পাকবাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ নিজেই দেখেছি
jugantor
মুক্তিযোদ্ধার কলাম
পাকবাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ নিজেই দেখেছি

  সোহেল রানা  

০৮ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে থেকেই আমি ছাত্রলীগের রাজনীতি করি। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে পড়াকালীন সেখানে রাজনীতি করেছি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আরও বেগবান হয় আমার রাজনৈতিক জীবন। আমি ছাত্রলীগের মুজিববাদী গ্রুপের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের ভিপি নির্বাচিত হই। এই প্রতিষ্ঠানে পড়ার সময় থেকেই জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। থাকতাম ইকবাল হলে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ চারদিকের পরিস্থিতি কেমন যেন ভালো লাগছিল না আমার। তাই মন সায় না দেওয়ায় সেই রাতে হলে না থেকে এক আত্মীয়ের বাসায় চলে যাই। আমি হল ছাড়ি সন্ধ্যার পর। ঠিক তার কয়েকঘণ্টা পরই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার অন্যান্য এলাকার মতো ইকবাল হলেও নারকীয় তাণ্ডব চালায়। পরের দিন খোঁজ নিয়ে জানতে পারি আমার পরিচিতদের মধ্যে যারা রাতে হলে ছিলেন, তারা অনেকেই বেঁচে নেই। এদিকে হলের ভিপি হওয়ার কারণে আমার কক্ষটি মেশিনগানের গুলি দিয়ে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল। আর আমাকে খুঁজেছে হায়েনারা। আমি তখন হলে যাওয়া কিংবা ঢাকায় অবস্থান করা নিরাপদ মনে না করায় বরিশালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। প্রচলিত যানবাহনে ভ্রমণ নিরাপদ না হওয়ায় হেঁটে কয়েকদিন পর বরিশাল গিয়ে পৌঁছি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গেরিলা দলে যোগ দেই। যুদ্ধের প্রথম পাঁচ মাস বরিশালে অবস্থান করেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, সংগঠিত করাসহ অন্যান্য কাজ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকি। অস্ত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিতরণ এবং যুদ্ধের সময় নেতাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার কাজে ব্যস্ত থাকি। এরপর বরিশালে না থেকে ঢাকায় আসার সিদ্ধান্ত নিই। এরই মধ্যে আমার খোঁজে পাকবাহিনী ও রাজাকাররা ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েছে। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢাকায় এসে গ্রিন রোডের একটি বাসায় আত্মগোপন করে থাকতে শুরু করি। বেশিদিন লুকিয়ে থাকতে আর ভালো লাগছিল না। শত্রু নিধনের জন্য প্রতিশোধ প্রবণ হয়ে উঠছিলাম। আমার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা মহসীন মন্টু তখন অবস্থান করছিল ঢাকার সন্নিকটে কেরানীগঞ্জের আটি নামের একটি এলাকায়। রাতের আঁধারে আমাদেরই একজন আমাকে মন্টুর আস্তানায় পৌঁছে দেয়। শুরু হয় আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মিশন। মন্টু অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে একটি বিশাল গ্রুপ তৈরি করে। আমি যাওয়ার পর সে খুব খুশি হয়। অস্ত্র সংগ্রহ এবং পরিচালনার কাজেও আমার ওপর দায়িত্ব বর্তায়। আমি পরোক্ষভাবে এ দলের হয়ে অনেক ছোট ছোট অপারেশনে অংশ নিই তখন। নভেম্বর শেষ দিকে আমরা যে এলাকায় অবস্থান করছি সেখানে পাকবাহিনীর আক্রমণের কথা জানতে পারি আমাদের সোর্সের মাধ্যমে। তাই ওরা আসার আগে থেকেই আমরা যুদ্ধ কৌশল ঠিক করে অবস্থান নিই। পাকবাহিনী সেই এলাকায় ঢুকেই ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছিল এবং মানুষজন যাদেরই পাচ্ছিল তাদেরই মেরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তখন পাকবাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ স্বচক্ষে দেখেছি। সকাল থেকে বিকাল এভাবে সেই এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে তারা। কিন্তু বিকালের দিকে তারা বেশ আনন্দচিত্তে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ঢাকার দিকে ফিরে আসা শুরু করে। এদিকে আমাদের পুরো গ্রুপটি তিন দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে তাদের ওপর। পাকবাহিনীর সদস্যরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের ৩০ থেকে প্রায় ৪০ জন সদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত দুই পক্ষই গোলাগুলিতে ব্যস্ত ছিলাম আমরা। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ আমাদের অবস্থানের দিকে তিনটি সামরিক হেলিকপ্টার আসতে থাকলে আমরা অবস্থান পরিবর্তন করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাই। এরপর গ্রামবাসী যারা বেঁচে ছিল তারা আমাদের নিয়ে আনন্দ উল্লাসও করেছে। এটিই মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার সবচেয়ে বড় সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা।

লেখক : অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ

মুক্তিযোদ্ধার কলাম

পাকবাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ নিজেই দেখেছি

 সোহেল রানা 
০৮ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে থেকেই আমি ছাত্রলীগের রাজনীতি করি। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে পড়াকালীন সেখানে রাজনীতি করেছি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আরও বেগবান হয় আমার রাজনৈতিক জীবন। আমি ছাত্রলীগের মুজিববাদী গ্রুপের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের ভিপি নির্বাচিত হই। এই প্রতিষ্ঠানে পড়ার সময় থেকেই জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। থাকতাম ইকবাল হলে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ চারদিকের পরিস্থিতি কেমন যেন ভালো লাগছিল না আমার। তাই মন সায় না দেওয়ায় সেই রাতে হলে না থেকে এক আত্মীয়ের বাসায় চলে যাই। আমি হল ছাড়ি সন্ধ্যার পর। ঠিক তার কয়েকঘণ্টা পরই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার অন্যান্য এলাকার মতো ইকবাল হলেও নারকীয় তাণ্ডব চালায়। পরের দিন খোঁজ নিয়ে জানতে পারি আমার পরিচিতদের মধ্যে যারা রাতে হলে ছিলেন, তারা অনেকেই বেঁচে নেই। এদিকে হলের ভিপি হওয়ার কারণে আমার কক্ষটি মেশিনগানের গুলি দিয়ে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছিল। আর আমাকে খুঁজেছে হায়েনারা। আমি তখন হলে যাওয়া কিংবা ঢাকায় অবস্থান করা নিরাপদ মনে না করায় বরিশালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। প্রচলিত যানবাহনে ভ্রমণ নিরাপদ না হওয়ায় হেঁটে কয়েকদিন পর বরিশাল গিয়ে পৌঁছি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গেরিলা দলে যোগ দেই। যুদ্ধের প্রথম পাঁচ মাস বরিশালে অবস্থান করেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, সংগঠিত করাসহ অন্যান্য কাজ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকি। অস্ত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিতরণ এবং যুদ্ধের সময় নেতাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার কাজে ব্যস্ত থাকি। এরপর বরিশালে না থেকে ঢাকায় আসার সিদ্ধান্ত নিই। এরই মধ্যে আমার খোঁজে পাকবাহিনী ও রাজাকাররা ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েছে। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢাকায় এসে গ্রিন রোডের একটি বাসায় আত্মগোপন করে থাকতে শুরু করি। বেশিদিন লুকিয়ে থাকতে আর ভালো লাগছিল না। শত্রু নিধনের জন্য প্রতিশোধ প্রবণ হয়ে উঠছিলাম। আমার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা মহসীন মন্টু তখন অবস্থান করছিল ঢাকার সন্নিকটে কেরানীগঞ্জের আটি নামের একটি এলাকায়। রাতের আঁধারে আমাদেরই একজন আমাকে মন্টুর আস্তানায় পৌঁছে দেয়। শুরু হয় আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মিশন। মন্টু অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে একটি বিশাল গ্রুপ তৈরি করে। আমি যাওয়ার পর সে খুব খুশি হয়। অস্ত্র সংগ্রহ এবং পরিচালনার কাজেও আমার ওপর দায়িত্ব বর্তায়। আমি পরোক্ষভাবে এ দলের হয়ে অনেক ছোট ছোট অপারেশনে অংশ নিই তখন। নভেম্বর শেষ দিকে আমরা যে এলাকায় অবস্থান করছি সেখানে পাকবাহিনীর আক্রমণের কথা জানতে পারি আমাদের সোর্সের মাধ্যমে। তাই ওরা আসার আগে থেকেই আমরা যুদ্ধ কৌশল ঠিক করে অবস্থান নিই। পাকবাহিনী সেই এলাকায় ঢুকেই ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছিল এবং মানুষজন যাদেরই পাচ্ছিল তাদেরই মেরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। তখন পাকবাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ স্বচক্ষে দেখেছি। সকাল থেকে বিকাল এভাবে সেই এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে তারা। কিন্তু বিকালের দিকে তারা বেশ আনন্দচিত্তে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ঢাকার দিকে ফিরে আসা শুরু করে। এদিকে আমাদের পুরো গ্রুপটি তিন দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে তাদের ওপর। পাকবাহিনীর সদস্যরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের ৩০ থেকে প্রায় ৪০ জন সদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত দুই পক্ষই গোলাগুলিতে ব্যস্ত ছিলাম আমরা। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ আমাদের অবস্থানের দিকে তিনটি সামরিক হেলিকপ্টার আসতে থাকলে আমরা অবস্থান পরিবর্তন করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাই। এরপর গ্রামবাসী যারা বেঁচে ছিল তারা আমাদের নিয়ে আনন্দ উল্লাসও করেছে। এটিই মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার সবচেয়ে বড় সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা।

লেখক : অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন