শিক্ষার্থী জোটের গণপ্রতিবেদন

গৃহবধূর সুচিকিৎসা ও আসামিদের দ্রুত বিচার দাবি

কুমিল্লা থেকে আরেক আসামি গ্রেফতার

  যুগান্তর রিপোর্ট ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুবর্ণচরের ঘটনায় গণপ্রতিবেদন প্রকাশ ও মানববন্ধন করে ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোট’
সুবর্ণচরের ঘটনায় গণপ্রতিবেদন প্রকাশ ও মানববন্ধন করে ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোট’

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গৃহবধূ গণধর্ষণের ঘটনায় গণপ্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। শুক্রবার ঢাকায় মানববন্ধনে ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোট’ এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

এতে বলা হয়, গণধর্ষণের শিকার নারী, তার পরিবার ও মামলার স্বার্থে খুব দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। গৃহবধূকে দ্রুত ঢাকায় নিয়ে আসা এবং ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস’ সেন্টারে ভর্তি করা উচিত। এছাড়া সব আসামিকে গ্রেফতার করে ৯০ দিনের মধ্যে বিচার করা উচিত।

এদিকে এ গণধর্ষণের ঘটনায় কুমিল্লার দাউদকান্দি বাসস্ট্যান্ড থেকে আরেক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া দু’জনকে আরও সাত দিন করে রিমান্ডে নিতে পুলিশ আদালতে আবেদন করেছে।

রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিকাল সাড়ে ৫টায় আয়োজিত মানববন্ধনে গণপ্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বক্তব্য দেন ভাস্কর রাশা, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর নেত্রী সঙ্গীতা ইমাম, যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোটের আহ্বায়ক শিবলী হাসান প্রমুখ।

গণপ্রতিবেদন সম্পর্কে শিবলী হাসান বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে সুবর্ণচরে এক গৃহবধূ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দেশের সর্বত্র এ নিয়ে প্রতিবাদ চলছে, এমনকি এ ঘটনার প্রতিবাদে দেশের বাইরেও অনেকে রাস্তায় নেমেছেন। গণধর্ষণের প্রতিবাদ ও ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোট বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করেছে ও করছে।

তিনি বলেন, যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোটের সদস্যরা ৬ জানুয়ারি সুবর্ণচর উপজেলা গিয়ে সেখানকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। পর্যবেক্ষণ শেষে তারা গণপ্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন।

জোটের প্রতিবেদনে বলা হয়, গণধর্ষণের শিকার চার সন্তানের জননী গৃহবধূ ভূমিহীন সংগঠনের একজন সক্রিয় সদস্য। প্রতিবাদী চরিত্রের অধিকারী ওই গৃহবধূ তাই সাবেক ইউপি সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে রুহুলের পছন্দের প্রতীকে ভোট না দেয়ায় ভোট কেন্দ্রেই গৃহবধূকে রুহুল হুমকি দেয়।

ভোট কেন্দ্রের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হীন উদ্দেশ্যে রুহুলের সন্ত্রাসী বাহিনী ওই রাতে গৃহবধূর বাড়িতে হামলা চালায়। প্রায় ১৪ জনের একটি দল তার স্বামী ও সন্তানকে বেঁধে রেখে তার ওপর অত্যাচার চালায়। তাকে মধ্যযুগীয় কায়দায় পেটানো হয়। ৯ জন পালাক্রমে তাকে গণধর্ষণ করে। হাত-পাসহ তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়। এক পর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে মৃত ভেবে ধর্ষকরা পালিয়ে যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার পরপরই সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করা হয়। যেখানে মূল পরিকল্পনাকারী, উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক রুহুল আমিনসহ বেশ কয়েকজনকে বাদ দিয়ে মামলা নথিভুক্ত করা হয়। তবে এ নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হলে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্রুত হস্তক্ষেপে বাকিদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জোটের তদন্তে যে কয়জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে তারা হল- মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা রুহুল আমিন, মোশাররফ হোসেন, সালাহউদ্দীন, সোহেল, হেঞ্জু মাঝি, বেছু, জসিম, মো. সোহেল, আবু চৌধুরী, স্বপন, আনোয়ার, বাদশা, হানিফ ও আমির হোসেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোটের সদস্যরা জেলা প্রশাসনের সঙ্গেও কথা বলেছেন এবং তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো উপস্থাপন করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মামলাকে প্রশাসন খুব দ্রুততার সঙ্গে পরিচালনা করছেন। নোয়াখালী প্রশাসনের তৎপরতা ও পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। তবে আমরা এও লক্ষ্য করেছি, প্রশাসনের ক্ষুদ্র একটি অংশ রাজনৈতিকভাবে রুহুলের পক্ষে এবং তাকে বাঁচানোর কৌশল তাদের কথাবার্তায় স্পষ্ট।

‘ভূমিদস্যু রুহুল আমিন’ হয়ে ওঠার পেছনে রাজনৈতিক দলের অবস্থান : প্রতিবেদনে বলা হয়, সন্ত্রাসী রুহুল আমিন একদিনে হয়নি। বরং দীর্ঘ সময় ও দলীয় সুযোগে ধর্ষক রুহুলের জন্ম। ‘হোটেল বয়’ থেকে কোটিপতি রুহুল হওয়ার পেছনে রয়েছে দলীয় প্রভাব। স্থানীয়দের এক সমাবেশে রুহুল আমিনের নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে অনেক তথ্য।

রামগতি-চরজব্বার সড়কের পাংখার বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পশ্চিমে তার নামে গড়ে তোলা হয়েছে রুহুল আমিন নগর। সেখানে রয়েছে তার বিলাসবহুল বাড়ি। আছে একটি ইটভাটা, দোকানপাটসহ ব্যবসায়িক ঘর। অসংখ্য মানুষের জমি দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত রুহুল।

বনদস্যু ও জলদস্যুদের নিয়ে রয়েছে তার ‘রুহুল আমিন বাহিনী’। আর তার এসব অপকর্মের শক্তির উৎস স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হানিফ চৌধুরী। দলীয় আশ্রয়ে থাকায় কেউই তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না।

চরজুবলী ইউপি চেয়ারম্যান হানিফের সখ্যের সূত্র ধরে রুহুল ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড সম্পাদকের দায়িত্ব পায় এবং দলীয় প্রভাব খাটানো শুরু করে। ২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রুহুল ৫ নম্বর চরজুবলী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচিত হয়।

দলীয় ফোরামে অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও রুহুল আমিনকে সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক করেন সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চরজুবলী ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হানিফ চৌধুরী। মূলত হানিফের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রুহুল এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে এবং এলাকায় অপরাধের রাজত্ব কায়েম করে।

যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোটের দাবিসমূহ : সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোট মনে করে গণধর্ষণের শিকার নারী, তার পরিবার ও মামলার স্বার্থে খুব দ্রুত বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

এগুলো হল- ১. গৃহবধূকে দ্রুত ঢাকায় নিয়ে আসা এবং ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস’-এ স্থানান্তর করা। ২. গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূ ও তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ৩. মামলার সব আসামিকে গ্রেফতার ও ‘রুহুল আমিন বাহিনী’র সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেফতার করা। ৪. ৯০ দিনের মধ্যে মামলার রায় দেয়া।

৫. রুহুলের অপকর্মের হোতা চরজুবলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হানিফ চৌধুরীকে আওয়ামী লীগ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা। ৬. ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া ও কার্যকর করা। বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ড না ঘটানো।

প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়, মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এ দেশ কোনো ধর্ষকের চারণভূমি হতে পারে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের বাংলাদেশে কোনো নারী নিপীড়ক ও ধর্ষকের স্থান হতে পারে না।

নোয়াখালী : কুমিল্লার দাউদকান্দি বাসস্ট্যান্ড থেকে বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে ধর্ষক হেঞ্জু মিয়াকে (২৯) গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। এ নিয়ে ১৩ দিনে ১১ জন ধর্ষককে গ্রেফতার করা হল।

রিমান্ডে থাকা সাতজনের মধ্যে পাঁচজন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। পাঁচজনকে জেলা কারাগারে পাঠানো হলেও দু’জনকে আরও সাত দিন করে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করেছে পুলিশ। রোববার তাদের রিমান্ডের শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।

ওসি (ডিবি) আবুল খায়ের যুগান্তরকে জানান, আসামি হেঞ্জুকে দাউদকান্দি বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উপজেলার মধ্যম বাগগা গ্রামের চাঁন মিয়ার ছেলে হেঞ্জু ঘটনার পর থেকে পলাতক ছিল।

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×