মিরপুরে মুশফিকের মহাকাব্য

বাংলাদেশ ৫২২/৭ ডিক্লেয়ার * জিম্বাবুয়ে ২৫/১

  জ্যোতির্ময় মণ্ডল ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুশফিকুর রহিম
রেকর্ডস্লাত মহাকাব্যিক ডাবল সেঞ্চুরির পর মুশফিকুর রহিমের উদযাপনে থাকল ভালোবাসার রং। সোমবার মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় দিনে। ছবি: এএফপি

সেঞ্চুরিকে এর আগেও তিনি ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়েছেন। মুশফিকুর রহিমই ছিলেন টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান। গলে পাঁচ বছর আগের সেই কীর্তি ছাপিয়ে কাল মিরপুরে মুশফিক লিখলেন নতুন এক মহাকাব্য। অপরাজিত ২১৯ রানের রেকর্ডস্নাত এক ইনিংস খেলে গড়লেন ইতিহাস।

রান, বল ও সময়ের হিসাবে টেস্টে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস, দেশের প্রথম ব্যাটসম্যান টেস্টে দুটি ডাবল সেঞ্চুরি, টেস্ট ইতিহাসের প্রথম উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে একাধিক ডাবল সেঞ্চুরি- এমন আরও কিছু দারুণ কীর্তি দিয়ে মুশফিক সাজিয়েছেন রেকর্ডের মালা। তার ইতিহাস গড়া ইনিংসে সোমবার মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয়দিনটি স্বাগতিকদের জন্য হয়ে থাকল আরও হিরন্ময়।

সাত উইকেটে ৫২২ রানের পাহাড় গড়ে কাল শেষ সেশনে নিজেদের প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। টেস্টে এটি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ এবং সবমিলিয়ে পঞ্চম সর্বোচ্চ ইনিংস। জবাবে শেষ বিকেলে ১৮ ওভার ব্যাট করে এক উইকেটে ২৫ রানে দিন শেষ করেছে জিম্বাবুয়ে।

অধিনায়ক হ্যামিল্টন মাসাকাদজাকে ১৪ রানেই ফিরিয়ে দিয়েছেন সিলেট টেস্টে ১১ উইকেট নেয়া তাইজুল ইসলাম। নয় উইকেট হাতে রেখে ৪৯৭ রানে পিছিয়ে থেকে আজ তৃতীয়দিন শুরু করবে জিম্বাবুয়ে।

সেঞ্চুরির পর আগেরদিনের উদযাপনে ছিল বুনো উল্লাস। সোমবার ডাবল সেঞ্চুরির পর উদযাপনে থাকল ভালোবাসার রঙ। মুশফিকের দিনে বাংলাদেশকে রান পাহাড়ের চূড়ায় তুলতে মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৮* রানের ইনিংসটারও বড় ভূমিকা রয়েছে। মুশফিকের মতো মিরাজেরও এটি টেস্টে নিজের সর্বোচ্চ ইনিংস। ম্যাচ শুরুর দিন মিরপুর প্রেসবক্সে এসেছিলেন এক ভারতীয় ক্রীড়া সাংবাদিক। অনেকটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলেছিলেন, বাংলাদেশ এ টেস্টে পাঁচশ’-সাড়ে পাঁচশ’ রান করবে। আগেরদিন মিলে গিয়েছিল তামিমের জোড়া সেঞ্চুরির ভবিষ্যদ্বাণী। কাল মিলল ভারতীয় ওই সাংবাদিকের কথাও। মিরপুর প্রেসবক্সে যেন শুধু জ্যোতিষিদের আগমন ঘটছে!

দু’দিনেই শুরুতে নিজের ব্যাটিংয়ে দারুণ মিল রেখেছেন মুশফিক। উইকেটে টিকে থাকা ছাড়া রানের চেষ্টাই করেননি। সুফল পেয়েছেন তাতেই। দ্বিতীয়দিনে প্রথম সেশনে উইকেটই হারাতে দেননি মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ।

সর্বশেষ আট ইনিংসে মাত্র ৪৭ রান করা মাহমুদউল্লাহ খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার পণ করেছিলেন। তাতে সফলও হচ্ছিলেন। দ্বিতীয় সেশনের দ্বিতীয় ওভারেই ফেরেন জার্ভিসের শিকার হয়ে। ১১০ বলে তিন চারে করেন ৩৬ রান। প্রথম সেশনে মাহমুদউল্লাহর চেয়েও মন্থর ছিলেন মুশফিক। প্রথম ৪৯ বলে করেন মাত্র সাত রান। ৫৬ বল পর মারেন প্রথম বাউন্ডারি।

দিনের প্রথম সেশনে জিম্বাবুয়ে উইকেট তো নিতে পারেনি, উল্টো হারাতে হয় টেন্ডাই চাতারাকে। দিনের দশম ওভারে বোলিং করতে গিয়ে পেশিতে টান পেয়ে মাঠে ছাড়েন। আর ফেরেননি তিনি।

মাহমুদউল্লাহর বিদায়ের পর ব্যর্থ হন আগের ম্যাচে ভালো ব্যাটিং করা আরিফুল হক। সাত উইকেট হারানোর পর মুশফিকের ডাবল সেঞ্চুরি হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কাও জেগেছিল। তবে অষ্টম উইকেটে মেহেদী হাসান মিরাজ এসে দারুণ সঙ্গ দিলেন। তারা দু’জনে এ উইকেট জুটিতে গড়লেন নতুন সর্বোচ্চ রান। সিকান্দার রাজার ওভারে একটি ডাবল ও এক ছক্কায় ৭৮ বলে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় হাফ সেঞ্চুরিতে পৌঁছে যান মিরাজ।

কাকতালীয়ভাবে মিরাজের প্রথম হাফ সেঞ্চুরির সময়ই ভারতের বিপক্ষে হায়দরাবাদে উইকেটে ছিলেন মুশফিক। ওই ম্যাচে আবার মুশফিক তার পঞ্চম টেস্ট সেঞ্চুরিটিও পান। কাল সিকান্দার রাজার ওই ওভারেই ডাবল সেঞ্চুরিতে মিরপুর রাঙান মুশফিক। ১৯৯ রানে পৌঁছালে যে কোনো ব্যাটসম্যানই যে নার্ভাস হয়ে যান সেটা খেলা শেষে স্বীকারও করলেন মুশফিক। এক রান দূরে দাঁড়িয়ে মাভুতার একটি ওভার মেডেনও দেন মুশফিক। গিট খোলে রাজার ওভারে। মিডউইকেটে ঠেলে দিয়েই পাশ পাল্টে ফেলতে দৌড়। তবে সরাসরি থ্রোটা উইকেটে লাগলে এক রানের আফসোসে পুড়তে হতো তাকে। সেটা হয়নি।

মুশফিক রান পূরণ করে দু’হাত দু’দিকে পাখির ডানার মতো মেলে ধরে চলে যান আরও ত্রিশ গজ দূরে। মুখের সামনে থেকে দু’হাত টেনে আঙুল দিয়ে একে দেন ভালোবাসা চিহ্ন। তার ডাবল সেঞ্চুরিটা যে প্রিয়তমা স্ত্রী জান্নাতুল কিফায়াত মন্ডীর জন্য। মিরপুর স্টেডিয়ামে চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে পূর্ণ করেন ডাবল সেঞ্চুরি। সম্ভাবনা ছিল পাকিস্তানের আজহার আলীকে টপকানোরও।

এ মাঠে এই পাকিস্তানি ২০১৫ সালে করেছিলেন ২২৬ রান। কাল মুশফিক মাত্র সাত রান দূরে থাকতেই ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। মুশফিকই এ বছর প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি করলেন। তিনি যখন মাঠ ছেড়েছেন তখন রেকর্ডের ফর্দটা অনেক লম্বা হয়ে গেছে। এখন তিনি বাংলাদেশের শুধুই সর্বোচ্চ রানের মালিক নন, সবচেয়ে বেশি সময় (৫৮৯ মিনিট) উইকেটে থাকা, সবচেয়ে বেশি বল (৪২১) খেলা ব্যাটসম্যানও। তবে সবার উপরের কীর্তি হল বিশ্বের প্রথম উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি দুটি ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন। এমন উইকেটেও কাইল জার্ভিস আরিফুলকে আউট করে নিজের পাঁচ উইকেট তুলে নেন।

শেষ বিকালে জিম্বাবুয়েকে ব্যাটিংয়ের পাঠিয়ে আগুন ঝরিয়েছেন দুই পেসার মোস্তাফিজুর রহমান ও অভিষিক্ত খালেদ আহমেদ। মোস্তাফিজ ছয় ওভারে মেডেন দিয়েছেন চারটি। তার করা ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই রিভিউ চায় বাংলাদেশ। সফল হয়নি।

তবে ক্যারিয়ারের প্রথম উইকেটটি কালই পেয়ে যেতে পারতেন খালেদ। তার দ্বিতীয় ওভারেই দ্বিতীয় স্লিপে ক্যাচ তুলে দেন অধিনায়ক মাসাকাদজা। তবে তৃতীয় স্লিপে দাঁড়ানো আরিফুল হক বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে ক্যাচ নিতে গেলে হাত থেকে পড়ে যায়। এরপর অবশ্য অধিনায়ককে ফিরিয়ে দলের প্রথম সাফল্য এনে দেন বাঁ-হাতি স্পিনার তাইজুলই।

ঘটনাপ্রবাহ : বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে সিরিজ, ঢাকা-২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×