লক্ষ্য নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন: তৈরি হচ্ছে কর্মপরিকল্পনা

দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ায় মনোযোগ * প্রতি মন্ত্রণালয়ে ব্যস্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা

  উবায়দুল্লাহ বাদল ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচনী ইশতেহার
নির্বাচনী ইশতেহার। ফাইল ছবি: যুগান্তর

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে কর্মপরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে প্রশাসনে। দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়তে এ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এ কর্মপরিকল্পনার আলোকেই আগামী ৫ বছর চলবে জনপ্রশাসন। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্তাব্যক্তিদের এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইশতেহারের নকল সংগ্রহ করেছেন। তারা নিজ নিজ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো খুঁজে বের করে তা কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য।

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ। ৭ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৭ জানুয়ারি তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অফিস করেন।

সেখানে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ক্ষুধা এবং দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যা প্রয়োজন সেটা তো আমরাই মেটাচ্ছি। তাহলে দুর্নীতি কেন হবে? কেউ দুর্নীতি করলে সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’

অতীতে নির্বাচনী ইশতেহার ধরে কেউ কর্মপরিকল্পনা করেছে বলে জানা নেই- মন্তব্য করেছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রশাসনবিষয়ক কলামিস্ট আলী ইমাম মজুমদার। রোববার তিনি যুগান্তরকে বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের কথা না বললেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান সব সময়ই ছিল। দুর্নীতি কেউ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আইন ছিল, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছিল, উদ্যোগও ছিল। এবার এটাকে জোর দেয়া হচ্ছে ইশতেহারে আসছে বলে। এটা ভালো একটি উদ্যোগ। আমি মনে করি, এটি বাস্তবায়ন হলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান আরও জোরদার হবে। পাশাপাশি প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। তবে এ কর্মপরিকল্পনা কাগজে-কলমে থাকলে দেশ-জাতির কোনো উপকার হবে না।

কর্মপরিকল্পনা প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক পদস্থ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সরকার গঠনের পরই আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রশাসনবিষয়ক প্রতিশ্রুতির আলোকে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করার নির্দেশ দেয়া হয়। প্রয়োজনে ওয়েবসাইট থেকে ইশতেহার ডাউনলোড করে প্রিন্ট করতে বলা হয়। সে অনুযায়ী আমরা কাজ শুরু করি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালেও প্রধানমন্ত্রী ইশতেহারের বিষয়গুলো উল্লেখ করে দুর্নীতিমুক্ত জনবান্ধব প্রশাসন গড়ার জন্য নির্দেশ দেন। প্রশাসনে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন যেন বিধিবিধান অনুযায়ী দক্ষতা, যোগ্যতার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা হয় সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বৃহস্পতিবার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রশাসনে শুধু বয়সের ভিত্তিতে পদোন্নতি না দিয়ে দক্ষতার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। কে কত বেশি কাজ করবে, সততার সঙ্গে কাজ করবে সেগুলো সব বিবেচনা করে কিন্তু পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে। পদ ফাঁকা পেলেই পদায়ন না করে যার যে বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ রয়েছে তাকে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পদায়ন করতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, সর্বক্ষেত্রে ডিজিটাল সুবিধার বিস্তৃতি ঘটানো গেলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। আমরা সেটাও করব।

দক্ষ, সেবামুখী ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়া প্রসঙ্গে ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মবৃত্তে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতির মাপকাঠি শুধু জ্যেষ্ঠতা নয়; যোগ্যতা হবে। একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ দুর্নীতিমুক্ত দেশপ্রেমিক গণমুখী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ অব্যাহত থাকবে। নিশ্চিত করা হবে প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ন্যায়পরায়ণতা এবং সেবাপরায়ণতা। প্রশাসনের দায়িত্ব হবে নির্ধারিত নীতিমালা ও নির্বাহী নির্দেশাবলি বাস্তবায়ন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সব ধরনের হয়রানির অবসান ঘটানো হবে। বিশেষভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নানা স্তর কঠোরভাবে সংকুচিত করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে কর্মপরিবেশ ও দক্ষতার দিক থেকে যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করা হবে। সেক্ষেত্রে দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এবং প্রায়োগিক ব্যবহারে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক যুগ্মসচিব নিজ দফতরে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা আমাদের মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট ইশতেহারের বিষয়গুলো দেখে সে অনুযায়ী দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গড়তে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছি। পাশাপাশি জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির বিষয়টিও কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

এ সময় তার হাতে থাকা আওয়ামী লীগের ইশতেহারের ফটোকপির স্পাইরাল বাইন্ডিং করা একটি কপির সবুজ কালিতে দাগানো বেশ কিছু ধারা যুগান্তরকে দেখান। তিনি বলেন, ইশতেহারে সন্ত্রাস-সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ ও মাদক নির্মূল; জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা গড়ার কথা বলা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তার কথার প্রতিফলন দেখা গেল রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এদিন শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া এই মন্ত্রণালয়ে যারা সংশ্লিষ্ট রয়েছেন তাদের দায়িত্ব। আমরা দক্ষিণ এশিয়ার একটি শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গড়তে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। দুর্নীতি কালো ব্যাধির মতো সমাজে ছেয়ে আছে। পাশাপাশি মাদক ও সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও টিআইবির ট্রাস্টি এম হাফিজ উদ্দিন খান যুগান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহার ধরে প্রশাসনে কর্মপরিকল্পনা তৈরি হলে সেটি একটি ভালো উদ্যোগ। তবে তার বাস্তবায়ন করাটাই আসল কাজ। সরকার আন্তরিকভাবে চাইলে দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়া খুব কঠিন কাজ নয়। আমরা আশা করব সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।’

‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ স্লোগানে এবারের ইশতেহারে ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ, ২০৩০ সালে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে উন্নয়ন জংশনে মিলিত হওয়া, ২০৪১ সালে সোনার বাংলা, ২০৭১ সালে স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তিতে সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো ও ২১০০ সালে নিরাপদ ব-দ্বীপ পরিকল্পনাকে লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে।

এছাড়া ২১টি অঙ্গীকার করা হয়েছে। এগুলো হল- ১. আমার গ্রাম, আমার শহর- প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ; ২. তারুণ্যের শক্তি- বাংলাদেশের সমৃদ্ধি : তরুণ যুব সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা; ৩. দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ; ৪. নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ সমতা ও শিশু কল্যাণ; ৫. পুষ্টিসম্মত ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা; ৬. সন্ত্রাস-সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ ও মাদক নির্মূল; ৭. মেগা প্রজেক্টগুলোর দ্রুত ও মানসম্মত বাস্তবায়ন; ৮. গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করা; ৯. দারিদ্র্য নির্মূল; ১০. সব স্তরে শিক্ষার মান বৃদ্ধি; ১১. সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা; ১২. সার্বিক উন্নয়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার; ১৩. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা; ১৪. আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা- লক্ষ্য যান্ত্রিকীকরণ; ১৫. দক্ষ ও সেবামুখী জনপ্রশাসন; ১৬. জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা; ১৭ ব্লু-ইকোনমি- সমুদ্রসম্পদ উন্নয়ন; ১৮. নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা; ১৯. প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও অটিজম কল্যাণ; ২০. টেকসই উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এবং ২১. সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×