বদলে যাচ্ছে নাটকের গল্প
jugantor
বদলে যাচ্ছে নাটকের গল্প
এক সময় নাটকে কমেডির নামে ভাঁড়ামিই দেখানো হতো। দর্শককে জোর করে হাসানোর চেষ্টা করা হতো। আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে এ ধরনের নাটকের নির্মাণের সংখ্যা কমে গেছে। নির্মিত হচ্ছে সিরিয়াস নাটক।

  তারা ঝিলমিল প্রতিবেদক  

১১ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার শুরু হওয়ার আগে টিভি নাটক বলতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটককেই বোঝানো হতো। তখন শিল্পমান বজায় রেখে একখণ্ড ও ধারাবাহিক নাটক নির্মিত হতো নিয়মিত। তবে দর্শকের রুচির সঙ্গে মিল রেখে কিংবা রুচি তৈরিতে সে সময়কার নাট্যজনরা ব্যাপক সতর্ক থেকে নাটক নির্মাণ করতেন। দর্শক সেভাবেই অভ্যস্ত ছিল তখন। এখনকার মতো বিটিভিতে তখন প্রতিদিন নাটক প্রচারও হতো না। তারপরও তখন নাটক দেখার যে আকাক্সক্ষা দর্শকের মধ্যে ছিল তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নাট্যকার, নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে যে সমন্বয় ছিল, তা এক কথায় অনবদ্য। বেশিরভাগ নাটকের শুটিংয়ের আগে মহড়া করা হতো। এভাবে তখন প্রায় প্রতিটি নাটকই দর্শকদের আকর্ষিত করত। এ ছাড়া তখনকার বেশিরভাগ নাটকই ছিল বিভিন্ন রকম সামাজিক বার্তায় ভরপুর। এ সবের সঙ্গে অল্প বিস্তর কমেডিও দেখা যেত। কিন্তু কমেডির নামে ভাঁড়ামি দেখা যেত না। অপ্রাসঙ্গিকভাবে তখন দর্শকদের হাসানোর চেষ্টা কিংবা সুড়সুড়ি দেওয়ার প্রবণতা একেবারেই ছিল না বলা চলে।

বেসরকারি টিভি চ্যানেল সম্প্রচারে আসার পর বিটিভির গণ্ডি এড়িয়ে আলাদাভাবে নাটকের বলয় গড়ে ওঠে। যদিও শুরুতে মানসম্মত নাটকের দিকেই চ্যানেলগুলোর নজর ছিল। কিন্তু দর্শক সমাগম বৃদ্ধি করতে ভিন্ন কিছুর দিকে নজর দেয় তারা। বলা যায় তখন থেকেই নাটকের গুণগত মান পরিবর্তন হতে শুরু করে। ‘কমেডি’ নামে আলাদা ঘরানার নাটক নির্মিত হতে থাকে। দর্শক চাহিদার কথা বলে চ্যানেলগুলোও এ ধরনের নাটকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সে সময়কার একটি জনপ্রিয় কমেডি নাটক হলো ‘রঙের মানুষ’। অবশ্য এ নাটকটিতে কমেডি থাকলেও ছিল না ভাঁড়ামির আশ্রয়। যার কারণে সব ধরনের দর্শককে আকর্ষিত করে নাটকটি। এটিকে সামনে রেখে এরপর অসংখ্য কমেডি নাটক নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ নাটকেই কমেডির নামে অযথা ভাঁড়ামির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে অনেক অভিনেতার নামের আগে যুক্ত হয়েছে ‘কমেডি’ শব্দটি। এর মধ্যে জনপ্রিয় দু-একজন অভিনেতাও আছেন। অনেক প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় শিল্পীরাও এ ভাঁড়ামির জন্য অভিনয় কমিয়ে দিয়েছিলেন।

আশার কথা হলো, এসব ভাঁড়ামি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে সিরিয়াস গল্পের নাটকই এখন নির্মিত হচ্ছে নিয়মিত। এ ধরনের নাটকের প্রতি শিল্পীদের পাশাপাশি সাধারণ দর্শকের আগ্রহও লক্ষণীয়। সংশ্লিষ্টদের অভিমত, দর্শক ধীরে ধীরে মানসম্মত সিরিয়াস গল্পের দিকেই ঝুঁকছেন এখন। এ প্রসঙ্গে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ‘কমেডি নাটক বলে আমি আলাদা কিছু বলতে চাই না। একটি নাটকের মধ্যে হাসি কান্নাসহ অনেক কিছুই থাকতে পারে। কিন্তু সেটার পরিমিতি বোধটাই আসল। আমিও কমেডি নাটকে অভিনয় করেছি, কিন্তু সেগুলোতে ভাঁড়ামি ছিল না। দর্শকদের বিনোদিত করার জন্য অভিনয় করি, হাসানোর জন্য নয়। আমি কিন্তু কমেডিয়ান নই, আমি অভিনেতা। দর্শককে হাসানোর জন্য কমেডির নামে ভাঁড়ামি দিয়ে নাটক নির্মাণ করবে, আমি এটার পক্ষপাতী নই। নাটকের মধ্যে সুস্থ সুন্দর একটি গল্প থাকবে। নাটক যেহেতু একটা জীবনের কিংবা মুহূর্তের গল্প। তাই সেখানে সবকিছুই থাকতে পারে। প্রতিদিনের জীবনযাপনে তো অনেক কিছুই থাকে। সেখান থেকে হাসি আর ভাঁড়ামি দিয়ে নাটক নির্মাণ করলে তো হবে না। এভাবে করতে গিয়ে নাটকের বারোটা বাজিয়ে দেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি যখন কমেডি নাটকে অভিনয় করতাম, তখন প্রতিটি নাটকেই একটি সুস্থ ও সুন্দর বক্তব্য ছিল। অভিনয়, শিল্প ও বিনোদন-এ তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে অভিনয় করার চেষ্টা করি। সস্তা বিনোদনের নাটকে তাই আমি কাজও করি না। এখন যেহেতু আবার সিরিয়াসধর্মী গল্পের নাটক নির্মাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই এটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছি।’

এদিকে নাট্যকার বৃন্দাবন দাসও নাটকে ভাঁড়ামির বিষয়টি নিয়ে অনেকটাই বিরক্ত ও বিব্রত। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে আসলে কমেডি হয় না, হয় ভাঁড়ামি। সার্ভিস হোল্ডার নামের একটি হাসির নাটক লিখেছিলাম অনেক আগে। হাসির পাশাপাশি মানুষ এটি দেখে কেঁদেছেনও। এক সময় নাটকের গল্প থেকে মা-বাবাসহ অনেক চরিত্রই হারিয়ে গিয়েছিল। এখন আবারও অল্প করে হলেও সে চরিত্রগুলো ফিরে আসছে। দর্শকও সেই নাটকগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখছেন। সিরিয়াস বলি আর কমেডি বলি, যাই করি না কেন মূল লক্ষ্য হলো ভালো নাটক করা, সে বিষয়টি এখন গুরুত্ব দিয়ে নাটক নির্মাণের প্রবণতা অনেক কম। তবে বিক্ষিপ্তভাবে ভালো নাটক নির্মাণের চেষ্টা করছেন অনেকেই, যা ইতিবাচক।’

অভিনেতা ও নির্মাতা সালাউদ্দিন লাভলু এক সময় কমেডি নাটক নিয়মিত নির্মাণ করতেন। তিনি বলেন, ‘করোনার লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে সিরিয়াস নাটক নির্মাণের বিষয়টি দেখা গেছে। সস্তা বিনোদনের নাটক থেকে দর্শক এখন অনেকটাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। টিভি চ্যানেলগুলো কীভাবে আগামীতে টিকে থাকবে, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। কারণ টিভিতে নাটক প্রচারের বিকল্প হিসাবে অনেক মাধ্যম এখন প্রচলিত। তাই আমি বলব সুস্থ ও সুন্দর গল্প নিয়ে নাটক নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।’

বদলে যাচ্ছে নাটকের গল্প

এক সময় নাটকে কমেডির নামে ভাঁড়ামিই দেখানো হতো। দর্শককে জোর করে হাসানোর চেষ্টা করা হতো। আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে এ ধরনের নাটকের নির্মাণের সংখ্যা কমে গেছে। নির্মিত হচ্ছে সিরিয়াস নাটক।
 তারা ঝিলমিল প্রতিবেদক 
১১ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার শুরু হওয়ার আগে টিভি নাটক বলতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটককেই বোঝানো হতো। তখন শিল্পমান বজায় রেখে একখণ্ড ও ধারাবাহিক নাটক নির্মিত হতো নিয়মিত। তবে দর্শকের রুচির সঙ্গে মিল রেখে কিংবা রুচি তৈরিতে সে সময়কার নাট্যজনরা ব্যাপক সতর্ক থেকে নাটক নির্মাণ করতেন। দর্শক সেভাবেই অভ্যস্ত ছিল তখন। এখনকার মতো বিটিভিতে তখন প্রতিদিন নাটক প্রচারও হতো না। তারপরও তখন নাটক দেখার যে আকাক্সক্ষা দর্শকের মধ্যে ছিল তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নাট্যকার, নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে যে সমন্বয় ছিল, তা এক কথায় অনবদ্য। বেশিরভাগ নাটকের শুটিংয়ের আগে মহড়া করা হতো। এভাবে তখন প্রায় প্রতিটি নাটকই দর্শকদের আকর্ষিত করত। এ ছাড়া তখনকার বেশিরভাগ নাটকই ছিল বিভিন্ন রকম সামাজিক বার্তায় ভরপুর। এ সবের সঙ্গে অল্প বিস্তর কমেডিও দেখা যেত। কিন্তু কমেডির নামে ভাঁড়ামি দেখা যেত না। অপ্রাসঙ্গিকভাবে তখন দর্শকদের হাসানোর চেষ্টা কিংবা সুড়সুড়ি দেওয়ার প্রবণতা একেবারেই ছিল না বলা চলে।

বেসরকারি টিভি চ্যানেল সম্প্রচারে আসার পর বিটিভির গণ্ডি এড়িয়ে আলাদাভাবে নাটকের বলয় গড়ে ওঠে। যদিও শুরুতে মানসম্মত নাটকের দিকেই চ্যানেলগুলোর নজর ছিল। কিন্তু দর্শক সমাগম বৃদ্ধি করতে ভিন্ন কিছুর দিকে নজর দেয় তারা। বলা যায় তখন থেকেই নাটকের গুণগত মান পরিবর্তন হতে শুরু করে। ‘কমেডি’ নামে আলাদা ঘরানার নাটক নির্মিত হতে থাকে। দর্শক চাহিদার কথা বলে চ্যানেলগুলোও এ ধরনের নাটকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সে সময়কার একটি জনপ্রিয় কমেডি নাটক হলো ‘রঙের মানুষ’। অবশ্য এ নাটকটিতে কমেডি থাকলেও ছিল না ভাঁড়ামির আশ্রয়। যার কারণে সব ধরনের দর্শককে আকর্ষিত করে নাটকটি। এটিকে সামনে রেখে এরপর অসংখ্য কমেডি নাটক নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ নাটকেই কমেডির নামে অযথা ভাঁড়ামির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে অনেক অভিনেতার নামের আগে যুক্ত হয়েছে ‘কমেডি’ শব্দটি। এর মধ্যে জনপ্রিয় দু-একজন অভিনেতাও আছেন। অনেক প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় শিল্পীরাও এ ভাঁড়ামির জন্য অভিনয় কমিয়ে দিয়েছিলেন।

আশার কথা হলো, এসব ভাঁড়ামি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে সিরিয়াস গল্পের নাটকই এখন নির্মিত হচ্ছে নিয়মিত। এ ধরনের নাটকের প্রতি শিল্পীদের পাশাপাশি সাধারণ দর্শকের আগ্রহও লক্ষণীয়। সংশ্লিষ্টদের অভিমত, দর্শক ধীরে ধীরে মানসম্মত সিরিয়াস গল্পের দিকেই ঝুঁকছেন এখন। এ প্রসঙ্গে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ‘কমেডি নাটক বলে আমি আলাদা কিছু বলতে চাই না। একটি নাটকের মধ্যে হাসি কান্নাসহ অনেক কিছুই থাকতে পারে। কিন্তু সেটার পরিমিতি বোধটাই আসল। আমিও কমেডি নাটকে অভিনয় করেছি, কিন্তু সেগুলোতে ভাঁড়ামি ছিল না। দর্শকদের বিনোদিত করার জন্য অভিনয় করি, হাসানোর জন্য নয়। আমি কিন্তু কমেডিয়ান নই, আমি অভিনেতা। দর্শককে হাসানোর জন্য কমেডির নামে ভাঁড়ামি দিয়ে নাটক নির্মাণ করবে, আমি এটার পক্ষপাতী নই। নাটকের মধ্যে সুস্থ সুন্দর একটি গল্প থাকবে। নাটক যেহেতু একটা জীবনের কিংবা মুহূর্তের গল্প। তাই সেখানে সবকিছুই থাকতে পারে। প্রতিদিনের জীবনযাপনে তো অনেক কিছুই থাকে। সেখান থেকে হাসি আর ভাঁড়ামি দিয়ে নাটক নির্মাণ করলে তো হবে না। এভাবে করতে গিয়ে নাটকের বারোটা বাজিয়ে দেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি যখন কমেডি নাটকে অভিনয় করতাম, তখন প্রতিটি নাটকেই একটি সুস্থ ও সুন্দর বক্তব্য ছিল। অভিনয়, শিল্প ও বিনোদন-এ তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে অভিনয় করার চেষ্টা করি। সস্তা বিনোদনের নাটকে তাই আমি কাজও করি না। এখন যেহেতু আবার সিরিয়াসধর্মী গল্পের নাটক নির্মাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাই এটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছি।’

এদিকে নাট্যকার বৃন্দাবন দাসও নাটকে ভাঁড়ামির বিষয়টি নিয়ে অনেকটাই বিরক্ত ও বিব্রত। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে আসলে কমেডি হয় না, হয় ভাঁড়ামি। সার্ভিস হোল্ডার নামের একটি হাসির নাটক লিখেছিলাম অনেক আগে। হাসির পাশাপাশি মানুষ এটি দেখে কেঁদেছেনও। এক সময় নাটকের গল্প থেকে মা-বাবাসহ অনেক চরিত্রই হারিয়ে গিয়েছিল। এখন আবারও অল্প করে হলেও সে চরিত্রগুলো ফিরে আসছে। দর্শকও সেই নাটকগুলো আগ্রহ নিয়ে দেখছেন। সিরিয়াস বলি আর কমেডি বলি, যাই করি না কেন মূল লক্ষ্য হলো ভালো নাটক করা, সে বিষয়টি এখন গুরুত্ব দিয়ে নাটক নির্মাণের প্রবণতা অনেক কম। তবে বিক্ষিপ্তভাবে ভালো নাটক নির্মাণের চেষ্টা করছেন অনেকেই, যা ইতিবাচক।’

অভিনেতা ও নির্মাতা সালাউদ্দিন লাভলু এক সময় কমেডি নাটক নিয়মিত নির্মাণ করতেন। তিনি বলেন, ‘করোনার লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে সিরিয়াস নাটক নির্মাণের বিষয়টি দেখা গেছে। সস্তা বিনোদনের নাটক থেকে দর্শক এখন অনেকটাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। টিভি চ্যানেলগুলো কীভাবে আগামীতে টিকে থাকবে, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। কারণ টিভিতে নাটক প্রচারের বিকল্প হিসাবে অনেক মাধ্যম এখন প্রচলিত। তাই আমি বলব সুস্থ ও সুন্দর গল্প নিয়ে নাটক নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন