একাদশ সংসদ নির্বাচন: নয়াদিল্লি চায় না ‘ভারত ফ্যাক্টর’

  মাসুদ করিম, নয়াদিল্লি থেকে ফিরে ১৪ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ
জাতীয় সংসদ। ফাইল ছবি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভারত কোন পথে থাকবে- তা নিয়ে সাধারণ ভোটারসহ সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতেও এ বিষয়ে আগ্রহের কমতি নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছে ভারত সরকার।

পাশাপাশি দেশটির বেসরকারি থিংকট্যাংক, সাংবাদিক, বিভিন্ন স্তরের মানুষ বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কষছেন নানা হিসাব-নিকাশ। সংশ্লিষ্টদের অভিমত, বাংলাদেশে নির্বাচনে যারাই জয়ী হবে, তাদের সঙ্গেই কাজ করবে ভারত। নয়াদিল্লির সাউথ ব্লক চায় বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘ভারত ফ্যাক্টর’ যেন না আসে।

যদিও দিল্লির পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার বিগত ১০ বছরেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উচ্চমাত্রায় পৌঁছেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী দমন হয়েছে। কানেকটিভিটি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব সহযোগিতা পেয়েছে ভারত। শেখ হাসিনার সরকারই দিল্লির কাছে স্বস্তিদায়ক। যদিও ভারতের প্রতিশ্রুত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়ায় বাংলাদেশে যথেষ্ট ক্ষোভ আছে।

আগামী বছরের শুরুর দিকে ভারতে ভোট হওয়ার কথা। এ নিয়ে ভারতের সংশ্লিষ্ট সবাই ব্যস্ত সময় কাটালেও বাংলাদেশের নির্বাচনকেও অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে দেশটির বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের পূর্বাঞ্চল অবশিষ্ট অঞ্চল থেকে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে।

ভারতের পূর্বাঞ্চল বলতে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যকে বোঝায়। ওই অঞ্চলের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। তাই বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ভারতের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের আধিপত্যও বাড়ছে। নেপাল ও ভুটানে চীনপন্থী সরকার ক্ষমতায় গেছে। শ্রীলংকা চীনের অর্থে হাম্মামতুতা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। আর পাকিস্তানের সঙ্গে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সিল্করোড করিডোর নির্মাণ করছে চীন।

যদিও মালদ্বীপে চীনপন্থী সরকারকে হারিয়ে নির্র্বাচনে জয়ী হয়েছে ভারতপন্থী বিরোধী দল। এসব কারণে ভারতের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। বাংলাদেশেও চীনের সম্পৃক্ততা ও প্রভাব বাড়ছে। এটি ভালোভাবেই বুঝতে পারছে ভারত। তাই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতায় ভারতের আপত্তি নেই। তবে ভারতের কাছে যেসব বিষয় স্পর্শকাতর, সেগুলোর ব্যাপারে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতায় আপত্তি আছে নয়াদিল্লির।

বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের ভূমিকা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সম্প্রতি দিল্লি সফরে যাওয়া বাংলাদেশের সাংবাদিকদের একজন ভারতীয় কূটনীতিক বলেছেন, ‘অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে। বিএনপি তাতে অংশ নেবে। এমন সম্ভাবনাই বেশি। আবার সহিংস পরিস্থিতির লক্ষ্যে অর্থ জোগানের কথাও শোনা যায়। তবে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে।’

দিল্লির প্রভাবশালী গণমাধ্যম এএনআইয়ের এডিটর ভিনিতা পান্ডে যুগান্তরকে বলেছেন, ‘আমার বাবা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। আমরা চাই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কটা সেই পর্যায়ে নিবিড় হোক। আর সম্পর্কটা দু’দেশের সরকারের মধ্যে, জনগণের মধ্যে থাকবে। সরকার কে থাকবে, সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়।’ তবে দ্য হিন্দু পত্রিকার কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার বলেন, ‘ভারত চায় শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় যাক।’

ভারতেও নির্বাচন আগামী বছরের শুরুর দিকে। ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতারা আসামে ভোট পেতে ৪০ লাখ নাগরিককে ভারত থেকে বহিষ্কার করার হুমকি দিচ্ছেন। যদিও এ বিষয়ে ভারত সরকারের সুর নরম।

ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভিকে সিং বাংলাদেশের সাংবাদিক প্রতিনিধি দলকে বলেছেন, ‘নাগরিক নিবন্ধন আদালতের নির্দেশে। এটা নিয়ে বাংলাদেশের ভয়ের কিছু নেই।’ তিস্তা ইস্যু বিজেপি ও মমতা ব্যানার্জির মধ্যে সমস্যা বলে মনে করেন ভারতের অনেকেই। সাউথ ব্লকের কূটনীতিকরা বলেন, মমতা ব্যানার্জির সম্মতি ছাড়া তিস্তা চুক্তি করলে আরও বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে। তার চেয়ে একটু সময় নিয়ে তা করা ভালো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, শেখ হাসিনাই ভারতের জন্যে স্বস্তিদায়ক হলেও নির্বাচনে ভারত দৃশ্যমান তৎপরতা দেখাবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঢাকায় এসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেন। আর বিএনপির বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচনকে সাংবিধানিকভাবে বৈধ বলে অভিহিত করেছিল ভারত। যদিও পশ্চিমা বিশ্ব ওই নির্বাচনে হতাশ হয়েছিল।

পশ্চিমারা চায়, ভারত বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রকে সমর্থন করুক। তবে ভারতের প্রভাবশালী থিংকট্যাংক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (ওআরএফ)-এর গবেষক হর্ষ পান্থ বলেছেন, ‘পশ্চিমা দেশেই কথিত পারফেক্ট গণতন্ত্র নেই।’ বাংলাদেশে নির্বাচনের ব্যাপারে ভারত আগেভাগেই সতর্কতামূলক অবস্থান গ্রহণ করছে। নির্বাচনকে তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই বলছে। বাংলাদেশি সাংবাদিকদের ভারতের বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারক বলেছেন, বাংলাদেশে নির্বাচনে সাংবিধানিকপন্থাকে তারা সমর্থন করেন।

ভারতের সাউথ ব্লকে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভিকে সিং বলেন, ‘নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ যে ইচ্ছাই প্রকাশ করবে, তার প্রতি আমরা সম্মান জানাব। নির্বাচনের এখনও কিছুটা সময় আছে। দেখা যাক, পরিস্থিতি কোন পথে অগ্রসর হয়।’

বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ভারতের কোনো বার্তা আছে কিনা জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিই আমাদের সমর্থন থাকবে। বাংলাদেশের জনগণই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। নির্বাচনের ইস্যু আমরা বাংলাদেশের জনগণের ওপর ছেড়ে দিতে চাই।’

সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ ইস্যুর চেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতিই ভারতের গুরুত্ব বেশি বলে অভিমত দেন। ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতে, ‘বাংলাদেশ যে সিদ্ধান্ত’ নেয় সেটাই বিবেচ্য। সিনহার বক্তব্য তারা আমলে নেবেন না বলেও জানান।

আরেক বৈঠকে ওআরএফের কৌশলগত স্টাডিস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হর্ষ ভি পান্থ বলেছেন, ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সমঝোতায় পৌঁছানো। দলগুলোকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হওয়া উচিত। নির্বাচনে অংশ নেয়া হল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। একেবারে নিখুঁত গণতন্ত্র পশ্চিমা দেশেও নেই। তাই প্রক্রিয়াটাকে মেনে নিতে হবে।’

ওআরএফের সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য বলেন, ‘ভারত জোরালোভাবে বিশ্বাস করে যে, নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। বাংলাদেশের জনগণই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। বাংলাদেশের নির্বাচনের ব্যাপারে অবশ্যই আগ্রহ আছে। বাংলাদেশে সবারই নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত।’

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter