দুর্নীতি রোধে ‘কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট’

পৃথক হচ্ছে প্রত্যেক ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা

এটি বাস্তবায়নের আগে একই পরিবারের ৩ থেকে ৪ জন পরিচালক থাকার বিধান সংশোধন করা উচিত -ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ * শৃঙ্খলা ফেরাতে এই মুহূর্তে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও সদিচ্ছা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা - খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

  মিজান চৌধুরী ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথক হচ্ছে প্রত্যেক ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা
ফাইল ছবি

অদক্ষতা ও দুর্নীতি দূর করতে প্রতিটি ব্যাংকে ‘কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট’ প্রচলনের নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এই ‘ম্যানেজমেন্টে’ ব্যাংকের মালিকানা এবং ব্যবস্থাপনা পৃথক থাকবে।

পাশাপাশি দক্ষতা ও যৌগ্যতা বাড়াতে ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে বলেছেন তিনি। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে এসব নির্দেশনা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এই নির্দেশনার পর কাজ শুরু করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থমন্ত্রীর এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারলে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে ব্যাংকিং খাতে। তবে এর জন্য দরকার হবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, সদিচ্ছা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পৃথক হওয়া উচিত। বাস্তবতা হচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে মালিকের সংখ্যাই বেশি। তারা বোর্ড অব ডিরেক্টর হিসেবে আছে। ব্যাংকের সবকিছু তারাই করছে।

ব্যাংকের পরিচালকরা শুধু পরিচালনা ও নির্দেশনার মধ্যে থাকলে এবং ব্যবস্থাপনার টেকনিক্যাল সাইডে হস্তক্ষেপ না করলে নিশ্চিত উন্নতি হবে। কিন্তু সেটি করবে কিভাবে। ইতিমধ্যে একই পরিবারের তিন থেকে চারজন করে একই ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে আছেন।

এ বিধান সংশোধন না করে অর্থমন্ত্রী তার নির্দেশ কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন- তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাত উন্নতির জন্য সুশাসন নিশ্চিত ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট’ সংক্রান্ত অর্থমন্ত্রীর নির্দেশ নতুন কিছু নয়, পুরনো কথা। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক বহু আগে ব্যাংক পরিচালনা বোর্ড এবং ব্যবস্থাপনাকে পৃথক করে কার কি দায়িত্ব- সেটি নিরূপণ করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে কেউ কাউকে অতিক্রম করতে নিষেধ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু সেগুলো কেউ মানেনি। এখন অর্থমন্ত্রী একই কথা বলেছেন। সেটি যে মানবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তিনি আরও বলেন, আমাদের নিয়ম-কানুন সবই আছে এবং ঠিক আছে। এখন দরকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও সদিচ্ছা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার। এই অর্থনীতিবিদের মতে, যদি কোনো ব্যাংকে পর্ষদের কোনো পরিচালক তার নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে এসে ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করে সেক্ষেত্রে ওপরের লেভেল থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এটি না করলে মুখে মুখে এসব বলে কোনো লাভ হবে না।

অথর্ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকিং খাতের অবস্থা নিয়ে সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী। সেখানে খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। ওই সময় তিনি প্রত্যেক ব্যাংকে ‘কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট’ প্রচলনের নির্দেশ দেন।

‘কর্পোরেট ম্যানেজমেন্টে’র মূল লক্ষ্যই হচ্ছে- ব্যাংকের মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনাকে পৃথক রাখা।

গত বছর ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে যে নতুন বিধান প্রবর্তন করা হয়, সেটি হল- কোনো ব্যাংক কোম্পানির পরিচালক একনাগাড়ে নয় বছরের বেশি থাকতে পারবেন না। তিন বছর বিরতি দিয়ে আবার নয় বছর থাকতে পারবেন। এভাবে তিন বছর বিরতির পর নয় বছর করে কারও আমৃত্যু ব্যাংক পরিচালক থাকতে আইনে কোনো বাধা নেই। এছাড়া একই পরিবার থেকে চারজন পরিচালক করারও বিধান রাখা হয়। এতে ব্যাংকগুলোতে পরিচালকদের ক্ষমতা বেড়ে যায় এবং কায়েম হয় পরিবারতন্ত্র।

এর আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালকরা তিন বছর করে দুই মেয়াদে টানা ছয় বছর পরিচালক থাকতে পারতেন। দুই মেয়াদ শেষে তিন বছর বিরতি দিয়ে আবারও তিন বছরের জন্য পরিচালক হতে পারতেন। আর একই পরিবারের দু’জনের বেশি পরিচালক থাকতে পারতেন না।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সোমবার যুগান্তরকে বলেন, পারিবারিক প্রতিষ্ঠান মনে করে ব্যাংকিং বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার পরও পরিচালকের পদে আসছেন অনেকে। অনেক পরিচালক ছাত্রত্ব শেষ না করেই বসে পড়ছেন। আবার নিজের ব্যাংক থেকে ঋণ দিচ্ছেন অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের।

তিনি বলেন, বিনিময়ে তিনি নিজেও ঋণ নিচ্ছে ঋণ সংশ্লিষ্ট গ্রহীতা পরিচালকের ব্যাংক থেকে। পরিচালকদের যোগসাজশে এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় এসব পরিচালকের নামে-বেনামে নেয়া ঋণই এক সময় খেলাপি হতে থাকে। অদক্ষ লোকজন ব্যাংকের পরিচালক পদে বসে যাওয়ার কারণেই ব্যাংকগুলো ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। এতে দেউলিয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। এই নেতৃত্বের অদক্ষতার কারণেই মূলত ব্যাংকিং খাতে ঋণগ্রহীতা চিহ্নিতকরণ, খেলাপি ঋণ আদায় ও লক্ষ্য নির্ধারণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতা প্রণয়ন সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সূত্র জানায়, ব্যাংকিং খাতে কর্মরত ৬১ শতাংশই মনে করে নীতিবান ভালো নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। এজন্য ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। অনেক পরিচালকই ব্যাংককে তার পারিবারিক ব্যবসা বলে মনে করেন। এমন ধারণা থেকেই ব্যাংকের কোনো কোনো পরিচালক তার সহকর্মীর সঙ্গে মালিকসুলভ আচরণ প্রদর্শন করেন।

বিআইবিএমের নির্বাহী কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেছেন, ব্যাংকের দক্ষ ও কার্যকরী নেতৃত্বের সংকটের কারণে খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট, ঋণ জালিয়াতি, প্রতারণা ও অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। এসব বন্ধ করতে যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন। একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক অলাভজনক ব্যাংককে অল্প সময়ের মধ্যে লাভজনক করতে পারেন। একইভাবে অসৎ নেতৃত্ব যে কোনো লাভজনক ব্যাংককে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারে। সৎ নেতৃত্বের মাধ্যমেই ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও সমৃদ্ধি আসতে পারে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×