জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বাসনা

খেলাপি ঋণ নবায়নে প্রভাবশালীদের তোড়জোড়

  দেলোয়ার হুসেন ২২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খেলাপি ঋণ নবায়নে প্রভাবশালীদের তোড়জোড়
নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বাসনায় প্রভাবশালীরা খেলাপি ঋণ নবায়নে তোড়জোড় শুরু করেছেন। ছবি: ফাইল ছবি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বাসনায় প্রভাবশালীরা খেলাপি ঋণ নবায়নে তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন। ইতিমধ্যে অনেকেই ঋণ নবায়ন করে নিয়েছেন। অনেকে নবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।

যাদের ঋণ নিয়মিত হিসাবে রয়েছে তারাও ব্যাংকে গিয়ে হালনাগাদ পরিস্থিতির খোঁজ নিচ্ছেন। ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন এমন ৫ জন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী খেলাপি ঋণ নবায়ন করেছেন। আরও ১৫ জন তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা খেলাপি ঋণ নবায়নের জন্য ব্যাংকে যোগাযোগ করছেন। এর বাইরে অনেকে খেলাপি ঋণ নবায়নের জন্য ব্যাংকে আবেদন করেছেন।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। তবে নির্বাচনটি কি প্রক্রিয়ায় হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনও বিতর্ক রয়ে গেছে। কারা অংশ নেবে, কারা নেবে না; সেটি এখনও পরিষ্কার নয়।

তিনি বলেন, নির্বাচন যত অংশগ্রহণমূলক হবে, প্রার্থীর সংখ্যা তত বাড়বে। বাড়বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এ ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা একে অন্যের দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করবেন। যে কারণে খেলাপি ঋণের বিষয়টি আগে থেকে পরিষ্কার রাখতে প্রার্থীরা তৎপর রয়েছেন।

গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোনো ঋণখেলাপি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না। একই সঙ্গে কোনো ঋণের গ্যারান্টার হলে ওই ঋণ যদি খেলাপি হয় এবং গ্রাহক ঋণ শোধ না করেন তাহলে গ্যারান্টারও খেলাপি হিসাবে গণ্য হবেন। কোনো কোম্পানির ঋণখেলাপি হলে ওই কোম্পানির পরিচালকরা খেলাপি হিসেবে গণ্য হবেন। এছাড়া কোনো কোম্পানিতে কোনো পরিচালকের ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার থাকলে ওই কোম্পানি তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বলে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে তিনিও ঋণখেলাপি হিসাবে গণ্য হবেন। ফলে এ ধরনের প্রার্থীরা নির্বাচন করতে পারবেন না। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার তারিখের ৭ দিন আগে থেকে প্রার্থীকে খেলাপি ঋণের দুর্নাম মুক্ত হতে হবে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বেক্সিমকো গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে আগ্রহী।

এ কারণে তিনি বেশ আগেই গ্রুপের খেলাপি ঋণ নবায়ন করে নিয়েছেন। সোনালী ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি কোম্পানির নামে খেলাপি ঋণ ছিল। এর মধ্যে বেক্সিমকো লিমিটেড ও বেক্সিমকো সিনথেটিকের বিপরীতে নগদ ২৫ কোটি টাকা পরিশোধ করে গত মার্চেই তিনি সেগুলো নবায়ন করেছেন। ফলে বর্তমানে গ্রুপের আর কোনো খেলাপি ঋণ নেই।

আকিজ গ্রুপের কর্ণধার ও যশোর-১ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি শেখ আফিল উদ্দিন এবারও ওই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে পারেন। তাদের গ্রুপের একটি কোম্পানির নামে খেলাপি ঋণ ছিল। সেটি ইতিমধ্যেই নবায়ন করে নেয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে আওয়ামী লীগের একজন এমপির মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের নামে জনতা ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ছিল। তা তিনি নবায়ন করে নিয়েছেন। সাবেক মন্ত্রী ও সাম্যবাদী দলের এক নেতার নামে স্বার্থসংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণ ছিল। তিনি ইতিমধ্যে তা নবায়ন করেছেন।

বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও মুন্নু গ্রুপের কর্ণধার প্রয়াত হারুনার রশিদ খান মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খানম রিতা বিএনপির পক্ষে মানিকগঞ্জ থেকে প্রার্থী হতে পারেন। তাদের প্রতিষ্ঠান মুন্নু ফ্রেবিক্স সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়ে ঋণখেলাপি হিসাবে চিহ্নিত।

তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৩০ কোটি টাকা। গ্রুপের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে এই ঋণ নবায়ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঋণ নবায়নের জন্য এককালীন ডাউন পেমেন্ট বাবদ ১১ কোটি টাকা সোনালী ব্যাংকে জমা দেয়া হয়েছে।

বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী মোর্শেদ খানের মালিকানাধীন প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকমের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। গ্রুপের পক্ষ থেকে ঋণ নবায়নের বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। তারা বিদেশি উদ্যোক্তাদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে ঋণ শোধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের ঢাকা-১৪ আসনের এমপি আসলামুল হকের মাইশা গ্রুপের নর্থ পাওয়ার ইউটিলিটি একটি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান। আসলামুল হকের গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে শুধু ন্যাশনাল ব্যাংকেই ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। যার বড় অংশই এখন খেলাপি।

তিনি এ ঋণ নবায়নের বিষয়ে ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। রাজশাহী-৪ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি এনামুল হকের নর্দান পাওয়ার সল্যুশন একটি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান। তিনিও খেলাপি ঋণ নবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন।

বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমানে বিকল্পধারার নেতা মেজর (অব.) আবদুল মান্নান পরিচালক থাকার সময়ে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) থেকে বিভিন্ন পক্ষ ৫১২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে প্রমাণ মিলেছে।

ফলে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ শোধ করতে পারছেন না। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন ঋণখেলাপির তালিকায় পড়েছে। ওই কোম্পানিতে তার দায়দেনা আছে বলে তিনিও এখন খেলাপির তালিকায় রয়েছেন। তিনিও আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন।

নীলফামারী-৪ আসনে জাতীয় পার্টির এমপি শওকত চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান যমুনা এগ্রো লিমিটেড বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের বংশাল শাখায় একটি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান। তিনি খেলাপি ঋণ নবায়নের জন্য ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘ সময় ধরে।

বরিশাল অঞ্চলের আওয়ামী লীগের সাবেক এক মন্ত্রী সোনালী ব্যাংকে ঋণখেলাপি। সেটি নবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আরও একজন মন্ত্রীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা খেলাপি ঋণ ইতিমধ্যে নবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া এইচআরসি সিন্ডিকেট, আনন্দ গ্র“প তাদের খেলাপি ঋণ নবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন এমন আরও কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী সোনালী, রূপালী ও ন্যাশনাল ব্যাংকে ঋণখেলাপি হিসাবে চিহ্নিত আছেন। তারাও খেলাপি ঋণ নবায়নে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×