নাইকো দুর্নীতি মামলার শুনানিতে খালেদা জিয়া

শেখ হাসিনাকেও আদালতে হাজির করতে হবে

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নাইকো দুর্নীতি মামলার শুনানিতে খালেদা জিয়া

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেছেন, আদালতে আমাকে আনতে (হাজির করতে) হলে তাকেও (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) আনতে (হাজির করতে) হবে।

আমি শুধু তাদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছি। আর আমি যদি তা না করতাম, তাহলে বলা হতো আমি অনুমোদন দেইনি কেন? আমি অপরাধী হলে তিনিও অপরাধী।

একজনকে সেভ করার জন্য আরেকজনকে বলি দেবেন, তা তো হতে পারে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) নাইকো দুর্নীতি মামলার আসামি ছিলেন। কাজেই তাকেও এখানে (আদালতে) হাজির করতে হবে।

বৃহস্পতিবার ঢাকার নয় নম্বর বিশেষ জজ আদালতে শুনানিতে হাজির হয়ে তিনি এসব কথা বলেন। শুনানি শেষে আদালতের বিচারক মাহমুদুল কবীর এই মামলার চার্জ (অভিযোগ) শুনানির জন্য আগামী বুধবার (১৪ নভেম্বর) দিন ধার্য করেন। ওইদিন এ মামলার অপর আসামি সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের পক্ষে চার্জ শুনানি শেষ করার নির্দেশনা দেন আদালত।

এদিন বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) থেকে

পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর স্থাপিত আদালতে হাজির করা হয়। তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। হাসপাতাল থেকে এদিনই (বৃহস্পতিবার) তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। আদালতের কার্যক্রম শেষে তাকে কারাগারে নেয়া হয়। আদালতে তিনি হুইল চেয়ারে বসা ছিলেন। এ সময় তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাজের মেয়ে ফাতেমা। খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়ার সময় তিনিও (ফাতেমা) সঙ্গে যান।

এদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের আপত্তি সত্ত্বেও তাকে আদালতে ও কারাগারে নেয়া হয়েছে। অপর দিকে বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতেই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, এটা দীর্ঘ ‘পেন্ডিং’ একটি মামলা। প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আজ (বৃহস্পতিবার) এখানে আদালত বসেছেন। মামলাটিতে চার্জ শুনানির দিন ধার্য আছে। খালেদা জিয়া ও মওদুদ আহমদ আদালতে উপস্থিত আছেন। মওদুদ আহমদ উচ্চ আদালতে গিয়েছেন। কিন্তু তিনি কোনো আদেশ আনতে পারেননি। এ মামলার কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, খালেদা জিয়ার পক্ষে সময় আবেদন করা হয়েছে। মওদুদ আহমদ ২৫ জুলাই আদালতের দেয়া আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন ফাইল করেছেন। মওদুদ আহমদের চার্জ শুনানি শেষ হওয়ার পর খালেদা জিয়ার শুনানি শুরু করা হবে।

এরপর মওদুদ আহমদ বলেন, গতবার যে কারণে সময়ের আবেদন করেছি, আজও সেই কারণেই সময় আবেদন করছি। হাইকোর্টে প্রচুর মামলার জট। আমি এখনও আদেশ আনতে পারিনি। হাইকোর্ট থেকে আবেদনটি রিজেক্ট করলে আমি আপিল করব না। সরাসরি আদালতে আসব।

মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, এ মামলায় সবচেয়ে বেশি সময় নিয়েছেন তিনি (মওদুদ আহমদ)। মূলত তিনি মামলা করতে চান না। তিনি মামলাটি শুরুর পর থেকে বিলম্ব করছেন। এ মামলার চার্জশিট, এজাহার, প্রক্রিয়া- সবকিছু নিয়েই হাইকোর্টে যাওয়া হয়েছে। উচ্চতর আদালতের কোনো বাধানিষেধ নেই। কাজেই চার্জ শুনানি থেকে বিচ্যুত হওয়া উচিত হবে না। মওদুদ আহমদের পর খালেদা জিয়ার চার্জ শুনানি শুরু করা হোক।

এরপর মওদুদ আহমদ বলেন, আমি তো এখানে (আদালতে) এসে হতবাক হয়ে গেছি। এখানে আইনজীবীদের বসার কোনো জায়গা নেই, টয়লেট নেই। এখানে আদালত বসার মতো পরিবেশ নেই।

তখন আদালত বলেন, পিপি (মোশাররফ হোসেন কাজল) যা বললেন তার কোনো জবাব আছে আপনার কাছে? জবাবে মওদুদ আহমদ বলেন, হ্যাঁ। তিনি (কাজল) যা বলেছেন তা মিথ্যা। আমার কাছে এ মামলার কোনো ডকুমেন্ট নেই। কিসের ভিত্তিতে বলব যেম আমি নির্দোষ। আর একবার সময় দেন, আর সময় নেব না।

এরপর বিচারক বলেন, ২৫ জুলাই আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে গিয়েছিলেন। এরপর একটা টেন্ডার নম্বর আপনি দিয়েছেন। রিভিশন নম্বর দেননি। আপনার দরখাস্ত (সময় চেয়ে আবেদন) নামঞ্জুর করা হল। আপনি চার্জ হেয়ারিং করেন।

মওদুদ আহমদ বলেন, সুপ্রিমকোর্টে মামলা রেখে এসেছি। আমাকে যেতে হবে। বিচারক বলেন, আপনি এখানেই থাকবেন। শুরু করেন। আপনি যত দেরি করবেন খালেদা জিয়ার আরম্ভ করতে ততই দেরি হবে। মওদুদ বলেন, তাকে (খালেদা জিয়া) হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল চিকিৎসার জন্য। কিন্তু তাকে তা না করেই আদালতে আনা হয়েছে। আমরা রাজনৈতিকভাবে এর প্রতিবাদ জানাব। এরপর দুপুর ১২টা ১০ মিনিটের দিকে তিনি মামলার এজাহার পাঠ করা শুরু করেন। তিনি বলেন, একই অভিযোগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মামলা হাইকোর্ট খারিজ করেছেন। এটাও একই মামলা। আমরা যদি আবার ক্ষমতায় যাই তাহলে আবার মামলাটি (শেখ হাসিনার মামলা) ওপেন করতে হবে।

বিচারক বলেন, আপনি যা বলছেন তা গ্রাউন্ডলেস। এরপর মওদুদ বলেন, আমার কাছে কোনো ডকুমেন্ট নেই। আপনি (বিচারক) তো আমাকে কোনো ডকুমেন্ট দেননি। যেজন্য আমি হাইকোর্টে গিয়েছি। এরপর ফের চার্জশিট পাঠ শুরু করেন মওদুদ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে একটি ‘রুলস অব বিজনেস’ ফলো করতে হয়। তাকে হাজার হাজার স্বাক্ষর করতে হয়।

এরপর বিচারক বলেন, আপনি এজাহার পড়া শেষ করে চার্জশিট পড়া শুরু করেছিলেন। এখন ফের এজাহার পড়ছেন। মওদুদ আহমদ বলেন, এ কথা আগে বললেই আমি পড়তাম না। আর এখন যখন পড়েই ফেলেছি, আর দু’এক পাতা আছে পড়ে ফেলি। এরপর তিনি ফের এজাহার পাঠ শুরু করেন। এরপর বিচারক বলেন, খালেদা জিয়া এবং পেট্রোবাংলার অংশ নয়, আপনি আপনার অংশ বলুন।

দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটের দিকে হঠাৎ আদালতে কথা বলতে শুরু করেন খালেদা জিয়া। তিনি আদালতের উদ্দেশে বলেন, আমাকে এখানে আনতে হলে, তাকেও (শেখ হাসিনা) এখানে আনতে হবে। আমি শুধু ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছি। একজনকে সেভ করার জন্য আরেকজনকে বলি দেবেন, তা তো হতে পারে না।

জবাবে বিচারক বলেন, এ মামলায় তিনি (শেখ হাসিনা) আসামি নন। তাকে কিভাবে কোর্টে আনব? তাকে এ মামলায় আনার সুযোগ নেই। এ মামলায় তার কোনো পার্ট নেই।

এরপর মওদুদ আহমদ বলেন, উনি (খালেদা জিয়া) ঠিকই বলেছেন। তিনি (খালেদা জিয়া) তো শুধু আগের বিষয়গুলো অগ্রসর করেছেন। জবাবে বিচারক বলেন, এ বিষয়গুলো খালেদা জিয়ার মুখ থেকে শুনব। আপনি আপনার অংশ বলুন।

এরপর মওদুদ আবারও এজাহার পাঠ শুরু করেন। এক পর্যায়ে বিচারক বলেন, আমি তো আগেই বলেছি, আপনি (মওদুদ) যত দেরি করবেন, খালেদা জিয়া তত কষ্ট পাবেন।

দুদকের আইনজীবী বলেন, আপনি (মওদুদ) আপনার অংশ শেষ করুন। রেস্ট নেন, খাওয়া-দাওয়া করেন। এরপর শুরু করেন। প্রত্যুত্তরে মওদুদ বলেন, আজ তো আর পারব না। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সমস্যা থাকতে পারে। আমার বয়স ৮১ বছর। আমি আর পারছি না। দয়া করে সময় দিন। আমার শরীর সাপোর্ট করছে না।

এরপর সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আদালতে এসেছেন। আমি ও মির্জা ফখরুল ইসলাম- দু’জনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে আদালতের ভেতর আধা ঘণ্টা কথা বলতে চাই। বিচারক বলেন, এটা আমার এখতিয়ারে পড়ে না। মওদুদ সাহেব এখানে আছেন, তাকে জিজ্ঞাসা করুন। এরপর বিচারক আগামী বুধবার এ মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন। একই সঙ্গে ওইদিন মওদুদ আহমদের চার্জ শুনানি শেষ করতে নির্দেশ দেন।

দুপুর ১টা ১৫ মিনিটের দিকে আদালতের কার্যক্রম শেষ হয়। আদালতের কার্যক্রম শেষে প্রায় দেড় মিনিট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হুইল চেয়ারে বসা খালেদা জিয়ার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে খালেদা জিয়া পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন। উচ্চ আদালতের নির্দেশে চিকিৎসার জন্য তাকে ৬ অক্টোবর বিএসএমএমইউতে নেয়া হয়। তিনি হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির অপর মামলায়ও সাজাপ্রাপ্ত হন।

এজলাস স্থানান্তর : এতদিন বকশীবাজার কারা অধিদফতরের প্যারেড মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী এজলাসে বসেছে ঢাকার নয় নম্বর বিশেষ জজ আদালত। আর এরই মধ্যে এ মামলার কার্যক্রম স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়ে বুধবার একটি আদেশ জারি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নিরাপত্তাজনিত কারণে এ মামলার বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঢাকা মহানগরের ১২৫ নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের ৭ নম্বর কক্ষকে অস্থায়ী আদালত হিসেবে ঘোষণা করা হল।

নাইকো দুর্নীতি মামলা : ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কানাডার কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে অস্বচ্ছ চুক্তির করে রাষ্ট্রের প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে এ মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর দুদকের তৎকালীন সহকারী পরিচালক (বর্তমানে উপপরিচালক) মুুহাম্মদ মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলাটি দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ৫ মে দুদকের তৎকালীন সহকারী পরিচালক (বর্তমানে উপপরিচালক) এসএম সাহিদুর রহমান এ মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। চার্জশিটে খালেদা জিয়াসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের পক্ষে আংশিক চার্জ শুনানি হয়। খালেদা জিয়া ছাড়া মামলার অপর আসামিরা হলেন- সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেন, সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, সাবেক সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলাম, সাবেক জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সিএম ইউছুফ হোসাইন, বাপেক্সের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মীর ময়নুল হক, বাপেক্সের সাবেক সচিব মো. শফিউর রহমান, ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, ঢাকা ক্লাবের সাবেক সভাপতি সেলিম ভূঁইয়া এবং নাইকোর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফ।

মির্জা ফখরুলের অভিযোগ : বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের আপত্তি সত্ত্বেও তাকে আদালতে ও কারাগারে নেয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অন্যায় ও বেআইনি। আমরা জানতে পেরেছি, মেডিকেল বোর্ডের যারা চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন তারা ছাড়পত্র দেননি। বৃহস্পতিবার রাজধানীর পুরনো কারাগারে স্থাপিত ঢাকার নবম বিশেষ জজ আদালতে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নাইকো দুর্নীতি মামলার অভিযোগ গঠনের আংশিক শুনানির পর কারা ফটকে সাংবাদিকদের কাছে এ অভিযোগ করেন বিএনপি মহাসচিব। মির্জা ফখরুল বলেন, চিকিৎসকরা বলেছেন, খালেদা জিয়া খুবই অসুস্থ। এই বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করে সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তাকে কারাগারের আদালতে নিয়েছে। তাকে আবার এই কারাগারেই রেখে দেয়া হয়েছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’ তিনি আরও বলেন, আমরা কারা অভ্যন্তরে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আদালত সময় দেননি।

বিএসএমএমইউ’র পরিচালক : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের (বিএসএমএমইউ) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ আল হারুন বলেন, দীর্ঘ এক মাসের বেশি সময় চিকিৎসা নেয়ার পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। চিকিৎসার পর এখন তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল আছে।

পরিচালক বলেন, খালেদা জিয়া যেসব শারীরিক সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন, আমরা চেষ্টা করেছি তাকে সবগুলো চিকিৎসা দিতে। বিভিন্ন ধরনের ইনভেস্টিগেশনের (শারীরিক পরীক্ষা) রিপোর্টও আমরা ভালো পেয়েছি। বর্তমানে তার (খালেদা) অবস্থা স্থিতিশীল আছে। অসুস্থতায় যেসব পরীক্ষা করা হয়েছিল এসবের রিপোর্টও বেশ ভালো পাওয়া গেছে। সিটিস্ক্যান রিপোর্টে অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি। মেডিকেল বোর্ড যদি মনে করে তার ফিজিওথেরাপি দেয়া প্রয়োজন তখন তারা তা দেবেন।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হারুন বলেন, হাসপাতালের পক্ষ থেকে আমরা তাকে (খালেদা) যথার্থ চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করেছি। কি কি চিকিৎসা দেয়া হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাসপাতালে তার জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তার কিছু কিছু বিষয় আছে- যেমন আর্থ্রাইটিস, আমরা বলতে পারি ব্যথা আছে, ব্যথা নেই। এটা একেবারে সুস্থ হওয়ার মতো নয়। এখানেও মেডিকেল বোর্ড গঠন করা আছে। যে কোনো সময় তিনি এলে চিকিৎসা নিতে পারবেন। ফিজিওথেরাপি সেখানেও চলবে। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা যথেষ্ট স্থিতিশীল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে কয়েকবার এমআরআই, এক্সরে ও সিটিস্ক্যান করা হয়েছে। তার রিপোর্টে আমরা যা পেয়েছি তিনি বেশ ভালো আছেন। এক্সরে রিপোর্ট সন্তোষজন, সিটিস্ক্যান রিপোর্ট ভালো।

বিএনপিপন্থী চিকিৎসকরা যা বললেন : পুরোপুরি সুস্থতা নিশ্চিত না করে মেডিকেল বোর্ডের প্রধানের অনুমোদন ছাড়াই খালেদা জিয়াকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন। বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।

জাহিদ হোসেন বলেন, খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক জলিলুর রহমান চৌধুরী এই মুহূর্তে দেশের বাইরে। বোর্ডের আরেকজন সদস্য ডা. বদরুন্নেসা দেশের বাইরে। অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক চৌধুরী, যার অধীনে খালেদা জিয়া ভর্তি তিনি বুধবার বিদেশ থেকে ফিরেছেন। তার সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করে, এমনকি তার ডিপার্টমেন্টের অধীনে ভর্তি থাকা অবস্থায় কারও সঙ্গে পরামর্শ না করেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সুনির্দিষ্টভাবে সরকারের ইচ্ছায় কারা কর্তৃপক্ষ খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউ থেকে নিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে যার অধীনে তিনি ভর্তি ছিলেন- অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক, তার কোনো ছাড়পত্র লেখার সৌভাগ্য হয়নি এবং রোগীর কী রোগ হয়েছে সেটি লেখারও সৌভাগ্য হয়নি। খালেদা জিয়াকে ১১টা ২৬ মিনিটে গাড়িতে তুলে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু দুপুর ১টা ০৫ মিনিটে অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক যখন ডি ব্লকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের ক্লাসে। সে সময় তাকে সেখান থেকে বের করে এনে হাসপাতালের পরিচালক একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলেন সই করতে। পরে তিনি সেই কাগজে সই করেন বলে অভিযোগ করেন জাহিদ হোসেন।

খালেদা জিয়ার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে : বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। রিজভী বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা শুরু হয়নি, কেবল পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সেই মুহূর্তে তাকে কারাগারে প্রেরণ করার উদ্যোগ শুধু মনুষ্যত্বহীন কাজই নয়, এটি সরকারের ভয়ঙ্কর চক্রান্ত। তিনি বলেন, চিকিৎসা না দিয়ে কারাগারে প্রেরণ খালেদা জিয়ার জীবনকে বিপন্ন করার অথবা শারীরিকভাবে চিরতরে পঙ্গু করার চক্রান্ত। খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি রাখার আহ্বান জানিয়ে রিজভী বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিএসএমএমইউতে ভর্তি রাখতে হবে, না হলে জনগণ আর বসে থাকবে না।

আদালত অবজ্ঞার শামিল : আদালতকে অবহিত না করে অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে নেয়া আদালত অবজ্ঞার শামিল বলে মনে করছেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। বৃহস্পতিবার সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি এতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে খালেদা জিয়ার মুক্তি, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের দাবিতে জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের ডাকে আগামী ১৭ নভেম্বর মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেন জয়নুল আবেদীন।

তিনি বলেন, ৬ নভেম্বর খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমরা আবেদন করেছিলাম, কিন্তু আজ (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত সে আবেদন তারা গ্রহণ করেনি। আজ সকালে খবর পেলাম, মাত্র আধা ঘণ্টার নোটিশে তাকে ‘ব্যাগ অ্যান্ড ব্যাগেজ’সহ আদালতকে কিছুই না জানিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা তার আইনজীবী। আমাদের বিষয়টি জানানো উচিত ছিল। মূলত আদালতের নির্দেশের পর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাই কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আদালতকেও অবহিত করেনি। সে রকম কোনো নোটিশ দেয়া হয়নি। এটা দুঃখজনক। এতে বিচার বিভাগের আদেশ অবজ্ঞা করা হয়েছে। সরকার এ আদেশ অবজ্ঞা করে খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠিয়েছে।

জয়নুল আবেদীন বলেন, আমরা সরকারকে অনুরোধ করছি, খালেদা জিয়াকে আবারও হাসপাতালে ফিরিয়ে নেয়ার। তার চিকিৎসার জন্য গঠিত বোর্ড না বলা পর্যন্ত তাকে হাসপাতালে রাখারও অনুরোধ করছি। আমরা এজন্যই একটি স্বাধীন ও ইউনাইটেড হাসপাতালে তার চিকিৎসার আবেদন জানিয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি, খালেদা জিয়ার পছন্দনীয় চিকিৎসকদের দিয়ে তার চিকিৎসা করানোর। আর যেহেতু রাজনৈতিক মামলায় তাকে সাজা দেয়া হয়েছে, তাই খালেদা জিয়ার মুক্তি চাইছি।

ঘটনাপ্রবাহ : কারাগারে খালেদা জিয়া

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×