করোনাকালে অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিক বাড়ানো কতটা যৌক্তিক
jugantor
করোনাকালে অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিক বাড়ানো কতটা যৌক্তিক
করোনার প্রকোপে পরিবর্তন এসেছে দেশের নাট্যাঙ্গনেও। বিশেষ করে অনেক কাটছাঁট করে নির্মিত হচ্ছে নাটক। একদিকে বাজেট সংকোচনে ব্যস্ত চ্যানেল কর্তৃপক্ষ, অন্যদিকে কিছুসংখ্যক তারকা এ দুঃসময়ে পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করেছেন। এ নিয়ে নাটকপাড়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলছে। বিস্তারিত লিখেছেন-

  সোহেল আহসান  

১৪ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই একটু একটু করে এগিয়েছে টিভি নাটক। এক সময় শুধু বিটিভিকেন্দ্রিক ছিল টিভি নাটক। একঝাঁক মেধাবী ও গুণী অভিনয়শিল্পীর সমন্বয়ে বর্ণিল হয়ে উঠত সেসব নাটক। দর্শকও সে সময় প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে নাটক দেখতেন। এভাবেই চলছিল টিভি নাটক। কিন্তু একুশ শতকের সূচনা লগ্ন থেকে পাল্টাতে থাকে টিভি নাটক। বিশেষ করে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের আবির্ভাবের ফলে নাটক নির্মাণের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং বাড়তে থাকে অভিনয়শিল্পীর সংখ্যা। স্যাটেলাইট চ্যানেল প্রচারে আসার পর একখণ্ড ও ধারাবাহিক নাটকে মনোযোগী হওয়ায় প্রত্যাশিতভাবেই অভিনয়শিল্পীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ফলে দর্শকের পছন্দের নাটক দেখার সুযোগও প্রসারিত হতে থাকে। তখন বিটিভিতে অডিশন দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সেই চ্যানেলে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া যেত। যদিও বিটিভিতে সেই ধারাটা এখনো প্রচলিত আছে। পাশাপাশি প্যাকেজ আওতায় নির্মিত নাটকের শিল্পীদের অডিশন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে অনেক টিভি চ্যানেলে নাটক প্রচার হয়। চ্যানেল বেশি হওয়ার কারণে নাটক নির্মাণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সব অভিনয়শিল্পীকে কাজে লাগানো হয় না। সব সময়ই কয়েকজন অভিনয়শিল্পীকে নির্ধারিত করে দেওয়া হয় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো থেকে। তাদের ব্যাখ্যা হলো, নির্দিষ্ট সেই অল্পসংখ্যক অভিনয় তারকা ছাড়া নাটক মার্কেটিং করতে চ্যানেলের সমস্যা হয়। তাই নির্মাতারা অনেকটা বাধ্য হয়েই সেসব তারকা অভিনয়শিল্পীকে দিয়ে নাটক নির্মাণ করছেন এখন।

ঠিক এ সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছেন এসব অভিনয়শিল্পীও। ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করে চলেছেন নিজেদের পারিশ্রমিক। যদিও তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তারা নির্মাতার দিকে প্রশ্নটি ছুড়ে দেন। তারা বলেন, নির্মাতারা না চাইলে তো আর তারা উপযাচক হয়ে অভিনয় করেন না।

নতুন বছরের শুরু থেকেই নাটকপাড়ায় অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা মুখর হয়ে উঠেছে। নাট্যাঙ্গনের সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারাও এ নিয়ে চিন্তিত। কারণ বর্তমানে নাটকের দাম তো বাড়েনি, তার ওপর চ্যানেল থেকে অর্থ ছাড় করতেও ব্যাপক সমস্যায় পড়েন নির্মাতা ও প্রযোজকরা। এমন একটি সময়ে কিছুসংখ্যক অভিনয় তারকা পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করেছেন; যা নেতিবাচকভাবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। পারিশ্রমিক বৃদ্ধির তালিকায় এ সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, আফরান নিশো, তৌসিফ, জোভান, মেহজাবিন, সাফা কবির, তানজিন তিশা, সাবিলা নূরসহ অনেকেরই নাম শোনা যাচ্ছে নির্মাতাদের কাছ থেকে। করোনার এ সময়ে পারিশ্রমিক বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে অন্য অনেক অভিনয়শিল্পীও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। যদিও উল্লিখিত তারকাদের অনেকেই বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কিছু বলছেন না।

এ বিষয়ে অপূর্বর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি তো নিজে থেকে পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করি না। আমার সমসাময়িকরা যা নেয় আমিও ঠিক সেভাবেই পারিশ্রমিক নিই। পারিশ্রমিক নির্ধারণের বিষয়টি অনেকটাই ব্যক্তিগত বিষয়। আমি তো নির্মাতাদের বাধ্য করছি না। অন্যান্য দেশে বিশেষ করে, বলিউডের কিংবা হলিউডের তারকারা তাদের পারিশ্রমিক নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেন; কারণ তাদের পারিশ্রমিক আন্তর্জাতিক মানের। তারা বলতে আগ্রহ পান। আমরা ছোট একটি দেশের অভিনয়শিল্পী উল্লেখ করার মতো পারিশ্রমিকও পাই না। এ নিয়ে জনসম্মুখে বলার মতো কিছু নেই। আর এ নিয়ে প্রচুর কথা ইদানীং শুনছি আমি। এটি আমার একটি ব্যক্তিগত বিষয়ও। তাই আমি বিষয়টি বিব্রতবোধ করছি। আমার মনোযোগ এখন শুধুই অভিনয়ের দিকে। কীভাবে আমার চরিত্রকে গল্প অনুযায়ী প্রাণবন্ত করতে হবে তা নিয়ে চিন্তায় থাকি।’ তিনি আরও বলেন, ‘অভিনয় জীবনের এ পর্যায়ে এসে দর্শকের কাছ থেকে ভালোবাসা পেয়েছি। তা নিয়েই ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে চাই। সমালোচকদের কাজ দিয়েই জবাব দেব। আমার অভিনয় ক্যারিয়ার নিয়ে আমি তৃপ্ত। ভবিষ্যতেও যেন মনের মতো চরিত্র নিয়ে দর্শকের মনোবাসনা পূর্ণ করতে পারি, তাই ভাবছি।’

এদিকে সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা আফরান নিশো ও তৌসিফের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু জোভান বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়েই বলেন, ‘নতুন বছরের দ্বিতীয় দিন থেকেই আমার অভিনয় পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করেছি। কারণ সব কিছুর দাম বাড়ছে। সেই জায়গায় পারিশ্রমিক কেন বাড়বে না। আমি সচেতনভাবেই পারিশ্রমিক বাড়িয়েছি। নির্মাতারা এ পারিশ্রমিকেই আমাকে দিয়ে অভিনয় করাচ্ছেন। তা ছাড়া এটি আমার ব্যক্তিগত একটি বিষয়ও। তাই আমি নতুন পারিশ্রমিকেই অভিনয় করে যেতে চাই।’

নারী অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নেন মেহজাবিন চৌধুরী। তার পারিশ্রমিক বৃদ্ধি নিয়েও মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তারপরের অবস্থানেই আছেন তানজিন তিশা, সাফা কবির ও সাবিলা নূরের মতো অভিনয়শিল্পীদের নাম। এ তিনজনের কেউই উল্লিখিত বিষয় নিয়ে কথা বলতে চান না। শুটিংয়ের ব্যস্ততা দেখিয়ে পাশ কেটে যান। এ ক’জন ছাড়া আরও কয়েকজন সিনিয়র-জুনিয়র অভিনয়শিল্পীও আলোচনায় আছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু একখণ্ডের নাটকে অভিনয়ের ক্ষেত্রেই এ তারকারা পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করেছেন। টিভি নাটকের পাশাপাশি অনলাইন প্লাটফর্মের নাটকও তারা করছেন পরিবর্তিত পারিশ্রমিকে। সব মিলিয়ে নাট্যমহলে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলছে। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। তবে নাট্যাঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা পারিশ্রমিক বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের জোর দাবি জানাচ্ছেন। হয়তো শিগগিরই এ বিষয়ে আন্তঃসংগঠন বৈঠকে কোনো একটি সিদ্ধান্ত আসবে বলে জানিয়েছেন সচেতনরা।

বিষয়টি যৌক্তিক মনে হচ্ছে না

কয়েকজন অভিনয়শিল্পীর পারিশ্রমিক বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে বিব্রতবোধ করছি। কারণ আমি নিজেও একজন অভিনয়শিল্পী এবং অভিনয় শিল্পী সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। সংগঠনের পক্ষে যদিও এ বিষয়ে কোনো সঠিক নির্দেশনা নেই, তারপরও দায় আমাদেরও আছে। করোনার সময় ছাড়াও টিভি নাটক যে খুব ভালো অবস্থানে ছিল তা আমি বলব না। বাজেট সংকটের কারণে মেধাবী অনেক নির্মাতাই এখন আর নাটক নির্মাণ করেন না। এ অবস্থায় করোনার প্রভাবে তো কাজই বন্ধ ছিল কয়েকমাস। এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। আগে যেসব অভিনয়শিল্পী মাসের প্রায় ২৫ দিন কাজ করতেন, এখন তারা দুই সপ্তাহ করতে পারছেন না নির্মাণ সংকটের কারণে। এ অবস্থায় যদি কেউ পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করেন তাহলে তা যৌক্তিক মনে হচ্ছে না আমার কাছে।

- শহীদুজ্জামান সেলিম, সভাপতি, অভিনয় শিল্পী সংঘ

শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব

পারিশ্রমিক বৃদ্ধির বিষয়টি বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এক ধরনের ক্রাইম হিসেবেই আমি মনে করছি। কারণ যেখানে নাটক শিল্প ধুঁকছে, করোনা মহামারিতে তছনছ হয়ে গেছে কাজের পরিবেশ, সেখানে এ ধরনের সিদ্ধান্ত যারা বাস্তবায়ন করেছে তাদের নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। শুধু নিজেদের নিয়ে ভাবলেই তো হবে না। একটি নাটকের সঙ্গে অনেকেই সংযুক্ত থাকেন। কারও পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পাচ্ছে না, শুধু অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পাচ্ছে, এটা কোনোমতেই যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না আমার কাছে। গুটিকয়েক শিল্পীর কাছে জিম্মি হলে তো হবে না। ডিরেক্টরস গিল্ডের সাধারণ সভায় এ বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছিল। এ নিয়ে প্রাথমিকভাবে অনেকেই কথা বলেছেন। শিগগিরই বিষয়টি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হব আমরা।

- সালাউদ্দিন লাভলু, সভাপতি, ডিরেক্টর’স গিল্ড

এটা অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত

এখনকার সময়টি একেবারেই ভালো যাচ্ছে না। বিশেষ করে টিভি নাটক অনেকটাই ধুঁকছে করোনার কারণে। কাজ কমে যাওয়ার কারণে এ সেক্টরের অনেকেই কর্মহীন। তারপর গত কয়েক মাসে কাজের গতি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু তা আশাব্যঞ্জক নয়। কর্মহীন অনেকেই কাজে ফিরেছেন। এ অবস্থায় অল্প সংখ্যক অভিনয়শিল্পী নাকি অভিনয়ের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করেছেন। যদি তারা আসলেই পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করে থাকেন, তাহলে তা হবে অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। কারণ নাটকের দাম একটুও বাড়েনি। তাই প্রযোজকরা অনেকটা ক্ষতির মুখে থেকে নাটক প্রযোজনা করছেন। লগ্নি করার পর তারা টাকা ঘরে তুলতে অনেক বিড়ম্বনাতেও পড়েন। আমার কথা হলো, এ ধরনের শিল্পীদের না নিয়ে অন্যদের সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে। তাতে করে একটি ভারসাম্য আসবে কাজের ক্ষেত্রে।

- ইরেশ যাকের, সভাপতি, টেলিভিশন প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন

করোনাকালে অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিক বাড়ানো কতটা যৌক্তিক

করোনার প্রকোপে পরিবর্তন এসেছে দেশের নাট্যাঙ্গনেও। বিশেষ করে অনেক কাটছাঁট করে নির্মিত হচ্ছে নাটক। একদিকে বাজেট সংকোচনে ব্যস্ত চ্যানেল কর্তৃপক্ষ, অন্যদিকে কিছুসংখ্যক তারকা এ দুঃসময়ে পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করেছেন। এ নিয়ে নাটকপাড়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলছে। বিস্তারিত লিখেছেন-
 সোহেল আহসান 
১৪ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই একটু একটু করে এগিয়েছে টিভি নাটক। এক সময় শুধু বিটিভিকেন্দ্রিক ছিল টিভি নাটক। একঝাঁক মেধাবী ও গুণী অভিনয়শিল্পীর সমন্বয়ে বর্ণিল হয়ে উঠত সেসব নাটক। দর্শকও সে সময় প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে নাটক দেখতেন। এভাবেই চলছিল টিভি নাটক। কিন্তু একুশ শতকের সূচনা লগ্ন থেকে পাল্টাতে থাকে টিভি নাটক। বিশেষ করে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের আবির্ভাবের ফলে নাটক নির্মাণের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং বাড়তে থাকে অভিনয়শিল্পীর সংখ্যা। স্যাটেলাইট চ্যানেল প্রচারে আসার পর একখণ্ড ও ধারাবাহিক নাটকে মনোযোগী হওয়ায় প্রত্যাশিতভাবেই অভিনয়শিল্পীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ফলে দর্শকের পছন্দের নাটক দেখার সুযোগও প্রসারিত হতে থাকে। তখন বিটিভিতে অডিশন দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর সেই চ্যানেলে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া যেত। যদিও বিটিভিতে সেই ধারাটা এখনো প্রচলিত আছে। পাশাপাশি প্যাকেজ আওতায় নির্মিত নাটকের শিল্পীদের অডিশন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে অনেক টিভি চ্যানেলে নাটক প্রচার হয়। চ্যানেল বেশি হওয়ার কারণে নাটক নির্মাণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সব অভিনয়শিল্পীকে কাজে লাগানো হয় না। সব সময়ই কয়েকজন অভিনয়শিল্পীকে নির্ধারিত করে দেওয়া হয় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো থেকে। তাদের ব্যাখ্যা হলো, নির্দিষ্ট সেই অল্পসংখ্যক অভিনয় তারকা ছাড়া নাটক মার্কেটিং করতে চ্যানেলের সমস্যা হয়। তাই নির্মাতারা অনেকটা বাধ্য হয়েই সেসব তারকা অভিনয়শিল্পীকে দিয়ে নাটক নির্মাণ করছেন এখন।

ঠিক এ সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছেন এসব অভিনয়শিল্পীও। ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করে চলেছেন নিজেদের পারিশ্রমিক। যদিও তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তারা নির্মাতার দিকে প্রশ্নটি ছুড়ে দেন। তারা বলেন, নির্মাতারা না চাইলে তো আর তারা উপযাচক হয়ে অভিনয় করেন না।

নতুন বছরের শুরু থেকেই নাটকপাড়ায় অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা মুখর হয়ে উঠেছে। নাট্যাঙ্গনের সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারাও এ নিয়ে চিন্তিত। কারণ বর্তমানে নাটকের দাম তো বাড়েনি, তার ওপর চ্যানেল থেকে অর্থ ছাড় করতেও ব্যাপক সমস্যায় পড়েন নির্মাতা ও প্রযোজকরা। এমন একটি সময়ে কিছুসংখ্যক অভিনয় তারকা পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করেছেন; যা নেতিবাচকভাবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। পারিশ্রমিক বৃদ্ধির তালিকায় এ সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, আফরান নিশো, তৌসিফ, জোভান, মেহজাবিন, সাফা কবির, তানজিন তিশা, সাবিলা নূরসহ অনেকেরই নাম শোনা যাচ্ছে নির্মাতাদের কাছ থেকে। করোনার এ সময়ে পারিশ্রমিক বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে অন্য অনেক অভিনয়শিল্পীও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। যদিও উল্লিখিত তারকাদের অনেকেই বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কিছু বলছেন না।

এ বিষয়ে অপূর্বর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি তো নিজে থেকে পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করি না। আমার সমসাময়িকরা যা নেয় আমিও ঠিক সেভাবেই পারিশ্রমিক নিই। পারিশ্রমিক নির্ধারণের বিষয়টি অনেকটাই ব্যক্তিগত বিষয়। আমি তো নির্মাতাদের বাধ্য করছি না। অন্যান্য দেশে বিশেষ করে, বলিউডের কিংবা হলিউডের তারকারা তাদের পারিশ্রমিক নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেন; কারণ তাদের পারিশ্রমিক আন্তর্জাতিক মানের। তারা বলতে আগ্রহ পান। আমরা ছোট একটি দেশের অভিনয়শিল্পী উল্লেখ করার মতো পারিশ্রমিকও পাই না। এ নিয়ে জনসম্মুখে বলার মতো কিছু নেই। আর এ নিয়ে প্রচুর কথা ইদানীং শুনছি আমি। এটি আমার একটি ব্যক্তিগত বিষয়ও। তাই আমি বিষয়টি বিব্রতবোধ করছি। আমার মনোযোগ এখন শুধুই অভিনয়ের দিকে। কীভাবে আমার চরিত্রকে গল্প অনুযায়ী প্রাণবন্ত করতে হবে তা নিয়ে চিন্তায় থাকি।’ তিনি আরও বলেন, ‘অভিনয় জীবনের এ পর্যায়ে এসে দর্শকের কাছ থেকে ভালোবাসা পেয়েছি। তা নিয়েই ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে চাই। সমালোচকদের কাজ দিয়েই জবাব দেব। আমার অভিনয় ক্যারিয়ার নিয়ে আমি তৃপ্ত। ভবিষ্যতেও যেন মনের মতো চরিত্র নিয়ে দর্শকের মনোবাসনা পূর্ণ করতে পারি, তাই ভাবছি।’

এদিকে সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা আফরান নিশো ও তৌসিফের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু জোভান বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়েই বলেন, ‘নতুন বছরের দ্বিতীয় দিন থেকেই আমার অভিনয় পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করেছি। কারণ সব কিছুর দাম বাড়ছে। সেই জায়গায় পারিশ্রমিক কেন বাড়বে না। আমি সচেতনভাবেই পারিশ্রমিক বাড়িয়েছি। নির্মাতারা এ পারিশ্রমিকেই আমাকে দিয়ে অভিনয় করাচ্ছেন। তা ছাড়া এটি আমার ব্যক্তিগত একটি বিষয়ও। তাই আমি নতুন পারিশ্রমিকেই অভিনয় করে যেতে চাই।’

নারী অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নেন মেহজাবিন চৌধুরী। তার পারিশ্রমিক বৃদ্ধি নিয়েও মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তারপরের অবস্থানেই আছেন তানজিন তিশা, সাফা কবির ও সাবিলা নূরের মতো অভিনয়শিল্পীদের নাম। এ তিনজনের কেউই উল্লিখিত বিষয় নিয়ে কথা বলতে চান না। শুটিংয়ের ব্যস্ততা দেখিয়ে পাশ কেটে যান। এ ক’জন ছাড়া আরও কয়েকজন সিনিয়র-জুনিয়র অভিনয়শিল্পীও আলোচনায় আছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু একখণ্ডের নাটকে অভিনয়ের ক্ষেত্রেই এ তারকারা পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করেছেন। টিভি নাটকের পাশাপাশি অনলাইন প্লাটফর্মের নাটকও তারা করছেন পরিবর্তিত পারিশ্রমিকে। সব মিলিয়ে নাট্যমহলে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলছে। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। তবে নাট্যাঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা পারিশ্রমিক বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের জোর দাবি জানাচ্ছেন। হয়তো শিগগিরই এ বিষয়ে আন্তঃসংগঠন বৈঠকে কোনো একটি সিদ্ধান্ত আসবে বলে জানিয়েছেন সচেতনরা।

বিষয়টি যৌক্তিক মনে হচ্ছে না

কয়েকজন অভিনয়শিল্পীর পারিশ্রমিক বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে বিব্রতবোধ করছি। কারণ আমি নিজেও একজন অভিনয়শিল্পী এবং অভিনয় শিল্পী সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। সংগঠনের পক্ষে যদিও এ বিষয়ে কোনো সঠিক নির্দেশনা নেই, তারপরও দায় আমাদেরও আছে। করোনার সময় ছাড়াও টিভি নাটক যে খুব ভালো অবস্থানে ছিল তা আমি বলব না। বাজেট সংকটের কারণে মেধাবী অনেক নির্মাতাই এখন আর নাটক নির্মাণ করেন না। এ অবস্থায় করোনার প্রভাবে তো কাজই বন্ধ ছিল কয়েকমাস। এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। আগে যেসব অভিনয়শিল্পী মাসের প্রায় ২৫ দিন কাজ করতেন, এখন তারা দুই সপ্তাহ করতে পারছেন না নির্মাণ সংকটের কারণে। এ অবস্থায় যদি কেউ পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করেন তাহলে তা যৌক্তিক মনে হচ্ছে না আমার কাছে।

- শহীদুজ্জামান সেলিম, সভাপতি, অভিনয় শিল্পী সংঘ

শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব

পারিশ্রমিক বৃদ্ধির বিষয়টি বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এক ধরনের ক্রাইম হিসেবেই আমি মনে করছি। কারণ যেখানে নাটক শিল্প ধুঁকছে, করোনা মহামারিতে তছনছ হয়ে গেছে কাজের পরিবেশ, সেখানে এ ধরনের সিদ্ধান্ত যারা বাস্তবায়ন করেছে তাদের নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। শুধু নিজেদের নিয়ে ভাবলেই তো হবে না। একটি নাটকের সঙ্গে অনেকেই সংযুক্ত থাকেন। কারও পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পাচ্ছে না, শুধু অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি পাচ্ছে, এটা কোনোমতেই যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না আমার কাছে। গুটিকয়েক শিল্পীর কাছে জিম্মি হলে তো হবে না। ডিরেক্টরস গিল্ডের সাধারণ সভায় এ বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছিল। এ নিয়ে প্রাথমিকভাবে অনেকেই কথা বলেছেন। শিগগিরই বিষয়টি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হব আমরা।

- সালাউদ্দিন লাভলু, সভাপতি, ডিরেক্টর’স গিল্ড

এটা অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত

এখনকার সময়টি একেবারেই ভালো যাচ্ছে না। বিশেষ করে টিভি নাটক অনেকটাই ধুঁকছে করোনার কারণে। কাজ কমে যাওয়ার কারণে এ সেক্টরের অনেকেই কর্মহীন। তারপর গত কয়েক মাসে কাজের গতি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু তা আশাব্যঞ্জক নয়। কর্মহীন অনেকেই কাজে ফিরেছেন। এ অবস্থায় অল্প সংখ্যক অভিনয়শিল্পী নাকি অভিনয়ের পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করেছেন। যদি তারা আসলেই পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করে থাকেন, তাহলে তা হবে অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। কারণ নাটকের দাম একটুও বাড়েনি। তাই প্রযোজকরা অনেকটা ক্ষতির মুখে থেকে নাটক প্রযোজনা করছেন। লগ্নি করার পর তারা টাকা ঘরে তুলতে অনেক বিড়ম্বনাতেও পড়েন। আমার কথা হলো, এ ধরনের শিল্পীদের না নিয়ে অন্যদের সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে। তাতে করে একটি ভারসাম্য আসবে কাজের ক্ষেত্রে।

- ইরেশ যাকের, সভাপতি, টেলিভিশন প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন