কী পেলাম কী হারালাম
jugantor
তারকাদের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার ৫০ বছর
কী পেলাম কী হারালাম
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ৫০ বছর পূর্ণ হল এ বছর। গত পঞ্চাশ বছরে রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়েছে অনেকবার। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের হাওয়া বরাবরই লেগেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। তবু সংস্কৃতির মানুষেরা দেশকে ভালোবেসে এক সুতায় মালা গাঁথার চেষ্টা করেছেন অবিরত। গত ৫০ বছরের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশের চেয়ে কতটা তারা দেশকে দিতে পেরেছেন সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। তারকাদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত লিখেছেন-

  হাসান সাইদুল  

০১ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

* আবুল হায়াত, অভিনেতা

দেখতে দেখতে বাংলাদেশ পঞ্চাশ পার করল। স্বাধীনতার অর্ধশতক বলা চলে। মূলত এ দেশ থেকেই মঞ্চ নাটকের একটি সুরাহা করতে পেরেছি। আমাদের মঞ্চ নাটক এখনো জীবিত আছে এটি একটি আনন্দের বিষয়। নাটক, গান, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করছে শোবিজের মানুষরা। বিশ্ববাসী এখন আমাদের দেশের নাম সমীহের সঙ্গে উচ্চারণ করে। এটি অনেক বেশি ভালোলাগার। এ দেশে এখনো বাস করছি এটিও একটি ভালোলাগা। তবে প্রত্যাশা দেশকে আরও উচ্চমাত্রায় দেখে যেতে চাই। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, স্বাধীন সঠিকভাবে হয়েছি কী? আশা করি এ সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। এ দেশের মাটি ও মানুষ আরও উর্বর হবে। হয়তো জীবত থাকতে দু’চোখে দেখে যেতে পারব না। তবু দেশ ও দেশের মানুষের জন্য আমার দোয়া ও ভালোবাসা সব সময়।

* আলম খান, সংগীতজ্ঞ

৭১’র আগে কাজ শুরু করলেও আমার খ্যাতি, সুনাম, ভক্তকুল কিন্তু এ দেশে এবং এ দেশের মানুষ। বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমি আলম খান হতে পেরেছি। এ জন্য দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। দেখতে দেখতে দেশ ৫০ বছর পার করে একান্নে উন্নীত হলো, এটা বেশ আনন্দের বিষয়। বেদনার গল্প তো থাকবেই। কষ্ট যন্ত্রণা, হানাহানি এসব থাকবেই। তা পাশ কেটে সবাইকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আমি প্রত্যাশা করি, রাজনৈতিক দল হিসাবে যারাই ক্ষমতায় থাকুক, দেশের কথা দেশের মানুষের কথা তারা চিন্তা করবে। দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াবে।

* শেখ সাদী খান, সংগীতজ্ঞ

এটা খুব আনন্দের বিষয় যে আমরা দেখে যেতে পারছি আমাদের দেশে স্বাধীনতা অর্জনের রজতজয়ন্তী পালিত হয়েছে। দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে দেশ। আধুনিকতার দিকে যাচ্ছে। অনেক দুঃখ কষ্ট এবং আনন্দের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। তবে বলা যেতেই পারে, দেশ আরও ভালো হতে পারত, আরও ভালো হতোসহ নানা কথা। যতটুকু এগিয়ে যাচ্ছে তাতে বা কম কী? কিন্তু এটিও বলার অপেক্ষা রাখে না, অযোগ্য লোকদের পায়চারি বেশি বিভিন্ন সেক্টরে। যারা না থাকলে এমনকি যোগ্য লোক দ্বারা কাজ করলে সফলতা আসবে এটি নিশ্চিত। আমি যেহেতু সংগীতের মানুষ তাই সংগীতের কথাই বলতে চাই। সংগীতেও অপসংস্কৃতি ঢুকে গেছে। যার ফল সবাই পাচ্ছে। সামনে এর পরিণাম কী হবে নিশ্চয়ই সেটি অনুমান করতে পারছেন সবাই। তাই স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উপলক্ষ্যে আমার প্রত্যাশা, দেশের মানুষ যেন সচেতন থাকে। দেশের শাসকরা যেন মেহনতি মানুষের কথা চিন্তা করেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখেন।

* খুরশিদ আলম, সংগীতশিল্পী

আমি একজন খুব সাধারণ মানুষ। গান গাই, মানুষকে বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করি। একজন গানের মানুষ হিসাবে এ দেশের কাছে, দেশের মানুষের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু পেয়েছি। এ পাওয়া কত দামি তা বলে বোঝানো যাবে না। আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীনতার অর্জনের ৫০ বছর পার করল। পাওয়ার হিসাব নয়, প্রত্যাশার কথা বলতে চাই। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসা, খাদ্যের কী অবস্থা এটা আপনারা সবাই জানেন। আমাদের সরকার এ তিনটি বিষয়ের ওপর নজর দেওয়া উচিত কঠোরভাবে। দেশ অনেক উন্নত হয়েছে এটি বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে কিছু কিছু জায়গা উন্নতির চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বেশি। এ বিষয়গুলো সরকারের একা নয়, আমাদেরও ভাবতে হবে। আমাদেরও সচেতন হতে হবে। তাহলে দেশ আরও এগিয়ে যাবে।

* ফরিদা আক্তার ববিতা, অভিনেত্রী

স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পালিত হয়েছে, কখনো তো স্বপ্নও দেখিনি যে তা দেখে যেতে পারব! কত মানুষ মারা যায় এ কোভিডে, হয়তো আমিও মরে যেতে পারতাম! কিন্তু আমার বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি পালিত হলো আর আমি তা উপভোগ করতে পেরেছি এটি ভিন্ন এক আনন্দ। তবে এ পূর্তি উপলক্ষ্যে আমার প্রত্যাশাও আছে, ‘দেশের মানুষ যেন শান্তিতে থাকে, দেশের মানুষ যেন খাদ্যাভাবে মারা না যায়, সে জন্য দায়িত্বরত কর্তাদের কাজ করতে হবে। দ্রব্যমূল্য যেন মেহনতি মানুষের সহনীয় হয় এদিকে নজর দিতে হবে। সবাই ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক, করোনা থেকে মুক্ত থাকুক এই কামনা করি।

* কবরী সারওয়ার, অভিনেত্রী

আমরা নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেই এগিয়ে এসেছি। ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫’র নির্মম হত্যাকাণ্ডসহ অনেক দুঃসময় আমরা পার করে এসেছি। দুর্ভিক্ষসহ নানা দৈন্য দুর্দশা কাটিয়ে পঞ্চাশ পূর্ণ করেছি। অর্ধশতকের বাংলাদেশে আমাদের অবশ্যই আনন্দ আছে, ছিল বেদনাও। তবে আমাদের বড় পাওয়া আমাদের দেশ স্বাধীন বাংলাদেশ। অতীতের মতো সামনেও নানা রকম ঝামেলা আসতেই পারে। তা প্রতিহত করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তবে আমার মনে হয়, মানুষের পাশে সম্পূর্ণরূপে দাঁড়াতে পারিনি, মেহনতি মানুষের সহভাগি হতে পারিনি সঠিকরূপে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আমার প্রত্যাশা, সামনের দিনগুলোতে যেন আমরা ভালো থাকি, মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারি সেভাবে কাজ করে যাব। এটিই আমার প্রত্যাশা।

* সাবিনা ইয়াসমিন, সংগীতশিল্পী

স্বাধীন দেশে বাস করছি, এটা একেবারেই অন্যরকম আনন্দ। আমাদের মতোই বড় হচ্ছে আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ- ভাবতে ভালোই লাগে। ৫০ পেরিয়ে ৫১, অর্ধশতকের পথচলা। আমার স্বীকৃতি, সম্মান ও সম্মাননা সবই তো এই বাংলাদেশ থেকে হয়েছে। দেশের বাইরে যখন যাই, মানুষ যখন বলে ‘বাংলাদেশি’, তখন নিজের মধ্যে অন্যরকম একটি অনুভূতি কাজ করে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে আমার প্রত্যাশা, আমরা যত দিন বাঁচব দেশের সংস্কৃতিকে যেন এগিয়ে নিয়ে যাই। করোনা মহামারিতে সব দেশের মতো আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তাই সৃষ্টিকর্তার কাছেও প্রার্থনা করি, এই মহামারি থেকে বাংলাদেশকে যেন রক্ষা করেন, দেশের মানুষ যেন ভালো থাকেন।

* আরিফা জামান মৌসুমী, চিত্রনায়িকা

‘স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সেই সুযোগ কিংবা বয়স আমার ছিল না। কিন্তু অর্জিত স্বাধীন দেশে বসবাস করছি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হলো। নিজের কাছে এ অর্জনের আনন্দটা যে কতটা গভীর তা বলে বোঝাতে পারব না। তবে এ পূর্তি উপলক্ষ্যে আমার একটি প্রত্যাশা, আমরা বিশেষ দিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে কয়েক মিনিট নীরব থাকার নাম শ্রদ্ধাঞ্জলি কিংবা চেতনা বললেই হবে না। মনের ভেতর স্বাধীনতার চেতনা লালন করতে হবে। দেশের মানুষকে দেশকে ভালোবাসতে হবে। দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। মেহনতি মানষের পাশে দাঁড়াতে হবে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এ কাজগুলো করলে আরও এগিয়ে যাবে।’

* শাফিন আহমেদ, সংগীতশিল্পী

আমি বাংলাদেশি- এটাই আমার গর্ব। আমি বাংলাদেশের শিল্পী, এটি যখন বিদেশের মাটিতে কনসার্ট করতে গিয়ে শুনি ভালো লাগে খুব। আমি যে খ্যাতি যশ পেয়েছি তা এ দেশে থেকেই পেয়েছি। তাই এ দেশের প্রতি আমি ঋণী। এ ঋণ শোধ করার মতো নয়। তবু সংগীতের মাধ্যমে দেশের মানুষকে ভালোবাসা দেওয়ার চেষ্টা করছি। দেশের উন্নয়নের কথা অস্বীকার করার মতো নয়। ৫০ বছরে দেশের অনেক প্রাপ্তি আছে, অনেক অর্জন আছে। তবে অপ্রাপ্তির বিষয় নয় বরং কষ্টও আছে দেশের মানুষের। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসাব্যবস্থা, খাদ্য, অন্ন, বস্ত্রের বিষয়গুলো চিন্তা করে দেখা যাক, কতটা ভালো অবস্থানে আছে? করোনার আতঙ্ক চলছে, এর মধ্যেও দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে কি না, এসব বিষয়ও ভাবা দরকার। তবে স্বাধীনতা অর্জনের রজতজয়ন্তীতে আমার একটি বড় প্রত্যাশা, মানুষ যেন কথা বলতে পারে! কথা বলার সুযোগ থাকতে হবে। নিজের অধিকার আদায়ের জন্য যে পথ, তা যেন সহজ হয়। মানুষ যেন সহজভাবে চলতে পারেন, বলতে পারেন, জানতে পারেন এবং খেতে পারেন- এ বিষয়গুলো জরুরি ভাবা দরকার বলে আমি মনে করি। খুব নগণ্যসংখ্যক লোকবল অত্যন্ত ভালো থাকবে, আর সংখ্যার সিংহভাগ থাকবে অবহেলায়, এটি কারও কাম্য নয়। আশা করি সামনের দিনগুলোতে এ বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে।

* আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল, অভিনেতা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছর পূর্তি দেখে যেতে পারব ভাবিনি। বয়স তো কম হলো না। কত ঘাত-প্রতিঘাত দেখে এসেছি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিক্ততার কথা বলতে চাই না। পেছনে যা হয়েছে তা মনে করেও ক্লান্ত হতে চাই না। চলচ্চিত্রের বর্তমান প্রেক্ষাপটের কথা চিন্তা করলে কষ্ট হয়। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে চলচ্চিত্রের অবস্থান কেমন ছিল তা সবাই জানেন। কিন্তু আজ ডিজিটালাইজেশনের যুগে চলচ্চিত্রে এ অবস্থা কেন তা নিয়ে সবার ভাবতে হবে। ভাবতে হবে চলচ্চিত্রকে কীভাবে উন্নত করা যায়। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে এটা আমার প্রত্যাশা।

* ড. ইনামুল হক, অভিনেতা ও লেখক

আমার যত অর্জন যত প্রাপ্তি সবই এ বাংলাদেশে। ছোটবেলা থেকে এ দেশের মাটি ও মানুষ দেখে আজকের এ অবস্থানে এসেছি। যা দেখেছি হয়তো আরও অনেক দেখতে পারতাম অথবা আরও কমও দেখতে পেতাম দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি। তবে যতটুক দেখেছি তা কম কিসে? যেতে যেতে আমাদের দেশ ৫০ বছর অতিক্রম করল। এটি একটি ভালোলাগা। অনেক কিছু দেখেছি, দেখছি, যদি বেঁচে থাকি ভবিষ্যতেও অনেক কিছু দেখা হবে। তবে এমন কিছু দেখে যেতে চাই যা দেশ ও দশের কল্যাণে হয়। মাঝে অপ্রীতিকর ঘটনার সূত্রপাত হয় এমন কিছু কখনো প্রত্যাশা করতে চাই না। দেশকে ভালোবাসি, ভালোবেসেই যাচ্ছি।

* তারিক আনাম খান, অভিনেতা ও নির্মাতা

১৯৭১ সাল থেকে আজ একটি নির্দিষ্ট সীমা থেকে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশ। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাসহ শত্রু পক্ষের নানা অপকৌশল থেকে বেঁচে যাওয়া দেশ আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নাম যখন দেখা যায় বুক ফুলে ওঠে গর্বে। আমি মূলত অভিনয়ের মানুষ, আমার কাছে সংস্কৃতিই বড় বিষয়। বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিষয় নিয়েই কথা বলতে চাই। ৫০ পেরিয়ে একান্নতে পা রেখেছে এ দেশ। এ উপলক্ষ্যে আমার প্রত্যাশা, সামনের দিনগুলোতে দেশের সংস্কৃতিকে যেন দায়িতপ্রাপ্তরা আরও উন্নত করেন, বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেন। আমরাও কাজ করছি। দেশীয় সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করলে বাংলাদেশ এবং আমাদেরই লাভ এবং প্রসার হবে। আমরা চাই আমাদের সংস্কৃতিও বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাক।

তারকাদের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার ৫০ বছর

কী পেলাম কী হারালাম

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ৫০ বছর পূর্ণ হল এ বছর। গত পঞ্চাশ বছরে রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়েছে অনেকবার। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের হাওয়া বরাবরই লেগেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। তবু সংস্কৃতির মানুষেরা দেশকে ভালোবেসে এক সুতায় মালা গাঁথার চেষ্টা করেছেন অবিরত। গত ৫০ বছরের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশের চেয়ে কতটা তারা দেশকে দিতে পেরেছেন সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। তারকাদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত লিখেছেন-
 হাসান সাইদুল 
০১ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

* আবুল হায়াত, অভিনেতা

দেখতে দেখতে বাংলাদেশ পঞ্চাশ পার করল। স্বাধীনতার অর্ধশতক বলা চলে। মূলত এ দেশ থেকেই মঞ্চ নাটকের একটি সুরাহা করতে পেরেছি। আমাদের মঞ্চ নাটক এখনো জীবিত আছে এটি একটি আনন্দের বিষয়। নাটক, গান, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করছে শোবিজের মানুষরা। বিশ্ববাসী এখন আমাদের দেশের নাম সমীহের সঙ্গে উচ্চারণ করে। এটি অনেক বেশি ভালোলাগার। এ দেশে এখনো বাস করছি এটিও একটি ভালোলাগা। তবে প্রত্যাশা দেশকে আরও উচ্চমাত্রায় দেখে যেতে চাই। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, স্বাধীন সঠিকভাবে হয়েছি কী? আশা করি এ সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। এ দেশের মাটি ও মানুষ আরও উর্বর হবে। হয়তো জীবত থাকতে দু’চোখে দেখে যেতে পারব না। তবু দেশ ও দেশের মানুষের জন্য আমার দোয়া ও ভালোবাসা সব সময়।

* আলম খান, সংগীতজ্ঞ

৭১’র আগে কাজ শুরু করলেও আমার খ্যাতি, সুনাম, ভক্তকুল কিন্তু এ দেশে এবং এ দেশের মানুষ। বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমি আলম খান হতে পেরেছি। এ জন্য দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। দেখতে দেখতে দেশ ৫০ বছর পার করে একান্নে উন্নীত হলো, এটা বেশ আনন্দের বিষয়। বেদনার গল্প তো থাকবেই। কষ্ট যন্ত্রণা, হানাহানি এসব থাকবেই। তা পাশ কেটে সবাইকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আমি প্রত্যাশা করি, রাজনৈতিক দল হিসাবে যারাই ক্ষমতায় থাকুক, দেশের কথা দেশের মানুষের কথা তারা চিন্তা করবে। দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াবে।

* শেখ সাদী খান, সংগীতজ্ঞ

এটা খুব আনন্দের বিষয় যে আমরা দেখে যেতে পারছি আমাদের দেশে স্বাধীনতা অর্জনের রজতজয়ন্তী পালিত হয়েছে। দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে দেশ। আধুনিকতার দিকে যাচ্ছে। অনেক দুঃখ কষ্ট এবং আনন্দের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। তবে বলা যেতেই পারে, দেশ আরও ভালো হতে পারত, আরও ভালো হতোসহ নানা কথা। যতটুকু এগিয়ে যাচ্ছে তাতে বা কম কী? কিন্তু এটিও বলার অপেক্ষা রাখে না, অযোগ্য লোকদের পায়চারি বেশি বিভিন্ন সেক্টরে। যারা না থাকলে এমনকি যোগ্য লোক দ্বারা কাজ করলে সফলতা আসবে এটি নিশ্চিত। আমি যেহেতু সংগীতের মানুষ তাই সংগীতের কথাই বলতে চাই। সংগীতেও অপসংস্কৃতি ঢুকে গেছে। যার ফল সবাই পাচ্ছে। সামনে এর পরিণাম কী হবে নিশ্চয়ই সেটি অনুমান করতে পারছেন সবাই। তাই স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উপলক্ষ্যে আমার প্রত্যাশা, দেশের মানুষ যেন সচেতন থাকে। দেশের শাসকরা যেন মেহনতি মানুষের কথা চিন্তা করেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখেন।

* খুরশিদ আলম, সংগীতশিল্পী

আমি একজন খুব সাধারণ মানুষ। গান গাই, মানুষকে বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করি। একজন গানের মানুষ হিসাবে এ দেশের কাছে, দেশের মানুষের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু পেয়েছি। এ পাওয়া কত দামি তা বলে বোঝানো যাবে না। আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীনতার অর্জনের ৫০ বছর পার করল। পাওয়ার হিসাব নয়, প্রত্যাশার কথা বলতে চাই। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসা, খাদ্যের কী অবস্থা এটা আপনারা সবাই জানেন। আমাদের সরকার এ তিনটি বিষয়ের ওপর নজর দেওয়া উচিত কঠোরভাবে। দেশ অনেক উন্নত হয়েছে এটি বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে কিছু কিছু জায়গা উন্নতির চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বেশি। এ বিষয়গুলো সরকারের একা নয়, আমাদেরও ভাবতে হবে। আমাদেরও সচেতন হতে হবে। তাহলে দেশ আরও এগিয়ে যাবে।

* ফরিদা আক্তার ববিতা, অভিনেত্রী

স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পালিত হয়েছে, কখনো তো স্বপ্নও দেখিনি যে তা দেখে যেতে পারব! কত মানুষ মারা যায় এ কোভিডে, হয়তো আমিও মরে যেতে পারতাম! কিন্তু আমার বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি পালিত হলো আর আমি তা উপভোগ করতে পেরেছি এটি ভিন্ন এক আনন্দ। তবে এ পূর্তি উপলক্ষ্যে আমার প্রত্যাশাও আছে, ‘দেশের মানুষ যেন শান্তিতে থাকে, দেশের মানুষ যেন খাদ্যাভাবে মারা না যায়, সে জন্য দায়িত্বরত কর্তাদের কাজ করতে হবে। দ্রব্যমূল্য যেন মেহনতি মানুষের সহনীয় হয় এদিকে নজর দিতে হবে। সবাই ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক, করোনা থেকে মুক্ত থাকুক এই কামনা করি।

* কবরী সারওয়ার, অভিনেত্রী

আমরা নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেই এগিয়ে এসেছি। ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫’র নির্মম হত্যাকাণ্ডসহ অনেক দুঃসময় আমরা পার করে এসেছি। দুর্ভিক্ষসহ নানা দৈন্য দুর্দশা কাটিয়ে পঞ্চাশ পূর্ণ করেছি। অর্ধশতকের বাংলাদেশে আমাদের অবশ্যই আনন্দ আছে, ছিল বেদনাও। তবে আমাদের বড় পাওয়া আমাদের দেশ স্বাধীন বাংলাদেশ। অতীতের মতো সামনেও নানা রকম ঝামেলা আসতেই পারে। তা প্রতিহত করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তবে আমার মনে হয়, মানুষের পাশে সম্পূর্ণরূপে দাঁড়াতে পারিনি, মেহনতি মানুষের সহভাগি হতে পারিনি সঠিকরূপে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আমার প্রত্যাশা, সামনের দিনগুলোতে যেন আমরা ভালো থাকি, মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারি সেভাবে কাজ করে যাব। এটিই আমার প্রত্যাশা।

* সাবিনা ইয়াসমিন, সংগীতশিল্পী

স্বাধীন দেশে বাস করছি, এটা একেবারেই অন্যরকম আনন্দ। আমাদের মতোই বড় হচ্ছে আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ- ভাবতে ভালোই লাগে। ৫০ পেরিয়ে ৫১, অর্ধশতকের পথচলা। আমার স্বীকৃতি, সম্মান ও সম্মাননা সবই তো এই বাংলাদেশ থেকে হয়েছে। দেশের বাইরে যখন যাই, মানুষ যখন বলে ‘বাংলাদেশি’, তখন নিজের মধ্যে অন্যরকম একটি অনুভূতি কাজ করে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে আমার প্রত্যাশা, আমরা যত দিন বাঁচব দেশের সংস্কৃতিকে যেন এগিয়ে নিয়ে যাই। করোনা মহামারিতে সব দেশের মতো আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তাই সৃষ্টিকর্তার কাছেও প্রার্থনা করি, এই মহামারি থেকে বাংলাদেশকে যেন রক্ষা করেন, দেশের মানুষ যেন ভালো থাকেন।

* আরিফা জামান মৌসুমী, চিত্রনায়িকা

‘স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সেই সুযোগ কিংবা বয়স আমার ছিল না। কিন্তু অর্জিত স্বাধীন দেশে বসবাস করছি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হলো। নিজের কাছে এ অর্জনের আনন্দটা যে কতটা গভীর তা বলে বোঝাতে পারব না। তবে এ পূর্তি উপলক্ষ্যে আমার একটি প্রত্যাশা, আমরা বিশেষ দিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে কয়েক মিনিট নীরব থাকার নাম শ্রদ্ধাঞ্জলি কিংবা চেতনা বললেই হবে না। মনের ভেতর স্বাধীনতার চেতনা লালন করতে হবে। দেশের মানুষকে দেশকে ভালোবাসতে হবে। দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। মেহনতি মানষের পাশে দাঁড়াতে হবে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এ কাজগুলো করলে আরও এগিয়ে যাবে।’

* শাফিন আহমেদ, সংগীতশিল্পী

আমি বাংলাদেশি- এটাই আমার গর্ব। আমি বাংলাদেশের শিল্পী, এটি যখন বিদেশের মাটিতে কনসার্ট করতে গিয়ে শুনি ভালো লাগে খুব। আমি যে খ্যাতি যশ পেয়েছি তা এ দেশে থেকেই পেয়েছি। তাই এ দেশের প্রতি আমি ঋণী। এ ঋণ শোধ করার মতো নয়। তবু সংগীতের মাধ্যমে দেশের মানুষকে ভালোবাসা দেওয়ার চেষ্টা করছি। দেশের উন্নয়নের কথা অস্বীকার করার মতো নয়। ৫০ বছরে দেশের অনেক প্রাপ্তি আছে, অনেক অর্জন আছে। তবে অপ্রাপ্তির বিষয় নয় বরং কষ্টও আছে দেশের মানুষের। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসাব্যবস্থা, খাদ্য, অন্ন, বস্ত্রের বিষয়গুলো চিন্তা করে দেখা যাক, কতটা ভালো অবস্থানে আছে? করোনার আতঙ্ক চলছে, এর মধ্যেও দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে কি না, এসব বিষয়ও ভাবা দরকার। তবে স্বাধীনতা অর্জনের রজতজয়ন্তীতে আমার একটি বড় প্রত্যাশা, মানুষ যেন কথা বলতে পারে! কথা বলার সুযোগ থাকতে হবে। নিজের অধিকার আদায়ের জন্য যে পথ, তা যেন সহজ হয়। মানুষ যেন সহজভাবে চলতে পারেন, বলতে পারেন, জানতে পারেন এবং খেতে পারেন- এ বিষয়গুলো জরুরি ভাবা দরকার বলে আমি মনে করি। খুব নগণ্যসংখ্যক লোকবল অত্যন্ত ভালো থাকবে, আর সংখ্যার সিংহভাগ থাকবে অবহেলায়, এটি কারও কাম্য নয়। আশা করি সামনের দিনগুলোতে এ বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে।

* আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল, অভিনেতা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছর পূর্তি দেখে যেতে পারব ভাবিনি। বয়স তো কম হলো না। কত ঘাত-প্রতিঘাত দেখে এসেছি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিক্ততার কথা বলতে চাই না। পেছনে যা হয়েছে তা মনে করেও ক্লান্ত হতে চাই না। চলচ্চিত্রের বর্তমান প্রেক্ষাপটের কথা চিন্তা করলে কষ্ট হয়। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে চলচ্চিত্রের অবস্থান কেমন ছিল তা সবাই জানেন। কিন্তু আজ ডিজিটালাইজেশনের যুগে চলচ্চিত্রে এ অবস্থা কেন তা নিয়ে সবার ভাবতে হবে। ভাবতে হবে চলচ্চিত্রকে কীভাবে উন্নত করা যায়। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে এটা আমার প্রত্যাশা।

* ড. ইনামুল হক, অভিনেতা ও লেখক

আমার যত অর্জন যত প্রাপ্তি সবই এ বাংলাদেশে। ছোটবেলা থেকে এ দেশের মাটি ও মানুষ দেখে আজকের এ অবস্থানে এসেছি। যা দেখেছি হয়তো আরও অনেক দেখতে পারতাম অথবা আরও কমও দেখতে পেতাম দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি। তবে যতটুক দেখেছি তা কম কিসে? যেতে যেতে আমাদের দেশ ৫০ বছর অতিক্রম করল। এটি একটি ভালোলাগা। অনেক কিছু দেখেছি, দেখছি, যদি বেঁচে থাকি ভবিষ্যতেও অনেক কিছু দেখা হবে। তবে এমন কিছু দেখে যেতে চাই যা দেশ ও দশের কল্যাণে হয়। মাঝে অপ্রীতিকর ঘটনার সূত্রপাত হয় এমন কিছু কখনো প্রত্যাশা করতে চাই না। দেশকে ভালোবাসি, ভালোবেসেই যাচ্ছি।

* তারিক আনাম খান, অভিনেতা ও নির্মাতা

১৯৭১ সাল থেকে আজ একটি নির্দিষ্ট সীমা থেকে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশ। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাসহ শত্রু পক্ষের নানা অপকৌশল থেকে বেঁচে যাওয়া দেশ আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নাম যখন দেখা যায় বুক ফুলে ওঠে গর্বে। আমি মূলত অভিনয়ের মানুষ, আমার কাছে সংস্কৃতিই বড় বিষয়। বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিষয় নিয়েই কথা বলতে চাই। ৫০ পেরিয়ে একান্নতে পা রেখেছে এ দেশ। এ উপলক্ষ্যে আমার প্রত্যাশা, সামনের দিনগুলোতে দেশের সংস্কৃতিকে যেন দায়িতপ্রাপ্তরা আরও উন্নত করেন, বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেন। আমরাও কাজ করছি। দেশীয় সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করলে বাংলাদেশ এবং আমাদেরই লাভ এবং প্রসার হবে। আমরা চাই আমাদের সংস্কৃতিও বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাক।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন