ভাষা সংগ্রামের অজানা অধ্যায়

শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের বাংলা ভাষা। আমাদের জাতীয়তাবোধের যে বিকাশ তার মূলে রয়েছে ভাষা আন্দোলন। ভাষা সংগ্রামীদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগারও এই ভাষা আন্দোলন। এ আন্দোলনকে ভিত্তি করেই বাংলাদেশের উৎপত্তি। বিশাল তাৎপর্যপূর্ণ যে আন্দোলন তার কতটাই বা জানি আমরা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের দিনটি ছাড়াও এই আন্দোলনের বীজ বপিত হয়েছে আরও আগে। সংগ্রাম চলেছে নানাভাবে। তার অনেকটা কারও কারও জানা থাকলেও আমজনতার কাছে তা পৌঁছায়নি। কারণ সেগুলো সেভাবে সংরক্ষিত হয়নি। ফলে ইতিহাসের এই অধ্যায়ের অনেক কিছুই নতুন প্রজন্মের কাছেও অজানা। আরও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, দীর্ঘদিনেও ভাষাসৈনিকদের তালিকা হয়নি। সরকারিভাবে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণেরও উদ্যোগ নেই। ভাষা সংগ্রামীরা বারবার এ ব্যাপারে কথা বললেও তেমন কোনো উদ্যোগ আজও চোখে পড়ে না। অথচ তাদের কাছ থেকে জেনে নেয়া কথাগুলোই এখন ইতিহাসের দলিল। এর অধিকাংশই ঘুরছে মুখে মুখে। অনেক ভাষাসৈনিক আজ প্রয়াত। তাদের সঙ্গে হারিয়ে গেছে ভাষা আন্দোলনের অনেক অজানা অধ্যায়ও। যারা এখনও বেঁচে আছেন তাদের সবাই বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ভাষা সংগ্রামের অজানা কথামালা জানতেই যুগান্তর মুখোমুখি হয়েছিল ক’জন ভাষা সংগ্রামীর। তারা আমাদের জানিয়েছেন ভাষা আন্দোলনের পূর্বাপর নানা অজানা ঘটনা। যা তুলে ধরা হল যুগান্তরের পাঠকদের জন্য...

  আলমগীর হোসেন, যুগান্তর রিপোর্ট ও হক ফারুক আহমেদ ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আজও সর্বক্ষেত্রে বাংলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি

গোলাম আরিফ টিপু

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন পৃথিবীর সব আন্দোলনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সেদিন মিছিলে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান সালাম, রফিক, বরকত, শফিউরসহ নাম না জানা অনেকে। এরপর বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়ই ১৯৭১ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর এক ঘোষণায় ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

ভাষাসৈনিক হিসেবে দেশের অনেকেরই অবদান রয়েছে। এদের মধ্যে অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু অন্যতম। তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক, প্রথিতযশা আইনজীবী ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ১৯৩১ সালের ২৮ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কমলাকান্তপুরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম।

১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সময় গোলাম আরিফ টিপু ছিলেন তুখোড় ছাত্রনেতা। রাষ্ট্রভাষা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, রাজশাহীর তিনি যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বেই মূলত রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫ সদস্যবিশিষ্ট স্টিয়ারিং কমিটির অন্যতম সদস্যও ছিলেন তিনি। ভাষাসৈনিক গোলাম আরিফ টিপুর সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়কালসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। একান্ত সাক্ষাৎকারে যুগান্তরের কাছে ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি তুলে ধরেন তিনি।

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে গোলাম আরিফ টিপু বলেন, আমাদের রাষ্ট্রভাষা কী হবে ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু হয় আলোচনা। বস্তুত পাকিস্তানের জন্ম হয় বেলুচ, চীন, পাঞ্জাব, পেশোয়ার আর আমাদের ইস্ট পাকিস্তান নিয়ে। তখন এখানকার সর্বেসর্বা ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। কেউ উর্দুর পক্ষে আর কেউ বাংলার। তখন এখানকার বুদ্ধিজীবী ড. শহীদুল্লাহসহ বেশ কয়েকজন, যারা শুরুতেই বললেন যে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার নিরিখে বাংলা ভাষা অন্যতম হওয়া উচিত। তারপর ১৯৪৮ সালে আন্দোলন একটু দানা বাঁধতে থাকল।

তিনি বলেন, ১৯৫২ সালে আমি ডিগ্রি (বিএ) পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম, তখন ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম হল। আমাকে করা হল সাধারণ সম্পাদক আর সভাপতি করা হল আবদুল মতিনকে। তখন আমাদের বন্ধু গাজীউল হক, তাজউদ্দীনসহ অন্যরা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবি তুললাম। এরই মধ্যে জিন্নাহ সাহেব এলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে উনি বললেন, ‘টৎফঁ ধহফ টৎফঁ ংযধষষ নব ংঃধঃব ষধহমঁধমব ড়ভ চধশরংঃধহ’ তখন আবদুল মতিন সঙ্গে সঙ্গে নো নো বলে প্রতিবাদ জানান। সঙ্গে সঙ্গে অন্য ছাত্ররা নো নো বলে চিৎকার করে ওঠে এবং দাঁড়িয়ে স্লোগান শুরু করে। পরিস্থিতি খারাপ দেখে জিন্নাহ সাহেব তাড়াতাড়ি বক্তৃতা শেষ করে সিকিউরিটি নিয়ে দ্রুত চলে যান। এভাবে ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত যেটা হল, এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু জড়িয়ে পড়লেন। আর এটার ভেতর দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন আমাদের মধ্যে বিরাজ করতে লাগল।

একুশে ফেব্রুয়ারির কাছাকাছি সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন ছিল- এমন প্রশ্নের জবাবে টিপু বলেন, তখন আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি এই তিনটা মূল সংগঠন ছিল। এর বাইরে দু-একটা ইসলামী নামে সংগঠন ছিল। তারা এই আন্দোলনের ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি ঘটাল। ২১ ফেব্রুয়ারির দিন আমি সেখানে ছিলাম না। এখানে গাজীউল হক, আবদুল মতিন, ওলি আহাদ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন জেলে। সাধারণ মানুষসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষ ওই রাজপথে ছিলেন। মতিন সাহেব বললেন, আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করব। সবাইকে নিয়ে মিছিল বের করলেন। পুলিশ বাধা দিল। টার্গেট ছিল একটাই- বাংলা ভাষা ও স্বাধীনতা। মেডিকেল কলেজ ও সেক্রেটারিয়েটে গুলি হল- প্রাণ দিলেন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ অনেকে।

দেশের প্রথম শহীদ মিনার রাজশাহীতে হয়েছিল বলে জানান ভাষাসৈনিক গোলাম আরিফ টিপু। তিনি বলেন, জানতে পারলাম, ঢাকার রাস্তায় গোলাগুলি হয়েছে। সেখানে বেশ কিছু ছাত্র মারা গেছেন। এই খবর পাওয়ার পর আমরা রাজশাহী কলেজ হোস্টেলের ডি ব্লকে যাই। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়া হল, নিহতদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ করতে হবে। তখন শহীদ মিনারের চিন্তা কারও মনে আসেনি। সে সময় কলেজের ভেতর ভবন নির্মাণের কাজ চলছিল। সেখানে বেশ কিছু ইট পড়েছিল। রাতেই ওই ইট ও কাদা দিয়ে এফ ব্লকের সামনে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়, যা ছিল দেশের প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ। তিনি বলেন, রাতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে সবাই চলে যাই। কিন্তু সকালে পুলিশ সেটি গুঁড়িয়ে দিয়ে আমাকে ধরে নিয়ে গেল।

সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে গোলাম আরিফ টিপু বলেন, সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা আদৌ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, এটা হওয়া দরকার। সাক্ষীর জবানবন্দি হচ্ছে বাংলায় আর রায় হচ্ছে ইংরেজিতে, এটা কোনোভাবেই হওয়া উচিত নয়।

ভাষা আন্দোলনের ভিত্তিতেই বাংলাদেশের উৎপত্তি

অধ্যাপক ফুলে হুসেন

ভাষাসৈনিক অধ্যাপক ফুলে হুসেন বলেছেন, ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি করেই বাংলাদেশের উৎপত্তি। আমাদের জাতীয়তাবোধের সব কিছুই আমরা শিখেছি ভাষা আন্দোলন থেকে। আমরা বাঙালি, বাংলা ভাষায় কথা বলি, আমাদের দেশ বাংলাদেশ- এসব বোধ এ আন্দোলন থেকেই পাওয়া। ভাষা আন্দোলন থেকেই উৎসারিত হয়েছে সব মন্ত্র।’ যুগান্তরের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আজ অবধি সরকারিভাবে ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামীদের নামের তালিকা তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, ‘এত বড় একটি আন্দোলনের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের নামের কোনো তালিকা নেই এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই, আর দেরি না করে অচিরেই তালিকাটি করুন। অন্তত যে ক’জন ভাষা সংগ্রামী বেঁচে আছেন তারা যেন তালিকাটি দেখে যেতে পারেন। আমার ৮৭ বছর বয়স, আর কদিন বাঁচব। সেই সঙ্গে আমি আরেকটি দাবি জানাব। বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভাষা আন্দোলনের জন্যই। সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের ফেলো বা একুশে পদকপ্রাপ্তদের বসার জন্য আলাদা জায়গা চিহ্নিত করা থাকে। কিন্তু ভাষা সংগ্রামীদের জন্য তেমনটা করা হয় না। আমি বলব একইভাবে যেন ভাষাসৈনিকদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হয়।’

১৯৪৮ সালে ফুলে হুসেন নেত্রকোনা সদরের দত্ত হাই স্কুলের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। তখন থেকেই তিনি ভাষা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে আইএসসি পড়তে কিশোরগঞ্জ সদরে চলে যান। তখন আন্দোলনের সঙ্গে আরও ওতপ্রোতভাবে জড়িত হন। গুরুদয়াল কলেজে আইএসসির প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালে তিনি কিশোরগঞ্জ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের মহকুমা শাখার দফতর সম্পাদক ছিলেন।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ফুলে হুসেন বলেন, ‘১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ভাষা সংগ্রামের ডাক আমজনতার কাছে পোঁছায়নি। কিন্তু ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন এবং তার পরবর্তীতে এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সারা দেশে তা গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ আন্দোলন স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সে অবস্থায় কিশোরগঞ্জে আমরা কলেজের ছাত্ররা ২১ ফেব্রুয়ারির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম। এদিন আমরা সেখানে ধর্মঘট করি। দোকানপাট সব বন্ধ থাকে। আমরা মিছিল করে শহর প্রদক্ষিণ করি। পরে জনসভায় মিলিত হই। কিশোরগঞ্জে ২১ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘট সফল হয়। সে সময় সেখানে ভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্যরা। কিন্তু আমরা ঢাকার আন্দোলনে লাঠিচার্জ এবং গুলি হওয়ার খবর পেয়েছি অনেক রাতে। সবার কাছে সবকিছু পরিষ্কার হল মূলত ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে। ছাত্র-জনতা সবাই সেদিন সকালেই ইসলামিয়া বোর্ডিংয়ের মাঠে জমায়েত হয়। আলোচনায় আমরা বললাম, এই আন্দোলন তো এখানে থামবে না। এটা কীভাবে সারা মহকুমায় প্রচার করা যায় সেই পরিকল্পনা করতে হবে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক একজনের ওপর কয়েকটি থানার দায়িত্ব পড়ল। আমার ওপর দায়িত্ব পড়ে করিমগঞ্জ, নিকলি, বাকুন্দিয়া এবং হোসেনপুর থানার। সেখানে যাওয়া, ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে মিছিল করা এই ধরনের আয়োজন চলতে থাকে।’

তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে সর্বস্তরে বাংলা প্রয়োগের একটা জোয়ার আসে। সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে সবকিছুই বাংলায় লেখা শুরু হল। কিন্তু আস্তে আস্তে কীভাবে যেন সব পরিবর্তন হতে লাগল। আমি একবার ভিয়েতনাম গিয়েছিলাম। সেখানে একটি সাইনবোর্ডও দেখলাম না ইংরেজিতে। সবকিছু ভিয়েতনামি ভাষায়। তাহলে আমাদের সবকিছু বাংলার হলে সমস্যাটা কোথায়? মনে রাখতে হবে, আগে জাতীয় ভাষাটা শিখতে হবে। বাংলা লিখতে-পড়তে জানতে হবে, তারপর প্রয়োজন হলে অন্য ভাষা।

ইচ্ছে থাকলেও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণ সম্ভব নয়

আহমদ রফিক

ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক বলেছেন, ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণে অবহেলা হয়েছে। সেটা সব আমলেই। মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র ১৬ খণ্ডে প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে ভাষা আন্দোলনের দলিলপত্র সংরক্ষণ, সংকলন বা ইতিহাস ধরে রাখার জন্য কিছুই হয়নি। এমনকি বর্তমানে ইচ্ছে থাকলেও আর সেটা করা সম্ভব নয়। কারণ আমাদের বন্ধুবান্ধব যারা সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, আন্দোলন সংগঠিত করেছেন বা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই আজ প্রয়াত। আমার মতো দুই-চারজন বেঁচে আছেন। পরিতাপের বিষয়- এই উদাসীনতা, অবাহেলা আমাদের রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে যায় না।’

যুগান্তরের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ভাষা আন্দোলন নিয়ে নানা আলাপচারিতায় আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বলেন আহমদ রফিক।

ভাষা আন্দোলনের বিশাল প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালিয়ানার জোয়ার কিন্তু ’৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারির পরই এসেছে। একুশের চেতনার প্রসারিত প্রভাব থেকেই ৬ দফা, ছাত্রদের ১১ দফা, মওলানা ভাসানীর ১৪ দফা। এগুলোর সম্মিলিত ফলই হল ’৬৯-র গণজাগরণ। ’৭১-র মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তাই আমি সব সময় বলি ’৫২-র ভাষা আন্দোলন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার।’

ভাষা আন্দোলনের অলিখিত, আজানা অনেক কিছু স্মৃতিচারণ করেন আহমদ রফিক। স্মৃতিচারণের শুরুতেই তিনি বলেন, ‘১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা নিয়ে যে আন্দোলন, সে দিনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর এক বছর পর ১৯৪৯ সালে ১১ মার্চে দিবসটির বছর পূর্তিতে তখনকার তমুদ্দুন মজলিস বা ছাত্রলীগ কেউ এগিয়ে আসেনি। অনেকে মনে করেন, এটা জিন্নাহ সাহেবের বক্তৃতার প্রভাব। কিন্তু ১৯৪৯ সালের ১১ মার্চ রমনার রাজপথে ছাত্র ফেডারেশনের কিছুসংখ্যক নেতা-নেত্রী দিবসটি পালনের জন্য রাজপথে নামে। তারা মিছিল করে, স্লোগান দেয়। সেই মিছিলে নেতৃত্বস্থানীয়দের মধ্যে ছিলেন নাদেরা বেগম, তকিউল্লাহ, আফজাল হোসেন, নাসির আহমেদসহ বেশ কয়েকজন। ছিলেন আমার সহপাঠী আবদুস সালাম। ৩০-৩৫ জনের এই ছোট্ট মিছিলটিকেও প্রশাসন সহ্য করেনি। লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং নেতৃত্বস্থানীয় কয়েকজনকে গ্রেফতার করে।’

আরেকটি স্মৃতিচারণ করে আহমদ রফিক বলেন, ‘১৯৫০ সালের কথা। এ ঘটানাও খুব একটা লিখিত নয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ‘মূলনীতি কমিটি’ নামের একটি কমিটি এক খসড়া রিপোর্ট তৈরি করে। সেখানে বলা হয়, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং শুধুমাত্র উর্দু’। এর প্রতিবাদে ঢাকার ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমে আসে। আমার মনে পড়ে, আতাউর রহমান মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন। আমি নিজেও সেই মিছিলে ছিলাম। নবাবপুর দিয়ে ইসলামপুর রোড হয়ে যায় এ মিছিল। মিছিল শেষে প্রতিবাদ সভা হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত ‘মূলনীতি কমিটি’র সেই রিপোর্ট স্থগিত হয়ে যায়। এভাবে ১৯৪৯, ১৯৫০, ১৯৫১ সালে ১৯৫২-র আন্দোলনের প্রস্তুতি-পর্ব তৈরি হয়েছিল।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রে“য়ারি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আহমদ রফিক বলেন, ‘সরকার এতটা নির্মম এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলনকারীদের মধ্যে যারা লাঠিপেটায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেও খুব তাড়াতাড়ি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই রাতারাতি বন্ড সই করে হাসপাতল থেকে বাড়ি চলে যায়। পরে ‘আজাদ’ পত্রিকায় একটি রিপোর্ট হল- ‘বাড়িতে গিয়েও তাদের কেউ কেউ রক্ষা পায়নি’। বাড়ি থেকেও তাদের গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনাবলিকে আমি বলি একুশের প্রতিবাদী আন্দোলনের ডালপালা।’

তিনি আরও বলেন, একুশের আন্দোলন সারা দেশে বিস্তৃতি পেয়েছিল দুটি কারণে। ঢাকায় মূলত ১৪৪ ধারা ভাঙার জন্য। কিন্তু যে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল, সমাবেশে গুলি চালানো ও শহীদ হওয়ার ঘটনা সারা দেশে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। সেই সময়ের আঞ্চলিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এ ঘটনা জেলা শহর মহকুমার শহর হয়ে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। সমাজের প্রতিটি স্তরে অর্থাৎ শ্রমিক-কৃষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাইকে নাড়া দেয়।

আহমদ রফিক বলেন, ভাষা আন্দোলন দেশের রাজনীতি এবং শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে একটি বাঁকফেরা পরিবর্তন ঘটায়। রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রবল বিকাশ ঘটায়। বাঙালিয়ানার একটা অদ্ভুত জাগরণ চারিদিকে লক্ষ করা যায়। বাংলায় নিজের নাম লেখা শুরু হয়। আবাসন আর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামও বাংলায় লেখা শুরু হয়। এমনকি কেউ কেউ গাড়ির নম্বর বাংলায় লেখায় শাস্তিও পেয়েছিলেন। আর ’৫১ সাল পর্যন্ত আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে পাকিস্তান-বন্দনা ছিল। বিশেষ করে কবিতায় পাকিস্তান ও কায়েদি আজম-বন্দনার অন্ত ছিল না। এটার একটা আশ্চর্য ধরনের পরিবর্তন ঘটল ১৯৫২ সালের আগস্টে। সে সময় কুমিল্লা শহরে সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্মেলন হল। আমরা সহপাঠীরা সেখানে গিয়েছিলাম। আয়োজনটির চেহারা ছিল গণতান্ত্রিক, জাতীয়তাবাদী এবং মূলত প্রগতিশীল। তার প্রমাণ সেখানে শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলসঙ্গীতের বিখ্যাত গানগুলো গীত হয়েছে তা নয়, মার্কসবাদী নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ ও ‘জবানবন্দী’ নাটকও মঞ্চস্থ হয়েছিল।’

ভাষা আন্দোলন নিয়ে সাহিত্যকর্মের কথা বলতে গিয়ে আহমদ রফিক বলেন, ‘আমার একটা আক্ষেপ, ভাষা আন্দোলন নিয়ে অনেক কবিতা লেখা হয়েছে, কিন্তু একটি মহৎ উপন্যাস তৈরি হয়নি। এটি বিস্ময়কর।’

সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনের প্রসঙ্গ টানতেই এ ভাষা সংগ্রামী বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম একটি অসাধারণ সংবিধান রচিত হয়। সেখানে বলা হল, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা ‘বাংলা’। যার মানে- জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহৃত হবে। স্লোগানটি আমরা তৃতীয় স্লোগান হিসেবে ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি মিছিলে দিয়েছি। প্রথম স্লোগান- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। দ্বিতীয় স্লোগান- ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ আর তৃতীয় হল- ‘সর্বস্তরে বাংলা চাই’। এ বাস্তবায়ন কিন্তু আজও হয়নি। উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞানশিক্ষা, উচ্চ আদালতে কোথাও না। এদেশে এখনও সেই ঔপনিবেশিক রাজ ভাষা এবং রাজ সংস্কৃতি বহাল তবিয়তে আছে। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষায়তনটিও আজ বিশাল- কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণও নেই। দুই-এক জায়গা ছাড়া কোথাও বাংলা পঠন-পাঠনও হয় না। তাহলে এটা একুশের চেতনার বাংলাদেশ হল কীভাবে? এ বিষয়গুলো শাসক কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না। কারণ তারা মনে করেন না যে, বাংলা মাধ্যমে শিক্ষার সমাপন হোক। কারণটা হল, ঔপনিবেশিক দাস মানসিকতা থেকে আমাদের মুক্তি আজও হয়নি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×