তৈরি পোশাক খাতে বন্ড ভ্যাটের জটিলতা

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তৈরি পোশাক
তৈরি পোশাক। ছবি: সংগৃহীত

তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বন্ড ও ভ্যাট নিয়ে ছয় ধরনের জটিলতা দেখা দিয়েছে।

এগুলো হচ্ছে- ইউডি (ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন) বহির্ভূত কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি, বন্ড লাইসেন্সে এইচএস কোড অন্তর্ভুক্ত না থাকলে সেই পণ্য কাস্টমসে খালাসে বাধা, অডিটের দলিলাদি জমার সময়সীমা বৃদ্ধি, স্থানীয়ভাবে গৃহীত সেবার বিপরীতে ভ্যাট আদায়ের নোটিশ জারি।

এসব জটিলতার কারণে অহেতুক হয়রানি ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তৈরি পোশাক খাতের রফতানিকারকরা। সম্প্রতি বন্ড ও ভ্যাটসংক্রান্ত এসব সমস্যা তুলে ধরে এনবিআরের সঙ্গে বৈঠক করে বিজিএমইএ।

নিয়ম অনুযায়ী, একটি রফতানি আদেশ পাওয়ার পর সেটি তৈরিতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি বা স্থানীয়ভাবে সংগ্রহের জন্য রফতানিকারকদের এলসি খুলতে হয়। পরে সেই এলসির তথ্য ইউডিতে (ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন) উল্লেখ করতে হয়। এর ভিত্তিতেই পরবর্তীতে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

১৯৯৩ সাল থেকে পোশাক শিল্পের ইউডি ইস্যু করছে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এই ইউডিতে পোশাক তৈরিতে কত ধরনের কাঁচামাল এবং সহগ অনুযায়ী তা কতটুকু ব্যবহার করা হবে তার বিস্তারিত উল্লেখ থাকে।

তৈরি পোশাক খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, ক্রেতার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সময় ইউডি-বহির্ভূত উপকরণ ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু ইউডিতে সেই সেবা বা উপকরণ যেমন ওয়াশিং-ফিনিশিংয়ের বর্ণনা না থাকায় সেটিকে রফতানি হিসেবে গণ্য করা হয় না।

অডিটের সময় সেবা বা উপকরণ ক্রয়ের বিপরীতে মূসক চালান চাওয়া হচ্ছে এবং ইউডি-বহির্ভূত পণ্যের ওপর শুল্ক-কর ও ভ্যাট দাবি করে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করছে বন্ড কমিশনারেট। এ কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান অডিট করাতে পারছে না।

যথাসময়ে অডিট করাতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান জেনারেল বন্ডের সুযোগ নিলেও তার মেয়াদ পার হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ডের আওতায় কাঁচামাল আমদানি করতে পারছে না।

বিজিএমইএ বলছে, আগে বন্ড কমিশনারেট থেকে অডিট করার সময় ইউডি-বহির্ভূত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির (বিবিএলসি) বিষয়গুলো দেখা হতো না।

এখন বন্ড কমিশনারেট থেকে ইউডিতে সব বিবিএলসির বিবরণ সংযোজন না থাকলে ভ্যাট আদায়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করছে। এ কারণে জটিলতা হচ্ছে এবং বন্ড লাইসেন্সধারী সব রফতানিমুখী পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানকে এ ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, বিজিএমইএ’র ভ্যাট ও বন্ডসংক্রান্ত জটিলতাগুলো সমাধানে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিজিএমইএ’র প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে। শিগগিরই এ সংক্রান্ত আদেশ হতে পারে।

এদিকে তৈরি পোশাক খাতের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে- এইচএস কোড সংক্রান্ত। বন্ড লাইসেন্সে আমদানি পণ্যের এইচএস কোড উল্লেখ না থাকলে সেগুলো খালাসে বিলম্ব হচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে মালামাল খালাস করা যায় না। এ কারণে রফতানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে এনবিআরের সঙ্গে ওই বৈঠকে বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়।

বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতার চাহিদা ও ফ্যাশনের দ্রুত পরিবর্তনের ফলে পোশাকে নতুন নতুন উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক সময় ক্রেতা বিনামূল্যে এসব উপকরণ সরবরাহ করে। কিন্তু বন্ড লাইসেন্সে এসব উপকরণের এইচএস কোড উল্লেখ না থাকায় বন্দর থেকে তা খালাস করতে গেলে জটিলতায় পড়তে হয়।

যেমন বর্তমানে ক্রেতারা নিরাপত্তা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি পোশাকের সাথে সিকিউরিটি ট্যাগ ও এলার্ম সংযোজন করছে। এগুলো বিনামূল্যে বা মূল্য পরিশোধ করে রফতানিকারককে সরবরাহ করা হয়।

এ ধরনের পণ্য বা উপকরণ ইউডিতে উল্লেখ থাকার পরও বন্ড লাইসেন্সে এইচএস কোড না থাকায় ঢাকা কাস্টম হাউস থেকে ছাড় করা হচ্ছে না। বন্ড লাইসেন্সে এ জাতীয় পণ্যের এইচএস কোড সংযোজনের আবেদন করা হলেও তা করা হচ্ছে না, অথবা সংযোজনে প্রচুর সময় লাগছে। ফলে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এছাড়া বৈঠকে অডিটের জন্য দলিলাদি জমার সময়সীমা তিন মাসের পরিবর্তে ছয় মাস করার প্রস্তাব দিয়েছে বিজিএমইএ। এর যৌক্তিকতায় বিজিএমএই বলছে, রফতানির পর ইজিএম পেয়ে পাস বইয়ে রফতানির তথ্য এন্ট্রি, রফতানির পরে ব্যাংকের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবাসিত হওয়া এবং ব্যাংক থেকে পিআরসি পেতে অনেক সময় লাগে।

ডেফার্ড পেমেন্ট প্রত্যাবাসনের জন্য অনেক ক্ষেত্রে তিন-চার মাস সময়ের প্রয়োজন হয়। এসব দলিলাদি জমা দিতে না পারলে অডিট করা যায় না। তাই বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্সিং বিধিমালা সংশোধন করে কাগজপত্র জমার সময়সীমা তিন মাসের পরিবর্তে ছয় মাস করা প্রয়োজন।

এতে রফতানি খাত উপকৃত হবে। একই সঙ্গে অডিট কার্যক্রম সহজ করার তাগিদ দিয়েছে বিজিএমইএ।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, অডিট, ইউডি-বহির্ভূত পণ্য ব্যবহারে নোটিশ জারি, বন্ড লাইসেন্সে এইচএস কোড সংযোজনসহ সমস্যাগুলো নিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এগুলো সমাধান হলে রফতানি কার্যক্রমে আরও গতি আসবে।

তিনি বলেন, বন্ডের অহেতুক হয়রানি দূর করতে অডিট কার্যক্রমকে অটোমেশন করতে হবে। আমদানি, রফতানি, পিআরসি ঠিক থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাইসেন্স নবায়ন করার বিধান চালু করতে হবে।

বৈঠকে ভ্যাটের জটিলতার কথাও আলোচনা হয়। বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়, ভ্যাট আইনের ধারা ৩ এর উপ-ধারা ২(ক) অনুযায়ী, রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের আমদানি ও রফতানি ভ্যাটমুক্ত। কিন্তু উৎপাদনের স্বার্থে স্থানীয়ভাবে কিছু পণ্য ও সেবা গ্রহণ করতে হয়। এসব পণ্য ও সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়নি।

এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- সাব-কন্ট্রাক্টরের খরচ, কুরিয়ার বা এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিস, মোটরগাড়ির গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপ, ছাপাখানা, অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং ফার্ম, আর্কিটেক্ট, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার বা ডেকোরেটর, ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম।

এসব সেবা গ্রহণ করার জন্য বিগত ৫ বছরের বকেয়া ভ্যাটসহ ভ্যাট দাবি করা হচ্ছে। ভ্যাট গোয়েন্দা থেকে প্রতিনিয়ত নোটিশ জারি করা হচ্ছে।

ভ্যাটের নোটিশ পাঠানো নিয়ে প্রশ্ন তুলে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, তৈরি পোশাক শিল্প বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণ করে। কিন্তু ভ্যাটের জন্য ওই সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে না ধরে পোশাক শিল্পকে ধরা হচ্ছে। এনবিআর যদি ভ্যাট আদায় করতে চায়, তাহলে সেবা প্রদানকারীর কাছ থেকে আদায় করুক। এতে বিজিএমইএ’র আপত্তি নেই।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×