‘মাল্টি ক্লায়েন্ট’ জরিপের ফাঁদে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান

  মুজিব মাসুদ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান
সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান। ছবি: সংগৃহীত

‘মাল্টি ক্লায়েন্ট’ জরিপের ফাঁদে আটকা পড়েছে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ফাইলটি। অভিযোগ আছে, সরকারের ভেতর ও বাইরে বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির শিকার একটি সিন্ডিকেটের ধারণা ‘মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভে’ ছাড়া সমুদ্রে তেল-গ্যাসসহ সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধানে যাওয়া বৃথা।

এ সিন্ডিকেটে রয়েছেন কতিপয় পেশাজীবী আমলা, দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী চক্র ও এ খাতের বিশেষজ্ঞ একটি মহল। অথচ বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দুটি দেশ মিয়ানমার ও ভারত ‘মাল্টি ক্লায়েন্ট’ সার্ভে ছাড়াই নিজ নিজ সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান শুরু করেছে এবং বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সন্ধানও পেয়েছে। মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমানাসংলগ্ন একাধিক ব্লক থেকে গ্যাস উত্তোলনও শুরু করছে।

জানা গেছে- শিল্প, বাণিজ্যসহ সব খাতে চলছে জ্বালানির জন্য হাহাকার। ঘাটতি মেটাতে ৪ গুণ বেশি দামে গ্যাস আমদানি হচ্ছে। কিন্তু দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে গতি নেই। স্থলভাগে কিছু কাজ হলেও সমুদ্রে একবারেই নজর নেই। বছরের পর বছর ঝুলে আছে দেশের বিশাল সমুদ্রসীমায় খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান কার্যক্রম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে দ্রুত ও ব্যাপক শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান সমস্যা হল প্রাথমিক জ্বালানিস্বল্পতা।

জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম যুগান্তরকে বলেন, প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে তাদের সীমানায় তেল-গ্যাস আবিষ্কারের পাশাপাশি উত্তোলনও করছে।

সেখানে বাংলাদেশ গত ৪ বছর ধরে একটি জরিপ কাজ শুরুই করতে পারেনি। দু’বার দরপত্র ডেকেও নির্বাচিত কোম্পানিকে কার্যাদেশ দেয়া যায়নি। সমুদ্রের ব্লকগুলোতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে না। এর আগে কয়েক দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেও পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত না থাকায় ভালো সাড়া মেলেনি।

গভীর সমুদ্রে জরিপের জন্য জাহাজ কেনা বা ভাড়ার বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমাসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে ২০১২ সালের ১৪ মার্চ। তারপর প্রায় ৭ বছর কেটে গেছে।

আর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমাসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে ২০১৪ সালের ৭ জুলাই। তারপর কেটে গেছে সাড়ে ৪ বছরের বেশি। এতদিন ধরে বাংলাদেশ শুধু ‘মাল্টি ক্লায়েন্ট’ সার্ভের পেছনেই ছুটে চলেছে।

জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যদি এখনই সিদ্ধান্ত নেয় ‘মাল্টি ক্লায়েন্ট’ সার্ভে করবে, তাহলেও এর সব আনুষঙ্গিকতা শেষ করতে অন্তত ২ বছর লাগবে। এরপর যে কোম্পানিকে দিয়ে সার্ভে করাবে, তারা নিজ খরচে সার্ভে করবে ঠিকই। কিন্তু অন্তত ১৫ বছর প্রাপ্ত সব তথ্যের মালিকানা থাকবে তাদের। এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাও সেই তথ্য না কিনে ব্যবহার করতে পারবে না।

পেট্রোবাংলার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, যে কোম্পানি সার্ভে করবে তারা আগ্রহী বিদেশি কোম্পানির কাছে তাদের প্রাপ্ত তথ্য বিক্রি করবে। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনো কোম্পানি সম্ভাবনাময় মনে করলে শুধু তখনই তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আসতে পারে।

এক্ষেত্রে যদি কোনো কোম্পানি আসেও সরকারের সঙ্গে তাদের সমঝোতা এবং চুক্তি অনুযায়ী কাজ শুরু করতে লাগবে আরও অন্তত ৫ বছর। অর্থাৎ সরকারের ‘মাল্টি ক্লায়েন্ট’ সার্ভের এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জ্বালানি অনুসন্ধানের বাস্তব কাজ শুরু করতে অন্তত ৭ বছর লেগে যাবে।

পেট্রোবাংলার অপর একটি সূত্র জানায়, ‘মাল্টি ক্লায়েন্ট’ সার্ভে ছাড়া মিয়ানমার ও ভারতের পদ্ধতি অনুসরণ করলে ১ বছরের মধ্যে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা সম্ভব।

এক্ষেত্রে মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরে তাদের ২০টি ব্লকে ১৩টি আন্তর্জাতিক কোম্পানির মাধ্যমে পিএসসি চুক্তি করে এ-৪, এ-৫, এ-৬, এ-৭, এ-৯, এডি-২, এডি-৩, এডি-৫, এডি-৭, এডি-১১, এম-১১, এম-১২, এম-১৩, এম-১৪ ব্লকে টুডি এবং থ্রিডি সিসমিক সার্ভে ও কূপ খননের মাধ্যমে ৪টি গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করে।

তার মতে, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে একটি কোম্পানি ২টি উন্নয়ন কূপে নতুন গ্যাসের স্তর (৪৮০০ মিটার) আবিষ্কার করেছে যা বাংলাদেশের অগভীর, গভীর সমুদ্র ও সমুদ্র তীরবর্তী এলাকার তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও প্রাপ্তিকে আরও সম্ভাবনাময় করেছে।

পেট্রোবাংলার এ কর্মকর্তা বলেন, ১৯৮৯ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরে ১০টি ব্লক ৯টি বিদেশি কোম্পানিকে প্রদান করে এবং ২টি গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করে।

২০১৩ সালে মিয়ানমার ৩০টি অফশোর (গভীর সমুদ্রে) ব্লকে হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রমের পদক্ষেপ গ্রহণ করে ৪টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। মিয়ানমার এখন এ প্রক্রিয়াকে আরও বড় পরিসরে শুরু করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমাও তেল-গ্যাসের জন্য সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র। তাদের মতে, ১৯৬৯-১৯৭৬ সাল পর্যন্ত জাপান, জার্মান এবং মিয়ানমারের পৃথক ৩টি কোম্পানি বঙ্গোপসাগরে সিসমিক সার্ভে এবং অনুসন্ধান কূপ খনন করেছে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে ৮টি বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে ৩১ হাজার লাইন কিলোমিটার ভূকম্পন জরিপ এবং ৭টি অনুসন্ধান কূপ খনন করে ১টি গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করেন। তাদের মতে বঙ্গবন্ধুর এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে সমুদ্রের চিত্র পাল্টে যেত এতদিনে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগর ও তার তীরবর্তী এলাকার প্ল্যাটফর্ম সীমার মধ্যে ইতিমধ্যে দেশের সাতটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলো হল- অনশোর এলাকায় শাহবাজপুর, ভোলা উত্তর, বেগমগঞ্জ, সুন্দলপুর, ফেনী আর অফশোর ওয়েল কুতুবদিয়া এবং সাঙ্গু।

বিভিন্ন জরিপে ইতিমধ্যে বরিশাল (মুলাদি), ভোলা, নোয়াখালী (বেগমগঞ্জ, সুন্দলপুর), হাতিয়া, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রামসহ (সাঙ্গু, কুতুবদিয়া) দক্ষিণাংশে হাইড্রোকার্বন জমা থাকার নিদর্শন প্রমাণিত হয়েছে।

ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এ অঞ্চলের হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধান খুব নিরাপদ এবং নিশ্চিত। টেকটনিক মুভমেন্টের কারণে বাংলার এ অঞ্চলগুলো উঁচু ও নিচু হয়ে গেছে যা বেঙ্গল বেসিনের আওতাভুক্ত ।

ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশের পাহাড়ি, দ্বীপ, সমুদ্র ও সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় একই সময়ে গ্যাস জেনারেশন হয়েছে। টেকটনিক কারণে চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চল থ্রাস্ট ও চ্যুতির জন্য উপরে উঠেছে এবং হাইড্রোকার্বনযুক্ত ফরমেশনে ফাটল সৃষ্টির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে ভূপৃষ্ঠে গ্যাস নির্গত হতে দেখা যাচ্ছে।

অপরদিকে, বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত অফশোর, দ্বীপ এবং নিকটবর্তী এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে বিশাল সেডিমেন্ট জমা হয়েছে যা গ্যাসের আধারকে সুরক্ষিত করেছে এবং হাইড্রোকার্বন উপস্থিতির জন্য এ ধরনের গ্যাস আধারের পুরুত্ব সঠিক।

অগভীর সমুদ্র এবং দ্বীপ এলাকার চেয়ে গভীর সমুদ্রের পানির গভীরতা ৪০০-১০০০ মিটারের বেশি হওয়ায় হাইড্রোকার্বনের আধার নিরাপদ থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কেননা গভীর সমুদ্রে টেকটনিক ক্রিয়া তুলনামূলক কম।

ভূতাত্ত্বিক এবং ভূপদার্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় হাইড্রোকার্বন প্রাপ্তির বৈশিষ্ট্য এক ও অভিন্ন। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর এবং বাংলাদেশের হাতিয়ায় খননকৃত সব কূপেই গ্যাস পরিলক্ষিত হয়।

যার ৮০ শতাংশ আবিষ্কৃত বাণিজ্যিক গ্যাস ও ২০ শতাংশ কূপ খননকালীন গ্যাস পাওয়া গেছে। তবে ভূতাত্ত্বিক জটিলতার কারণে সঠিকভাবে কূপ পরীক্ষণ করা যায়নি। এ অবস্থায় এখনই জরুরি ভিত্তিতে এসব কাজের উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×