বিএনপিপন্থীরা প্রকাশ্যে চাপে, আড়ালে শঙ্কা

  বিএম জাহাঙ্গীর ১১ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপিপন্থীরা প্রকাশ্যে চাপে, আড়ালে শঙ্কা

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ইতিমধ্যে প্রশাসনেও এর আঁচ পড়তে শুরু করেছে। চলছে নানান সমীকরণ মেলানোর হিসাব নিকাশ। শেষ পর্যন্ত কী হবে, পরবর্তী সরকার কারা গঠন করতে যাচ্ছে, ইত্যাদি। কেননা, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে আমলাদের বড় একটি অংশের ভূমিকারও পরিবর্তন ঘটে।

কেউ কেউ রাতারাতি খোলস পাল্টে নতুন পরিচয়ে নিজেকে আবির্ভূত করেন। এমন ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে। বিশেষ করে গত প্রায় এক দশকে বিভিন্ন পর্যায়ে শত শত কর্মকর্তাকে অবলীলায় খোলস পাল্টাতে দেখা গেছে। এ সুবাদে অনেকে তাদের পদোন্নতি ও প্রাইজপোস্টিং বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে যারা বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাদের অনেকে এখন পুরোদস্তুর আওয়ামী লীগ সেজে বসে আছেন। তাই প্রশাসনবিষয়ক বিশ্লেষকদের কয়েকজন মনে করেন, এদের ব্যাপারে বিশেষ সতকর্তা অবলম্বন না করলে ঘরের শত্রুর মতো বড় বিভীষণ আর কিছু হবে না।

সঙ্গত কারণে প্রকাশ্যে প্রশাসনে সরকারবিরোধী মনোভাবাপন্ন কর্মকর্তারা চাপের মুখে থাকলেও কার্যত বাস্তবতা ভিন্ন রকমও হতে পারে। এ নিয়ে যুগান্তরের কাছে নানা শঙ্কার কথাও ব্যক্ত করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকন সুপরিচিত আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা।

তাদের মতে, নির্বাচনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হাতে প্রবল ক্ষমতা থাকে। তাই তারা চাইলে কিংবা সুযোগ পেলে আইন-কানুনের মধ্যে থেকেও প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। যা কোনো দল কিংবা প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে চলে যেতে পারে।

অবশ্য নির্বাচনী প্রশাসনের কর্মকর্তারা কতখানি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, তা নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনকালীন সরকারের ওপর। কিন্তু সবসময় এ সংজ্ঞা ঠিক থাকে না। পরিবেশ পরিস্থিতি অনেক কিছু শেষ সময়ে পাল্টে দেয়।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার শনিবার যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন কমিশন সবল ও নিরপেক্ষ থাকলে নির্বাচনে আমলাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কম থাকে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক দিন চাকরির বাইরে, তাই বর্তমানে প্রশাসনে এ বিষয়টি কী পর্যায়ে রয়েছে তা বলতে পারছি না।’

সাবেক সচিব ও প্রশাসনবিষয়ক কলামিস্ট বদিউর রহমান বলেন, প্রশাসন দলীয়করণের জন্য দায়ী বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। বর্তমানে রাজনীতিমুখী বেহাল প্রশাসনের জন্য বড় দুই দলের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। এর ফলে নির্বাচনে আমলারা অঘোষিত প্রভাব বিস্তার করতে পারে বা করে থাকে।

প্রসঙ্গত, এরশাদ সরকারের সময় পর্যন্ত প্রশাসনে দলীয়করণ বলতে তেমন কিছু ছিল না। যেটুকু ছিল তা গৌণ। কিন্তু ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতার আসার পর প্রশাসন দলীয়করণ শুরু হয়। সে সময় প্রথম আঘাত আসে ’৭৩ ব্যাচের কর্মকর্তাদের ওপর। চাকরিচ্যুতি আর ওএসডি থেকে শুরু করে নানাভাবে তাদের ওপর খড়গ নেমে আসে।

এরপর ১৯৯৬ সালে জনতার মঞ্চে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের প্রবেশের মধ্য দিয়ে প্রশাসন দলীয়করণে নতুনমাত্রা যুক্ত হয়। সে সময় ‘পান্ডা গার্ডেনে’ আমলাদের গোপন বৈঠক এখনও ইতিহাসের অংশ। তবে ’৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কমমাত্রায় দলীয়করণ হলেও কিছুটা পাল্টা প্রতিক্রিয়া তো ছিলই।

ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকারের শেষদিকে জনতার মঞ্চের আদলে না হলেও সচিবালয়ে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ প্রকাশ্যে সরকারবিরোধী ভূমিকা রাখে। এতে বেশ কয়েকজনের চাকরি চলে যায়। এরপর ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতার আসার পর তারা চাকরি ফিরে পান। বিএনপি ক্ষমতায় এসে আওয়ামীপন্থী হিসেবে চিহ্নিত ’৭৩ ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতিবঞ্চিত করতে পদোন্নতি বিধিমালা তিন দফায় পরিবর্তন করে।

এ ছাড়া ওএসডি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রেকর্ড সৃষ্টি করা হয়। সে সময় বহু কর্মকর্তাকে সরকারবিরোধী চিহ্নিত করে পদোন্নতিবঞ্চিত করাসহ ওএসডি করে মাসের পর মাস ফেলে রাখা হয়। এরপর ২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর ওই বছর ২৪ নভেম্বর উত্তরায় বিএনপিপন্থী আমলাদের আলোচিত বৈঠকটি ‘উত্তরা ষড়যন্ত্র’ বলে বিশেষ পরিচিতি পায়। এভাবে আমলা ও রাজনীতিবিদদের বাড়াবাড়ির ফল হিসেবে বয়ে আনে দুই বছরের ওয়ান ইলেভেন সরকার।

কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট এবং বর্তমানে ১৪ দলীয় জোট ক্ষমতায় থাকলেও প্রশাসন দলীয়করণের নাগপাশ থেকে বের হতে পারেনি। একপক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে প্রশাসন দলীয়করণের অহরহ অভিযোগ তোলে। আর বাস্তব চিত্র সবার জানা। এর মাঝখানে পড়ে বহু নিরীহ মেধাবী কর্মকর্তাকে বলি হতে হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের টানা দুই মেয়াদের শাসনামলে প্রশাসনে এখন একচ্ছত্র আধিপত্য সরকারি দলের। নির্বাচনী প্রশাসন সাজানোর বিষয়ও এখানে নিষ্প্রয়োজন। বলতে গেলে নানা রকম স্বার্থের হিসাবে বেশির ভাগ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আওয়ামী লীগের অনুসারী বলে দাবি করেন। এটিই বাস্তবতা।

এ ছাড়া, ২০০৯ সালের শুরুতে যারা সিনিয়র সহকারী সচিব কিংবা উপসচিব ছিলেন তাদের অনেকে এখন অতিরিক্ত সচিব ও সচিব। এ কারণে প্রশাসনজুড়ে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী মনোভাবাপন্ন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই চাপের মুখে রয়েছেন। তবে চারদলীয় জোট সরকার ও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আমলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকের রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশ বড় একটি সংখ্যায় বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ ঘটেছে।

যাদের কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও আছেন। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে যারা সত্যিকারার্থে আওয়ামীপন্থী ত্যাগী কর্মকর্তা, তারা প্রাপ্য মর্যাদা ও সুবিধা পাননি। তাদের অনেকে সচিব হয়েছেন বেশ বিলম্বে এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে তারা পোস্টিংও পাননি। ডিসি হওয়া থেকে শুরু করে সচিব পদে দায়িত্ব পাওয়া পর্যন্ত অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাদের। এজন্য অভিমান করে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের অনেককে বলতে শোনা যায়, ‘আওয়ামী লীগ বন্ধুও চেনে না, শত্রুও চিনতে ভুল করে।’

চিহ্নিত আওয়ামীপন্থী কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, শুরু থেকেই যাদের আওয়ামী ঘরানার পরিচিতি নেই- নির্বাচনের সময় তাদের ওপর নির্ভর করা বোকামি হবে। বরং বুমেরাং হওয়ার আশঙ্কা আছে।

কেননা, পদোন্নতি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বিগত কয়েক বছরের রোডম্যাপ বা পথনকশা তাদের রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে। শীর্ষ পর্যায় ভুল বুঝতে পারেন বলে, তারা সেটি সাহস করে বলতে চাননি। কিন্তু যেহেতু নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে, তাই এ বিষয়ে সতর্ক না থাকার কোনো বিকল্প নেই।

সাবেক সচিব বদিউর রহমান বলেন, নির্বাচনের সময় রিটার্নিং অফিসার অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করতে পারেন। সেটি কোনো প্রার্থীর বিপক্ষে গেলে সেই দল এবং তিনি তো অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিপক্ষ কতখানি শক্ত পাহারা বসাতে পারবে তার ওপর সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনেকখানি নির্ভর করে।

সাবেক একজন সচিব যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগপন্থী কর্মকর্তাদের অনুমান কিংবা আশঙ্কা সত্যি হলে সেটি প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে। কেননা, প্রকাশ্য শত্রুর চেয়ে গোপন শত্রু বেশি বিপদের।

এ প্রসঙ্গে বদিউর রহমান বলেন, ‘অরজিনাল বিএনপিপন্থী কর্মকর্তারা যদি আওয়ামী লীগের লেবাস পরে থাকেন তাহলে তাদের দিয়ে আর যাই কিছু হোক নির্বাচনে কোনো ফল ঘরে তোলা সরকারি দলের জন্য কঠিন হবে। তারা যে এখন বিএনপির পক্ষে কাজ করবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’

মনে রাখতে হবে, সরকারি পরিভাষা ‘জনস্বার্থ’ ব্যবহার করে আমলারা চিঠি ইস্যু থেকে শুরু করে নানারকম সিদ্ধান্ত দেন। কিন্তু যদি তিনি সেখানে রাজনীতির স্বার্থ তালাশ করেন তাহলে তাকে দিয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হবে না।’

এ প্রসঙ্গে সাবেক প্রভাবশালী সচিব আবু আলম শহিদ খান যুগান্তরকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা সংবিধান ও আইন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ বিষয়ে তারা অনেক ক্ষমতাও রাখে। তবে সে দায়িত্ব কতখানি নিরপেক্ষ হবে তা নির্ভর করে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনকালীন সরকারের চাওয়া না চাওয়ার ওপর।

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×