সরকারের ধারাবাহিকতায় স্বস্তি

মেগা প্রকল্পে অগ্রাধিকার

১০ প্রকল্পে অক্সিজেন সরবরাহ অব্যাহত রাখাই চ্যালেঞ্জ : পরিকল্পনামন্ত্রী * কাজগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হওয়ায় প্রয়োজন কার্যকর সমন্বয় : ইআরডি সচিব * উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে দেশের চেহারা বদলে যাবে : বিশেষজ্ঞরা

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হামিদ-উজ-জামান

দেশে চলমান মেগা প্রকল্প

পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণসহ ১০টি বৃহৎ প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ করাই নতুন সরকারের অন্যতম টার্গেট। কাজেই স্বপ্নের মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এগুলোতে দেয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ।

দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আর্থিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতেই সরকার দ্রুত এসব কাজ শেষ করতে চাচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, স্বপ্নের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদের শেষদিকে এক ধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছিল। ওই সময় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতিও শঙ্কার মধ্যে পড়ে। কিন্তু একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিশাল বিজয়ের মধ্য দিয়ে সরকারের ধারাবাহিকতা থাকায় মেগা প্রকল্পেও স্বস্তি বিরাজ করছে। সরকারের নীতি ও কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়েছে বলে মনে করেন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা।

অবকাঠামো উন্নয়নে মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশের প্রবৃদ্ধি আরও বেগবান হবে। বড় বড় প্রকল্পের দিকে বিশেষ নজর দেয়ার জন্য সরকার দশটি মেগা প্রকল্পকে ফাস্টট্র্যাকভুক্ত করেছে। সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ফাস্টট্র্যাকভুক্ত মেগা প্রকল্পগুলো হচ্ছে- পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু-মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প।

তবে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পটির অর্থায়ন চূড়ান্ত না হওয়ায় এখনও কোনো অগ্রগতি হয়নি। দশটি প্রকল্পের মধ্যে বেশির ভাগই সঠিক পথে আছে। তবে পিছিয়ে পড়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশ আরও এগিয়ে যাবে। পরিবর্তন হবে সার্বিক অবস্থার।

পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান মেগা প্রকল্প প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, আমাদের সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে চলমান মেগা ১০টি প্রকল্পে ফিড দেয়া এবং অক্সিজেন সময়মতো সরবরাহ অব্যাহত রাখা। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সমন্বয় করে এ কাজটা করব। এসব প্রকল্প যাতে কোনোভাবেই বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে সর্বোচ্চ দৃষ্টি রাখব।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, এখন সরকারের চলমান নীতি এবং কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। এটা অর্থনীতির জন্য ভালো হয়েছে। চলমান উদ্যোগগুলোর কোনো ব্যত্যয় বা বিঘ্ন ঘটার সুযোগ নেই। একজন নাগরিক হিসেবে এবং পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পক হিসেবে বলব, এটা নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক।

সূত্র জানায়, গত আগস্ট মাস পর্যন্ত ফাস্টট্র্যাকভুক্ত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ প্রকল্পের বাস্তবায়ন সঠিক পথেই রয়েছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্প : সরকারের নিজস্ব অর্থে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পটিতে ব্যয় হচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এটি এখন দৃশ্যমান স্বপ্নময় প্রকল্প। গত আগস্ট মাস পর্যন্ত সার্বিক বাস্তবায়ন হয়েছে ৫৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। এছাড়া মূল সেতুর বাস্তবায়ন ৬৬ শতাংশ, জাজিরা প্রান্তের অ্যাপ্রোচ রাস্তা, মাওয়া প্রান্তের সড়ক, সার্ভিস এরিয়া-২ এর কাজ শতভাগ শেষ। নদীশাসন কাজ ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে।

তবে পিলার জটিলতার কারণে বাস্তবায়ন কিছুটা পিছিয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে। সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৫৭ দশমিক ৫০ ভাগ।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র : দেশের সর্বোচ্চ ব্যয়ের প্রকল্প এটি। বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত আগস্ট মাস পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ২০৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে। কাজ শুরু হয়েছে ২০১৬ সালের জুলাই মাস থেকে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে।

ইতিমধ্যেই প্রথম পর্যায়ের প্রস্তুতি অংশের কাজ প্রায় শেষ। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজও অনেকদূর এগিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এটি হবে দেশের ইতিহাসে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র : বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি তৈরি হচ্ছে। এতে ব্যয় হচ্ছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। ২০০৯ সালের জুলাই থেকে এর কাজ শুরু হয়েছে। ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ১৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ। বাউন্ডারি ওয়াল, স্লোপ, ভূমি উন্নয়ন ও অফিস কাম আবাসিক ভবনের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। অন্যান্য কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৪ সালের জুলাই মাস থেকে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শেষ হওয়ার কথা ২০২৩ সালের জুনে। আগস্ট পর্যন্ত সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ১৮ দশমিক ৬৭ ভাগ।

প্রকল্পগুলো প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মনোয়ার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আমি সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ইতিমধ্যেই মুখ্য সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে মেগা প্রকল্পগুলোর অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেছি। প্রকল্পগুলো যেহেতু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে সেজন্য কার্যকর সমন্বয় দরকার। আমরা সে কাজটিই করছি। কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা উচ্চ পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে।

ফাস্টট্র্যাকভুক্ত অপর প্রকল্পগুলো হচ্ছে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র : জাপান সরকারের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় প্যাকেজ ১ দশমিক ১-এর পাওয়ার প্লান্ট এবং ওপার্ট ফ্যাসিলিটিজের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। প্যাকেজ ১ দশমিক ২-এর আওতায় প্লান্ট এবং পোর্ট ফ্যাসিলিটিজের কাজ গত আগস্ট মাস পর্যন্ত ২০ দশমিক ১৬ শতাংশ হয়েছে। অন্যান্য কাজ কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মেট্রোরেল প্রকল্প : জাপান সরকারের অর্থায়নে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীতে বাস্তবায়ন হচ্ছে মেট্রোরেল প্রকল্প। প্রকল্পটির শুরু থেকে আগস্ট পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২৩ দশমিক ২২ শতাংশ। ২০১২ সালের জুলাই থেকে কাজ শুরু হয়। শেষ হবে ২০২৪ সালে। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে দৃশ্যমান হয়েছে মেট্রোরেলের পিলার। দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে চলছে।

এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ : প্রকল্পটি বিল্ট ওন অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর সঙ্গে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ফাস্টট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং কমিটির ১০ম সভায় গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পটিও যুক্ত করা হয়। এর আওতায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি মহেশখালী-আনোয়ারা গ্যাস সঞ্চালন সমান্তরাল পাইপলাইন নির্মাণ, আনোয়ারা-ফৌজদারহাট গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম-ফেনী-বাখরাবাদ গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প যুক্ত রয়েছে।

পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ : পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য এ প্রকল্পকে ১৯টি কম্পোনেন্টে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি কম্পোনেন্ট সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে, ৬টি কম্পোনেন্ট পিপিপির মাধ্যমে এবং ৬টি কম্পোনেন্ট জিটুজি পদ্ধতির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।

পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ : চীন সরকারের অর্থায়নে জিটুজি পদ্ধতিতে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের শুরু থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৯ হাজার ৮৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ১৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে কাজ শুরু হয়। ২০২২ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা।

দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু-মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প : এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির সার্বিক ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ১১ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০১০ সালের জুলাই থেকে কাজ শুরু হয়েছে। মেয়াদ নির্ধারণ করা আছে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত।

শুধু ফাস্টট্র্যাক নয়, সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের জন্য সরকারের নেয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংযোগ বাড়বে, সম্পর্কেরও উন্নতি হবে।

সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নেও সরকার যথেষ্ট অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এশিয়াসহ আন্তর্জাতিক সড়কগুলোর সঙ্গে মিল রেখে চার লেন সড়কের পাশে সার্ভিস লেন রাখা হচ্ছে। এদিকে এরই মধ্যে অনেকটা দৃশ্যমান হয়েছে জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল চার লেন। যা ঢাকার সঙ্গে উত্তরের ১৬ জেলার সড়ক যোগাযোগ দ্রুততর করবে। মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পও এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদ থেকেই বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন সূচকে এগিয়ে। নতুন সরকারের সময় এ ধারা অব্যাহত থাকবে। এজন্য প্রয়োজন এগুলো সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ১৫ বছর পর বাংলাদেশের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে যাবে।

দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে এই ধরনের বড় প্রকল্প জরুরি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের মাথাপিছু আয়ও বাড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি সঞ্চার হবে, সুযোগ সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের।