জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা

খালেদা জিয়ার ৭ বছর কারাদণ্ড

হারিছ চৌধুরীসহ বাকি দুইজনের সাত বছর কারাদণ্ড * ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে অর্থ সংগ্রহ ও খরচ করেছেন, যা কাম্য নয়। ভবিষ্যতে যাতে কেউ এ ধরনের অন্যায় কাজ না করার সাহস পায়, সে জন্য কঠোর শাস্তি -আদালত * কাকরাইলের কেনা ৪২ কাঠা জমি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের আদেশ * রায় ঘোষণার দিন থেকে খালেদা জিয়ার সাজা কার্যকর : দুদক পিপি

  মিজান মালিক ও হাসিব বিন শহিদ ৩০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিএসএমএমইউতে খালেদা জিয়া
বিএসএমএমইউতে খালেদা জিয়া। ছবি: যুগান্তর

দুর্নীতির আরেক মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন।

আদালত দুদক প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগ এবং মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ বিচার-বিশ্লেষণ করে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় (ক্ষমতার অপব্যবহার) দোষী সাব্যস্ত করে এ সাজা দেন। এর আগে চলতি বছরের ৮ ফেব্র“য়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় একই বিচারক খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সাজা দেন। ওই মামলায় তিনি কারাগারে আছেন।

রায়ে খালেদা জিয়া ছাড়া অপর তিন আসামি হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও হারিছ চৌধুরীর একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। তাদের প্রত্যেককে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে খালেদা জিয়াসহ প্রত্যেক আসামিকে ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা ও অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ট্রাস্টের অর্থে কেনা রাজধানীর কাকরাইলের ৪২ কাঠা জমি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

আসামিদের মধ্যে হারিছ চৌধুরী পলাতক রয়েছেন। আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এ ছাড়া খালেদা জিয়াসহ অপর তিন আসামি কারাগারে আছেন। রায় ঘোষণা উপলক্ষে আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খানকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হলেও মামলার প্রধান আসামি খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করা হয়নি। তিনি বর্তমানে কারা তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সোমবার রায় ঘোষণার সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে তার কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি অপর দুই আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খানের পক্ষেও কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।

এদিকে রায়ের প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, গাজীপুর, খুলনা, বরিশাল, গাইবান্ধা, নোয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, রূপগঞ্জ, জামালপুরসহ বিভিন্ন স্থনে এসব কর্মসূচি পালন করা হয়। এ ছাড়া রাজশাহী, সুনামগঞ্জ ও জয়পুরহাটে বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশি বাধার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সমাবেশে বক্তারা এ রায় প্রত্যাখ্যান করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন।

রায় ঘোষণার পর দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল সাংবাদিকদের বলেন, দুর্নীতির এ মামলায় আদালত খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন। কোনো ট্রাস্ট করতে গেলে ব্যক্তিগত টাকা দিয়ে তা করতে হয়। কিন্তু এখানে তিনি ব্যক্তিগত সম্পদ না দিয়েই দলীয় ফান্ড থেকে ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। এ কাজে হারিছ চৌধুরী, জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খান তাকে (খালেদা জিয়া) সহযোগিতা করেছেন। ট্রাস্টের জন্য যে সম্পদ ক্রয় করেছিলেন তাতেও তিনি এক কোটি ২৪ লাখ টাকা বেশি দিয়েছিলেন। আমরা মনে করি, খালেদা জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাবস্থায় ওই ট্রাস্টের অ্যাকাউন্ট ওপেন করার সময় প্রধানমন্ত্রীর পদ গোপন করেছেন। ৩২ জন সাক্ষীর আলোকে আদালত এ রায় দিয়েছেন। প্রত্যেক আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।

এদিকে সোমবার রাতে মোশাররফ হোসেন কাজল যুগান্তরকে বলেন, খালেদা জিয়াকে সাত বছরের যে সাজা দেয়া হয়েছে তা রায়ের দিন অর্থাৎ আজ (সোমবার) থেকে কার্যকর হবে। তিনি যে পরিমাণ সাজা ভোগ করেছেন তা এ মামলা থেকে বাদ যাবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে কাজল বলেন, আইনের বিধান হচ্ছে- সাজা কর্তন হয়। বিচারকের বিস্তারিত রায় দেখে তা ভালো করে বোঝা যাবে।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, এটা একতরফা রায়। খালেদা জিয়া আগেই বলেছেন- তিনি ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না। কোনো আদালত থেকেই তিনি ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না। তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। নির্বাচন থেকে তাকে দূরে রাখার জন্য এ ধরনের রায় দেয়া হয়েছে। রায়ের কপি পাওয়ার পর তা সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে বসে পর্যালোচনা করা হবে। এরপর এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।

রায়ের বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেছেন, আসামিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউটিং এজেন্সি হিসেবে আমরা অভিযোগ প্রমাণে সমর্থ হয়েছি। এখানে কোনো রাজনৈতিক বিষয় নেই। আইনি প্রক্রিয়ায় রায় হয়েছে।

এর আগে সোমবার সকালে এ মামলায় খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিচার চলবে- এ মর্মে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে করা আপিল আবেদন খারিজ করেন আপিল বিভাগ। গত ১৬ অক্টোবর এ মামলার যুক্তিতর্ক কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করে বিচারিক আদালত রায় ঘোষণার এদিন ধার্য করেন। মামলায় ৪৬ কার্যদিবস যুক্তিতর্কের পর রায় ঘোষণার এদিন ধার্য করা হয়। মামলা দায়েরের সাত বছর দুই মাস ২১ দিন পর চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করা হল।

এদিন বেলা ১১টা ২৩ মিনিটে বিচারক তার এজলাসে আসেন। এর পরপরই রায় ঘোষণার জন্য দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতের কাছে নিবেদন পেশ করে বলেন, খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তার অনুপস্থিতিতে বিচার চলা সংক্রান্ত আদেশ চ্যালেঞ্চ করে উচ্চতর আদালতে গিয়েছিলেন। হাইকোর্ট আপনার (বিচারক) আদেশ বহাল রেখেছেন। এমনকি আপিল বিভাগও খালেদা জিয়ার আপিল খারিজ করে দিয়েছেন। এতে রায় ঘোষণা করতে আইনগত আর কোনো বাধা নেই। মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতের উদ্দেশে আরও বলেন, মামলায় খালেদা জিয়াসহ আসামি চারজন। এ মামলায় ৩২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে। জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খানের পক্ষে কিছু যুক্তিতর্ক হয়েছে। ৩৪২ ধারার কার্যক্রমও কিছু হয়েছে। বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, আজ রায় ঘোষণা করুন। পরে বেলা ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে আদালত রায় ঘোষণা শুরু করেন।

যে ১৫ কারণে শাস্তি : মামলার এজাহার, চার্জশিট (অভিযোগপত্র) ও সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে বিচারক আসামিদের সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে রায়ে ১৫টি বিবেচ্য বিষয় তুলে ধরেন। এগুলো হচ্ছে-

১. খালেদা জিয়া ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তার প্রয়াত স্বামী জিয়াউর রহমানের নামে ৬ নম্বর মইনুল রোডের ঠিকানায় ‘শহীদ জিয়াউর রহমান চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’ নামে ট্রাস্ট গঠন করেন কি না?

২. খালেদা জিয়া নিজে ওই ট্রাস্টের প্রথম ট্রাস্টি এবং তার দুই ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমানকে ট্রাস্টের সদস্য করা হয় কি না?

৩. খালেদা জিয়া ট্রাস্টের প্রথম ম্যানেজিং ট্রাস্টি হিসেবে সোনালী ব্যাংকের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় শাখায় নিজ স্বাক্ষরে ২০০৫ সালের ৯ জানুয়ারি ৩৪০৭৬১৬৫ নম্বর সঞ্চয়ী হিসাব খোলেন কি না?

৪. মেট্রো মেকার্স অ্যান্ড ডেভেলপারস লিমিটেডের নাম ব্যবহার করে ট্রাস্টের অনুকূলে অর্থ ইস্যু হয়েছে কি না?

৫. ৫টি পে অর্ডারের মাধ্যমে মেট্রোমেকার্সের ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ট্রাস্টের ওই হিসাবে জমা হয় কি না?

৬. মেট্রো মেকার্স বা এর মালিকপক্ষ তাদের হিসাব থেকে ওই ট্রাস্টের হিসাবে ওই টাকা পেমেন্ট করেছে কি না?

৭. খালেদা জিয়া দাফতরিক ক্ষমতার প্রভাবে বিভিন্ন অবৈধ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ওই ব্যাংকের শাখায় ট্রাস্টের হিসাবে জমা প্রদান করা হয় কি না এবং খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর পদ ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলার ফরমে স্বাক্ষর করেছেন কি না?

৮. সুরাইয়া খানকে কাকরাইলের বাড়িসহ ৪২ কাঠা জমির দলিলমূল্যে ৬ কোটি ৫২ লাখ টাকার স্থলে অতিরিক্ত ১ কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা দেয়া হয়েছিল কি না?

৯. ২০০৫ সালের ৯ জানুয়ারি ট্রাস্টের নামে খোলা ওই ব্যাংক হিসাবে শরিফুল ইসলাম নামের অস্তিত্বহীন এক ব্যক্তির মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা জমা হয়েছে কি না?

১০. প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার পরও ওই ট্রাস্টে কোনো প্রকার অর্থ জমা হয়েছে কি না?

১১. খালেদা জিয়া ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা সংগ্রহ জমা ও খরচ করেছেন কি না?

১২. আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খান তাকে এ কাজে সহায়তা করেছেন কি না? আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না কর্তৃক জনতা ব্যাংকের সাতমসজিদ রোড শাখা থেকে ৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা বিএনপির দলীয় ফান্ডের টাকা হিসাবে পে অর্ডার করে ট্রাস্টের হিসাবে দিয়েছেন কি না? একই আসামি সাতটি পে-স্লিপের মাধ্যমে ৪৭ লাখ টাকা ট্রাস্টের হিসাবে জমা করেছেন কি না?

১৩. পূবালী ব্যাংক পল্টন শাখা থেকে হারিছ চৌধুরীর নামে দলের ফান্ড থেকে ২ কোটি টাকা পে অর্ডার হয় কি না এবং তা হারিছ চৌধুরী লোক দিয়ে ওই ট্রাস্টের হিসাবে জমা দিয়েছেন কি না?

১৪. প্রসিকিউশন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে সক্ষম হয়েছে কি না?

১৫. আসামিরা ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন কি না?

সাক্ষ্যপ্রমণ বিশ্লেষণে আদালতের অভিমত : রায়ে বিচারক সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে বলেন, ট্রাস্ট ডিডে (চুক্তি) ওই ট্রাস্টের ঠিকানা ৬ মইনুল রোড ব্যবহার করা হয়। অপর কোনো ঠিকানা ব্যবহার করা হয়নি। এটি ছিল খালেদা জিয়ার আবাসিক ঠিকানা। সরকারি বাসভবন। সেখানে বসে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তার দুই ছেলে ট্রাস্টের দু’জন সদস্য ছিলেন। কিন্তু ট্রাস্টে দলের কাউকে সাক্ষী বা সদস্য করা হয়নি। অথচ দলীয় ফান্ডের টাকা ট্রাস্টের ফান্ডে জমা করেন। বিএনপির দলীয় ব্যাংক হিসাব থেকে হারিছ চৌধুরীর নামে দুই কোটি টাকা দেয়া হয়।

আদালত বলেন, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান হিসেবে তার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মাধ্যমে দলীয় ফান্ড থেকে দুই কোটি টাকা দেন। চ্যারিটেবল ট্রাস্ট একটি ব্যক্তিগত ট্রাস্ট। দলের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব থেকে দলীয় টাকা (দুই কোটি) ট্রাস্টের হিসাবে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে জমা করেন।

আদালত মনে করেন, আসামি হারিছ চৌধুরী ও জিয়াউল ইসলাম মুন্না ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা ট্রাস্টের হিসাবে স্থানান্তরে পে অর্ডার করতে সক্ষম হন। বিএনপির দলীয় বিভিন্ন ফান্ড থেকে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ৬ কোটি ১৮ লাখ ৮৯ হাজার ৫২৯ টাকা ট্রাস্টের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।

আসামিরা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় দেয়া আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্যেও বৈধভাবে ট্রাস্টের হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি বলেননি। মেট্রো মেকার্স অ্যান্ড ডেভেলপারসের কথা বলে আসামি মনিরুল ইসলাম খান প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএফএম জাহাঙ্গীরকে তিনটি ফরম পূরণ করতে বলেন। তিনি সরল বিশ্বাসে ৫টি পে অর্ডারে স্বাক্ষর দেন। এতে করে এর মাধ্যমে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ট্রাস্টের অ্যাকাউন্টে জমা হয়।

রায়ে বলা হয়, খালেদা জিয়া সোনালী ব্যাংক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় শাখায় ট্রাস্টের নামে হিসাব খোলার আবেদন করেন এবং তার একক স্বাক্ষরে এটি পরিচালিত হবে বলে উল্লেখ করেন। আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না ৭টি পে-ইন স্লিপের মাধ্যমে ৪৭ লাখ টাকা ট্রাস্টে জমা দেন। এছাড়া শরীফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি ৫০ হাজার টাকা জমা দেন। ওই ৫০ হাজার টাকা দিয়ে হিসাব খোলা হয়। অথচ ওই ব্যক্তি ট্রাস্টি নন, সাক্ষী নন, এমনকি রাজনৈতিক দলের কর্মীও নন। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। এমন ব্যক্তির মাধ্যমে হিসাব খোলার সময় ৫০ হাজার টাকা জমা দেয়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এই শরীফুল ইসলাম অবাঞ্ছিত-আগুন্তুক ব্যক্তি হিসেবে এই টাকা জমা দিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মচারীও ছিলেন না। এই শরীফুল ইসলাম মারা গেছেন কি না বা তিনি পচা শরীফ কি না, তা জানা যায়নি। তার বিষয়ে চার্জশিটে বিস্তারিত বলা হয়নি। সাফাই সাক্ষীর মাধ্যমেও শরীফুল ইসলামের অস্তিত্ব প্রমাণ হয়নি।

বিচারক আরও বলেন, ট্রাস্টের হিসাবে জমা হওয়া অর্থের বিষয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অবহিত ছিলেন। যেহেতু তিনি ট্রাস্টের প্রথম ট্রাস্টি, সেহেতু তার অগোচরে জমা হওয়ার কথা নয়। তিনি অন্য আসামিদের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। ট্রাস্ট গঠনের উদ্দেশ্য তারা বাস্তবায়ন করেননি। হারিছ চৌধুরী অবৈধভাবে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করে ৫টি পে অর্ডারের মাধ্যমে মেট্রো মেকার্সের নামে ট্রাস্টে জমা দেন। বর্ণিত অবস্থায় প্রমাণিত যে, খালেদা জিয়া তিনজন আসামির সহায়তায় ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অপরাধ করেছেন। এই ধারায় সম্পৃক্ত অর্থ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণ : রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ক্ষমতাবান প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, যা সাক্ষীদের সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়েছে। অপর আসামিদের সাহায্যে অবৈধ উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে খালেদা জিয়া অবৈধভাবে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের তহবিল গঠন করে তিনি নজির স্থাপন করেছেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আসীন থেকে অবৈধভাবে যেভাবে তিনি অর্থ সংগ্রহ ও খরচ করেছেন, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভবিষ্যতে ওই পদে থেকে আর কেউ যেন ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এভাবে দুর্নীতি করতে না পারেন বা অবৈধ কাজ করতে না পারেন, সেজন্য তার কঠোর শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। পর্যবেক্ষণ শেষে বিচারক রায়ের আদেশের অংশ পড়ে শোনান।

মামলা ও বিচার পর্ব : জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে ২০১১ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলাটি দায়ের করে দুদক। তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি খালেদা জিয়াসহ চারজনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এরপর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ২০১৫ সালের ৫ মে এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। উচ্চ আদালতের আদেশে সাক্ষীদের রিকল করায় ২০১৭ সালের ২৬ অক্টোবর এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শেষ হয়। ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর এ মামলায় নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আত্মপক্ষ সমর্থনে আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন খালেদা জিয়া। ওই বছরের ২১ ডিসেম্বর এ মামলার যুক্তিতর্ক কার্যক্রম শুরু হয়। ওই সময় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা ছাড়াও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার শুনানি একসঙ্গে চলেছে। সে সময় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার যুক্তিতর্ক কার্যক্রম অগ্রসর হলেও এ মামলার যুক্তিতর্ক তেমন অগ্রসর হয়নি।

৩০ জানুয়ারি এ মামলায় খালেদা জিয়াসহ সব আসামির সর্বোচ্চ সাজা অর্থাৎ সাত বছর কারাদণ্ড দাবি করে দুদক প্রসিকিউশন। এরপর থেকে দীর্ঘদিনেও আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক কার্যক্রম সমাপ্ত না করায় অবশেষে রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন আদালত। মামলায় মোট ৩৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩২ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে।

২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর দুর্নীতির এ মামলায় খালেদা জিয়া হাজির না হলে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন আদালত। এরও আগে ২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর বিদেশে থাকাকালে খালেদা জিয়ার জামিন বাতিল করে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। বর্তমানে কারাগারে থাকলেও এ মামলায় তিনি অস্থায়ী জামিনে আছেন।

চার্জশিটে যা বলা হয়েছে : ট্রাস্টের অ্যাকাউন্টে টাকা প্রাপ্তি ও জমা দেয়া এবং উত্তোলনের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি সম্পূর্ণটাই সন্দেহজনক। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সরকারি বাসভবনের ঠিকানা ব্যবহার করে ট্রাস্টের রেজিস্ট্রি করেন। তিনি তার রাজনৈতিক সচিব ও অন্যদের দিয়ে ট্রাস্টের ওই অ্যাকাউন্টে অবৈধভাবে টাকা সংগ্রহ ও লেনদেন করেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ওই অ্যাকাউন্টে লেনদেন হলেও প্রধানমন্ত্রী বহাল না থাকার পর ওই অ্যাকাউন্টে আর কোনো লেনদেন হয়নি। ওই ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে মোট ১ কোটি ৯০ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় জমা করেন। আর জমির দলিলমূল্যের চেয়েও ১ কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমি বিক্রেতাকে প্রদান দেখিয়েছেন। অর্থাৎ ওই ট্রাস্টের অ্যাকাউন্টে মোট ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা আসামিপরা পরস্পর যোগাসাজশে অবৈধভাবে সংগ্রহ করেন, জমা করেন এবং খরচ করেন। ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে এ চার্জশিট দাখিল করা হয়।

আত্মপক্ষ সমর্থনে যা বলেছেন খালেদা জিয়া : ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর এ মামলায় খালেদা জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। আত্মপক্ষ সমর্থনে খালেদা জিয়া বলেছেন, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের কোনো কাজই আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে করিনি। এর সঙ্গে সরকারি বা রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মচারী জড়িত নয়। কাউকে কোনো সুবিধা দিয়ে বা বাধ্য করে ট্রাস্টের জন্য টাকা নেয়া হয়নি। সে ধরনের কোনো অভিযোগও নেই। তবুও আমাকে হেয় ও হেনস্তা করার উদ্দেশ্যেই কেবল এ মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ মামলা দায়েরের ফলে আমি চলমান এক অসঙ্গত পরিস্থিতির শিকার মাত্র। আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের (দুদক) কোনো সাক্ষী অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস পাওয়ার যোগ্য।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৮ ফেব্র“য়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে তার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ পাঁচ আসামিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং প্রত্যেকের ২ কোটি ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করে রায় ঘোষণা করেন বিচারিক আদালত। রায় ঘোষণার পরপরই খালেদা জিয়াকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। সেখান থেকে সম্প্রতি তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেয়া হয়েছে। সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন।

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×