কয়েকটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান

টাকা ফেরত পেতে গ্রাহকের হাহাকার

প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হামিদ বিশ্বাস

ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড

ঋণ অনিয়মসহ নানা কারণে টাকার চরম টানাটানিতে পড়েছে কয়েকটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। অবস্থা এতটাই খারাপ যে গ্রাহকের টাকা পর্যন্ত ফেরত দিতে পারছে না।

টাকা না পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা চেয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। এদের মধ্যে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকও।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (আইএলএফএসএল) কাছে ‘বেটা ওয়ান ইনভেস্টমেন্ট লি.’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের সুদাসলে পাওনা রয়েছে প্রায় ৬৩ লাখ টাকা। মূল টাকা ৫০ লাখ। ওই টাকা ফেরত পেতে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

জানতে চাইলে বেটা ওয়ান ইনভেস্টমেন্টের কর্ণধার আতিকুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, আইএলএফএসএলের সঙ্গে বেশ কিছুদিন চিঠি ও কথা চালাচালি হয়। তাতে খুব বেশি কাজ হয়নি। পরে ৫০ লাখ টাকা ফেরত পেতে ছয় মাস আগে চিঠি দিয়েছি বাংলাদেশ ব্যাংকে। সর্বশেষ চলতি মাসে আরও একটি ফলোআপ চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো জবাব মেলেনি।

একইভাবে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফসি) কাছে শাহীন আক্তার নামের এক গ্রাহকের সুদে আসলে পাওনা ২১ লাখ টাকা। তার মূল টাকা ১৬ লাখ।

এ টাকা না পেয়ে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অভিযোগ করেছেন। জানতে চাইলে শাহীন আক্তার যুগান্তরকে বলেন, বিআইএফসির কাছে পাওনা টাকা চাইলে উল্টো ঝাড়ি মারে। তাই টাকা ফেরত পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা চেয়েছি।

পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের কাছে মিজানুর রহমান নামের এক গ্রাহকের পাওনা ৬ লাখ টাকা। দুটি এফডিআর করেছিলেন তিনি।

টাকা ফেরত না পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের শরণাপন্ন হন তিনি। জানতে চাইলে মিজানুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, তিন মাস মেয়াদি দু’টি এফডিআর খুলেছি। এফডিআরের মেয়াদ গত বছরের সেপ্টেম্বরে শেষ হয়েছে। চার মাসেও কোনো টাকা পাইনি। সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা চেয়েছি।

শুধু তিন গ্রাহক নয়, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা ফেরত পেতে কয়েক ডজন চিঠি এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, টাকা ফেরত না দেয়ার অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। সাধারণত এ ধরনের অভিযোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের এফআইসিএসডিতে জমা হয়। প্রয়োজনে নিবিড়ভাবে পরিদর্শন করা হবে।

অতিমুনাফার লোভে ধরা খাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের একটি রূপালী ব্যাংক। ব্যাংকটি মোট ৮টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী আমানত রেখেছিল। এর চারটিতে রাখা আমানত সুদসহ আটকে গেছে।

এগুলো হল- বিআইএফসি, পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও ফাস ফাইন্যান্স (এফএএস)। তাদের কাছে সুদসহ ব্যাংকটির পাওনা প্রায় ৩৭৪ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংক গ্রাহকের আমানতের এ টাকা কীভাবে ফিরিয়ে আনবে বা আদৌ ফেরত পাবে কি-না তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, রূপালী ব্যাংককে আদায় না হওয়ায় ওই টাকার বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হবে। এতে আরও খারাপ হবে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সুবিধার বিনিময়ে রূপালী ব্যাংকের এসব টাকা কয়েকটি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত হিসেবে রাখা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রধান যুগান্তরকে বলেন, এমনটি হওয়ার কথা নয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে কোনো অর্থায়ন করা হয়নি। পুরনো টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা সময় চাচ্ছে। পিপলস লিজিং সুদের টাকা দিয়েছে। তাদের সুদের টাকা আটকে গিয়েছিল।

রূপালী ব্যাংকের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) শওকত জাহান যুগান্তরকে বলেন, বিআইএফসি নিয়ে বিপদে আছি। আমরা একা নই, সবাই। তবে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও ফাস ফাইন্যান্সে রাখা আমানত নিয়মিত আছে। এগুলো নিয়ে সমস্যা হবে না।

রীতি অনুযায়ী জনগণের কাছ থেকে ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ করে, তার বড় অংশই ঋণ দিয়ে থাকে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো আমানতের একটি অংশ অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ধার দেয়।

আবার সরকারি বিল-বন্ডেও বিনিয়োগ করে। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশির ভাগই ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে চলে। বর্তমানে দেশে ৩৪টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র পাঁচ-ছয়টি গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে চলছে, অর্থাৎ গ্রাহকের আস্থায় আছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নন-ব্যাংক আট আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রূপালী ব্যাংক মোট ৫৩৪ কোটি টাকা স্থায়ী আমানত হিসেবে রেখেছিল, যা এখন সুদাসলে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি।

অর্থাৎ বিভিন্ন নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে রূপালী ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চার প্রতিষ্ঠানে রাখা ৩৭৪ কোটি টাকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে ব্যাংকটি।

পিপলস লিজিংয়ে ব্যাংকটি ১২০ কোটি টাকা আমানত রেখেছিল। এর বিপরীতে নিয়মিত সুদ মিলছে না। আর বিআইএফসিতে রাখা ৫০ কোটি টাকা সুদসহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭ কোটিতে। প্রতিষ্ঠানটি কোনো টাকাই দিতে পারছে না।

এ দুটি প্রতিষ্ঠানের সাধারণ গ্রাহকরাও টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। ১০০ কোটি টাকা নেয়া ফাস ফাইন্যান্সও নিয়মিত সুদ দিতে পারছে না রূপালী ব্যাংককে। একই পরিমাণ টাকা নেয়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের অবস্থাও প্রায় অভিন্ন। এ দুই প্রতিষ্ঠান আমানতের মেয়াদ নবায়ন করে চলছে।

আরও কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রেখে তা ফেরত পাচ্ছে না। একটি ব্যাংক প্রিমিয়ার লিজিং ও বিআইএফসির কাছে সুদসহ প্রায় ৭০ কোটি (মূল টাকা ৬০ কোটি) টাকা পাওনা রয়েছে। এসব টাকা ফেরত পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা চেয়েছে ব্যাংকটি।