আবজালের সম্পত্তি

আদালতের নির্দেশের পর জব্দ প্রক্রিয়া শুরু

সম্পদের হিসাব চেয়ে দুদকের নোটিশ

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেন ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি ক্রোক ও জব্দের প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুদক। মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশের পর এ প্রক্রিয়া শুরু হয়।

একই দিন এ দম্পতির সম্পদের হিসাব চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নোটিশ জারি করেছে। নোটিশ প্রাপ্তির সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাদের সমুদয় সম্পদের হিসাব দাখিল করতে বলা হয়।

দুদকের উপ-পরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. সামসুল আলমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার সিনিয়র মহানগর দায়রা জজ আদালত আবজাল ও তার স্ত্রীর সব সম্পত্তি ক্রোক ও জব্দের নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী তাদের সম্পত্তি দুদকের রক্ষণাবেক্ষণে থাকবে। তারা এসব সম্পদ স্থানান্তর, হস্তান্তর বা বিক্রি করতে পারবেন না। এই নির্দেশের পরপরই তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদকের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান ও উপ-পরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য মঙ্গলবার রাতে টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, আবজাল দম্পতির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও জব্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

দুদকের পক্ষ থেকে আদালতে আবেদন করার পর আদালত যে আদেশ দিয়েছেন, তার কপি ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, সাবরেজিস্ট্রি ও ভূমি অফিস, ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে অবহিত করা হয়েছে।

নিয়মানুযায়ী আদালতের নির্দেশ প্রাপ্তির পর থেকেই এ ধরনের সম্পত্তি জব্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তিনি আরও জানান, আবজালের স্ত্রী রুবিনা খানম স্বাস্থ্য অধিদফতরের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন শাখার সাবেক স্টেনোগ্রাফার।

এখন তিনি রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে ব্যবসা করেন। নোটিশ জারির আগে দুদক আবজাল দম্পতিকে তাদের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, আবজাল হোসেন বেতন পান সাকুল্যে ৩০ হাজার টাকা। অথচ চড়েন হ্যারিয়ার ব্র্যান্ডের গাড়িতে। উত্তরায় তিনি ও তার স্ত্রীর নামে বাড়ি আছে পাঁচটি। আরেকটি বাড়ি আছে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় আছে অন্তত ২৪টি প্লট ও ফ্ল্যাট। দেশে-বিদেশে আছে বাড়ি ছাড়াও মার্কেট। এসব সম্পদের বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া যেসব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তার মধ্যে আছে- উত্তরায় ১৫নং সেক্টরে ৩ কাঠা জমির দুটি প্লট, মিরপুরে ৯ কাঠা জমি, এর মধ্যে আড়াই কাঠার ওপর টিনশেড বাড়ি, খিলক্ষেতে ৩ কাঠা ও ৪ কাঠার দুটি প্লট।

এ ছাড়া ফরিদপুর কোতোয়ালি পৌরসভার রঘুনাথপুরে সাড়ে ১৩ শতাংশ জমি, পৌরসভার হাবেলী মৌজায় ১৫ শতাংশ জমির ওপর বাড়ি, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের খালিশপুরে সাড়ে ৩ কাঠার প্লট ও সাড়ে ৫ কাঠা জমি, ফরিদপুর জেলার টেপাখোলা ইউনিয়নে ১১৪ শতাংশ জমি ও রাজবাড়ীর বসন্তপুরে ২৩০ শতাংশ জমি।

এ ছাড়া তার স্ত্রী রুবিনা খানমের সম্পদের মধ্যে রয়েছে- উত্তরার ১৩নং সেক্টরে ৩ কাঠা ১ শতাংশ জমির ওপর ৬ তলা বাড়ি (নং-৪৭), ১৩নং সেক্টরে ৩ কাঠা জমির ওপর আরও একটি বাড়ি, জোয়ার সাহারায় ১১৪৬ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট, মিরপুরে একটি টিনশেড বাড়ি ও পল্লবীতে আড়াই কাঠার প্লট, সাভারে ১৫ শতাংশ জমি, ফরিদপুরে ২৩ শতাংশ জমির তিনটি প্লট, কেরানীগঞ্জের খাজা সুপার মার্কেটে ২টি দোকান, বসুন্ধরার ইস্ট-ওয়েস্ট আবাসিক প্রকল্পে ৩ কাঠার ২টি প্লট ও ২০০০ সিসির একটি হ্যারিয়ার ব্র্যান্ডের গাড়ি। এর বাইরেও আবজাল দম্পতির নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। তারা হিসাব দাখিল করলে দুদক পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান করে সেসব সম্পদের তথ্য বের করবে বলে জানান একজন কর্মকর্তা।

দুদকের অনুসন্ধানের প্রাথমিক তথ্যে দেখা গেছে, আবজাল দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে বড়জন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পড়াশোনা করেন। ছোট দুজনের মধ্যে একজন ষষ্ঠ শ্রেণী এবং অন্যজন দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করে গত বছর থেকে দেশেই পড়াশোনা করছে। এই দম্পতির ছয়জন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভিন্ন পদে কর্মরত।

সূত্র জানায়, স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও লাইসেন্স তৈরি করে টেন্ডার-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন আবজাল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষকর্তা ও প্রভাবশালী ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের সঙ্গেও আবজালের রয়েছে সুসম্পর্ক। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আবজাল হোসেন গত এক বছরে সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ২৮ বারেরও বেশি সপরিবার সফর করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনির পর্টার স্ট্রিট মিন্টুতে যে বাড়ি কিনেছেন, তার দাম দুই লাখ ডলারেরও বেশি।

এদিকে আবজালের দুই ভাই ও তিন শ্যালকের বিরুদ্ধেও কোটি কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ মিলেছে। আফজাল ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমই যে শুধু স্বাস্থ্য অধিদফতরের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী তাই নয়, আবজালের দুই ভাই ও তিন শ্যালককেও তিনি (আবজাল) এই স্বাস্থ্য বিভাগে চাকরি দিয়েছেন। তারা হলেন- আবজালের ভাই ফরিদপুর টিভি হাসপাতালের ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট বেলায়েত হোসেন, আরেক ভাই লিয়াকত হোসেন মহাখালী জাতীয় অ্যাজমা সেন্টারের হিসাবরক্ষক।

তিন শ্যালকের মধ্যে বুলবুল ইসলাম মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদফতরের উচ্চমান সহকারী, শরিফুল ইসলাম খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিস সহকারী ও রকিবুল ইসলাম স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়িচালক। সরকারি চাকরির সুবাদে তারাও আবজালের মতো কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। তাদের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলবও করে দুদক। মঙ্গলবার তাদের ৫ জনের হাজির হওয়ার কথা ছিল দুদকে। তবে তারা এ জন্য তিন সপ্তাহের সময় নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×