শতাধিক গাড়ি ভাংচুর, ৫টিতে আগুন

বাসচাপায় ঝরল দুই প্রাণ

মালিবাগ-রামপুরা সড়ক অবরোধ সাড়ে তিন ঘণ্টা

  যুগান্তর রিপোর্ট ০২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিহত
রাজধানীর মালিবাগে মঙ্গলবার বাসচাপায় দুই গার্মেন্ট শ্রমিক নিহত হওয়ার পর বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের বাস ভাংচুর। ইনসেটে: নিহত দুই নারী। ছবি: যুগান্তর

নতুন বছরের প্রথম দিন মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে বেপরোয়া বাসের চাপায় নিহত হয়েছেন দুই পোশাক শ্রমিক।

খবর পেয়ে তাদের সহকর্মীরা রাস্তায় নেমে আসেন। সড়ক আটকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্ষোভ করতে থাকেন তারা। এ সময়ে শতাধিক গাড়ি ভাংচুর করা হয়, আগুন দেয়া হয় পাঁচটিতে।

নিহত শ্রমিকরা হলেন নাহিদ পারভীন পলি (২০) ও মিম আক্তার (১৬)।

রামপুরা জোনের ট্রাফিক সার্জেন্ট শুভ কুমার দে জানান, দুপুর দেড়টায় মালিবাগ আবুল হোটেলের সামনে রাস্তা পারাপারের সময় মিম ও পলিকে চাপা দেয় সুপ্রভাত পরিবহনের সদরঘাট থেকে গাজীপুরগামী একটি বাস। ঘটনাস্থলেই মারা যান মিম।

গুরুতর অবস্থায় পলিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সহকর্মী সুমি ও সজল গায়েন যুগান্তরকে জানান, পলি মগবাজারের পূর্ব নয়াটোলায় ভাড়া বাসায় থাকত।

চাকরি করত মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার এসএম ফ্যাশন গার্মেন্টসে। সেখানেই মিমের কাজের ব্যবস্থা করে পলি। মিমের চাকরির প্রথম দিন ছিল মঙ্গলবার। দুপুরের খাবার খেতে কারখানা থেকে বাসায় যাচ্ছিলেন তারা।

মিমের খালাতো ভাই সাইফুল জানান, মিম বগুড়ার গাবতলী উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের সোনাই মোল্লার মেয়ে।

চাকরির উদ্দেশ্যে সে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় খালার বাসায় আসে। পলির মাধ্যমে সে গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছিল। পলির গ্রামের বাড়ি নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলায়। বাবার নাম এজাজ আহমেদ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসচাপায় দুই পোশাক শ্রমিক নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনটার দিকে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসে। তারা আবুল হোটেল থেকে রামপুরা টিভি সেন্টার পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে যানবাহন ভাংচুর শুরু করে।

সুপ্রভাত, রাইদা, অনাবিল, গ্রিন ঢাকা, প্রচেষ্টাসহ বিভিন্ন পরিবহনের অর্ধশতাধিক বাস ভাংচুর করে। ভাংচুর করে পিকআপসহ ব্যক্তিগত যানবাহনও।

থেমে থেমে সুপ্রভাত পরিবহনের ২টি, অনাবিল পরিবহনের ১টি ও প্রচেষ্টা পরিবহনের ২টি গাড়িতে আগুন দেয়।

মালিবাগ ও চৌধুরীপাড়া এলাকায়ও শ্রমিকরা নেমে আসেন রাস্তায়। সেখানে ভাংচুর করা হয় আরও ২০-২৫টি গাড়ি।

বিক্ষোভ-ভাংচুরের কারণে রামপুরা ব্রিজ থেকে মৌচাক পর্যন্ত সড়কের উভয় দিকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

ভাংচুর শুরু হলে বিভিন্ন বাসের চালক-সহকারী ও যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। চালকরা দ্রুত গাড়ি ঘুরিয়ে বিকল্প পথে যেতে থাকেন।

এ সময় সড়কে পথচারীদের মধ্যে ছড়ায় আতঙ্ক।

নূরে মক্কা পরিবহনের চালক মেহেদী বলেন, আমাদের ৭টি গাড়ির সব গ্লাস ভেঙেছে, তা পরিবর্তন করা যাবে। কিন্তু যেভাবে আগুন দেয়া শুরু হয়েছে, তাতে বাসের কিছু থাকবে না। তাই ঝুঁকি নিয়ে পালাচ্ছি।

সবচেয়ে বেশি গাড়ি ভাংচুর হয়েছে সুপ্রভাত পরিবহনের। পরিবহনটির ৩০টির মতো গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে বলে এক চালক দাবি করেছেন।

নাইম নামে এক চালক বলেন, যে বাস মেরেছে, বিচার হলে তার হবে। বাকিগুলো কী দোষ করেছে?

গ্রিন ঢাকা পরিবহনের হেলপার জুনায়েদ বলেন, আমাদের ৪টি গাড়ি ভাংচুর করেছে শ্রমিকরা। প্রচেষ্টা পরিবহনের হেলপার শাকিল বলেন, কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সামনে দেখি গাড়ি ভাংচুর করছে শ্রমিকরা।

যাত্রী নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা সাইড করলেও রক্ষা হয়নি। আমাদের ৯টি গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে। দুটিতে আগুন দেয়া হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শ্রমিকরা বিক্ষোভ-ভাংচুর শুরু করলে পুলিশ প্রথমে শ্রমিকদের সরে যাওয়ার অনুরোধ জানায়। তারা সরে না গেলে লাঠিপেটা শুরু করে।

এ সময় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পুলিশের মতিঝিল জোনের ডিসি আনোয়ার হোসেন বলেন, শ্রমিকদের আমরা বুঝিয়ে সরানোর চেষ্টা করেছি।

এক পর্যায়ে হ্যান্ডমাইকে তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বিক্ষুব্ধ গার্মেন্টস কর্মীদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

তাদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা শান্ত হও দোষীদের বিচার হবে। তোমাদের কাউকে আটক করা হবে না। আমি কথা দিচ্ছি বিচার হবে। অনুরোধ করছি তোমরা রাস্তা ছেড়ে চলে যাও।

বাস দুর্ঘটনায় জড়িত চালক ও মালিকপক্ষকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। যেসব পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে তদন্ত করে তাদেরও বিচার করা হবে।

ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, সাড়ে ৬টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সড়কে যান চলাচল শুরু হয়েছে। দুই শ্রমিক নিহতের ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। আইনগতভাবে যা যা করার সুযোগ আছে।

পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় ৫-৬ জন পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে মতিঝিল জোনের নাজমুন্নাহার চোখে আঘাত পান। তাকে রাজধানীর আগারগাঁও চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটে নেয়া হয়েছে।

হাতিরঝিল থানার ওসি আবু ফজলুল করিম যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় বাস ও এর চালককে আটক করা হয়েছে।

মালিবাগ থেকে রামপুরাগামী যানবাহনকে ডাইভারশন দিয়ে মগবাজার থেকে হাতিরঝিলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

শাহিদা নামে এক শ্রমিক বলেন, আমাদের দুই পোশাক শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় অবরোধ করছিলাম। পরে আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। তখন শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে গাড়ি-ভাংচুর শুরু করে। তবে পুলিশ এমন দাবি অস্বীকার করে বলেছে, শুরু থেকেই গাড়ি ভাংচুর করে শ্রমিকরা।

খবর পেয়ে ঢামেক হাসপাতালে ছুটে যান পলি ও মিমের অনেক সহকর্মী। মিমের খালা লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

সূত্র মতে, আজ এখানে দুই লাশের ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপরই পরিবারের হাতে লাশ হস্তান্তর করা হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×