সাধারণ মানুষের কথা কণ্ঠে ধারণ করতে চাই : মাকসুদুল হক

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক

জনপ্রিয় ব্যান্ড সঙ্গীতশিল্পী মাকসুদুল হক

জনপ্রিয় ব্যান্ড সঙ্গীতশিল্পী মাকসুদুল হক। ম্যাক নামেও পরিচিত তিনি। সঙ্গীতাঙ্গনে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পথচলা তার। ফিডব্যাক ছেড়ে ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নিজের ব্যান্ডদল ‘মাকসুদ ও ঢাকা’।

মেলায় যাইরে, মৌসুমী, মাঝি, তোমার চিঠি’র মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গান গেয়েছেন। ছাত্রজীবন থেকেই জড়িত ছিলেন সব প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গেও। নিজের ক্যারিয়ার ও সঙ্গীতাঙ্গনের বেশ কিছু বিষয় নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এ শিল্পী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান সাইদুল

যুগান্তর: সঙ্গীতে আসার পেছনে কার অবদান ছিল?

মাকসুদ: আমার পরিবারে কোনো মিউজিশিয়ান ছিল না। রেডিও আমার গানের প্রথম শিক্ষক। বলা যায় এটার অবদানই বেশি ছিল। তখন বাংলাদেশ বেতার ছিল না, ছিল পূর্ব পাকিস্তান রেডিও। রেডিওতে গান শুনে শুনেই শিখেছি। সেই অর্থে আমার কোনো গানের শিক্ষক নেই।

পূর্ব পাকিস্তান রেডিওতে প্রতি রোববার ‘টপ অব দ্য পপ’ নামে একটি গানের অনুষ্ঠান হতো। সেখানে ওয়ার্ল্ডস হিট গানগুলো প্রচার করা হতো। সেগুলো শুনতাম। আর গান শোনার মাধ্যম বলতে রেডিওই, তখন তো টেপরেকর্ডার বের হয়নি। তাই দিনের ভালো একটা সময় কাটত রেডিও শুনে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের বশির আহমেদ, খন্দকার ফারুক আহমেদ, সৈয়দ আবদুল হাদী, এদিকে পাকিস্তানের আহমেদ রুশদী একটু পপ প্যাটার্নের গান করতেন। গানের ট্র্যাক কিন্তু অনেক ছিল, যেহেতু রেডিওতেই গান শুনতাম। এভাবেই শুনতে শুনতে আমিই গান শোনাতে শুরু করলাম।

যুগান্তর: প্রথম কোন ব্যান্ড দলের সঙ্গে গান শুরু করেছিলেন?

মাকসুদ: ১৯৭৪ সালের দিকে মালিবাগের ‘আর্লি বার্ড’ নামে একটি ব্যান্ড ছিল। ওরা পল্লবীতে শো করতে আসত। ওদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আমি একটি-দুটি গান করতাম। ওরা খুব পছন্দ করল। তারপর ওদের সঙ্গে অনেক জায়গায় কনসার্ট করেছি। এটিই ছিল কোনো ব্যান্ড দলের সঙ্গে আমার প্রথম সম্পৃক্ততা।

যুগান্তর: বাংলায় গান গাওয়া নিয়মিত হয় কীভাবে?

মাকসুদ: ১৯৭৬ সালে গাইতে শুরু করেছি। ওই সময় একটি হোটেলে গায়ক হিসেবে কাজ পাই। তখন আমার ভাবনায় ছিল, ইংলিশ ছাড়া আর কোনো ভাষায় গান গাওয়াটা ক্ষেত ব্যাপার। বিভিন্ন রকম ওয়েস্টার্ন গানই আমি গাইতাম তখন। পপ, রক্, রেগে ইত্যাদি।

ফিডব্যাকের লিড-ভোকালিস্ট হওয়ার সুবাদে এমনিতেই একটা পরিচিতি ছিল আগে থেকে। একটা সময় আমি ভাবলাম শ্রোতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চাইলে এবং শিল্পী হিসেবে নিজের চিন্তাভাবনা সাধারণ শ্রোতার মাঝে ছড়াতে চাইলে, সাধারণ মানুষ যে ভাষায় দৈনন্দিন ভাব প্রকাশ করে সেই ভাষায় শিল্পীর গান গাওয়া জরুরি।

তারপর থেকে বাংলায় গাইতে শুরু করি। এরপর ফিডব্যাকের ব্যাপক জনসমাদৃত অ্যালবাম ‘উল্লাস’ প্রকাশের পর ব্যান্ড এবং আমার খ্যাতি আগের চেয়ে বেড়ে যায়। পরে ‘মেলা’ অ্যালবাম যখন প্রকাশ হয়, ‘মেলায় যাই রে’ গানটা বাংলাদেশে এবং দেশের বাইরে বাংলাভাষীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। ব্লকবাস্টার হিট বলতে যা বোঝায়, ‘মেলায় যাই রে’ গানটি সেটা অর্জন করে রিলিজের পরপরই।

এরপর ১৯৯৪ সালে প্রকাশ হয় ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’, যা বাংলা গানের স্টুডিও অ্যালবামের মধ্যে বছরের সেরা নির্বাচিত হয় একটা বাংলা সাপ্তাহিকের পাঠক জরিপে। এরপর বাংলা গান নিয়ে আর পেছন ফিরতে হয়নি।

যুগান্তর: ‘মেলায় যাই রে’ গানের পেছনের গল্প কী ছিল?

মাকসুদ: গানটি তৈরি করতে দুই বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল। এর কথাগুলো লিখতেও তিন মাস সময় লেগে যায়। আর সুর করতে সময় লাগে প্রায় আট মাস।

অবশেষে ১৯৯০ সালে গানটি ‘মেলা’ অ্যালবামে প্রকাশ করতে সক্ষম হই। তখন আমি ফিডব্যাক ব্যান্ডের একজন দুরন্ত সেনা। ৬০-এর দশক থেকে রমনা বটমূলে বৈশাখী উৎসব পালন করা হচ্ছে। তখন পহেলা বৈশাখ বলতে আমরা ‘হালখাতার দিন’ বুঝতাম।

আমার বাবা একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তাই পহেলা বৈশাখ এলেই বাবার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়াতাম। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে গ্রাম-গঞ্জে মেলার আয়োজন চলত। সেই মেলায় বিভিন্ন ধরনের পণ্য বেচাকেনা ও মিষ্টি বিতরণ করা হতো।

এভাবেই মূলত বৈশাখের আমেজটা সাধারণ মানুষের মধ্যে আসে। একসময় রমনায় এই উৎসবকে ঘিরে মেলা ও গান-বাজনা শুরু হয়। তখন দেখতাম, মেলায় মানুষের উপচেপড়া ভিড়। শত আনন্দের মাঝেও মানুষ একটা অপূর্ণতা নিয়ে বাড়ি ফিরত। মনে হতো, আনন্দ-উল্লাসের কোথাও একটা অভাব রয়েছে। সেই ভাবনা থেকেই মূলত আমি গানটি লেখা শুরু করি।

যুগান্তর: ‘প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিষিদ্ধ’ গানে সত্যিকার অর্থে প্রাপ্তবয়স্ক কারা?

মাকসুদ: আমার ‘প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিষিদ্ধ’ অ্যালবামটি নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। অনেকে বলেছে এটা নিষিদ্ধ হবে। আমি বলেছি এটা নিষিদ্ধ কেন হবে? কারা করবে? আমি নিজেই সেটার নাম দিলাম ‘প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিষিদ্ধ।’ প্রাপ্তবয়স্ক বলতে আমি যারা দেশ চালায় তাদেরই বলেছি।

যুগান্তর: আপনাদের সময়কার ব্যান্ডগুলোর অবস্থা তো বেশ রমরমা ছিল...

মাকসুদ: আমরা আজম ভাইদের (আজম খান) পরের ব্যাচ। তখন বাংলাদেশে ব্যান্ড বলতে উচ্চারণ, সোলস, সকিং ব্ল–স, মাইলস, রেনেসাঁ, অবসকিউর এরাই ছিল। বেশ দাপটের সঙ্গেই কাজ করছিল সবাই। ভালোই লাগত।

যুগান্তর: অনেক দিন আপনার কোনো একক কিংবা ব্যান্ডের অ্যালবাম প্রকাশ হচ্ছে না। নতুন অ্যালবাম কবে আসবে?

মাকসুদ: অনেক আগেই বলেছি, ব্যান্ডের বাইরে আমি আর কোনো একক অ্যালবাম প্রকাশ করব না। এখন যা করব, তা আমার ব্যান্ড ‘মাকসুদ ও ঢাকা’কে সঙ্গে নিয়েই করব। অডিও বাজারের বর্তমান অবস্থার কারণেই অ্যালবাম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি।

স্টেজ শো আর টিভি অনুষ্ঠান নিয়েই এখন আমরা ব্যস্ত আছি। ভক্ত-শ্রোতাদের অনুরোধে ব্যান্ডের নতুন অ্যালবামের কাজ শুরু করেছি। ৩-৪টি গানের রেকর্ডিংও প্রায় শেষ। অ্যালবামের কাজটি পুরোপুরি শেষ করে সবাইকে বলব। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরেই অ্যালবামটি প্রকাশ করব।

যুগান্তর: গানে এখনও যৌথ প্রযোজনার হাঁকডাক চলছে। এটাকে কীভাবে দেখছেন?

মাকসুদ: আমাদের দেশে শিল্পীর কোনো অভাব পড়েনি যে শিল্পী ধার করে এনে গান গাওয়াতে হবে। আমাদের দেশীয় শিল্পীদের নিজস্ব একটা জনপ্রিয়তা রয়েছে। তাদের বাদ দিয়ে ভিনদেশি শিল্পীদের দিয়ে গান গাওয়ানো দেশীয় শিল্পীদের অসম্মান ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা আমাদের দেশের পরিচালক, প্রযোজকদের ভাবতে হবে।

যুগান্তর: জীবনটাকে কীভাবে দেখেন?

মাকসুদ: আমার জীবনে ১৯৯০ সালটি ছিল একটা ক্রান্তিকাল। এতদিন জীবনটাকে যেভাবে দেখে আসছিলাম, ওই বছরে এসে সেই দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলে যেতে শুরু করে। আমি ওই সময় থেকে বাউল মিউজিক নিয়ে ভাবা শুরু করি, রিসার্চ শুরু করি।

বুঝতে পারি যে, বাউল মিউজিক হচ্ছে মানবতার মিউজিক। এ সময় আমি লালন ফকিরের গানে মগ্ন হই। একইসঙ্গে এটাও বলব যে, এ সময়টাতেই কোরআন আমাকে মুক্তির দিশা দিতে থাকে। এ রকম একটা পরিপ্রেক্ষিতে বাউলদের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নানা অনুষঙ্গ ধরে রেখেছে।

এটা ভাবতে গেলে আশ্চর্য হতে হয়, একটা গরিব মানুষে ভরা দেশে বাউল পন্থা এত জনপ্রিয়। বাউলদের চারটা তরিকার মধ্যে আমি কালো তরিকা নিয়েছি নিজের জন্য।

যুগান্তর: আপনি তো লেখালেখিও করেন...?

মাকসুদ: ১৯৯৯ সালের টুকরো কিছু লেখা নিয়ে ২০০৪ সালে ‘আমি বাংলাদেশের দালাল বলছি’ নামে একটা বই প্রকাশ করি। ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও কাটতি থাকা সত্ত্বেও বইটি কোথাও পাওয়া যায় না।

তাই কিছুদিন আগে আমি এটাকে ই-বুক হিসেবে বের করেছি। এ ছাড়া আমি আরও দুটি বই লিখেছি। একটি বাউলদের ওপর, আরেকটি ইংরেজি কবিতার বই।

যুগান্তর: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

মাকসুদ: আমি প্রচলিত কোনো রাজনৈতিক দলের রাজনীতি করি না। সাধারণ মানুষের কথা কণ্ঠে ধারণ করতে চাই। এটা নিয়ে আমার গানও আছে। আর সারা জীবন গানের সঙ্গেই থাকতে চেয়েছি আর থাকতে চাইও।