একুশ বাঙালির সাহসের সমাচার

  কামাল লোহানী ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একুশ বাঙালির সাহসের সমাচার

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলার বিপ্লবী ছাত্রসমাজ যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল ১৪৪ ধারা ভেঙে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রার তা ছিল ঐতিহাসিক।

তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্র সমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ ছিল বাঙালির ইতিহাসে অভূতপূর্ব।

তখনকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তো বটেই এমনকি কমিউনিস্ট পার্টি পর্যন্ত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার বিরুদ্ধে ছিল। সাধারণ মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যাদের ভূমিকা অগ্রবর্তী সাহসী বলে স্বীকৃত সেই কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠনের নেতারা পর্যন্ত পার্টির সিদ্ধান্ত মেনে ১৪৪ ধারা ভাঙতে চাননি।

কিন্তু ১৯৫২-এর ছাত্রসভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত সাহসে রাজপথে ছোট ছোট দলবেঁধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে সোচ্চার হন। স্বৈরাচারী মুসলিম লীগ সরকার দমন-পীড়ন গ্রেফতারের পথ বেছে নেয়।

ছাত্রদের মিছিল গুলিবর্ষণ করলে শহীদ হন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ আরও অনেকে। মায়ের ভাষার দাবিকে দমনপীড়নে স্তব্ধ করে দেয়ার এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জেগে ওঠে সারা দেশ। ছাত্রদের সাহস ছড়িয়ে যায় সমাজের সাধারণ মানুষের বুকে। ফলে প্রতিবাদ সংঘটিত হয় সারা বাংলাদেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম ছড়িয়ে যায় গোটা দেশে।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার মতো জেগে ওঠে প্রতিবাদী বাংলাদেশ- ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ/কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে/সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ/জল ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে/সাবাস বাংলাদেশ এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে-পুড়ে মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।’- এই প্রত্যয়ে। একুশের সেই সাহসের পরিণতি মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ। তাই এ কথা বলা প্রয়োজন নির্দ্বিধায়, একুশের চেতনা বাঙালি জাতির সাহসের সমাচার। তাই একুশ ফিরে ফিরে আসে আমাদের সাহসে উজ্জীবিত সকল আন্দোলন-সংগ্রাম আর গণজাগরণে।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও এ কথা মর্মান্তিক সত্য যে, একুশ আমাদেরকে অনেক কিছু দিলেও আমরা একুশকে কিছুই দিইনি- কেবল শহীদ মিনার ছাড়া। এমনকি আমরা একুশের ভোরের সূর্যোদয়ের ‘প্রভাত ফেরি’কে পর্যন্ত মধ্যরাতের ‘র‌্যালি’তে রূপান্তরিত করেছি এবং তা করেছি স্বাধীন দেশে। আমরা সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চালুর দাবিকে আজও বাস্তবায়িত করতে পারিনি। এখনও অফিস-আদালত চলে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায়। আজও পর্যন্ত আমরা ভাষাশহীদদের রক্তের ঋণ শুধতে পারিনি- সর্বস্তরে বাংলাভাষার প্রচলন করতে পারিনি। বর্তমানে আমাদের মানসিক হীনমন্যতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জীবনের সর্বস্তরে ইংরেজির প্রাধান্য বিস্তারে আমরা উঠেপড়ে লেগেছি।

একজন সাংস্কৃতিক যোদ্ধা হিসেবে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, একজন ভাষাসংগ্রামী হিসেবে আমি বর্তমান এই ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারের কাছে প্রত্যাশা করি একুশের শহীদদের দাবিগুলো- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু’ এবং ‘সকল আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা চাই’- বাস্তবায়নের কাজ সম্পন্ন করবেন। এই সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার কমপ্লেক্স শিল্পী হামিদুর রহমানের পূর্ণাঙ্গ নকশায়- ভাস্কর নভেরা আহমেদের ম্যুরালসহ- বাস্তবায়িত করেন। শহীদ মিনার কমপ্লেক্সের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করলে একুশের শহীদদের প্রতি জাতির অপরিশোধ্য ঋণের কিছুটা অন্তত শোধ হবে। বাঙালি জাতির পরবর্তী প্রজন্মের তরুণদের অন্তরে সঞ্চারিত হবে একুশের চেতনা।

অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×