হলি আর্টিজান হামলা

অর্থ ও অস্ত্রের জোগানদাতা জঙ্গি কমান্ডার রিপন

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার, পাঁচ দিনের রিমান্ডে * অস্ত্র সংগ্রহ ও পরিকল্পনার কথা স্বীকার * জঙ্গি ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা ছিল

  যুগান্তর রিপোর্ট ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার মামুনুর রশিদ রিপন
র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার মামুনুর রশিদ রিপন। ছবি: সংগৃহীত

হলি আর্টিজান হামলা বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের অর্থ ও অস্ত্রের জোগান দিয়েছেন দুর্ধর্ষ জঙ্গি কমান্ডার মামুনুর রশিদ রিপন। জেএমবির একাংশের আমীর ও কথিত ডা. নজরুল ইসলামের শিষ্য রিপন হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পরিকল্পনার পর ভারতে যান। এ জন্য ভারত থেকে তিনি অর্থ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ করেন।

হলি আর্টিজান মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি রিপন র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে জানান, হামলার জন্য তিনি ৩৯ লাখ টাকার জোগান দিয়েছেন।

শনিবার রাতে গাজীপুরের বোর্ডবাজার থেকে র‌্যাব তাকে গ্রেফতার করে। এদিকে এ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি শরিফুল ইসলাম খালেদ পলাতক রয়েছেন। খালেদ ভারতে পালিয়ে আছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা।

রিপন হলি আর্টিজান মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হলেও এখনও তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়নি। ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল সবুজবাগ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে রোববার আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে র‌্যাব।

রোববার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, শনিবার রাত সোয়া ১১টার দিকে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় একটি বাস থেকে রিপনকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে একটি ডায়েরি, চারটি খসড়া মানচিত্র এবং নগদ এক লাখ ৪৭ হাজার ৭৫৫ টাকা পাওয়া গেছে।

মুফতি মাহমুদ খান বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে রিপন জানিয়েছেন ২০১৪ সালে ত্রিশালের মতো জঙ্গি ছিনতাই পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। ত্রিশালের মতো আরেকটি ঘটনা ঘটিয়ে জঙ্গিদের উজ্জীবিত করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। মূলত হলি আর্টিজান হামলা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিদের ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা ছিল তাদের।

মুফতি মাহমুদ আরও জানান, সারওয়ার জাহান (জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত) জেএমবির আমীর হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন করে অর্থ সংগ্রহ ও দাওয়াতি কাজ শুরু করে রিপন। বিকাশের দোকান লুটের ছয় লাখ টাকা, সিগারেট বিক্রেতার টাকা ছিনতাই করে এক লাখ টাকা, গাইবান্ধার এক ঘটনায় আরও এক লাখ টাকাসহ আট লাখ টাকা জোগাড় করে সারওয়ার জাহানের হাতে তুলে দেন রিপন। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তামিম চৌধুরী (জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত) ও সারওয়ার জাহানের মধ্যকার গোপন সমঝোতা বৈঠকে রিপন উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে তাকে শূরা সদস্য মনোনীত করা হয়। সংগঠনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রিপনের নেতৃত্বে একটি দল ২০১৬ সালের এপ্রিলে অর্থ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহের জন্য ভারতে যান। সেখান থেকে তিনি অস্ত্র সংগ্রহ করে মারজানের মাধ্যমে ঢাকার কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় পাঠান। হলি আর্টিজানে হামলার আগে রিপন ৩৯ লাখ টাকা সংগ্রহ করে সারওয়ার জাহানের হাতে তুলে দেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘদিন রিপন ভারতে পালিয়ে ছিলেন। দেশে ফিরে জেএমবিকে নতুন করে সংগঠিত করার লক্ষ্যে বিশেষ মিশন নিয়ে তিনি মাঠে নামেন। এমনকি হলি আর্টিজান মামলায় গ্রেফতার আসামিদের আদালতে আনা-নেয়ার পথে ছিনতাইয়ের পরিকল্পনাও ছিল তার।

জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা আমীর আবদুর রহমানের মেয়ে জামাতা আউয়ালের ভাগ্নে রিপন। এ কারণে সংগঠনে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এ গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে জেএমবিকে সংগঠিত করার পাশাপাশি নতুন করে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করছিলেন তিনি।

র‌্যাব জানায়, উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জঙ্গি হামলা ও টার্গেট কিলিং রিপনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে হয়েছিল। ওইসব হামলার নেতৃত্বে ছিলেন হলি আর্টিজান মামলায় কারাগারে থাকা জঙ্গি জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী।

র‌্যাব আরও জানায়, রিপনের বাড়ি বগুড়ার নন্দীগ্রামের শেখের মারিয়া গ্রামে। বাংলা মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর তাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়। ঢাকার মিরপুর, বগুড়ার নন্দীগ্রাম ও নওগাঁর বিভিন্ন মাদ্রাসায় তিনি লেখাপড়া করেছেন। সর্বশেষ ২০০৯ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাদ্রাসাতুল দারুল হাদিস থেকে দাওরায়ে হাদিসে পড়াশোনা শেষ করেন তিনি।

পরে তিনি বগুড়ার সাইবার টেক নামে একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে অফিস অ্যাপ্লিকেশন কোর্স করে ওই প্রতিষ্ঠানেই চাকরি নেন। সেখানে চাকরি করার সময় ডা. নজরুলের মাধ্যমে রিপন জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হন। তার সাংগঠনিক নাম রিপন দেয়া হয়। এর আগে তিনি রশিদ নামে পরিচিত ছিলেন। তার প্রাথমিক কাজ ছিল চাঁদা সংগ্রহ করে ডা. নজরুলের কাছে পৌঁছে দেয়া।

উত্তরাঞ্চলের জেএমবির শীর্ষ নেতা ডা. নজরুলের মাধ্যমে রিপনের জঙ্গিবাদে হাতেখড়ি হয়। জঙ্গি কার্যক্রমে রিপনের আগ্রহ দেখে তাকে সংগঠনের অর্থ সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়েছিলেন নজরুল। খুব অল্প সময়ে তিনি নজরুলের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

২০১৩ সালে নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে নজরুল খুন হওয়ার পর জেএমবির নব্যধারার (নব্য জেএমবি) সঙ্গে রিপন যুক্ত হন। সেখানেও তাকে সংগঠনের দাওয়াতি কার্যক্রম ও অর্থ সংগ্রহের বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়। উত্তরাঞ্চলের টার্গেট কিলিং এবং বিভিন্ন জঙ্গি হামলার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বও ছিল তার ওপর। সংগঠনে তিনি রেজাউল করিম ও আবু মুহাজির নামেও পরিচিত।

হলি আর্টিজান মামলায় একজন আসামি পলাতক : হলি আর্টিজান হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী রিপন গ্রেফতার করার পর এখন এ মামলায় একমাত্র পলাতক আসামি শরিফুল ইসলাম খালেদ। গত বছরের ২৬ নভেম্বর এ মামলার আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। ৩ ডিসেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।

এর আগে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) দীর্ঘ তদন্ত শেষে আটজনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দেয়। এ মামলায় ২১ জন জড়িত থাকলেও হলি আর্টিজান হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরীসহ ১৩ জন বিভিন্ন জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয়েছেন।

এর মধ্যে হামলাকারী পাঁচজন ঘটনাস্থলে নিহত হয়। এ কারণে তাদের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন- রাজীব গান্ধী, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাতকাটা সোহেল মাহফুজ, হাদিসুর রহমান সাগর, রাশেদ ইসলাম ওরফে আবু জাররা, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ ওরফে রিপন।

২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানে জঙ্গিরা হামলা চালায়। অস্ত্রের মুখে তারা দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে। ওই রাতে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তা নিহত হন। পরদিন সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন নিহত হয়। ১৮ বিদেশিসহ ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান একজন রেস্তোরাঁ কর্মী।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×