনাকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে হবে। নতুবা পিছিয়ে পড়বেন।

তবে আমি সবসময় অডিওটাকে সামনে রাখতে চাই। ভিডিও তো গানের অনুষঙ্গ মাত্র। অডিওটাই আসল। সেটি যত মানসম্পন্ন ও শ্রুতিমধুর ততটাই শ্রোতার কানে এবং কণ্ঠে দুটোতেই থাকবে। পাশাপাশি এটাও সত্যি, করোনার এ দীর্ঘ সময়ে আমাদের গান আবারও অডিওতে ফিরে যেতে পারত। যেহেতু করোনার মধ্যে দীর্ঘদিন ভিডিওর শুটিং করতে পারেননি কেউ। সময়ের চাহিদা মেটাতে শুধু শিল্পীর উপস্থিতিতে অডিও গানের স্টুডিও ভার্সন প্রকাশ করতে পারতেন। কিন্তু সেটি বুঝতে ওতো সময় লেগেছে। কারণ করোনাভাইরাস কতদিন থাকবে, কবে যাবে, সতর্কতা অবলম্বন করে সচেতন থাকতে গিয়ে বাইরে বের না হওয়া- সবকিছু মিলিয়েই সবাই ছিলেন চিন্তাক্লিষ্ট। এসব কারণে গান নিয়ে আলাদা কিছু ভাবার মতো হয়তো মানসিক অবস্থা ছিলও না কারও। সুবর্ণ সুযোগ বা অন্য যাই কিছু বলুন, মানুষ বেঁচে থাকা নিয়েই বেশি ভেবেছেন। তাই ভাবনার জগতে অন্য কিছু কারোই ছিল না বলে আমার মনে হয়। তবে সময়টা যে সুবর্ণ ছিল সেটি স্বীকার করতেই হবে।’

মানুষ এখন আর স্টুডিও ভার্সনে গান শুনতে চান না : সোহেল

করোনাকালের মধ্যে অডিও গানের স্বর্ণযুগে ফিরে যাওয়ার কতটা সম্ভব ছিল এমন প্রশ্নে দেশের আরেক শীর্ষস্থানীয় অডিও-ভিডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিডি চয়েসের কর্ণধার জ‌হিরুল ইসলাম সোহেল বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি আমাদের কাছে একটি দুর্যোগের মতো। হঠাৎ করে আমরা চিন্তাও করিনি, এটি এমন দীর্ঘমেয়াদি হবে। এখন টেকনোলজির পরিবর্তনের কারণে আমরা ইন্টারনেটের কাছে এতটাই অসহায়, গান হয়ে গেছে মূলত দেখার মাধ্যম। সময়টা এমন হয়ে গেছে যে, এখন আর কেউ অডিও শুনতে অভ্যস্ত নন, তারা ভিডিও গানে আগ্রহী।

বছরখানেক আগেও ইউটিউবে কোনো লিরিক্যাল ভিডিও প্রকাশ করা হলে লাখের ওপরে ভিউ হতো। আর এখন তা ১০-১৫ হাজারে নেমে এসেছে, যা শিল্পীর জন্য অসম্মানজনক। কারণ মানুষ এখন আর স্টুডিও ভার্সনে গান শুনতে চান না। তবে পুরনো দিনের গানগুলো স্টুডিও ভার্সনে শুনতে অভ্যস্ত তারা। কিন্তু বর্তমানে যে গানগুলো প্রকাশ হচ্ছে, তার সঙ্গে ভিডিও চান শ্রোতারা।

আগে যেমন গান শুধু শোনা হতো, আর এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে তা বদলে দেখার মাধ্যমে রূপ নিয়েছে। এখন মানুষ গান শোনেন বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে। সেখানে তারা শুধু অডিওটি শোনেন। আমি মোটামুটি আশাবাদী, অ্যাপসে গান শোনার এ মাধ্যমটি আরও উন্নত হবে। আগে যেটি ক্যাসেট প্লেয়ার, ভিসিডি ও সিডিতে শোনা হতো, সেটি এখন মোবাইলে শোনা যাবে।’