উপজেলা নির্বাচনে একক প্রার্থী বাছাই: আওয়ামী লীগের চ্যালেঞ্জ

গ্রুপিং-কোন্দল ও সহিংসতার আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের * প্রতিটি চেয়ারম্যান পদের বিপরীতে গড়ে ৮ জন প্রার্থী * প্রতি পদে তিনজন প্রার্থী নাম পাঠাতে তৃণমূলকে নির্দেশ * স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, দলের প্রতি নিবেদিত ও ত্যাগী নেতাদের বিবেচনায় আনা হবে * সমাজ, দল ও সরকারে সমালোচিত ও বিতর্কিতরা অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন

  রেজাউল করিম প্লাবন ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

উপজেলা নির্বাচন
উপজেলা নির্বাচনে একক প্রার্থী বাছাই: আওয়ামী লীগের চ্যালেঞ্জ

আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এরই মধ্যে একক প্রার্থী নির্ধারণে তৃণমূলে চিঠি পাঠিয়েছে দলটি। প্রতি উপজেলার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদের বিপরীতে তিনজন করে প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠাতে জেলা কমিটিগুলোকে বলা হয়েছে। শনিবার অনুষ্ঠেয় দলটির স্থানীয় মনোনয়ন বোর্ডের সভায় একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

তবে উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ব্যাপারে বিএনপি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ায় প্রার্থীজট দেখা দিয়েছে আওয়ামী লীগে। দেশের বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি চেয়ারম্যান পদের বিপরীতে গড়ে ৮ জন করে প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। আগ্রহী প্রার্থীদের ধারণা- ‘দলীয় মনোনয়ন পেলেই নিশ্চিত জয়’। প্রার্থীর ছড়াছড়ি হওয়ায় বাছাইয়ে কেন্দ্রের নির্দেশনা বাস্তবায়নে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।

এ নিয়ে গ্রুপিং-কোন্দল কিংবা সহিংসতার আশঙ্কাও করছেন তারা। শুধু তা-ই নয়, কেন্দ্র কার্যকর অর্থে কঠোর না হলে অনেক স্থানেই দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হিসেবে নির্বাচনী মাঠে থাকতে পারেন- এমন শঙ্কাও আছে সংশ্লিষ্টদের।

বিএনপিহীন একতরফা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে একক প্রার্থী নিশ্চিতে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে ক্ষমতাসীনদের- এমনটি ভাবছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের শঙ্কা- যদি একক প্রার্থী নিশ্চিত না হয়, তাহলে সহিংসতা হতে পারে। ভেঙে পড়তে পারে দলীয় শৃঙ্খলা।

এদিকে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, অভিজ্ঞতা ও সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়, দলের প্রতি নিবেদিত ও ত্যাগী- এমন নেতাই মনোনয়নে যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। এবার দলের বাইরে প্রার্থী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ দলীয় সভাপতি ‘বিদ্রোহী প্রার্থীদের’ জন্য আজীবন বহিষ্কারের নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল মতিন খসরু যুগান্তরকে বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি অধিক গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় আনা হবে। এছাড়া থাকতে হবে সততা, নিষ্ঠা, দলের জন্য নিবেদিত, সততা ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তি। সমাজ, দল ও সরকারে সমালোচিত-বিতর্কিতরা অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন।

এদিকে উপজেলা নির্বাচন একতরফা হলে তা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। বুধবার যুগান্তরকে তিনি বলেন, যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়, সেক্ষেত্রে একক প্রার্থী নিশ্চিতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে আওয়ামী লীগকে। আর ক্ষমতাসীনরা একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে না পারলে নিজেদের মধ্যে দলীয় কোন্দল সৃষ্টির শঙ্কা আছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এই নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়। এজন্য বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে আওয়ামী লীগকে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। গণতন্ত্রে ভারসাম্য আনার কাজটি আওয়ামী লীগকেই করতে হবে। একদল দিয়ে গণতন্ত্র হয় না। গণতন্ত্র হল বহুদলীয়।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দলটির স্থানীয় নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভোটের ভিত্তিতে প্রার্থী নির্ধারণ করে কেন্দ্রে পাঠাবে। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রতি পদের বিপরীতে ৩ জন করে প্রার্থীর নাম পাঠাতে বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্র অধিকতর যাচাই-বাছাই করে একক প্রার্থী নিশ্চিত করবে।

কোন দল নির্বাচনে আসবে কি আসবে না, সেটা তাদের ব্যাপার- এমন মন্তব্য করে হানিফ বলেন, তবে আমরা আশা করি স্থানীয় নির্বাচনে সবাই অংশ নেবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কোনো পদেই একাধিক প্রার্থী হবে না। হওয়ার সুযোগ নেই। একক প্রার্থী নিশ্চিতে কোনো চ্যালেঞ্জও নেই।

স্থানীয় নির্বাচন কখনও জোটবদ্ধ হয়নি জানিয়ে আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, এতে আগের মতোই দলীয়ভাবে সবাই অংশগ্রহণ করবে। সব দল সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ এবং যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে, তার পক্ষেই কাজ করবে।

বরাবরের মতো এবারও উপজেলা নির্বাচন দলগতভাবে করা হবে বলে জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি বুধবার যুগান্তরকে বলেন, এতে জোটের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এরই মধ্যে আমরা দলীয় প্রার্থী নির্ধারণে কাজ করছি।

জানা যায়, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিতে ১৪ দলীয় জোটের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এবং জাতীয় পার্টি-জেপিসহ অন্য শরিক দলগুলো নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি শুরু করেছে।

দলীয় প্রতীকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয়ার কথা আগেই জানিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

বিএনপির অংশ না নেয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ না নিলে বিরাট ভুল করবে। দলটির মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা যেতে পারে। দলগতভাবে তারা নির্বাচনে না এলেও বিএনপির অনেক নেতাই উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে কেন্দ্রের নির্দেশে প্রার্থী বাছাইয়ে বেশ হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। এরই মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তদবির আসছে বলেও জানান সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা। কেন্দ্রের পাঠানো নির্দেশনায় মনোনয়ন দৌড়ে পিছিয়ে থাকা নেতাদের অনেকে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিতে নানা তৎপরতা চালাচ্ছেন।

মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার কারণে গ্রুপিং-কোন্দল কিংবা সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না মন্তব্য করে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ সালাম যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি না থাকায় দলে মনোনয়ন প্রার্থীর ছড়াছড়ি রয়েছে।

কিন্তু সবার প্রত্যাশা তো দল পূরণ করতে পারবে না। তিনি বলেন, প্রার্থী মনোনয়নে আমাদের একটি গাইড লাইন দেয়া হয়েছে কেন্দ্র থেকে। আমরা সে মোতাবেক কাজ করছি। তিনি আরও বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো নেতার নির্বাচন বা কাজ করার সুযোগ নেই। যদি কেউ করে থাকেন তবে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিভিন্ন উপজেলা থেকে যুগান্তরের পাঠানো প্রতিবেদনে দেখা যায়, দলীয় মনোনয়নে জয় নিশ্চিত হওয়ায় প্রতিটি উপজেলার কমপক্ষে ৮ জন করে আওয়ামী লীগ নেতা নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দলের প্রভাবশালী নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। সবার লক্ষ্য- যে করেই হোক নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করা।

ফরিদপুর সদরে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী মো. জাহিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত আছি। এখন উপজেলা নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করি। দল মনোনয়ন দিলে জয় নিশ্চিত করব। একই উপজেলার মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য প্রার্থীরাও বলেছেন, দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত হলে জয় নিশ্চিত করা যাবে।

আগের স্থানীয় নির্বাচনগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার কারণে উপজেলা, পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অনেক স্থানেই দলের প্রার্থীর পরাজয়ের কারণ ঘটেছে। এতে সেসব এলাকায় দলের মধ্যে বিভেদ-দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে দেখা দেয়।

বিষয়টি মাথায় রেখে এবার আগে থেকেই শক্ত অবস্থানে থেকে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থিতা চূড়ান্ত করতে কাজ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। সেক্ষেত্রে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তাৎক্ষণিক দল থেকে বহিষ্কার ছাড়াও কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

দল থেকে আজীবন বহিষ্কারের হুশিয়ারি আগেই দিয়ে রেখেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোন্দল এড়াতে গত ১৫ জানুয়ারি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্তে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বাক্ষরিত চিঠি তৃণমূলে পাঠানো হয়েছে।

দলের সব জেলা-উপজেলা কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক-যুগ্ম আহ্বায়কদের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, উপজেলা নির্বাচনের প্রতিটি পদে একক অথবা তিনজন প্রার্থীর নামের সুপারিশ-সংবলিত একটি প্যানেল তৈরি করতে হবে। দলের উপজেলা শাখা প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে বর্ধিত সভা করে এ প্যানেল তৈরি করে দলের জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠাবে। এরপর জেলা আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সব উপজেলার প্রার্থী তালিকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ডাকযোগে কিংবা সরাসরি অন্য কোনো মাধ্যমে পৌঁছে দেবে।

এই প্রার্থী তালিকায় জেলা ও উপজেলা শাখার সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়কদের যৌথ স্বাক্ষর থাকতে হবে। চিঠিতে প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় তৃণমূলকে কিছু নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, উপজেলা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে ইচ্ছুক প্রার্থীদের মনোনয়ন ফরমের মূল্য চেয়ারম্যান পদে ২০ হাজার টাকা এবং ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে পাঁচ হাজার টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দুই মাস বিরতি দিয়ে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন শুরু করতে যাচ্ছে ইলেকশন কমিশন (ইসি)। চলতি বছর পাঁচ ধাপে ৪৯২টির মধ্যে ৪৫০টির বেশি উপজেলা পরিষদে নির্বাচনের আয়োজন করতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কমিশনের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর মধ্যে প্রথম ধাপে রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কয়েকটি জেলার ৬৯টি উপজেলায় নির্বাচন হবে আগামী ৮ বা ৯ মার্চ।

জেলাগুলো হচ্ছে- পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ। দ্বিতীয় ধাপের উপজেলাগুলোতে ১৮ মার্চ, তৃতীয় ধাপে ২৪ মার্চ এবং চতুর্থ ধাপে ৩১ মার্চ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। বাকি উপজেলাগুলোতে রোজার ঈদের পর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি কমিশন সভায় এসব উপজেলা নির্বাচনের তফসিল নির্ধারণ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে রাজশাহী, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের ১৬টি জেলার ১২৫টি উপজেলা; তৃতীয় ধাপে খুলনা, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের ১৭ জেলার ১১১টি এবং চতুর্থ ধাপে বরিশাল, ঢাকা, চট্টগ্রাম বিভাগের ২৪ জেলার ১৫৯টি উপজেলার ভোটগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে মঙ্গলবারের বৈঠকের কার্যপত্রে।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের মার্চ থেকে মে মাসে ছয় ধাপে এর অধিকাংশগুলোতে ভোট হয়েছিল। আইনে মেয়াদ শেষের পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে ভোট করার বাধ্যবাধকতা থাকায় এ নির্বাচন করতে হচ্ছে।

১৯৮৫ সালে উপজেলা পরিষদ চালু হওয়ার পর ১৯৯০ ও ২০০৯ সালে একদিনেই ভোট হয়েছিল। ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ছয় ধাপে ভোট করেছিল তৎকালীন নির্বাচন কমিশন। সেই ধারা বজায় রেখে এবার বিভাগওয়ারি ভোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এবারই প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে।

উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে যুগান্তরের বিভিন্ন ব্যুরো অফিস ও জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন সংক্ষিপ্ত আকারে নিচে দেয়া হল :

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। প্রতিটি উপজেলায় আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থী উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। শুরু করেছেন তদবির-লবিং।

চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যান পদে কাকে রেখে কাকে মনোনয়ন দেবেন এ নিয়েই রীতিমতো উৎকণ্ঠায় রয়েছেন দলের নেতারা। বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কারণে আওয়ামী লীগে প্রার্থীর ছড়াছড়ি।

তাদের ধারণা, দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীক পেলেই নির্বাচিত হবেন। এ কারণে সবাই মরিয়া হয়ে উঠেছেন দলের মনোনয়ন লাভের জন্য। প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দানা বেঁধে উঠতে পারে এবং তা সংঘাত-সহিংসতায় রূপ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন স্বয়ং দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা।

চট্টগ্রামে নবগঠিত কর্ণফুলী উপজেলাসহ ১৫টি উপজেলা রয়েছে। এর মধ্যে নবগঠিত কর্ণফুলী উপজেলার নির্বাচন এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। বাকি ১৪টি উপজেলায় অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন। ১৪টি উপজেলায় আওয়ামী লীগেরই শতাধিক প্রার্থী রয়েছেন যারা চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য গ্রুপিং-লবিং করছেন। প্রতিটি উপজেলায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের একেকটি পদের বিপরীতে ৬ জন থেকে ১০ জন পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন।

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলার উপজেলাগুলোতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতিমধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। এ বিভাগের ৬৭টি উপজেলায় চেয়ারম্যান এবং নারী ও পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রায় দেড় হাজার প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। তারা শুরু করেছেন গণসংযোগ। দিচ্ছেন ভোটারদের প্রতিশ্রুতি। ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সরব হয়ে উঠেছেন সম্ভাব্য প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকরা।

এদের মধ্যে বেশির ভাগ প্রার্থীই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। চেয়ারম্যান পদে শুধু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ার কারণে আওয়ামী লীগ নেতারা দলীয় মনোনয়ন বোর্ডের কাছ থেকে তাদের মনোনয়ন নিশ্চিত করতে চাইছেন। আর ভাইস চেয়ারম্যান পদে লড়াইয়ের জন্য এ দলটির নেতারা দলীয় সমর্থন আদায়ের জন্য ইতিমধ্যে লবিং শুরু করেছেন। তবে বিএনপি বা অন্য দলের প্রার্থীরা এখনও সেভাবে সরব নয়। তারা দলীয় সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন।

রংপুর ব্যুরো জানায়, আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে এবার রংপুর বিভাগের ৫৮টি উপজেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থী নিয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিপাকে পড়েছে। প্রার্থীদের সংখ্যা এবার সবচেয়ে বেশি রংপুর বিভাগের ৮ জেলায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ১৯০ জন নেতাকর্মী চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

বরিশাল ব্যুরো জানায়, দলীয় প্রতীকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে বরিশাল জেলার ১০ উপজেলার তৎপরতা চালাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রায় একশ’ নেতা। সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে নানা আলোচনার ঝড় উঠেছে। ইতিমধ্যে অনেক প্রার্থী কৌশলে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে জানান দিচ্ছে। কোনো কোনো উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পেতে লবিং তদবির চালাচ্ছে ১০ জনেরও বেশি প্রার্থী। এর মধ্যে বর্তমান চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতি-সম্পাদকসহ অঙ্গসংগঠনের নেতারাও রয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল সদর উপজেলায় ৮ জন নেতা চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন চাচ্ছেন। একইভাবে হিজলা উপজেলায় ১০ জন, আগৈলঝাড়া উপজেলায় ৬ জন, বানারীপাড়ায় ৭ জন, বাবুগঞ্জে ৭ জন, মেহেন্দিগঞ্জে ৬ জন, মুলাদীতে ৮ জন, গৌরনদীতে ৮ জন, বাকেরগঞ্জ উপজেলায় ৭ জন, উজিরপুরে ১২ জন প্রার্থী রয়েছেন।

খুলনা ব্যুরো জানায়, উপজেলা নির্বাচন নিয়ে খুলনা বিভাগের সর্বত্র সম্ভাব্য প্রার্থীরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ করছেন প্রার্থীরা। দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বিএনপি’র প্রার্থীরা আপাতত নিশ্চুপ থাকলেও মাঠে সরব আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। প্রত্যেক উপজেলায় একাধিক প্রার্থী ব্যাপকভাবে প্রচারণায় নেমেছেন। খুলনাসহ বিভাগের পাঁচ জেলায় অন্তত দেড়শ’ প্রার্থী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। দলীয় মনোনয়ন পেতে ঊর্র্ধ্বতন নেতাদের দরবারে ধরনা দিচ্ছেন।

কুমিল্লা ব্যুরো জানায়, এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কুমিল্লার ১৫ উপজেলায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে এখন প্রার্থীর ছড়াছড়ি। জেলার ১৭ উপজেলার মধ্যে ১৫ উপজেলায় নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রতিটি উপজেলায় একাধিক প্রার্থী দলের মনোনয়ন পেতে ব্যাপক লবিং-তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো কোনো উপজেলায় ৫-১০ জনেরও বেশি প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। এছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নবঞ্চিত অনেকেই এবার উপজেলা নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী। তবে জেলার অধিকাংশ উপজেলায় দলীয় মনোনয়ন না পেলেও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে কেউ কেউ নির্বাচন করতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইল জেলার ১২টি উপজেলায় ৬৮ জন প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। প্রতিটিতে আওয়ামী লীগের অর্ধ থেকে এক ডজন প্রার্থী গণসংযোগ শুরু করেছেন। এদিকে টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলার মধ্যে পাঁচটি উপজেলার ১১ জন আওয়ামী লীগ নেতা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে এবার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নের জন্য মাঠে নেমেছেন।

ঘটনাপ্রবাহ : উপজেলা নির্বাচন ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×