অবলোপন নীতিমালা: বিশেষজ্ঞদের অভিমত

খেলাপি ঋণের ঝুঁকি আরও বাড়বে

অবলোপন নীতিমালা কেন শিথিল করল, তা আমার জানা নেই -ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ * অবলোপন নীতিমালা শিথিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমবে না -ড. মইনুল ইসলাম

  হামিদ বিশ্বাস ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খেলাপি ঋণের ঝুঁকি আরও বাড়বে

ঋণ অবলোপনের নীতিমালায় শিথিলতার কারণে ব্যাংকে দীর্ঘমেয়াদে খেলাপির ঝুঁকি আরও বাড়বে- এমন মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, এটি খেলাপি ঋণ কমানোর কোনো সহজ পথ হতে পারে না। এর মাধ্যমে কাগজ-কলমে খেলাপি ঋণ সাময়িক কমলেও বাস্তবে ব্যাংকগুলোর আর্থিক চিত্র ক্রমশই নাজুক হয়ে উঠবে। এছাড়া প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) না রেখে অবলোপন করলে ঝুঁকিতে পড়বে ব্যাংক ও আমানতকারীরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অবলোপন হলে শুধু ব্যাংক তার স্থিতিপত্র থেকে বাদ দিয়ে আলাদাভাবে হিসাব করতে পারে। কিন্তু ঋণগ্রহীতা মাফ পাবেন না। ফলে অবলোপন বাড়লে প্রকৃত পক্ষে খেলাপি ঋণ কমবে না। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় জোরদারে একদিকে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কমিটি করছে। অন্যদিকে অবলোপনের নীতিমালা শিথিল করা হয়েছে। এটা সাংঘর্ষিক। এতে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা আরও বাড়বে। কেননা ঋণ খেলাপিরা মনে করবে খেলাপি হলে মামলা হবে এবং তা দীর্ঘদিন চলবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ঋণ অবলোপনের সময়সীমা ৫ বছর থেকে ৩ বছরে নামানো ঠিক হয়নি। এর মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর আইনের পরিবর্তে কেন অবলোপন নীতিমালা শিথিল করল, তা আমার জানা নেই।

বিশ্ববাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকের ভেতরের অবস্থা খারাপ। কিন্তু বাইরের অবস্থা ভালো। ঋণ অবলোপনের নতুন নীতিমালা সেদিকেই ইঙ্গিত করে। এটা বিপদ সংকেত। তিনি বলেন, বেশিরভাগ ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। কাগজ-কলমে ব্যাংকের স্বাস্থ্য ভালো দেখে সাধারণ মানুষ শেয়ার কিনবে। কিন্তু বাস্তবচিত্র ভিন্ন কথা বলবে। এতে শেয়ার হোল্ডাররাও বঞ্চিত হবে।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অবলোপন নীতিমালা শিথিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমবে না, সাময়িক ঢেকে যাবে। কারণ আদায় জোরদারে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেই। এছাড়া ৪৯ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকার ঋণ অবলোপনের যে হিসাব গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, তা সঠিক নয়। সুদসহ অবলোপনের এ অংক আরও অনেক বেশি হবে। এটি গোপন করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে।

নীতিমালার এ শিথিলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতির গবেষক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি যুগান্তরকে বলেন, রাইট অফ (অবলোপন) ব্যাংকিং খাতের একটি আন্তর্জাতিক পদ্ধতি। হঠাৎ করেই নীতিমালায় কেন শিথিল করা হল বা পরিবর্তন আনা হল, সেটা পরিষ্কার নয়। এর মাধ্যমে কাগজে-কলমে সাময়িক খেলাপি ঋণ কমলেও বাস্তবে তা আরও খারাপের দিকে যাবে।

ব্যাংক ব্যবস্থায় মন্দমানে শ্রেণীকৃত খেলাপি ঋণ স্থিতিপত্র (ব্যালান্স শিট) থেকে বাদ দেয়াকে ঋণ অবলোপন বলে। যদিও এ ধরনের ঋণগ্রহীতা পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত তা প্রকৃত অর্থে খেলাপি ঋণ। ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে।

বুধবার ঋণ অবলোপনের নীতিমালা শিথিল করে একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বলা হয়, ব্যাংকগুলো মাত্র ৩ বছর পর মন্দ মানের খেলাপি ঋণ অবলোপন করে ব্যালান্স শিট বা স্থিতিপত্র থেকে বাদ দিতে পারবে।

আবার অবলোপন করার জন্য আগের মতো শতভাগ প্রভিশন লাগবে না। দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপনে মামলা করতে হবে না। এতদিন কোনো ঋণ মন্দমানে শ্রেণীকৃত হওয়ার ৫ বছর পূর্ণ না হলে তা অবলোপন করা যেত না। মামলা না করে অবলোপন করা যেত ৫০ হাজার টাকা। আর শতভাগ প্রভিশন বা ওই ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখা লাগত।

সার্কুলারে আরও বলা হয়, অবলোপনের আগে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রি বা গ্যারান্টার থেকে পাওনা আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। আর সংশ্লিষ্ট ঋণ থেকে স্থগিত সুদ বাদ দেয়ার পর অবশিষ্ট স্থিতির সমপরিমাণ প্রভিশন রাখতে হবে। আগে পুরো দায়ের (বকেয়া টাকা) বিপরীতে প্রভিশন করতে হতো। তবে আগের মতোই পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিতে হবে। অবলোপনের পরও ঋণ আদায়ের চেষ্টা অব্যাহত রাখা, সম্পূর্ণ দায় পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। অবলোপন করা ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করা যাবে না।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে ৯৯ হাজার ৩৭১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে মন্দ মানের খেলাপি ৮২ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। মোট খেলাপি ঋণের ৮৩ দশমিক ১৬ শতাংশই মন্দ মানের। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ৪৯ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে। আদায় হয়েছে ১১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। এতে অবলোপন করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। অবলোপন বিবেচনায় নিলে ব্যাংক খাতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৩৭ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অবলোপনসহ খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাস্তবে আরও অনেক বেশি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×