৬ গ্রেডে মজুরি বাড়ল পোশাক শ্রমিকদের

বেড়েছে ১৫ থেকে ৭৮৬ টাকা * দু-একদিনের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি * কাজে যোগ দেয়ার আহ্বান শ্রমিক নেতাদের * কাজে যোগ না দিলে কারখানা বন্ধের হুশিয়ারি বিজিএমইএর * আশুলিয়ায় ৫০ কারখানা বন্ধ

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

৬ গ্রেডে মজুরি বাড়ল পোশাক শ্রমিকদের
ছবি: যুগান্তর

তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের মজুরি কাঠামোর সমন্বয় করা হয়েছে। ছয় গ্রেডে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো হয়েছে। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি আমলে নিয়ে সরকার রোববার সংশোধিত মজুরি কাঠামো ঘোষণা করেছে। এতে ১নং থেকে ৬নং পর্যন্ত গ্রেডগুলোয় বেতন যৌক্তিকভাবে সমন্বয় করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বিভিন্ন গ্রেডের বেতন কাঠামোর বৈষম্য দূর করা হয়েছে। ১৫ টাকা থেকে শুরু করে ৭৮৬ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রেডে বেতন বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া সপ্তম গ্রেডে ৮ হাজার টাকা মজুরি কাঠামো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

সংশোধিত বেতন কাঠামো অনুসারে ১নং গ্রেডে ১৮ হাজার ২৫৭ টাকা মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে মজুরি ছিল ১৭ হাজার ৫১০ টাকা। বেড়েছে ৭৪৭ টাকা মজুরি। ২নং গ্রেডের মজুরি ১৫ হাজার ৪১৬ টাকা ধরা হয়েছে। আগে ছিল ১৪ হাজার ৬৩০ টাকা। বেড়েছে ৭৮৬ টাকা। ৩নং গ্রেডে ২৫৫ টাকা বেড়ে ৯ হাজার ৮৪৫ টাকা, ৪নং গ্রেডে ১০২ টাকা বেড়ে ৯ হাজার ৩৪৭ টাকা, ৫নং গ্রেডে ২০ টাকা বেড়ে ৮ হাজার ৮৭৫ টাকা এবং ৬নং গ্রেডে ১৫ টাকা বেড়ে ৮ হাজার ৪০৫ টাকা মজুরি হয়েছে।

এদিকে মজুরি কাঠামোর সন্তোষজনক সমন্বয়ের দিনেও সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে শ্রম অসন্তোষের মুখে অর্ধশত পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মজুরি ইস্যুতে সপ্তাহব্যাপী চলা শ্রম অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে রোববার দিনভর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

বেতন কাঠামোর সংশোধন পর্যালোচনায় গঠিত মালিক, শ্রমিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় কমিটির বৈঠক শেষে সচিবালয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান এবং বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী সংশোধিত নতুন মজুরি কাঠামোর ঘোষণা দেন।

মজুরি কাঠামোর অসঙ্গতি দূর হওয়ায় খুশি হয়েছেন শ্রমিক নেতারা। তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এ সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়েছে। এখন যে মজুরি কাঠামো ঘোষণা হল সেটি আমরা শুধু মেনেই নিচ্ছি না, আমরা স্বাগতও জানাই। পাশাপাশি সব শ্রমিককে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

মালিক পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- গত কয়েকদিনে আন্দোলনের নামে যারা পোশাক কারখানা ভাংচুর করেছে তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সম্পদ রক্ষায় সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। সরকার যেন কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের অবিলম্বে কাজে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে মালিক পক্ষ। পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলেছে, সোমবার থেকে যেসব কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দেবে না, সেসব কারখানা শ্রম আইন অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হবে। একইভাবে কোনো শ্রমিক কাজে না ফিরলে তার মজুরি বন্ধ করে দেয়া হবে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে শ্রম সচিব আফরোজা খানের নেতৃত্বে পোশাক কারখানা মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান জানান, নতুন মজুরি কাঠামো অনুমোদন করার পর তাতে শ্রমিক নেতারা স্বাক্ষর করেছেন।

আর বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানান, দু-একদিনের মধ্যে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। তিনি বলেন, পোশাক শ্রমিকরা জানুয়ারির বেতন নতুন মজুরি কাঠামো অনুসারে পাবেন। নতুন মজুরি কাঠামো অনুসারে ডিসেম্বরে যে পরিমাণ টাকা কম পেয়েছেন, তা জানুয়ারির বেতনের সঙ্গে দেয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, যারা ভাংচুর করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এ বিষয়ে একটা ফয়সালায় আসা উচিত। এ ক’দিনে যে ক্ষতি হয়েছে, তারা (পোশাক শ্রমিক) সবাই উদ্যোগী হয়ে কাজ করে যেন তা পুষিয়ে দেন। তিনি বলেন, সরকারি নিয়ম অনুসারে নিহত শ্রমিকের পরিবার যে ক্ষতিপূরণ পাবেন তার সঙ্গে আমি আরও ১ লাখ টাকা দেব।

বৈঠকে শ্রম সচিব আফরোজা খান, বাণিজ্য সচিব মফিজুল ইসলাম, এফবিসিসিআই’র সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, সাবেক সভাপতি একে আজাদ, বিজিএমই’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী এমপি, মো. আতিকুল ইসলাম এবং শ্রমিকদের পক্ষে নাজমা আকতার, ফজলুল হক মন্টু, আমিরুল হক আমিন, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি মন্টু ঘোষ, বাংলাদেশ বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি সালাউদ্দিন স্বপন, গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারী লীগের সভাপতি লিমা ফেরদাউস, মজুরি বোর্ডের সাবেক সদস্য সিরাজুল ইসলাম রনি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের পক্ষে এফসিসিআই সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, গত কয়েকদিনে আন্দোলনের নামে যারা পোশাক কারখানা ভাংচুর করেছে তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সম্পদ রক্ষায় সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। সরকার যেন কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেয়। এ সময় তিনি পোশাক শ্রমিকদের অবিলম্বে কাজে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান।

শ্রমিকদের পক্ষে ব্রিফিংয়ে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলেন, সোমবার থেকে শ্রমিকরা কাজে যোগ দেবেন। মজুরি কাঠামো নিয়ে যে অসামঞ্জস্যতা ছিল, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তা সমাধান হয়েছে। নতুন যে মজুরি ঘোষণা হল, শুধু মেনে নেয়া নয়, আমরা স্বাগত জানাই। ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে আমরা আন্দোলন করব। তবে সেই আন্দোলন ধ্বংসাত্মক করা যাবে না। আন্দোলনের নামে রাস্তা অবরোধ নয়, কারখানা ভাংচুর নয়। মালিককে অবরুদ্ধ করা নয়। এ ক’দিনের আন্দোলনের নামে যারা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করেছেন তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবেন। তবে নিরপরাধ শ্রমিক যেন এর শিকার না হয়।

কারখানা বন্ধের হুশিয়ারি বিজিএমইএ’র : সোমবার থেকে শ্রমিকরা কাজে না ফিরলে শ্রম আইন অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধের হুশিয়ারি দিয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন (বিজিএমইএ)। রোববার এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকদের এ বার্তা দেয়া হয়। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিজিএমইএ ভবনে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী, বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলামসহ বিজিএমইএ’র পরিচালকরা উপস্থিত ছি?লেন।

বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আপনারা কর্মস্থলে ফিরে যান, উৎপাদন কাজে অংশগ্রহণ করুন। একই সঙ্গে তিনি হুশিয়ারিও দেন। তিনি বলেন, সোমবার থেকে কোনো কারখানায় শ্রমিক কাজে যোগ না দিলে শ্রম আইনের ১৩/১ ধারা অনুযায়ী ওই কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হবে। আর যেসব শ্রমিক কারখানায় কাজে যোগ দেবে না, তাদের কোনো মজুরিও দেয়া হবে না। কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি বলেন, শ্রমিকরা কাজ করলে তো কারখানা বন্ধের প্রয়োজন নেই। ত্রিপক্ষীয় কমিটির রোববারের সিদ্ধান্ত শ্রমিকরা মেনে না নিলে সোমবার থেকে কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে।

মজুরি কাঠামো নিয়ে আন্দোলন অযৌক্তিক এমন মন্তব্য করে বিজিএমইএ সভাপতি আরও বলেন, এ বিষয়ে সরকার গঠিত ত্রিপক্ষীয় কমিটি কাজ করছে। শ্রমিক?দের সরলতার সুযোগ নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল শিল্পে শ্রমিকদের ব্যবহার করে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। এটা মোটেও কাম্য নয়। এ খাতটি ধ্বংস হলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শ্রমিকরা। কর্মহীন হবে তারা।

এক প্রশ্নের জবাবে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন দেয়া হচ্ছে। কিছু ব্যত্যয় হলে তা প?রি?শোধ করা হবে। শ্রমিক ধর্মঘটে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একেকজনের ক্ষতি একেক রকম। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে ইমেজের। টাকার ক্ষতি কোনো না কোনোভাবে পুষিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়, সেটাই বড় ক্ষতি। একবার ভাবমূর্তির ক্ষতি হলে সেটা পুষিয়ে নিতে দুই থেকে তিন বছর সময় লেগে যায়।

আশুলিয়ায় অর্ধশত কারখানা বন্ধ : আশুলিয়া (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে সপ্তম দিনের মতো শ্রমিক অসন্তোষ চলে। আশুলিয়ায় থেমে থেমে সড়ক অবরোধের চেষ্টাকালে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সকালে আশুলিয়ার আবদুল্লাহপুর ইপিজেড সড়কের জামগড়া এলাকায় সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়।

শ্রমিকরা জানান, সকালে হামী’ম গ্রুপের হামীম ও ঘোষবাগ এলাকার বান্দু ডিজাইনের শ্রমিকরা কাজে যোগ দেয়ার উদ্দেশে কারখানায় যায়। তবে পথে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা তাদের পথে পথে বাধা দেয়। বাধা উপেক্ষা করে যারা কারখানায় গেছে তারাও আন্দোলনরত শ্রমিকদের ভয়ে কাজ থেকে বিরত ছিল। ফলে কারখানা দুটি ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের আশুলিয়ার ইউনিক, জামগড়া, বেরন ও নরসিংহপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত শিল্প-কারখানাগুলোয় শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে।

একপর্যায়ে শ্রমিকরা টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়ক অবরোধ করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। সাভারের এইচআর কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে বিক্ষোভের চেষ্টা করলে পুলিশের বাধায় বিক্ষোভ পণ্ড হয়ে যায়।

শিল্পপুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার সানা শামিনুর রহমান জানান, বিশৃঙ্খলা এড়াতে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×