চাই আত্মজিজ্ঞাসা চাই জবাবদিহিতা

  বুলবন ওসমান ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি
বুলবন ওসমান। ছবি সংগৃহীত

ফেব্রুয়ারির ২১ দিন অর্থাৎ ২১ তারিখ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে এক ধরনের বাংলাপ্রীতি দেখা দেয়। বাংলা ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গকারী সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের কথা স্মরণ করি। আর যথারীতি ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখ থেকে সব ভুলে যাই।

যেন এটুকুই হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের চেতনা। কিন্তু ‘একুশের চেতনা’ তো এত ছোট জিনিস নয়। সত্যি কথা বলতে কী, এটা আমাদের গোটা বাঙালি জাতিসত্তার অস্তিত্ব। বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা-সংস্কৃতি-সাহিত্য- সবকিছু নিয়েই একুশের চেতনা। শুদ্ধভাবে বাংলা বলা, লেখা ও শেখা তো বটেই শুদ্ধভাবে চিন্তা করা পর্যন্ত। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না, ঘটছে উল্টোটা। আমরা শুদ্ধতার বদলে অশুদ্ধ ও বিকৃতির প্রতিযোগিতায় নিমগ্ন। আমরা বিকৃত উচ্চারণে অশুদ্ধ বাংলায় কথা বলছি, শিখছি এবং তা ছড়িয়ে দিচ্ছি।

বাংলা ভাষাকে রক্ষার জন্য বায়ান্নর শহীদরা নিজেদের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন আর আমরা সেই ভাষাকেই প্রাণহীন বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছি। অথচ পৃথিবীর ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা হচ্ছে অন্যতম প্রাণশক্তিসম্পন্ন ভাষা। সজীব এবং সতেজ ভাষা। বাংলা ভাষার উচ্চারণে যে কোনো সূক্ষ্ম শব্দও ধরা সম্ভব। নিখুঁতভাবে। যে ক্ষমতা কি না অনেক ভাষারই নেই। বাংলা ভাষা অনেক শক্তিশালী। আমাদের বর্ণমালায় যেমন ‘প’ আছে ‘ফ’ও আছে- অর্থাৎ মহাপ্রাণ, হীনপ্রাণ দুটোই আছে- এতে ধ্বনিগত দিক থেকে সঠিক উচ্চারণ সম্ভব হয়। ধরা যাক, ‘আরবি’ ভাষায় ‘প’ ধ্বনিটাই নেই, ওরা পাকিস্তানকে বলে বাকিস্তান, ‘আল বাকিস্তান’। সিন্ধুকে ‘হিন্দু’ উচ্চারণ করা হয়।

বাংলা এদিক থেকে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভাষা। জাপানিরা ‘হ্যালো’ উচ্চারণ করতে পারে না। বলে ‘হ্যারো’। সমৃদ্ধ ভাষা হওয়া সত্ত্বেও আমরা প্রমিত বা মান বাংলা ভাষা থেকে বিচ্যুত হচ্ছি- বিকৃতির পঙ্কে পা রাখছি। আমরা প্রমিত, আঞ্চলিক বা বিদেশি ন্যূনতম মানেও অর্থবহ বাংলা ভাষার চর্চা করতে পারছি না- সব মিলিয়ে দেশে এক উদ্ভট ও বিচিত্র ভাষার গড্ডালিকাপ্রবাহ তৈরি করছি। এটা কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গেও ঘটছে। ওরা ‘বাচ্চা’ শব্দটিকে ‘বাচ্ছা’ বানিয়ে ফেলেছে। হিন্দি এবং অন্য ভারতীয় ভাষার সহবতে। বাংলা ভাষা থেকে বিচ্যুতির আরও উদাহরণ- ওরা বলছে, ‘ছিলিস’ মানে ‘ছিলে’।

বাংলা ভাষাচর্চার শিথিলতা বর্তমানে আমাদের দেশে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেদিন দেখলাম বাংলা একাডেমির একটি অভিধান জনৈক নারীকে উৎসর্গ করা হয়েছে। বিষয়টা বিস্ময়কর- অভিধানের মতো গ্রন্থ কোনো ব্যক্তিকে উৎসর্গ করা যায়, তা আমার জানা ছিল না। বাংলা ভাষার চর্চায় আমরা ভাষার ওপর ব্যক্তির খেয়াল-খুশির স্বেচ্ছাচার চাপিয়ে দিয়ে এক অনিরাময়যোগ্য নৈরাজ্য সৃষ্টি করছি।

বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের ধারাবাহিকতায়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়ন ও গবেষণার লক্ষ্যে। বর্তমানে বাংলা একাডেমির একমাত্র কাজ এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বলে প্রতিভাত হচ্ছে একুশের বইমেলা করা। আমার মনে হয় বইমেলার দায়িত্ব বই বিক্রেতা, প্রকাশকদের হাতেই ছেড়ে দেয়া প্রয়োজন।

আমাদের দেশে যার যেটা কাজ নয়, সে সেটা নিয়ে পড়ে আছে এবং তাতে যা ঘটছে তা হল- শ্রমের, অর্থের এবং মেধার অপচয়। এটা একটা মারাত্মক দুরারোগ্য ব্যাধির পর্যায়ে পৌঁছেছে। বইমেলা করতে গিয়ে বাংলা একাডেমি নিজে যে বইগুলো বের করে, সেগুলো মানহীন প্রকাশনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সেগুলোর পাতায় পাতায় ভুল, প্রচ্ছদ-মুদ্রণ-সৌকর্য পীড়াদায়ক, এমনকি বাঁধাইটা পর্যন্ত খুবই নিুমানের। একুশের চেতনা যদি হয় মাতৃভাষার উন্নয়ন, তাহলে বলতেই হবে এই কাজে কারোই মন নেই।

বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়নের লক্ষ্যে যে পুরস্কারগুলো দিয়ে থাকে, সে পুরস্কারের ব্যবস্থাপনাটাও তারা যথাযথভাবে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চালিয়ে যেতে পারে না- এটা সত্যিই দুঃখজনক। বাংলা একাডেমির পুরস্কার সে কারণে দেখা যায় অপাত্রে প্রদানের অজস উদাহরণ। ইতঃপূর্বে দেখা গেছে, তারা কোনো বছর পুরস্কার দেয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাননি। আবার হয়তো দেখা গেছে পরের বছর আট-দশজনকে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুগ্মভাবে পুরস্কার প্রদান করে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে।

যেমন এ বছর তারা নাকি শিশু-সাহিত্যে পুরস্কৃত করার মতো কোনো শিশু-সাহিত্যিককেই খুঁজে পাননি। তারা যদি পরের বছর দুই-তিনজনকে যুগ্মভাবে পুরস্কার দেন তবে আমি অন্তত অবাক হব না। কারণ এমন প্রহসনের উদাহরণ তাদের আছে। পুরস্কার হচ্ছে কাজের স্বীকৃতি, পুরস্কার হচ্ছে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর প্রয়াস। আমাদের এখানে সেটা দেয়ার বদলে নেয়ার পদ্ধতি হয়ে গেছে- এটা যে কত অসম্মান ও অগৌরবের তা প্রকাশ করা মুশকিল। সবকিছু নষ্টদের অধিকারে আধিপত্যে চলে গেলে একুশের চেতনা- বেদনারই নামান্তর হয়ে উঠবে।

তাই আমি মনে করি, একুশের চেতনাকে রক্ষা করতে হলে আজ আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। আত্মজিজ্ঞাসা তথা জবাবদিহিতার অভ্যাস গড়ে তুলে সবাইকে নিজের কাজটি করতে হবে যথাযথভাবে। যার যে কাজ তার সে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাহলেই কেবল বিচ্যুতি, বিকৃতি বিধ্বংসী হওয়া থেকে আমরা রক্ষা পাব।

অনুলিখন : শুচি সৈয়দ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×