মার্চে ফের ভোটের উত্তাপ

সদ্যসমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের রেশ না কাটতেই মার্চে ফের শুরু হচ্ছে ভোটের উত্তাপ। কয়েক ধাপে অনুষ্ঠেয় উপজেলা নির্বাচন শুরু হবে এ মাসে। পাশাপাশি হবে ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন। এই দুই নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা তৎপরতা। হিসাব কষছে বড় দুই দল- আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিতে পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীনরা। তবে এ ব্যাপারে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বিএনপি। অন্যদিকে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলসহ সব ছাত্র সংগঠন। যদিও সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিতসহ বেশকিছু দাবি কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরেছে। নির্বাচন আয়োজনে ইতিমধ্যে পৃথকভাবে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেছে ইসি ও ঢাবি কর্তৃপক্ষ

  হাসিবুল হাসান, তারিকুল ইসলাম ও মাহমুদুল হাসান নয়ন ১৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভোটের উত্তাপ

আওয়ামী লীগের টার্গেট নিরঙ্কুশ বিজয়

মাঠে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা * গুরুত্ব পাবে তৃণমূলের মতামত

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে তোড়জোড় শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। জাতীয় সংসদ ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ঈর্ষান্বিত সাফল্য উপজেলায়ও পুনরাবৃত্তির প্রত্যাশা করছে দলের হাইকমান্ড। শনিবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়। নিরঙ্কুশ জয় নিশ্চিতে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দু’ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছেন শাসক দলের নেতারা। বিএনপি নির্বাচনে এলে এক ধরনের প্রস্তুতি না এলে অন্যভাবে হবে নির্বাচন। এদিকে তফসিল ঘোষণার আগেই একাধিক দলে ভাগ হয়ে জেলা সফরের চিন্তাও আছে নেতাদের। এতে নেতাকর্মীদের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দলের ঐক্য সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে। প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের মতামত গ্রহণ করাসহ বেশকিছু ইস্যু প্রাধান্য দিয়ে এ সফর করতে চান তারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) মুহম্মদ ফারুক খান যুগান্তরকে বলেন, সব উপজেলায় আমাদের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমরা কেন্দ্রীয়ভাবেও প্রস্তুতি নিচ্ছি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের উপজেলা ও জেলা কমিটির সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো যোগ্য ও জনপ্রিয়দেরই উপজেলায়ও মনোনয়ন দেবে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনে ‘নির্বাচনী জোট’ থাকলেও উপজেলায় তেমনটি ভাবা হচ্ছে না। তবে নির্বাচনে আমাদের দু’ধরনের প্রস্তুতিই থাকছে। আপাতত আমরা একক প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশনা আছে। বিকল্প প্রস্তুতিও থাকছে। বিএনপি নির্বাচনে এলে আমরা জোটবদ্ধ নির্বাচন করব। কারণ উল্লেখ করে বলেন, আমাদের লক্ষ্য নিরঙ্কুশ জয় নিশ্চিত করা।

এদিকে জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোল শেষ না হতেই উপজেলা নির্বাচনে তৃণমূলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রস্তুতি নিচ্ছে। পিছিয়ে নেই বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যানরাও। ইতিমধ্যে নিজেদের অবস্থান থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগও বাড়িয়ে দিয়েছেন তারা। তবে নির্বাচনে মনোনয়নের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।

দেশের সাড়ে চারশ’ উপজেলায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে ভোট হবে। এ লক্ষ্যে জানুয়ারির শেষদিকে বা ফেব্রুয়ারির শুরুতে তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা, পবিত্র রমজান ও আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েক ধাপে উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মার্চ মাসে কয়েক ধাপে ভোট করতে চায় বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ইসি কর্মকর্তারা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলীয় জোট মিলে মহাজোট হিসেবে নির্বাচন হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় পার্টি এখন জাতীয় সংসদের বিরোধী দল। তারা আর সরকারে নেই। ফলে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মহাজোট থাকছে না এটা মোটামুটি নিশ্চিত। এমনকি সরকারের মন্ত্রিপরিষদে নেই ১৪ দলের অন্য কোনো শরিক দলের সদস্য। তবে তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করবে নাকি এককভাবে নির্বাচন করবে সে সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে বিএনপির অংশগ্রহণের ওপর। বিএনপি নির্বাচনে এলে হয়তো জাতীয় নির্বাচনের মতোই জোট করে ভোটে যাওয়ার বিষয়টি জোরালো হবে। একই বিষয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন যুগান্তরকে বলেন, গত উপজেলা নির্বাচনে তো আমরা আলাদাভাবে অংশ নিয়েছি। কিন্তু এবার কি হবে সেটা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এবারও আলাদা হতে পারে। তবে ১৪ দলের বৈঠকে বসে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

১৪ দলের শরিক জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ১৪ দলীয়ভাবে করব নাকি আলাদাভাবে করব সেটা সময়ই বলে দেবে। আমাদের একটা সন্দেহ হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি উপজেলা নির্বাচনে না-ও আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে তারা না এলেও উপজেলা নির্বাচনটা যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয় সে জন্য আমরা ১৪ দল আলাদা আলাদা অংশ নিতে পারি। আর তারা ভোটে এলে জোটগতভাবে হবে। জোটগতভাবে নির্বাচন করলে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির আসার সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি তো এখন বিরোধী দলে চলে গেছে, তাই উপজেলা নির্বাচনে আর মহাজোট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিএনপি এলে ১৪ দলীয় জোটগতভাবে নির্বাচন হতে পারে।

এদিকে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, নিজেদের রাজনীতির মাঠে টিকিয়ে রাখতেই বিএনপিকে উপজেলা নির্বাচনে আসতে হবে। এ ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই। তাই এখন মুখে যাই বলুক না কেন ভোটের মাঠে ঠিকই আসবে। এ জন্য নিজেদের প্রস্তুতিটাও জোরালোভাবেই নিচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

এবার উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যান তিনটি পদে দলীয় প্রতীকে ভোট হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলীয় টিকিট পাওয়ার জন্য জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের অনেক নেতা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। স্থানীয় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ধরনা দিচ্ছেন তারা। স্থানীয়ভাবে পোস্টার-ব্যানারে জানান দিচ্ছেন নিজেদের আগ্রহের কথা। পাশাপাশি নবনির্বাচিত এমপি-মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাদের শুভেচ্ছা জানানোর সময় জানাচ্ছেন নিজেদের আগ্রহের কথা। সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনসহ বিগত সময়ে দলের প্রয়োজনে তাদের ভূমিকার কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। কারও সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক বৈরিতা থাকলে তা-ও দূর করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

উপজেলা নিয়ে বিএনপির সিদ্ধান্ত তফসিলের পর

২০ দল-ঐক্যফ্রন্ট বিএনপির দিকে তাকিয়ে * জামায়াতকে ধানের শীষ দিলে গণফোরামের ‘না’

আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা তা তফসিল ঘোষণার পর জানাবে বিএনপি। দলটির তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় একটি অংশ নির্বাচন বর্জনের পক্ষে। তবে অংশগ্রহণ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত রয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোরও। এ নিয়ে এখনও কোনো জোটের সঙ্গেই বিএনপির আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তবে ২০ দলের শরিক জামায়াতে ইসলামীকে উপজেলা নির্বাচনেও ধানের শীষ প্রতীক দেয়া হলে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে না যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল গণফোরাম। বিএনপিসহ দুই জোটের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।

বিএনপি সূত্র জানায়, আপাতত উপজেলা নির্বাচন নিয়ে ভাবছে না দলটির হাইকমান্ড। তারা এখন জাতীয় নির্বাচনে সারা দেশের ‘অনিয়ম ও কারচুপির’ তথ্য সংগ্রহ করছেন। সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। একই সঙ্গে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মী যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবার ও হামলা-মামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ যুগান্তরকে বলেন, উপজেলা নির্বাচন নিয়ে দলীয় ফোরামে এখনও আলোচনাই হয়নি। জাতীয় নির্বাচনে সারা দেশের অনিয়ম ও কারচুপির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আপাতত সেগুলো নিয়ে পর্যালোচনা চলছে।

স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, বিএনপি উপজেলা নির্বাচনে যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তফসিল ঘোষণার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

দলটির তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় একটি অংশ আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জনের পক্ষে। তারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সামলে ওঠার আগেই আরেকটি নির্বাচনে অংশ নিলে কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। উল্টো এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর আরেক দফা মামলা-হামলা হবে। এছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে দলের পক্ষ থেকে যে প্রচার চালানো হচ্ছে, সেটিও গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। নির্বাচনে অংশ নিয়ে বর্তমান সরকারকে দ্বিতীয়বার বৈধতা দেয়ার পক্ষে নন তারা।

অন্যদিকে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে একটি অংশ। তারা মনে করছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সাংগঠনিকভাবে চাঙ্গা রাখতেই ভোটে অংশ নেয়াটা জরুরি। এর মাধ্যমে নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধভাবে আবারও মাঠে থাকতে পারবেন। অন্যথায় কর্মীদের মনোবল আরও ভেঙে পড়বে। তাদের যুক্তি, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে সেই চিত্র আরেকবার ফুটে উঠবে। জাতীয় নির্বাচনে কতটা অনিয়ম হয়েছে তা প্রমাণ করতে এটা একটা ভালো সুযোগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের নামে কি ধরনের নির্বাচন হতে পারে তা দেশের মানুষ ক’দিন আগে দেখেছে। এরপর আবারও যে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে তার কি নিশ্চয়তা আছে? এছাড়া জাতীয় নির্বাচনে দলের নেতাকর্মীদের ওপর যে হামলা-মামলার ঝড় গেছে তা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এমন পরিস্থিতিতে উপজেলা নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নেবেন।

দলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল জেলা উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনই প্রমাণ করেছে দলীয় সরকার ও বর্তমান সিইসির অধীনে কোনো ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না। জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে না। সুতরাং উপজেলা নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আর যদি উপজেলা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তাহলে তা হবে রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

সূত্র জানায়, শুক্রবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলের নীতিনির্ধারকদের এক বৈঠকেও উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এতে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের একজন নীতিনির্ধারক যুগান্তরকে বলেন, তফসিল ঘোষণার পর ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার বিষয়ে বিএনপি সিদ্ধান্ত নেবে। এর আগে এ বিষয়ে দলের তৃণমূলসহ কেন্দ্রীয় নেতাদেরও মতামত নেয়া হবে। ওই নীতিনির্ধারক আরও বলেন, বর্তমানে জাতীয় নির্বাচনে ‘অনিয়ম ও কারচুপির’ তথ্য সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করছি। শিগগিরই ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের খোঁজখবরের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

বিএনপির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্টের শরিকরা : উপজেলা নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোও। তাদের মধ্যে কোনো কোনো শরিক দল অংশ নেয়ার পক্ষে, আবার কেউ বিপক্ষে। তারা প্রধান শরিক দল হিসেবে বিএনপির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। এ বিষয়ে কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনে যাবে কি যাবে না সে বিষয়ে জোটের প্রধান শরিক বিএনপি সিদ্ধান্ত নেবেন। এরপর আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত জানাব। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন নিয়ে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ে উপজেলা সংগঠনের কাছ থেকে মতামত চেয়েছি। একাদশ সংসদ নির্বাচন কেমন হয়েছে তা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন। এমন অবস্থায় উপজেলা নিয়ে নেতৃবৃন্দ কি ভাবছেন- সে বিষয়ে মতামত নিচ্ছি। ইতিবাচক মতামত পেলে জাতীয় নির্বাচনের মতো ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেটা এখনই বলার সময় হয়নি। মতামত নেয়ার পর্যায়ে কেবল আছি। আমাদের সিদ্ধান্ত আমরা নেব।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না যুগান্তরকে বলেন, আমি উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে। তবে এ বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।

জামায়াত নেতাদের ধানের শীষ প্রতীক দিলে গণফোরামের ‘না’ : এদিকে ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরিক বিএনপির সঙ্গেও এখন পর্যন্ত আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে। উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিলে জামায়াতে ইসলামী নেতাদের ধানের শীষ প্রতীক দেয়া হলে তাতে আপত্তি জানাবে দলটি। এমনকি বিএনপি এমন সিদ্ধান্ত নিলে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে না যাওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছে দলটির নেতারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, উপজেলা নির্বাচনের বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে তো আসতেই হবে। আমার সৌভাগ্য যে, ঐক্যফ্রন্টের নেতারা সবাই ঐকমত্যের ভিত্তিতে সব সিদ্ধান্ত নেয়। উপজেলা নির্বাচনের বিষয়ে তফসিলের আগেও ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক হতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আমরা কোনোদিন রাজনীতি করিনি। এখনও করি না, ভবিষ্যতেও করব না। দলটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু বলেন, আমরা আগেই পরিষ্কার করে বলেছি, জামায়াতের সঙ্গে আমরা ছিলাম না। বিএনপির সঙ্গে আমাদের জোট হয়েছে, ২০ দলের সঙ্গে নয়। উপজেলা নির্বাচনে জামায়াত নেতাদের ধানের শীষ প্রতীক দেয়া হলে গণফোরাম জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঐক্যফ্রন্টের আরেক শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না কোনো মন্তব্য করতে চাননি। বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের কাছেও এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

২৮ বছর পর ‘দ্বিতীয় পার্লামেন্ট’খ্যাত ডাকসু নির্বাচন

আগে ৭ বার ভেস্তে গেছে নির্বাচনের উদ্যোগ

দীর্ঘ ২৮ বছর পর ফের আশার আলো দেখছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন আয়োজনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। এতে দেশের ‘দ্বিতীয় পার্লামেন্ট’খ্যাত ডাকসু নির্বাচনের আলোচনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে এখন সারা দেশে। ১৯৯১ সাল থেকে সাতবার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা বিভিন্ন কারণে ভেস্তে গেছে। তবে এবার তা চান না বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে ৩৮ হাজার শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে প্রত্যাশিত সব পদক্ষেপ গ্রহণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

নির্বাচন সামনে রেখে ইতিমধ্যে ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রশাসনের কয়েক দফায় আলোচনা হয়েছে। সক্রিয় করা হয়েছে ‘পরিবেশ সংসদ’। কাজ চলছে গঠনতন্ত্র সংশোধন ও পরিমার্জন করে ‘সময়োপযোগী’ করার। প্রকাশ করা হয়েছে খসড়া ভোটার তালিকা। এর বাইরে হলের প্রাধ্যক্ষদের নিয়ে বৈঠকে ডাকসু নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। তবে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য ছাত্র সংগঠনগুলো বলছে, ডাকসু নির্বাচনের জন্য সব পদক্ষেপের আগে ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিতসহ বিশ্ববিদ্যালয়কে সবার জন্য নিরাপদ করতে হবে।

নির্বাচনের সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, জাতির প্রত্যাশা রয়েছে। আর এই নির্বাচনের জন্য আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়ে এগোতে হবে। আর সেভাবেই আমরা কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রেখেছি। আশা করছি, সবার সদয় সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা নির্বাচন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারব। এটি একটি সুন্দর প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম হবে শিক্ষার্থীদের জন্য। গঠনতন্ত্র সংশোধনের বিষয়ে তিনি বলেন, সবার জন্য যেই প্রস্তাবগুলো মঙ্গলজনক সেগুলোই গ্রহণযোগ্য হবে।

কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের নিরাপদ ক্যাম্পাস ও সহাবস্থানের দাবি করেছে- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্প্রতি প্রভোস্ট কমিটির একটি সভা হয়েছে। সেখানে তারা জানিয়েছে, ক্যাম্পাসে ইতিমধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রয়েছে। সবাই একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে।

নির্বাচনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস যুগান্তরকে বলেন, আমরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে আমাদের প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেছি। লিখিতভাবেও সেটা জানাব। ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান আছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যদি তাদের (ছাত্রদল) মতাদর্শ গ্রহণ করে, তবে তারা ক্যাম্পাসে আসতে পারবে, কেউ তাদের বাধা দিচ্ছে না। আমরা চাই সব সংগঠন নির্বাচনে আসুক।

ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকী যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনের জন্য সবার আগে ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। সহাবস্থান নিশ্চিত না হলে নির্বাচন হবে কিভাবে। আমরা ইতিমধ্যে প্রশাসনকে জানিয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। এখানে কোনো সহাবস্থান নেই। আমরা আশা করি, প্রশাসন দ্রুত সহাবস্থান নিশ্চিত করবে। যেখানে সবার জন্য নিরাপদ হবে এই ক্যাম্পাস। তাহলেই ডাকসু নির্বাচনের পরিবেশ ফিরে আসবে।

ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির যুগান্তরকে বলেন, আমরা দ্রুত নির্বাচনের তফসিল চাই। ডাকসু নির্বাচনের আগে সবার জন্য ক্যাম্পাসকে নিরাপদ করে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি গঠনতন্ত্র সংশোধনেরও কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সালমান সিদ্দিকী যুগান্তরকে বলেন, ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হলগুলোয় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের যে দখলদারি রয়েছে, এটি বহাল রেখে কোনোভাবেই একটি সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন সম্ভব নয়। আমরা ক্যাম্পাস ও হলগুলোয় সব সংগঠনের সমান অংশীদারিত্ব ও সহাবস্থান চাই।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে। এরপর দীর্ঘ সাড়ে ২৮ বছরে ৭ বার ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও নানা জটিলতায় তা ভেস্তে গেছে। ১৯৯০ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময় ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে শুধু প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিরা। কিন্তু ২০১৮ সাল পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করেননি। ১৯৯০ সালের ৬ জুন সর্বশেষ নির্বাচনের এক বছর পর ১৯৯১ সালের ১২ জুন তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলেও সহিংসতার ফলে তা ভেস্তে যায়।

পরে ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ তফসিল ঘোষণা করলেও ছাত্রলীগের বাধার মুখে নির্বাচন স্থগিত হয়। ১৯৯৫ সালে তফসিল ঘোষণা করা হলে সেবারও নির্বাচন হয়নি। ১৯৯৬ সালে অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী ভিসির দায়িত্ব নেয়ার পর একাধিকবার ডাকসু নির্বাচনের সময়সীমার কথা জানান। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় ব্যর্থ হন তিনি। ১৯৯৭ সালে বঙ্গবন্ধু হলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ছাত্রদল নেতা আরিফ হোসেন তাজ খুন হলে ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি ১৯৯৮ সালের ২৩ মে রিপোর্ট দেয়। রিপোর্টে মেয়াদোত্তীর্ণ ডাকসু ভেঙে দেয়া এবং পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুপারিশ করা হয়। সে অনুযায়ী ২৭ মে সিন্ডিকেট সভায় ডাকসু ভেঙে দেয়া হয়। এরপরও অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী দু’বার নির্বাচনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু তাও আলোর মুখ দেখেনি।

ওই সময় ডাকসুর জন্য গঠিত নতুন (সংশোধিত) গঠনতন্ত্রে ডাকসু ভাঙার ৪ মাসের মধ্যে পুনরায় নির্বাচনের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত ডাকসুর তফসিল ঘোষণা হয়নি। ২০০৫ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ভিসি অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ ওই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দিলে তাও আলোর মুখ দেখেনি। এরপর ২০০৯ সালে অধ্যাপক ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিক উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করলে ডাকসু নির্বাচনের জোর দাবি ওঠে। দাবি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। এরপর বিভিন্ন সময় দফায় দফায় ডাকসু নির্বাচনের দাবি ওঠে। তার সময়কালে ২০১৭ সালের ২৯ জুলাই ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়া উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তারপর থেকেই ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে টানা আন্দোলন করে আসছে শিক্ষার্থীরা।

এরপর ২০১৭ সালের শেষদিকে ভিসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি ডাকসু নির্বাচনের পক্ষে কথা বলেন। ডাকসু নির্বাচন দেয়ার ক্ষেত্রে তার দুটি বিষয়ে বাধ্যবাধকতা ছিল। একটি হল ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবরের হাইকোর্টের একটি আদেশ। এ আদেশে ছয় মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ সিনেট গঠন করে ভিসি প্যানেল মনোনয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এ নির্দেশের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ সদস্যের সিনেট পূর্ণাঙ্গ করতে হবে। যার মধ্যে পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি থাকতে হবে। দ্বিতীয় বাধ্যবাধকতা ছিল- ৬ মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন দিতে হাইকোর্টের নির্দেশ। ২০১২ সালের ১১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ শিক্ষার্থীর একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ নির্দেশ দেন আদালত।

এদিকে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের কোনো আয়োজন দৃশ্যমান না হওয়ায় গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে উকিল নোটিশ পাঠান রিটকারীদের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ অক্টোবর চেম্বার বিচারপতি হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে বিষয়টি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। সেই শুনানি শেষে গত রোববার (৬ জানুয়ারি) হাইকোর্ট জানান, মার্চে ডাকসু নির্বাচনের কোনো বাধা নেই। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় ৩১ মার্চের মধ্যে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঠিক হয়।

এদিকে আইনি জটিলতা কাটিয়ে ৩১ মার্চের মধ্যে ডাকসু নির্বাচনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে খসড়া ভোটার তালিকা (শিক্ষার্থীদের ডাটাবেজ) প্রকাশ করা হয়েছে। ৩১ অক্টোবর হলভিত্তিক শিক্ষার্থীদের ডাটাবেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি আবাসিক হলের সঙ্গে সংযুক্ত ও আবাসিক মিলিয়ে ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন শিক্ষার্থীর নাম রয়েছে। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৫০৯ জন ছাত্রী ও ২৩ হাজার ৯৮৪ জন ছাত্র। তবে উপাচার্য তখন বলেছিলেন, এটি পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকা নয়। এছাড়া ডাকসু নির্বাচনের প্রধান অংশীদার বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন নিয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে পরিবেশ পরিষদের বৈঠক হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ জানুয়ারি ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠনতন্ত্র সংশোধনে বৈঠক ডাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এই সংগঠনগুলোর নেতাদের আগামীকাল সোমবারের মধ্যে লিখিতভাবে তাদের প্রস্তাব তুলে ধরতে বলা হয়েছে।

গঠনতন্ত্র সংশোধনে চলছে কাজ : ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে গঠনতন্ত্র সময়োপযোগী করতে কাজ করছে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের জন্য গঠনতন্ত্র সংশোধনী/পরিমার্জনবিষয়ক সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি। ১০ জানুয়ারি ১৩টি ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেছে এই কমিটি। ৫ সদস্যের এ কমিটির আহ্বায়ক ড. মিজানুর রহমান বলেন, যেহেতু ১৯৯৮ সালে সর্বশেষ ডাকসু ও হল সংসদের গঠনতন্ত্র পর্যালোনা করা হয়েছে, তাই নতুন করে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে তাদের থেকে লিখিত প্রস্তাব পাওয়ার পর আমরা চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করব। কমিটির সুপারিশমালা ভিসি সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করবেন। এই কমিটি মূলত গঠনতন্ত্র ও নির্বাচনের আইনি দিকটি দেখবে। পাশাপাশি মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণের সুপারিশ করবে। তবে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছে। এক্ষেত্রে নিয়মিত শিক্ষার্থী বলতে কী বোঝায়, এ নিয়ে সংযোজন-বিয়োজন, মতপার্থক্য থাকতে পারে।

এদিকে ছাত্র সংগঠনগুলো গঠনতন্ত্রে বেশ কিছু সংশোধন ও পরিমার্জনের সুপারিশ করবে বলে যুগান্তরকে জানিয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রলীগ তাদের সুপারিশে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ক একটি নতুন পদ সৃষ্টি, নির্বাচনের প্রার্থিতার ক্ষেত্রে নিয়মিত ছাত্র হওয়া বাধ্যতামূলক করা এবং নির্বাহী পরিষদের পদ বাতিলের বিধানে নতুন কিছু বিষয় সংযোজনের দাবি জানাবে। এছড়া ছাত্রলীগের প্রস্তাবের মধ্যে থাকতে পারে ডাকসুর গঠনতন্ত্র বাংলায় প্রণয়ন, ডাকসুর কাঠামোতে পর্যাপ্ত হারে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, ডাকসুতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক, গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক পদ সৃষ্টি।

ক্যাম্পাসে সহাবস্থান, নির্বাচনে সব সংগঠনের প্রচার-প্রচারণা সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেবে ছাত্রদল। প্রগতিশীল বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা ‘প্রগতিশীল ছাত্র জোট’ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমফিল করা (নিয়মিত) শিক্ষার্থীদের ভোটার করা, দীর্ঘদিন পর নির্বাচন হচ্ছে বিধায় একটি নির্দিষ্ট সেশন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ প্রদান, সভাপতির (ভিসি) ক্ষমতা হ্রাস এবং সেক্রেটারিয়েট বডির (কার্যনির্বাহী পরিষদ) সদস্যদের ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া ক্যাম্পাসে ‘দখলদারিত্ব’ থাকায় অন্তত এবার ডাকসু নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হলের ভেতর না করে কাছের কোনো একাডেমিক ভবনে করা, ছাত্র অধিকারবিষয়ক সম্পাদকের পদ সৃষ্টি এবং বিদ্যমান গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সমাজসেবা সম্পাদক ও সামাজিক বিনোদন সম্পাদক পদ দুটির নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে সমাজকল্যাণ ও পরিবেশ সম্পাদক এবং সাংস্কৃতিক সম্পাদক রাখার দাবি আসতে পারে তাদের কাছ থেকে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×